প্রচ্ছদ চিত্র

আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা: হিটলার কি দূরদর্শী ছিলেন নাকি ভুল?

4.1
(14)
Bookmark

No account yet? Register

১৯৪১ সালের ডিসেম্বর, একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত যখন পৃথিবীর দুই প্রান্তের যুদ্ধ এক বিন্দুতে মিলে যায়। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানিজরা আমেরিকান নৌবহর পার্ল হার্বারে আক্রমণ করে। অন্যদিকে তার চার দিন পর হিটলার আটলান্টিক মহাসাগরে আমেরিকার বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

আমেরিকাকে এই যুদ্ধে টেনে আনার এই পদক্ষেপটি হিটলারের সবচেয়ে গোলমেলে সিদ্ধান্ত বলে ধারণা করা হয়। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান একটি দেশ ছিল আমেরিকা। এমন একটি দেশকে আক্রমণ করা বা যুদ্ধ শুরু হবার পর তার থেকে প্রতিরক্ষার কোনো কৌশল ছাড়া হিটলার কেন এ যুদ্ধে টেনে এনেছিলেন সেটা একটা বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে এমন একটা সময়ে এই কাজটা তিনি করেন যখন তিনি ইউরোপকে প্রায় হাতে নিয়ে আসছিলেন।

ঐ বছরই রাশিয়াতে সফলভাবে আক্রমণ করার পর যখন সোভিয়েত রেড আর্মিকে জার্মানরা সবে প্রতিহত করা শুরু করেছে ঠিক তখনই আমেরিকাকে, যে পুরোটা সময় অন্য প্রান্তে ঘুমিয়ে ছিল তাকে জাগিয়ে তোলার যুক্তি কী? জার্মানির ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন জুয়া খেলাকে কি কেবল হিটলারের আত্মগরিমার (Rampant megalomania) বহিঃপ্রকাশ বা পাগলামি বলে চালিয়ে দেওয়া যায় নাকি এর পিছনেও তাঁর কোনো দূরদর্শিতা ছিল?

হিটলার অনুসারীদের কাছে থেকে সম্মাননা পাচ্ছেন ; চিত্রসূত্র- গেটিইমেজেস
অনুসারীরা হিটলারকে সম্মান জানাচ্ছে ; চিত্রসূত্র- গেটিইমেজেস

নাৎসি শাসনের শুরুতে হিটলার যখন তাঁর কমান্ডারদের সাথে যুদ্ধ পরিকল্পনা করে তাতে আমেরিকা বিষয়ক কিছু উল্লেখ করা হয় নি। ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত আমেরিকা জার্মানির ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্বিকার ছিল। কিন্তু ক্রমশ হিটলারের ইহুদি হত্যার খবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেলে আমেরিকার জনগণের মাঝে নাৎসি বাহিনীর প্রতি যে বিদ্বেষের ফুলকির সূত্রপাত হয়, যাতে ঘি ঢেলে দেয় ১৯৩৯ সালে Reichstag এ হিটলারের দেওয়া তিন মিনিটের বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের প্রতি সূক্ষ্ম কটাক্ষ। রুজভেল্ট একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন হিটলার ও মুসোলিনিকে যাতে তারা ৩০ টি দেশকে আক্রমণ না করে, কিন্তু এই বিষয়টি হিটলার ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে দেওয়া বক্তব্যে যেভাবে কটাক্ষ করে উড়িয়ে দেন তাতেই সবাই নিশ্চিত হয়ে যায় যে আমেরিকার সাথে তাঁর সমঝোতার যাবার মানসিকতা নাই।

আমেরিকা কি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত?

জার্মানির যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যথেষ্ট বাধা পায় তাঁর দেশের নাগরিকের থেকে। সে জন্যই ১৯৪০ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নীরব দর্শক। এমনকি নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে তিনি এমন প্রতিশ্রুতিও দেন যে-

Your boys are not going to be sent into any foreign wars

তবে রুজভেল্ট বরাবরই চেষ্টা করছিলেন এই হিটলারের বিরুদ্ধে যাবার; কারণ তিনি ছিলেন অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট।

হিটলার ১৯৪১ এর ডিসেম্বরে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে রুজভেল্টকে কিছুটা বিপাকে ফেলেন। কারণ ঐ সময়ে কংগ্রেস কোনভাবেই এই যুদ্ধে জড়াতে চায় নি।

