বৃত্তাকার শহর বাগদাদ: উত্থান থেকে পতন

মো. যোবায়ের হাসান
4.5
(4)
Bookmark

No account yet? Register

৩০ জুলাই ৭৬২ সাল, আব্বাসি খলিফা আল-মনসুর কাজ শুরু করেন বাগদাদ শহর নির্মাণ করতে।

উমাইয়াদের পতনের পরে, বিজয়ী আব্বাসি শাসকেরা তাদের একটি রাজধানী গঠন করতে চেয়েছিলেন, যেখানে তারা শাসন করতে পারে।

কমপক্ষে দুটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে শহরটির বৃদ্ধি এর অসাধারণ অবস্থান দ্বারা উপকৃত হয়েছিল।

টাইগ্রিস নদীর তীরে কৌশলগতভাবে ও ব্যবসায়ের পথে এটির নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় এটির প্রচুর পরিমাণে জল ছিল।

নির্মাণের প্রথম কয়েক বছর, শহরটিকে কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের রিমাইন্ডার বলা হত!

বাগদাদের একটি এনিমেটেড ছবি
বাগদাদের একটি এনিমেটেড ছবি। উৎসঃ A CityMaker

গোল্ডেন গেট প্রাসাদ

গোল্ডেন গেট প্রাসাদ, খলিফার বাসভবন, যার কাজ ৭৬৩ সালে শেষ হয়েছিল। বাগদাদের কেন্দ্রে অবস্থিত এই প্রাসাদটি ছিল খলিফা এবং তাঁর পরিবারের আবাসস্থল। একটি সবুজ গম্বুজ ছিল যা ৩৯ মিটার উঁচু এবং বর্গক্ষেত্র আকারের অডিয়েন্স চেম্বারটি ছিল গম্বুজটির নীচে, খিলনযুক্ত ছাদ সহ।

শ্রোতাদের চেম্বারের সামনে একটি আলকোভ (দেওয়ালের গায়ে খিলানযুক্ত কুঠরি) ছিল, যা ৪৫ ফুট (১৪ মিটার) উঁচু এবং ৩০ ফিট (৯.১ মিটার) প্রশস্ত একটি খিলান দিয়ে সজ্জিত ছিল।

গোল্ডেন গেট প্রাসাদের একটি এনিমেটেড ছবি
গোল্ডেন গেট প্রাসাদের একটি এনিমেটেড ছবি। উৎসঃ A CityMaker

নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার এক বছর পরে, প্রাসাদটি এবং মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ৭৬৩ সালে, খলিফা আল-মানসুরকে শহরে আবাস গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়।

শহরটি প্রায় 2 কিলোমিটার (1.2 মাইল) ব্যাস হিসাবে একটি বৃত্ত হিসাবে নকশা করা হয়েছিল, যা একে “বৃত্তাকার শহর” হিসাবে পরিচিত করে তোলে।

বাগদাদের উন্নতি

বাগদাদ, দশম শতাব্দীতে এর সর্বোচ্চ জনসংখ্যায় পৌঁছে।

প্রতিষ্ঠার এক প্রজন্মের মধ্যে বাগদাদ শিক্ষা ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

শহরটি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন এবং শিক্ষার একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসাবে উন্নতি লাভ করেছিল।

জ্ঞানের ঘর

“বায়তুল-হিকমাহ” অথবা “জ্ঞানের ঘর” ছিল সর্বাধিক পরিচিত একাডেমীগুলির মধ্যে একটি!

বাগদাদের গ্র্যান্ড লাইব্রেরি নামেও পরিচিত এটি নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম বইয়ের সংগ্রহ ছিল।

বায়তুল-হিকমাহ এর একটি কল্পিত চিত্র
বায়তুল-হিকমাহ এর একটি কল্পিত চিত্র। উৎসঃ 1001 Inventions

যদিও আরবি ভাষা বিজ্ঞানের আন্তঃদেশীয় ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হত, তবুও বাগদাদে কেবল আরবই নয়, পার্সিয়ান, সিরিয়াক, নেস্টোরিয়ান, ইহুদী, আরব খ্রিস্টানও জড়িত ছিল।

৯৩০ সালে কর্ডোভার সাথে যুদ্ধ বাঁধার পরে এটিই সম্ভবত পৃথিবীর বৃহত্তম শহর ছিল।

বেশ কয়েকটি অনুমান অনুসারে, শহরটি এর শীর্ষে থাকা অবস্থায় এতে প্রায় ১০ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দা ছিল!

আরও পড়ুন: ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস: ইতিহাসের পাতায় পাতায় যুদ্ধের ধারাবিবরণী

টাইগ্রিস নদী

টাইগ্রিস নদী, যা বাগদাদের লাইফব্লাড ।

“One Thousand and One Nights” যা “Arabian Nights” হিসাবে বহুলভাবে পরিচিত, এর অনেকগুলি কাহিনী এই সময়ের মধ্যে বাগদাদে সেট করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে টাইগ্রিস নদী
সাম্প্রতিক সময়ে টাইগ্রিস নদী। উৎসঃ Youtube

শহরটি যথাযথতা এবং আকারে এমনকি কনস্ট্যান্টিনোপোলকেও ছাড়িয়ে যাবে।

আব্বাসীয় খলিফাদের অনেকেই শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং প্রাচীন ও সমসাময়িক উভয় সাহিত্যের সংগ্রহ উপভোগ করেতেন।

দিনের বেলা বাগদাদ একটি ব্যস্ত শহর ছিল এবং রাতে ছিল অনেক আকর্ষণীয়।

সেখানে সরাইখানার নাচ-গান এবং ট্যাভর (এমন একটি জায়গা যেখানে লোকেরা মদ্যপ পানীয় পান করতে এবং খাবার সরবরাহ করতে জড়ো হয়) , ব্যাকগ্যামন এবং দাবা করার জন্য হল, লাইভ নাটক, কনসার্ট এবং অ্যাক্রোব্যাট ছিল।

