সোনার টেকনোলজি – সাগরতলে মানুষের ইন্দ্রিয়

4.7
(7)
Bookmark

No account yet? Register

সম্পূর্ন ভিন্ন একটা জায়গা থেকে শুরু করছি। অন্তর্জালের কল্যাণে নেটফ্লিক্স আজকে অতি পরিচিত নাম। অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা আর সিরিজের বদৌলতে কোম্পানিটি আজকে গোটা পৃথিবী জুড়েই অতি পরিচিত। কিন্তু এর সফলতা শুরু হয়েছিলো “Daredevil” নামক সুপারহিরো সিরিজের মধ্য দিয়ে। সিরিজের মূল চরিত্র ‘ম্যাট মার্ডক’ একজন অন্ধ আইনজীবি যে কিনা “হোয়াইট ক্যান” বা লাঠি ছাড়া পথ চলতে পারে না! তাহলে এই লোকটা নায়ক হলো কিভাবে?

নেটফ্লিক্স এর Daredevil
নেটফ্লিক্স এর Daredevil সোর্সঃ pinterest

চোখ ছাড়াও মানুষের আরো চারটি ইন্দ্রিয় আছে যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে কান। সিরিজের মূলচরিত্র ‘ম্যাট’ তার গুরু ‘স্টিক’ এর কাছ থেকে এই বাকি চার ইন্দ্রিয়, বিশেষত কানে শোনার মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তির অভাবকে কাটিয়ে ওঠা যায় তা খুব ভালো ভাবে শিখে নিয়েছিল এবং তা এতটাই অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলো যে এর মাধ্যমে যে কোন দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন লোকের চেয়েও সে প্রায় নিখুঁতভাবে আশেপাশের সবকিছুর অবস্থান নির্ণয় করতে পারতো। 

ভাবছেন কি নিয়ে কথা বলতে এসে কি নিয়ে বলতেছি? যে পদ্ধতিটির মাধ্যমে ম্যাট এই অসম্ভব কাজটি করতো তার নাম “ইকোলোকেশন”। পরিপার্শ্বের কোন বস্তু বা প্রাণী থেকে উৎপন্ন কিংবা প্রতিফলিত শব্দ শুনে তার অবস্থান, আকৃতি, গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পদ্ধতিকে বলা হয় “ইকোলোকেশন”। বিভিন্ন প্রাণী যারা শব্দের উপর নির্ভর করে, যেমন বাদুড়, তিমি, ডলফিন ইত্যাদি এই পদ্ধতিটির উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভর করে থাকে। আমাদের আলোচ্য “সোনার টেকনোলজি” ও এই ইকোলোকেশন এর মূলনীতির ওপরেই দাঁড়িয়ে। 

বুৎপত্তি

১৮৯০ থেকে ১৯০০ সাল আমেরিকার উত্তর উপকূলের জন্য ছিল খুবই বাজে সময়। শুধুমাত্র এ সময়েই ম্যাসাচুসেটস সাগরে বরফের ধাক্কায় আর সাগরের রুক্ষ তলদেশে দিশা হারিয়ে প্রায় হাজার খানেক জাহাজ ডুবি হয়। পুরো উপকূল জুড়ে প্রায় হাজার খানেক লাইটহাউজ বসানোর পরও যখন অবস্থার উন্নতি হলো না তখন একদল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ‘সাবমেরিন সিগনাল কোম্পানি’ (SSC) নামের একটি কোম্পানি চালু করেন। কোম্পানিটির কাজ ছিলো মূলত অগভীর পানি এবং বিশেষ করে কোরাল এবং রিফ এ যাতে জাহাজগুলো বিপদে না পরে সেরকম একটা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। কিন্তু তারা ঠিক সুবিধা করতে পারছিলো না। 

ম্যাসাচুসেটস  সাগর
ম্যাসাচুসেটস  সাগর সোর্সঃ sciencehistory

ঘটনাক্রমে SSC এর একজন এক্সিকিউটিভ “হ্যারল্ড ফে” এর সাথে দেখা হয়ে যায় “রেগিনাল্ড ফ্যাসিন্ডেন” এর ,যিনি কিনা বিজ্ঞানী মহলে তখন বেশ পরিচিত “তারবিহীন টেলিফোন” বা রেডিও নিয়ে গবেষণার জন্য। সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা তখন কেবল “হাইড্রোফোন” এর উন্নতিকেই এই সমস্যার সমাধান হিসেবে জোর দিচ্ছিলেন। তিনি সবার বিপরীতে গিয়ে বিশেষ ধরনের “ট্রান্সডিউসার” আবিষ্কার করে বসেন যা কিনা একই সাথে শব্দ পাঠাতে এবং গ্রহণ করতে পারে।

