একটি শূন্য আবিষ্কারের আত্মকাহিনী

5
(5)
Bookmark

No account yet? Register

“মহাবিশ্বের যত অমৃত বাণী

গণিতকে করেছে রাণী,

গণিতকে যারা করে না ভয়

গণিত শুধু তাদের সাথে কথা কয়।”

গণিত ও সংখ্যাকে বলা হয় মহাজাগতিক ভাষা। গণিত আছে বলেই অনেক কঠিন ধারণার ব্যাখ্যা সহজ হয়ে গেছে। গণিত এবং সংখ্যার যথার্থ ব্যবহার এবং প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি একটি আধুনিক ও উন্নত সভ্যতা। প্রাগৈতিহাসিক মানুষজন গণনা করতে জানতো না, হিসেব কষা তো বাদই দিলাম। সে থেকেই কালের দিগন্তে আস্তে আস্তে আবিস্কার হলো সংখ্যার। মানুষ শিখলো গণনা। সহজ হলো জীবনযাত্রা। আবিস্কার হলো নানান সংখ্যার। ডারউইন এর মতবাদ যদি গণিতে খাটাই তাহলে দেখা যাবে কালের বিবর্তনে সংখ্যা আবিষ্কারের সাথে সাথে তাতে এসেছে নানা পরিবর্তন। সবথেকে রহস্যজনক এবং অন্যরকম সংখ্যা হলো শূন্য। যার অর্থ ‘কিছুই না’। ব্যপারটা অদ্ভুত! তো অসামান্য বন্ধুগণ আজ আমরা জানবো সেই ‘কিছুই না’ অর্থাৎ শূন্য এর ইতিহাস। 

শূন্য
শূন্য চিত্রসূত্র: মাইকিউটগ্রাফিক্স

শূন্য কি? 

প্রথমে আসা যাক শূন্য কি? শূন্য হলো একটি পূর্ণ সংখ্যা। যখন এটি গণনা হিসেবে ব্যবহৃত হয় তার অর্থ কোনো বস্তু সেখানে উপস্থিত নেই। বরার্ট ক্যাপলান (Robert Kaplan) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের একজন অধ্যাপক। তিনি তাঁর একটি বই এ লিখেন-

“Zero is in the mind,

But not in the sensory world.”

অর্থাৎ খালি জায়গাতে যদি আপনি তারা দেখতে পান তবে এর অর্থ আপনি তাদের বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় বিকিরণে স্নান করছেন। অন্ধকার শূন্যতার কাছেও সর্বদা কিছু থাকে। সম্ভবত একটি সত্য শূন্য অর্থ ‘নিরঙ্কুশ’। হয়তো স্টিফেন হকিং এর ‘বিগ ব্যাং’ থিওরির আগে বিরাজমান ছিলো এই শূন্যের সুন্দর ডেফিনেশন। 

তবুও কার্যকর অর্থে শূন্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্বের অন্যান্য সকল সংখ্যা আহরণ করতে শূন্যের ধারণাটি ব্যবহার করা হয়। 

আরো পড়ুন: সেরার সেরা দাবাড়ুগণ ১: মিখাইল তাল, দ্য ম্যাজিশিয়ান ১ম পর্ব

আবিষ্কারের আদ্যোপান্ত

আমরা আজ হয়তো বুঝতে পেরেছি যে শূন্য সংখ্যাটি কোনো ধনাত্মক কিংবা নেতিবাচক সংখ্যা নয়। তবে এটি সর্বদা এমন ছিল না। ইতিহাস জুড়ে শূন্যের বিকাশ ঘটেছে এবং সংস্কৃতির পরিবর্তিত ধারার সাথে পরিবর্তন হয়েছে। প্রাচীন গ্রীকরা বিশ্বাস করত যে অস্তিত্ব 1 দিয়ে শুরু হয়েছিল এবং এর অস্তিত্বের কারণেই একের চেয়ে কম কিছু লিখা অসম্ভব। সুতরাং প্রাচীন গ্রীকদের সংখ্যা ব্যবস্থায় শূন্য সহ কোনও লেখার ব্যবস্থা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ‘Nothing’ কিংবা ‘কিছুই না’ এই সর্বব্যাপী প্রতীক দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি ইউরোপে যাওয়ার পথ খুঁজে পেলো না। 

শূন্য কিংবা জিরোর উৎস সম্ভবত মেসোপটেমিয়ার (Mesopotamia) সভ্যতার সুমেরীয় লেখকরা চার হাজার বছর আগে শুরুর দিকে সংখ্যা কলামগুলোতে অনুপস্থিতি বোঝাতে ফাঁকা স্থান ব্যবহার করা হতো, তবে শূন্যের প্রতীকটির প্রথম ব্যবহার রেকর্ড করা হয় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর প্রাচীন ব্য্যবিলনে।

ব্যাবিলনীয়রা প্রচলিত দশভিত্তিক সংখ্যার বদলে ষাটভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করত। বর্তমানে প্রচলিত ০ থেকে ৯ পর্যন্ত দশটি অঙ্কের বদলে সেখানে ছিল ৬০টি অঙ্ক। কোনো স্থানীয় মানের অনুপস্থিতি বোঝাতে তারা একটি খালি জায়গা ব্যবহার করত। আধুনিক দশমিক-ভিত্তিক সিস্টেমগুলি দশম, শত এবং হাজারের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য শূন্যকে ব্যবহার করার জন্য একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন তৈরি করেছিল।

মায়ানরা সংখ্যার মধ্যে শূন্য ব্যবহার করে, সময়কাল প্রকাশ করতে এবং ক্যালেন্ডারের তারিখ গুলো চিহ্নিত করতে। মায়ানরা তাদের ক্যালেন্ডারে শূন্য চিহ্নিতকারী ব্যবহার শুরু করার সাথে সাথে আমেরিকায় প্রায় একই জাতীয় প্রতীকটি স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করেছিল।

