টার্নার সিনড্রোম: ক্রোমোজমের অস্বাভাবিকতাই যখন বন্ধ্যাত্বের কারণ

5
(5)
Bookmark

No account yet? Register

জীবন জুড়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততা। জীবন কখনও মধ্য গগনে, সূর্যের প্রখর তাপে মনের জমি কখনও রূক্ষ, শুষ্ক। চাই একটু নরম, আর্দ্রতা, অকৃত্রিম ভালবাসার শীতল ছায়া। ছােট খাটো গুল্ম নয়, চাই বট বৃক্ষের ন্যায় বিশাল ছায়া। যার তলে ক্লান্তি ধুয়ে মুছে নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা জাগে। এই জীবনেই কত বিচিত্র ঘটনা আমাদের মাঝে ঘটে যায়, যা কখনো আমরা ভাবি না, বোঝা সত্ত্বেও ভাবতে চাই না। আজ এমন এক ঘটনা নিয়ে লিখতে বসেছি যার নিত্য বাস্তবতার সাথে আমরা পরিচিত কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখা খুব কম জনেই জানি।  

মানুষ নামক প্রাণীটি মহান সৃষ্টিকর্তার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। শতাব্দী থেকে শতাব্দী চিন্তাভাবনার পর আমরা জানতে পেরেছি এই মানুষ নামক জীবটির দেহে ২৩ জোড়া বা  ৪৬ টি  ক্রোমোজোম রয়েছে। এই নিরেট সত্য কথাটি  আমরা প্রায়  কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু পৃথিবীর একটি অপ্রিয় সত্য কিংবা প্রিয় কথা হচ্ছে সবকিছুর একটা ব্যতিক্রমী  দিক আছে। তেমনি এই মানুষ নামক প্রাণীর দেহ গঠনেও কখনো কখনো ব্যতিক্রম ঘটনা না চাইতেও ঘটে যায়।

হ্যাঁ, আমাদের মাঝে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের ছেচল্লিশটির জায়গায় পঁয়তাল্লিশটি ক্রোমােজ়োম থাকে। আর এই পুরো ঘটনাটিকে বৈজ্ঞানিক ভাবে টার্নার সিনন্ড্রোম বলা হয়। Homo sapiens বা  মানুষের দেহে ৪৫টি ক্রোমােজ়োম কিভাবে সম্ভব! ব্যাপারটা শুনতে একটু অদ্ভূত, অসম্ভব এবং অবাস্তব লাগছে, তাই না?  জানতে ইচ্ছুক হলে এই নিবন্ধটি আপনার জন্যই। শেষ অবধি ধৈর্য ধরে সাথেই থাকুন- 

টার্নার  সিনড্রোম একটি ক্রোমোজোমের রোগ। এটি বিশেষত মহিলাদের আক্রান্ত করে। মানুষের প্রতিটি কোষে ২৩ জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম থাকে, যেগুলো লিঙ্গ নির্ণয় করে থাকে। মহিলাদের ক্ষেত্রে, এই ক্রোমোজোমের জোড়াকে XX বলে, এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে, এই জোড়াকে বলা হয়  XY। মহিলাদের ক্ষেত্রে কোনো একটি X ক্রোমোজোমে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে টার্নার সিন্ড্রোমের সৃষ্টি হয়।

আবিষ্কার ও নামকরণ 

হেনরি  টার্নার। চিত্রসূত্র: Cambridge.org

১৯৩৮ সালে হেনরি টার্নার নামক একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট এটি প্রথম বর্ণনা করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিষয়টিকে টার্নার সিনড্রোম নামকরণ করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে অক্সফোর্ড এবং লন্ডনের গাইয়ের হাসপাতালের ডক্টর চার্লস ফোর্ড এবং তাঁর সহকর্মীদের দ্বারা 45, X karyotype, সম্পন্ন একজন মহিলার প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই  টার্নার সিনড্রোম ধারণাটি বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক সারা সাড়া ফেলে।

