স্যার ডন ব্র্যাডম্যান: টেস্ট ক্রিকেটে যার অভাবনীয় এক ব্যাটিং গড় (পর্ব – ১)

4.5
(4)
Bookmark

No account yet? Register

ক্রিকেট বরাবরই এক ধৈর্য্যের খেলা এবং তা যদি হয় টেস্ট ক্রিকেট তবে তো কথাই নেই। বেশ কিছু দেশ এই টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করেছে। তবে যখন হাজারো সমালোচনা পেছনে ফেলে ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়ার মাঝে যখন ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ক্রিকেট শুরু হয় তখন কেই বা ভেবেছিলো এই টেস্ট খেলাতেই এমন কিছু কিংব্দন্তির জন্ম হবে যাদের নাম লিখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে, যাদের জয়গান গাওয়া হবে তাদের মৃত্যর পরও। হ্যাঁ, আজ আমরা কথা বলবো এমনই এক কিংবদন্তির কথা যার টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাটিং গড় আকাশচুম্বী। যে সংখ্যার আশেপাশেও নেই কেও। তার ব্যাটিং গড় ছিল ৯৯.৯৪। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? না হলেও পরিসংখ্যান এটাই বলে। আজ আমরা জানবো স্যার ডন ব্র্যাডম্যান সম্পর্কে।

পরিচিতি এবং পরিবার

পুরো নাম ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান। জন্ম ১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্দ্রায় (Cootamundra) কিন্তু এনএসডব্লিউ শহর বোরাল-এ তার প্রাথমিক বছরগুলো অতিবাহিত করেন। তাকে প্রায়শই ‘দ্য ডন‘ বলা হত। তিনি জর্জ ব্র্যাডম্যান ও এমিলির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন, যার ছিল এক ভাই ও তিন বোন।

ব্র্যাডম্যান(ডানে) এবং তাঁর ছোট ভাই (বামে)।চিত্রসূত্র: indiafantasy

১৯৩২ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি জেসি মারথা নামের একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে দুই ছেলে সন্তান এবং এক মেয়ে সন্তানের জনক হন।

ব্র্যাডম্যান এবং তাঁর পরিবার।
ব্র্যাডম্যান এবং তাঁর পরিবার। চিত্রসূত্র: Australian Story(Twite)

ক্রিকেটের হাতেখড়ি

তিনি একটি একাকী খেলা তৈরি করেছিলেন যেখানে তিনি পারিবারিক জলের ট্যাঙ্কের বাঁকা ইটের ভিত্তির বিরুদ্ধে ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে বারবার একটি গল্ফ বল আঘাত করতেন। বাড়ির দেয়ালকে তার অফ-সাইডে একটি বাউন্ডারি হিসেবে ব্যবহার করে তিনি তার মাথায় ‘টেস্ট’ ম্যাচ নির্মাণ করতে সক্ষম হন যেখানে ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি ট্যাঙ্ক স্ট্যান্ডের ডেলিভারি করা অপ্রত্যাশিত বলের বিরুদ্ধে নিজেকে পিট করতেন। ডন ব্র্যাডম্যানের শৈশবের এই বিখ্যাত গল্পটি সারা বিশ্বের ক্রিকেট ভক্তরা ভালভাবেই জানেন।

এটি এমন এক সময়ে ছিল যখন ছোট্ট ডোনাল্ড সবেমাত্র বোরাল ইন্টারমিডিয়েট হাই স্কুলে পড়তে শুরু করেছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাচ্চাদের জন্য খুব কম সংগঠিত খেলা ছিল। প্রধান শিক্ষক একজন ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন এবং ছেলেদের খেলাধুলা করতে উৎসাহিত করতেন।

ডোনাল্ড ইতিমধ্যে সব ধরনের বল জাতীয় খেলাগুলোর প্রেমে পড়েছিলেন এবং খেলার কোনও জায়গা না থাকায় এবং খুব বেশি বন্ধুদের সাথে খেলতে না পারায়, তিনি একা ক্রিকেট খেলার এই অদ্ভুত কিন্তু কার্যকর পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি সেই সময়ের বিখ্যাত ক্রিকেটারদের নিয়ে গঠিত দুটি পক্ষ সংগঠিত করে এটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতেন, এবং তিনি সেই সমস্ত মহান নামগুলির জন্য ব্যাট করতেন।