কিন্তু সত্যি বলতে ইউরোপের যুদ্ধে শুরু থেকেই আমেরিকার পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল বিশেষ করে ইংল্যান্ডের সাহায্যে। জাপান আর জার্মানির মধ্যে যে তথ্য বিনিময় হচ্ছিল তার সিগন্যাল আরও আগেই আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স জেনে গিয়েছিল।

তাই রুজভেল্ট জানতেনই যে তাঁদের যুদ্ধ কেবল প্রশান্ত মহাসাগরে বেশি দিন সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাছাড়া ১৯৪০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আমেরিকা চাইলেও যুদ্ধে যেতে পারত না কারণ বড় একটা বাধা ছিল কংগ্রেস। আর এই বছরেই আমেরিকান আর্মি পৃথিবীতে ২০তম স্থানলাভ করে। হিটলার জানত বড়জোর এক বা দেড় বছরের মধ্যেই আমেরিকা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতো, তাই তাঁর হিসেবে পার্ল হার্বারের পরপরই যুদ্ধ ঘোষণা অযৌক্তিক নয়। 

প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যুদ্ধ ঘোষণা করছেন - যে যুদ্ধ এক অর্থে হিটলার এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ; চিত্রসূত্র- গেটিইমেজেস
প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যুদ্ধ ঘোষণা করছেন ; চিত্রসূত্র- গেটিইমেজেস

জাপান কেন আমেরিকার বিরুদ্ধে ছিল?

জাপান চেয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের অবস্থান শক্তপোক্ত করতে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সম্পদের ঘাটতি নিয়ে একমাত্র সীমারেখা বাড়ানো ছাড়া জাপানের পক্ষে সম্ভব ছিল না বিশ্বে প্রথম সারির ক্ষমতাবান দেশের কাতারে আসা। চল্লিশের দশকের শুরুতে পূর্ব এশিয়ার কোরিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণে ফ্রান্সের সীমানা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল আর চীনে তখনও যুদ্ধ চলছিল

আরও পড়ুন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: একটি হত্যা ও ২ কোটি মানুষের মৃত্যু

কিন্তু আমেরিকা আরও আগে থেকেই জাপানের বিস্তৃতিকে বিপজ্জনক মনে করে যুদ্ধের জন্য দরকারি তেল আর অন্যান্য সামগ্রীর সাপ্লাই বন্ধ করে দেয়। চীনের যুদ্ধ স্থগিত হয়ে যায়, তাই জাপানের জন্য আমেরিকার নৌবহর আক্রমণ করা ছাড়া আর কোনো সহজ পথ খোলা ছিল না।

পার্ল হার্বারে আক্রমণ; চিত্রসূত্র- উইকিমিডিয়া
পার্ল হার্বারে আক্রমণ; চিত্রসূত্র– উইকিমিডিয়া

হিটলার যে বিকল্প পথ নিতে পারতেন

ফ্রান্সকে জয় করার পর সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণের মধ্যেই হয়তো একটি বিকল্প ছিল। ইংল্যান্ড তখনও যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও হিটলার আর তাঁর নৌবাহিনী তাঁকে জোরালো আক্রমণ করার ঝুঁকি নিতে চায় নি কারণ আমেরিকা তাহলে চুপ করে থাকতো না। জার্মানরা যদি সোভিয়েতকে যত দ্রুত সম্ভব হটিয়ে ইংল্যান্ডকে নেগোশিয়েট করাতে পারত তাহলে হয়তো আমেরিকা তার গর্ত থেকে বের হতো না; জার্মানি যুদ্ধটি জিতে যেত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন একটি পোস্টার যেখানে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেলট ও উইন্সটন চার্চিলকে দেখা যাচ্ছে ; চিত্রসূত্র- গেটিইমেজেস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন একটি পোস্টার যেখানে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেলট ও উইন্সটন চার্চিলকে দেখা যাচ্ছে ; চিত্রসূত্র- গেটিইমেজেস

তবে ততটা সহজ ছিল না এসব। ৪১ এর মার্চে আমেরিকান পার্লামেন্টে পাশ করা “লেন্ড-লিজ বিল” (Lend-Lease bill) অনুযায়ী আমেরিকা অন্য যেকোনো দেশকে যুদ্ধ সরঞ্জাম দিতে পারবে যদি ঐ দেশকে অরক্ষিত মনে হয়- যা আদতে ইংল্যান্ডকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই।