রেগিনাল্ড ফ্যাসিন্ডেন
রেগিনাল্ড ফ্যাসিন্ডেন সোর্সঃ sciencehistroy

“তিনি তার বিবেচনাকে সবার চেয়ে উন্নত বলে মনে করতেন এবং কোন পদক্ষেপ নেয়ার সময় নিজের বিবেচনার উপর অটল থাকতেন এবং যে পদক্ষেপ তিনি নিতেন তার উপরও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে অটল থাকার চেষ্টা করতেন।” স্ত্রী হেলেন

ফেসেন্ডেন ওসিলেটর
ফেসেন্ডেন ওসিলেটর সোর্সঃ nationalgeographic

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তিনি এর নামকরণ করেন  “ফেসেন্ডেন ওসিলেটর” যাতে কেউ ভুলে না যায় এর আবিষ্কারককে। ১৯১৪ এর ২৭ এপ্রিল আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন ফেসেন্ডেন এবং SSC এর ইঞ্জিনিয়াররা এর পরীক্ষা চালাতে মিয়ামী সাগরে সাগরপৃষ্ঠের ১৩০ মিটার নিচের এক বরফপিন্ডকে বেছে নেন। ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে ফেসেন্ডেন নিজেও কিছুটা বিচিলিত হয়েছিলেন কি? তবে ৫৪০ হার্টজে ওসিলেটর যে শব্দ তৈরী করেছিলো তা আর বিশ্বাসঘাতকতা করে নি, ফিরে এসেছিলো সঠিক উপাত্তগুলো নিয়েই। আর এভাবেই আবিষ্কৃত হয় পানির তলদেশের মানুষের “অন্ধের যষ্টি” ইকো রেঞ্জিং ওসিলেটর বা হালের সোনার।

সোনার বলতে আমরা কি বুঝি

SONAR বলতে বোঝায় সাউন্ড নেভিগেশন এন্ড রেঞ্জিং। এটি মূলত পানির নিচে কোন শব্দ উৎপন্ন করে সেই শব্দ কোন বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসার পর সময়ের পার্থক্য এবং শব্দের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে সেই বস্তুর আকৃতি এবং গতিপ্রকৃতি পরিমাপের পদ্ধতি। সোনার মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকে ।

১। এক্টিভ সোনার (ট্রান্সমিটার এবং রিসিভারের সমন্বয়ে)

২। প্যাসিভ সোনার (শুধুমাত্র রিসিভার)

আমাদের আজকের আলোচনা মূলত এক্টিভ সোনারকে ঘিরেই।

সারফেস ভেসেল এর সোনার
সারফেস ভেসেল এর সোনার সোর্সঃ twitter

তত্ত্ব কথা

এক্টিভ সোনারে ব্যাবহার করা হয় বিশেষ ধরণের ট্রান্সডিউসার যা পানিতে নির্দিষ্ট অক্ষে শব্দের তরঙ্গ বা সিগনালকে ছড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য, ট্রান্সডিউসার হচ্ছে সেই যন্ত্র যার মাধ্যমে এখানে বৈদ্যুতিক স্পন্দনকে শব্দ তরঙ্গতে রূপান্তর করা হয় একইসাথে প্রতিধ্বনিত শব্দকে গ্রহণ ও করা হয় এর মাধ্যমে। যেহেতু ট্রান্সডিউসারের একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ ছড়িয়ে দেয়া হয় তাই রিসিভার নির্দিষ্টভাবে ওই ব্যান্ডের প্রতিধ্বনিকে গ্রহণ করে। সাধারণত এই শব্দের রেঞ্জ ১ থে ১০০ কিলো হার্জ হয়ে থাকে টিপিক্যালি যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ১.৫ সেন্টিমিটার থেকে ১.৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।

যেভাবে কাজ করে
যেভাবে কাজ করে সোর্সঃ bluerobotics

 ছোট একটি সিস্টেমে সাধারণত একটি ট্রান্সডিউসারই যথেষ্ট কিন্তু একটি বড় সিস্টেমের জন্য অনেকগুলো ট্রান্সডিউসার অ্যার‍ো এর মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে। ট্রান্সডিউসারে গ্রহণকৃত শব্দের বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অক্ষে অবস্থানরত বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাত্বিকভাবে এক্টিভ সোনার এভাবেই কাজ করে থাকে।

আরো পড়ুন: আয়না কাহিনি: মনোহারিণী আয়নার একাল সেকাল

ব্যাবহারিক প্রয়োগের চিত্রটা কেমন?