এই অদ্ভুত পদ্ধতিটি তার পক্ষে বেশ উপযুক্ত ছিল। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা খেলতেন, যা প্রায়শই ঘটত তার মায়ের অসন্তুষ্টি তে। অনেক সাক্ষাৎকারে ব্র্যাডম্যান পরে বলেছিলেন যে, এই পদ্ধতি তার গঠনমূলক বছরগুলোতে তাকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিল।

পেশাদার হিসেবে ক্রিকেট অঙ্গনে পদার্পণ

১৯২০-২১ মৌসুমে ১২ বছর বয়সী ব্র্যাডম্যান মিত্তাগং স্কুলের বিপক্ষে বোরাল হাই স্কুলের হয়ে ১১৫ রানে অপরাজিত থাকেন। এটি তার প্রথম শতক। এক মৌসুম পর বোরাল ক্লাব দলের একজন আসতে ব্যর্থ হয়, ব্র্যাডম্যান তার পরিবর্তে খেলেন এবং ৩৭ রানে অপরাজিত থাকেন।

খুব শীঘ্রই, তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট একটি কলিং আসে। তার বাবা ১৯২১ সালের অ্যাশেজের চূড়ান্ত টেস্ট দেখতে সিডনি সফরের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার তরুণ ছেলেকে তার সাথে নিয়ে যান এবং এটিই ছিল এই তেরো বছরের তরুণের জন্য শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটের প্রথম স্বাদ। ডনের বাল্যকালের নায়ক জনি টেইলর এই ম্যাচে খেলেন কিন্তু চার্লি ম্যাকার্টনির খেলা দেখে তিনি মুগ্ধ হন।

চার্লি ম্যাকার্টনি (বামে) এবং জনি টেইলর (ডানে)
চার্লি ম্যাকার্টনি (বামে) এবং নি টেইলর (ডানে)। চিত্রসূত্র: লেখক

বাবাকে ফিরে আসতে হয়েছিল বলে তিনি কেবল প্রথম দুই দিনের খেলা দেখতে পেয়েছিলেন। ছোট ছেলেটি ক্রিকেট নিয়ে এতটাই রোমাঞ্চিত হয়েছিল যে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার বাবাকে বলেছিল, 

“I shall never be satisfied until I play on this ground.”

১৯২৫ সালে তিনি বোরাল দলে স্থায়ী স্থান পান যা ছিলো তার চাচার দল এবং উইঙ্গেলোর বিপক্ষে তার প্রথম বড় ইনিংস- ২৩৪ রান করেন। ঐ স্থানীয় প্রতিযোগিতার ফাইনালে তিনি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মস ভ্যালের বিপক্ষে ৩০০ রান করেন। ঐ মৌসুমে ব্র্যাডম্যান ১০১.৩ গড়ে ১৩১৮ রান করেন, ৭.৮ গড়ে ৫১ উইকেট নেন এবং ২৬ টি ক্যাচ ধরেন।

মিত্তাগং বনাম বোরাল দলের ফটো সেশন (১৯২৫)
মিত্তাগং বনাম বোরাল দলের ফটো সেশন (১৯২৫)। চিত্রসূত্র: Google Arts & Culture

১৯২৬ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস ক্রিকেট এসোসিয়েশন, ব্র্যাডম্যানকে ট্রায়াল গেমে খেলতে বলে। সামান্য স্কোর করেন, তবুও তিনি ভবিষ্যতের খেলোয়াড় হিসাবে নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি সিডনির সেন্ট জর্জ ক্লাবের সাথে গ্রেড ক্রিকেট খেলেন। খুব ভাল সূচনা করেন দলের হয়ে। তবুও, তিনি নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রথম একাদশে যেতে পারেননি। 

আরো পড়ুন: যে উপায়ে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা লাভবান হয় (প্রথম পর্ব)

১৬ ডিসেম্বর, ১৯২৭ তারিখে ব্র্যাডম্যান দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক করেন এবং পাঁচ নম্বরে ব্যাট করেছিল। প্রথম ইনিংসে তিনি ৪৪ রান করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্র্যাডম্যান সাত নম্বরে ব্যাট করেন এবং ১১৮ রান করেন।