আরও পড়ুন: কল্পকাহিনীকে হার মানানো আপেক্ষিক সময়ের তত্ত্ব এবং টুইন প্যারাডক্স 

লিঙ্গ নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া

বিয়ে, একটি সামাজিক ঘােষণা, যার মাধ্যমে দুটি ছেলে মেয়ে একসাথে থাকার সুযোগ পায়। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করার উদ্দেশ্য হিসেবে কালের নিয়মে দম্পতির কোল আলো করে আসে ফুটফুটে সন্তান। সন্তান কে নিয়ে গড়ে ওঠে মা বাবার জীবন, স্বপ্নগুলো। এই হবু সন্তানকে পৃথিবীতে আসার আগে অনেক গুলো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া পাড়ি দিয়ে অবশেষে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে।

মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য দু’টি আলাদা ক্রোমোজোম রয়েছে। এই দুটি ক্রোমােজোমকে বলা হয়  সেক্স ক্রেমােজোম। মানুষের দেহকোষে  মোট ২৩ জোড়া বা ৪৬ টি ক্রোমােজোম রয়েছে। এদের ২২ জোড়াকে বলা হয় অটোজোম আর বাকী ১ জোড়া হলাে সেক্স ক্রোমোজোম। নারীর রয়েছে দুটি সমরূপ সেক্স ক্রোমোজোম যাদেরকে X ক্রোমােজোম বলা হয়। পুরুষেরও দুটি সেক্স ক্রোমােজোম রয়েছে বটে তবে এরা অসমরূপ। এদের একটি হলাে X ক্রোমােজোম ও অন্যটি হলাে Y ক্রোমােজোম ।

ডিম্বাণু। চিত্রসূত্র: Free3D

নারীতে বিদ্যমান X ক্রোমােজোম মিয়োসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে ডিম্বাণু তৈরির সময় দুইটি X ক্রোমােজোম পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অটোজোমের ৪৪ টি ক্রোমােজোমও আলাদা হয়ে ২২ টি করে এক একটি ডিম্বাণুতে অবস্থান নেয়। তার মানে এক একটি ডিম্বাণুতে ক্রোমােজোমের সংখা দাঁড়ায় ২২ + ১= ২৩ টি।

চিত্র: শুক্রাণু। চিত্রসূত্র: Free 3D

একইভাবে পুরুষে X ক্রোমােজোম মিয়ােসিসে বিভাজনের কারণে Y ক্রোমােজোম থেকে আলাদা হয়ে যায়। এখানেও অটোজোমের ৪৪ টি ক্রোমােজোম আলাদা হয়ে ২২ টি করে এক একটি শুক্রাণুতে যায়। স্বাভাবিক ভাবে পুরুষ থেকে উৎপাদিত শুক্রাণুগুলাে হয় দু’রকমের। একটি থাকে X ক্রোমােজোম আর ২২টি অটোজোম ( ২২ + X) আর অন্যটিতে থাকে একটি Y ক্রোমােজোম আর ২২ টি অটোজোম  (২২ + Y) । 

তার মানে একেকটি শুক্রাণুতে ক্রোমােজোমের সংখা দাঁড়ায় ২২ + ১= 2৩ টি। 

চিত্র: মানব ভ্রুণ। চিত্রসূত্র: Free 3D

অতঃপর ডিম্বাণুর সাথে শুক্রাণু নিষেকের মাধ্যমে মিলিত হয়ে জাইগোট গঠন করে। এখানে লক্ষণীয় X ডিম্বাণুর সাথে কোন (X / Y) শুক্রাণু এসে মিলবে তার ওপর নির্ভর করে সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে।

আরও পড়ুন: ভ্যাক্সিন আবিষ্কার: ড. এডওয়ার্ড জেনার এবং মানবজাতির বসন্তজয়

স্বাভাবিক মিয়োসিস কোষ বিভাজন

চিত্র: স্বাভাবিক মিয়োসিস। অলংকরণ: লেখক

আমাদের জনন মাতৃকোষে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মধ্যে মিয়োসিস কোষ বিভাজন ঘটে। মিয়োসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মাতৃকোষটি অর্ধেক হয়ে যায়। ফলে শুক্রাণুর ৪৬ টি বা ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থেকে ২৩ টি করে ক্রোমোজম পৃথক হয়ে যায়। একই ঘটনা ডিম্বাণুর ক্ষেত্রেও ঘটে।