বাস্তবে শব্দ যখন ছড়িয়ে যায় তখন টার্গেট যে বস্তুটির উদ্দেশ্যে তরঙ্গ ব্যাবহৃত হয় সেখান থেকে প্রথম প্রতিফলন সেখান থেকে নাও আসতে পারে।শব্দ সরলরেখায় ভ্রমণ করে না বরঞ্চ এটা পর্যায়ক্রমে অক্ষ বরাবর চারদিকে ছড়িয়ে পরে এবং “গেইন” ডাটাকে জটিল করে তোলে। যেমন সাগরের তলদেশ শব্দকে প্রতিফলিত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সাগরের পৃষ্ঠেও অনেক বস্তু থাকতে পারে যা ট্রান্সডিউসারে একটি জটিল এবং অসচ্ছ রেসাল্ট নিয়ে আসে। এখানে আরো অনেক বিষয় ও যুক্ত। শব্দের গতি পানির গভীরতা, তাপমাত্রা,ঘনত্ব এবং লবণাক্ততার ওপর ও নির্ভরশীল এবং এসব ক্রাইটেরিয়া শব্দকে বেকে যেতে বাধ্য করে। পানিতে শব্দের এই নারীসুলভ আচরণ পরিমাপের জন্য মেরিনাররা SVP(সাউন্ড ভেলোসিটি প্রোফাইল) ব্যাবহার করে থাকেন। 

এসভিপি   প্রোফাইল
এসভিপি প্রোফাইল সোর্সঃpressbooks

“ভাবুন তো একবার এত এত শব্দের মধ্য থেকে অনেকদূরে থাকা আপনার টার্গেটকে কিভাবে চিনবেন! কিভাবেই বা তার অবস্থান নিশ্চিত হবেন?”

শব্দ যেভাবে তথ্য হয়ে যায়

ট্রান্সডিউসারে উৎপন্ন শব্দ এত পথ ঘুরে যখন ফিরে আসে তখন ঠিক একে মানুষের কানে শুনে বিশ্লেষণ এর অবস্থায় থাকে না। শব্দের এই জটিল এবং সুবিশাল ইনডেক্সকে প্রকাশ করতে ব্যাবহৃত হয় “স্পেক্টোগ্রাম”। এরপর চলে এই স্পেক্টোগ্রামে নির্দিষ্ট ব্যান্ড ধরে আইসোলেশন(ওই ব্যান্ডের বিশ্লেষণ), অনেক সময় অতিসূক্ষ শব্দ এই ইন্ডেক্স এ ধরা পড়ে যার অর্থ উদ্ধার করতে গেইন বাড়িয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যাবহার করে মর্ম উদ্ধার করা হয়। সাগরের তলে এত বিশাল শব্দ ভান্ডার যে, শব্দের প্রকৃত উৎস জানার জন্য মেরিনারদের আলাদা ডেটাবেস ব্যাবহার করতে হয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে যে কাজটি মূলত করা হয় তাকে বলে সিগনাল রিকগনাইজেশন।  

স্পেক্টোগ্রাম
স্পেক্টোগ্রাম সোর্সঃ towardsdatascience

শেষমেশ

প্রায় শ’খানেক বছর হতে চলা এই সিস্টেম মানুষকে দিয়েছে পানির নিচে এক বিস্ময়কর ইন্দ্রিয়তা। তিমি, ডলফিন কিংবা হাঙ্গর প্রকৃতি প্রদত্ত এই গুণকে কাজে লাগিয়ে টিকে আছে লক্ষ বছর ধরে। যদিও এই টেকনোলজিতে এখনো অনেক গলদ রয়ে গেছে তবুও একে নিঃসন্দেহে বলা চলে চার ভাগের তিন ভাগ জলরাশির এ দুনিয়ায় মানুষের সেরা হাতিয়ার। সাগরের অজানা রহস্য আবিষ্কারে সামনের দিনগুলোতে এটি আরো এগিয়ে যাবে এই কামনাই করি।

প্রচ্ছদ ছবিসূত্র: pewtrusts

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সোনার টেকনোলজি – সাগরতলে মানুষের ইন্দ্রিয়

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!