তাতারদের আক্রমণ, ৬১৭ হিজরি

আগের বছরই তাতারদের (মঙ্গোলদেরই একটি নাম) হাতে পতন ঘটেছে খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের। তাতার ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

ইবনুল আসীর লিখেছেন,

“মুসলমানদের মাঝে তাতার ভীতি এত প্রকট ছিল যে, একজন তাতার একটি গলিতে প্রবেশ করে, সেখানে একশজন মুসলমান ছিল। সেই তাতার একে একে তাদের প্রত্যেককে হত্যা করে। কিন্তু তারা কেউই তাকে প্রতিরোধ করার চিন্তাও করেনি।” ইবনুল আসীর

৬১৭ হিজরিতে তাতাররা আজারবাইজানের একাংশ দখল করে ফেলে। এসময় শোনা যায় তারা উত্তর ইরাকের মসুলে আক্রমণ করবে।

অভিনীত মঙ্গোল সৈন্য।
অভিনীত মঙ্গোল সৈন্য। উৎসঃ Pinterest

দূর্বল আব্বাসি খলিফা নাসির লিদিনিল্লাহ এবার তাতারদের ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেন। তিনি তাতারদের মোকাবেলা করার জন্য বাহিনী গঠন করেন। তার সেই বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল মাত্র ৮০০ জন! অনেক চেষ্টা করেও তিনি এর চেয়ে বেশি সেনা যোগাড় করতে পারেননি। এই ক্ষুদ্র বাহিনী দেখে তাতাররাও বিশ্বাস করতে পারেনি। তারা ভেবেছিল এই ছোট বাহিনীর পেছনে আব্বাসিদের মূল বাহিনী এগিয়ে আসবে। তাই তারা লড়াই না করেই ফিরে যায়!

এ ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। একজন খলীফা কেন মাত্র ৮০০ জন সৈন্য সংগ্রহ করবে?

এক বছর ধরে মুসলিম ভূখন্ডে তাতাররা যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল, তা নিয়ে বাগদাদের লোকজনের কোনো চিন্তা বা পেরেশানি ছিল না। বরং আমিরদের কেউ কেউ এর থেকে বেশি পেরেশান ছিল তাদের গায়ক গোলামদের নিয়ে। একজন তো বলেই বসেছিল,

“এই গোলামকে হারানো আমার জন্য বাগদাদ হারানোর চেয়েও বেশি কষ্টকর। এমনকি ইরাক হাতছাড়া হলেও আমার এতটা কষ্ট লাগবে না।”

খিলাফাহর রাজধানী ব্যস্ত ছিল মদ-নারী ও গানবাজনা নিয়ে। হালাকু খান যখন মসুলের আমির বদরুদ্দিনের কাছে মিনজানিক (এক প্রকার যুদ্ধাস্ত্র) চেয়ে দূত পাঠিয়েছিল, একই সময় খলিফা মুস্তাসিম দূত পাঠিয়ে কয়েকজন গায়িকা দাসী চেয়েছিলেন! এমনকি তাতাররা যখন বাগদাদের কাছে চলে এসেছে খলিফা মুস্তাসিম তখনো আরাফা নামক দাসীর নাচ দেখতে ব্যস্ত।

বাগদাদ অবরোধ, ১০ ফেব্রুয়ারী ১২৫৮

১২৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাগদাদ চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলদের দ্বারা দখল হয়।

বাগদাদ অবরোধের সময় অনেক মহল আগুন, অবরোধ বা লুটপাটের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়।

মঙ্গোল আক্রমণের একটি কল্পিত চিত্র
মঙ্গোল আক্রমণের একটি কল্পিত চিত্র। উৎসঃ TDB

মঙ্গোলরা খলিফা আল-মুস্তাআসিম সহ শহরের বেশিরভাগ বাসিন্দাকে হত্যা করেছিল এবং শহরের বিশাল অংশ ধ্বংস করে দিয়েছিল।

বাগদাদ ধ্বংসের একটি কল্পিত ছবি।
বাগদাদ ধ্বংসের একটি কল্পিত ছবি। উৎসঃ A CityMaker

বাগদাদের এই ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে আব্বাসীয় খিলাফতের অবসান ঘটে।

তাতারদের আক্রমণ শুরু হয় ৬১৬ হিজরিতে, আর তাতারদের হাতে বৃত্তাকার শহর বাগদাদের পতন হয় ৬৫৬ হিজরিতে। এই ৪০ বছরে একের পর এক শহরে নির্বিচারে তারা আক্রমণ চালায়। কিন্তু খিলাফাহর পক্ষ থেকে তাতারদের প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয় নি। অন্যান্য অনেক শহরের অবস্থাও ছিল প্রায় স্বাভাবিক, নিজেরা তাতারদের দ্বারা আক্রমণের স্বীকার হওয়ার আগ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমানদের নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল না!

ফিচার ছবিসূত্রঃ Ancient Origins

তথ্যসূত্র:

  • A CityMaker
  • Imran Raihan
  • Bibijaan
  • আল কামিল ফিত তারিখ, ১০/৪১৩- ইবনুল আসীর।
  • আত তাতার বাইনাল ইনতিশার ওয়াল ইনকিসার, পৃ- ৪২ – আলি মুহাম্মাদ আস সাল্লাবি।
  • আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৭/৩৫৬- ইবনু কাসির।

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on বৃত্তাকার শহর বাগদাদ: উত্থান থেকে পতন

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!