পরবর্তীতে শুক্রাণুর ২৩ ক্রোমোজম এবং ডিম্বাণুর ২৩ ক্রোমোজম নিষেকের মাধ্যমে মিলিত হয়ে জাইগোট গঠন করে। ফলে জাইগোট বা নতুন জীবের ক্রোমোজম সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৬ টি বা ২৩ জোড়া। যা একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের ক্রোমোজম সংখ্যার সমান।

টার্নার সিনড্রোম এর ক্ষেত্রে মিয়োসিস কোষ বিভাজন 

চিত্র: টার্নার সিনড্রোমে মিয়োসিস। অলংকরণ: লেখক

টার্নার  সিনড্রোম এর ক্ষেত্রে মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় কিছুটা ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। মায়ের মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় ডিম্বাণুর ৪৬ টি বা ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থেকে একটি অপত্য কোষে ২৩ টি  ক্রোমোজম পৃথক হলেও অপর অপত্য কোষে ২২ টি ক্রোমোজম স্থান্তরিত হয়। অর্থাৎ একটি ক্রোমোজম X অনুপস্থিত থাকে।

ফলে নিষেকের সময় পিতা থেকে আগত শুক্রাণুর ২৩ টি ক্রোমোজম এবং মাতা থেকে আগত ডিম্বাণুর ২২ টি ক্রোমোজম একত্রে মিলিত হয়ে ২৩+২২=৪৫ ক্রোমোজম বিশিষ্ট জাইগোট গঠন করে। এই জাইগোট থেকে সৃষ্ঠ জীবের ক্রোমোজম সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ টি। 

টার্নার সিনড্রোমে মিয়োসিস। অলংকরণ: লেখক

একইভাবে বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। যেমনঃ মায়ের ডিম্বাণুর ঠিকঠাক কোষ বিভাজন হলেও পিতার মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় ৪৬ টি ক্রোমোজম থেকে একটি অপত্য কোষে ২৩ টি  ক্রোমোজম পৃথক হলেও অপর অপত্য কোষে ২২ টি ক্রোমোজম স্থান্তরিত হয়। ফলে নিষেকের পর এক্ষেত্রেও জাইগোটে ক্রোমোজম সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ টি। এখানে উল্লেখ্য যে শুধুমাত্র X ক্রোমোজমের ক্ষেত্রেই উল্লেখিত ঘটনা সম্ভব।

এখন এই পুরো ঘটনার ক্যারিওটাইপ যদি আমরা দেখি তাহলে সেটি নিচের চিত্রের মতো হবে।

টার্নার  সিনড্রোমের ক্যারিওটাইপ। চিত্রসূত্র: Medline plus

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এরকম জাইগোট থেকে ভূমিষ্ঠ শিশু ছেলে হবে নাকি মেয়ে? উত্তর দেওয়া একটু জটিল হলেও এটা অনুমেয়, যেহেতু X মেয়েদের বৈশিষ্ট্য তাই অনাগত শিশুটি মেয়ে হয়েই জন্ম নিবে।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে, টার্নার  সিনড্রোম কোনো বংশগত ব্যাধি নয়। কিন্তু বিরল ক্ষেত্রে, এই  সিনড্রোম মা বাবার কাছ থেকে আসতে পারে।

টার্নার  সিনড্রোমে আক্রান্ত নারীর ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা 

টার্নার  সিনড্রোম  প্রতি ২০০০ জীবিত জন্মগ্রহণকারী শিশুর মধ্যে থেকে প্রায় 1 জনকে প্রভাবিত করে । টার্নার  সিনড্রোম আক্রান্ত রোগীকে  সনাক্ত শনাক্ত করা বেশ কঠিন তবে কিছু লক্ষণ দেখে অনেকাংশেই নিশ্চিত হওয়া যায়।লক্ষণগুলো হলো:-