বিন্দু (ডানদিকে) এখন আমাদের শূন্যের প্রাচীনতম সংস্করণ হিসাবে স্বীকৃত
বিন্দু (ডানদিকে) এখন আমাদের শূন্যের প্রাচীনতম সংস্করণ হিসাবে স্বীকৃত। চিত্র সূত্রঃ Smithsonian

তবে ভারতীয়রা শূন্যের ব্যবহার এমনভাবে শুরু করে যেনো কোনো একটি সংখ্যা। এবং এই ব্যবহারের মাধ্যমেই শূন্যের ধারণাটি চালু হয়েছে বলে ধরা হয়। এযাবৎকাল পর্যন্ত শূন্যের সকল ধারণাই ছিল অস্বচ্ছ। শূন্য কে একটি পরিচালিত রুপ দান করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্য ভট্ট। খ্রিস্টীয়  পঞ্চম  শতকের দিকে আর্য ভট্ট এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি তৎকালীন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা দান করতেন।

আরো পড়ুন: ‘অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প’: এক গণিতবিদের পাওয়া না পাওয়ার আখ্যান

বিখ্যাত গণিতবিদ  আর্য ভট্ট
বিখ্যাত গণিতবিদ  আর্য ভট্ট । চিত্র সূত্রঃ Koolsmartlearning

আর্য ভট্ট মাত্র ২৩ বছর বয়সে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর তার বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি শূন্যের ব্যবহার করেছিলেন একটি সংখ্যার মত করে।

ব্রহ্মগুপ্ত প্রায় ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে শূন্য ব্যবহার করে সর্বপ্রথম পাটিগণিতের ক্রিয়াকলাপকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি একটি শূন্য নির্দেশ করতে সংখ্যার নীচে বিন্দু ব্যবহার করেছিলেন। এই বিন্দুগুলি পর্যায়ক্রমে ‘শূন্য’, যার অর্থ খালি বা ‘খা’।

শূন্যটি বখশালি পান্ডুলিপিতে বিন্দুরূপে পাওয়া যায়
শূন্যটি বখশালি পান্ডুলিপিতে বিন্দুরূপে পাওয়া যায়। চিত্র সূত্রঃ Real Archaeology

তবে আরব সভ্যতা পরবর্তীতে শূন্যের পরিমার্যনা করে। নবম শতাব্দীতে, মোহাম্মদ ইবনে-মুসা আল-খোয়ারিজমী (Al-Khowarizmi) সর্বপ্রথম সমীকরণের শূন্য বা বীজগণিত হিসাবে কাজ করেন যা জানা গিয়েছিল।

মোহাম্মদ ইবনে-মুসা আল-খোয়ারিজমী
মোহাম্মদ ইবনে-মুসা আল-খোয়ারিজমী। চিত্র সূত্রঃ Batoppers

তিনি অ্যালগোরিদম হিসাবে পরিচিত সংখ্যাগুলি এবং ভাগ করার জন্য দ্রুত পদ্ধতিও বিকাশ করেছিলেন। আল-খোয়ারিজমি শূন্যকে ‘সিফর’ বলেছিলেন, যা থেকে আমাদের সিফার উৎপন্ন হয়। ৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শূন্য প্রায় আমরা যেমন এটি জানি একটি ডিম্বাকৃতি হিসাবে লেখা হয়েছিল – তবে এক্ষেত্রে অন্যান্য সংখ্যার চেয়ে ছোট। 

যদি আপনি কোনও তাৎক্ষণিক সময়ে আপনার গতিটি জানতে চান তবে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গতির পরিবর্তনটি পরিমাপ করতে হবে। এই সেট পিরিয়ডটিকে আরও ছোট করে, আপনি তাৎক্ষণিকভাবে গতি অনুমান করতে পারেন। ফলস্বরূপ, সময় পরিবর্তন শূন্যের নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে গতির পরিবর্তনের অনুপাতও শূন্যের চেয়ে কিছু সংখ্যার সমান হয়ে যায় – একই সমস্যা যা ব্রহ্মগুপ্তকে স্তূপিত করেছিল।

১৬০০-এর দশকে নিউটন এবং লাইবনিজ এই সমস্যাটি স্বাধীনভাবে সমাধান করেছিল এবং বিশ্বকে বিশাল সম্ভাবনার দিকে উন্মুক্ত করেছিল। তারা শূন্যের কাছে যাওয়ার সাথে সংখ্যার সাথে কাজ করে ক্যালকুলাস জন্ম দিয়েছেন যা ছাড়া আমাদের পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং অর্থনীতি এবং অর্থের অনেক দিক থাকবে না।

একবিংশ শতাব্দীতে শূন্য অনেক পরিচিত লাভ করে। মহাদেশ, শতাব্দী এবং মন জুড়ে শূন্যের বিকাশ এটিকে মানব সমাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসাবে পরিণত করেছে। কারণ গণিত একটি বিশ্ব ভাষা এবং ক্যালকুলাস একটি মুকুট অর্জন, শূন্য বিদ্যমান এবং সর্বত্র ব্যবহৃত হয়। শূন্যকে আর কোনও মূর্খ বলার মতো গল্প বলে মনে হচ্ছে না।

প্রচ্ছদ চিত্র: Canadian Occupational Safety

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on একটি শূন্য আবিষ্কারের আত্মকাহিনী
    Shihabul
    25 Apr 2021
    8:50pm

    Joss cilo

    1
    0
    Osman
    27 Apr 2021
    8:47pm

    অসাধারণ লিখেছেন ভাইয়া
    অনেক কিছু জানতে পারলাম

    0
    0

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!