শুধু তাই নয়, আমেরিকানরা Victory Program নামে একটি পরিকল্পনা হাতে নেয় যেটা অনুযায়ী ১৯৪৩ সালের মধ্যে তাদের পাঁচ মিলিয়নের একটি আর্মি তৈরী হবার কথা ছিল।

ওদিকে আটলান্টিকে আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজ আর জার্মান ইউবোট বেড়েই চলেছিল, যাকে বলা যায় এক প্রকার ‘অঘোষিত যুদ্ধ’। হিটলার আটলান্টিক ছেড়ে অন্য কোনো দিকে সরতে পারছিল না তাই সে জাপানকে দিয়েই প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড় তুলতে চেয়েছিল কারণ জাপান, ইতালি আর জার্মানির মধ্যে একটি formal agreement ছিল যার নাম Tripartite Pact। পার্ল হার্বারের পরপরই কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই হিটলার আটলান্টিকেও আক্রমণ শুরু করে দেয়।

হিটলার: যাঁর পরিকল্পনায় ছিল ত্রুটি

জাপান সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নি। তাদের জন্য এটা ছিল মারাত্মক ঝুঁকি নেওয়া।

১৯৩৯ সালের মঙ্গোলিয়ান বর্ডারে জাপানিজ আর্মির যে ভয়ঙ্কর পরাজয় ঘটে সোভিয়েত আর মঙ্গোলদের সমবেত আক্রমণে তারা সেটা ভুলে নি। তাছাড়া যুদ্ধ শুরু করতে করতে আগস্ট, শেষ হতে হতে অক্টোবর তথা পুরোদমে সাইবেরিয়ান শীতকাল। ঐ অবস্থায় জাপানিজদের মধ্যে কোনো আত্মবিশ্বাসই হিটলার তৈরী করতে পারে নি।

এটা সত্যি যে জাপান যদি সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেত তাহলে হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পূর্ণ অন্যদিকে মোড় নিত, ঠিক যেমনটা ঘটেছিল পার্ল হার্বার আক্রমণে।

আমেরিকা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে না জড়াতো তাহলে কেমন হতো আজকের পৃথিবী

এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন। তবে জাপানের সম্ভাবনা ছিল পূর্ব এশিয়াতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান লাভ করার। আর সেক্ষেত্রে ইউরোপের যুদ্ধ হয়তো আরও অনেক বছর গড়াতো। আমেরিকা হিটলারকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল, সোভিয়েতও তাদের প্রচুর ক্ষতি সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ইংল্যান্ড প্রায় পতনের মুখ থেকে ফেরত আসে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে।

জার্মান আর্মি সোভিয়েত ইউনিয়নের অকল্পনীয় ক্ষতি সাধন করলেও তাঁকে হারাতে পারে নি যার অন্যতম কারণ ছিল ঐ সময় শুধু সোভিয়েতের উপর মনোযোগ না দিয়ে আমেরিকার দিকে যুদ্ধকে টেনে নেওয়া। ফলে ইউরোপ তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়।

তড়িঘড়ি করে নেওয়া এ সিদ্ধান্তকে হিটলারের পাগলামো বলা যায় কিনা নিশ্চিত না, তবে অবশ্যই এটাও হিটলারের আত্মম্ভরিতা আর ক্ষমতার জুয়া খেলারই একটা অংশ ছিল। যা শুধু জার্মান বা আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বেরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: theweek.in

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা: হিটলার কি দূরদর্শী ছিলেন নাকি ভুল?
    করবী কানন শিশির
    5 Mar 2021
    8:42pm

    অসাধারণ লেখনী!!! কত সহজ বিশ্লেষণ!!! আমি সত্যিই অভিভূত। We want more from you ❤️

    1
    0
    .
    6 Mar 2021
    12:23am

    এই বিষয়টি আমার নিজের কাছেও খুব জটিল লাগতো সত্যি বলতে, সহজ ভাষায় কেউ বুঝিয়ে দেয় নি বা কোথাও লেখা পাই নি। তাই নিজেই চেষ্টা করলাম যাতে অন্যরা সহজে বুঝতে পারে ভিতরের রাজনীতি টা
    অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে

    1
    0

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!