১. ছোট গলা।

২. জন্মের সময় হাত ও পা ফুলে থাকা।

৩. নরম নখ, যেগুলো উপরের দিকে ঘুরে যায়।

৪. কানের গঠনে অস্বাভাবিকতা।

৫. উচ্চ রক্তচাপ।

৬. দুর্বল হাড়ের গঠন।

৭. দৈহিক উচ্চতা কম হওয়া।

৮. অনুন্নত ডিম্বাশয়ের কারণে বন্ধ্যাত্ব।

৯. মাসিক না হওয়া।

১০. আনুষঙ্গিক লিঙ্গগত বৈশিষ্টের কম বৃদ্ধি হওয়া।

আরও পড়ুন: স্টেথোস্কোপ আবিষ্কার: মেয়ে ভীতি থেকে যে যন্ত্রের জন্ম

কিভাবে টার্নার সিনড্রোম নির্ণয় ও চিকিৎসা করা হয়?

জন্মের আগে বা জন্মের সময় শিশুর মধ্যে কিছু শারীরিক গঠনের অস্বাভাবিকতাকে দেখে এই  সিনড্রোম নির্ণয় করা যেতে পারে।

এছাড়াও টার্নার  সিনড্রোম নির্ণয়ের জন্য অনেকপ্রকার শনাক্তকরণ পরীক্ষা আছে। সেগুলো হল 

  • শারীরিক পরীক্ষা।
  • যৌন হরমোন শনাক্তের জন্য রক্তপরীক্ষা।
  • হার্টের ত্রুটিগুলি পরীক্ষা করার জন্য ইকোকার্ডিওগ্রাম করা।
  • ক্রোমোজোমের পরীক্ষা।
  • জিনগত পরীক্ষা।

তবে বর্তমানে, টার্নার সিনড্রোমের কোনো পরিচিত প্রতিকার নেই। এই চিকিৎসার লক্ষ্য হল উপসর্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা। এর মধ্যে রয়েছে:

১. হরমোনগত চিকিৎসা (ব্যাহত বৃদ্ধিকে পরাস্ত করতে সাধারণত শৈশবেই এটা করা হয়)।

২. ইস্ট্রোজেন প্রতিস্থাপন থেরাপি (হাড়ের ক্ষতি আটকায় এবং যৌবনারম্ভের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে)।

৩. কাউন্সেলিং (উত্তম মনস্তাত্ত্বিক সমন্বয় করে)।

টার্নার সিনড্রোমে স্বাভাবিক জীবনযাপন

টার্নার সিনড্রোমধারী ব্যক্তি একটু মানসিক ভাবে শক্তিশালী হলেই অন্য সকল মানুষের মতো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারেন। এর  কোনও নিরাময় নেই সত্যি কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যবহার করে চাইলেই জীবনযাত্রাকে উন্নত করা সম্ভব।

টার্নার সিনড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চাদের গ্রোথ হরমোন ইঞ্জেকশন দিলে তা যেমন লম্বা হতে সাহায্য করে। একই সাথে এটি যৌবনকালে গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য বিকাশেও সহায়তা করে থাকে। যা স্বাভাবিক জীবনযাপন ফিরিয়ে দিতে অনেকাংশেই সহায়ক।

এছাড়াও টার্নার সিনড্রোমের আক্রান্ত বন্ধ্যা মহিলারা বিজ্ঞানের বিস্ময় আবিষ্কার IVF(In Vitro Fertilization)  এর মাধ্যমে  চাইলেই  সন্তান ধারণ করতে পারেন।

সর্বপরি বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর যুগে টার্নার সিনড্রম শনাক্ত হলেই ভয় নয়, বরং একটু সচেতনা এবং যথোপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতিই এনে দিতে পারে জয়।

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on টার্নার সিনড্রোম: ক্রোমোজমের অস্বাভাবিকতাই যখন বন্ধ্যাত্বের কারণ

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!