১৯২৮-১৯২৯ মৌসুমের শুরুতে বেশ কয়েকটি বড় স্কোরের পর পেরি চ্যাপম্যানের ইংরেজ দলের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে খেলার জন্য মনোনীত হন। 

এই ধরনের চিহ্নিত কৃতিত্ব দ্রুত এক বছর পরে টেস্ট নির্বাচন ঘটায়, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ব্রিসবেনে ইংল্যান্ডের সাথে ৬৭৫ রানে পরাজিত হয়, তিনি মাত্র ১৮ এবং ১ রান করেন এবং পরবর্তীতে ম্যাচের জন্য বাদ পরেন। যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথম এবং শেষবারের মতো বাদ পড়া। মেলবোর্নে তৃতীয় টেস্টের জন্য ফিরে এসে, তিনি ৭৯ এবং ১১২ রান করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ভাগ্যের সম্ভাব্য উত্থানকে স্বীকৃতি দেয়। ব্র্যাডম্যান পঞ্চম টেস্টে এমসিজিতে আরেকটি শতক করেন। এই শতরানের মধ্যে তিনি সিডনিতে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ৩৪০ নট আউট সম্পন্ন করেন। পরের বছর, আবার এসসিজিতে, তিনি কুইন্সল্যান্ডের বিপক্ষে নিউ সাউথ ওয়েলসের দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৫২ নট আউটের বিশ্ব প্রথম-শ্রেণীর ব্যক্তিগত রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এটি একজন অস্ট্রেলীয় এবং অস্ট্রেলিয়ায় সর্বোচ্চ ইনিংস হিসেবে রয়ে যায়।

একজন স্ব-শিক্ষিত ব্যাটসম্যান হওয়ার কারণে ব্র্যাডম্যানের শৈলীর অভাব, ক্রস-ব্যাট শট খেলার প্রবণতা এবং নরম ইংলিশ উইকেটে তিনি যে সমস্যার সম্মুখীন হবেন তার প্রতি অনেক সমালোচনা করা হয়। ব্র্যাডম্যান ধারাবাহিকভাবে বিশাল স্কোর সংগ্রহ করে তার সমালোচকদের উত্তর দিয়েছিলেন। সমগ্র খেলোয়াড়ী জীবনে তিনি একজন উচ্চমানের ব্যাটসম্যান ছিলেন, যিনি সেরা বোলিং আক্রমণকেও মধ্যমানের বলে মনে করতে পারতেন। 

SCG তে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান (১৯৩০)
SCG তে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান (১৯৩০)। চিত্রসূত্র: ABC

১৯৩০ সালে তার প্রাথমিক ইংল্যান্ড সফরকে কেবল মাত্র একটি বিজয় শোভাযাত্রা হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে যেখানে তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক মর্যাদার ব্যক্তিত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। 

অ্যাশেজ সফরে যাওয়ার আগে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান তার প্রাপ্ত একটি ট্রফি ধরে রেখেছেন
অ্যাশেজ সফরে যাওয়ার আগে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান তার প্রাপ্ত একটি ট্রফি ধরে রেখেছেন। চিত্রসুত্র:ESPN

সফরে তিনি ৯৮.৬৬ গড়ে ২,৯৬০ রান করেন। টেস্ট খেলায় তিনি ১৩৯.১৪ গড়ে ৯৭৪ রান করেন, যার মধ্যে ১৩১, ২৫৪, ৩৩৪ ও ৪৫২ রান ছিল। ১৯৩০ ও ১৯৩৮ উভয় ইংল্যান্ড সফরে মে মাস শেষ হওয়ার পূর্বে ১,০০০ রান তুলেন। তিনি একমাত্র খেলোয়াড় যিনি এই জাতীয় পার্থক্য অর্জন করেছিলেন।

(চলবে….) 

ফিচার ছবি: My Khel

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on স্যার ডন ব্র্যাডম্যান: টেস্ট ক্রিকেটে যার অভাবনীয় এক ব্যাটিং গড় (পর্ব – ১)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!