স্যার ডন ব্র্যাডম্যান: টেস্ট ক্রিকেটে যার অভাবনীয় এক গড় (পর্ব – ২)

0
(0)
Bookmark

No account yet? Register

কীর্তিতে ব্র্যাডম্যান

প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যান ছিলেন অতুলনীয়, তাঁর গড় ছিল ৯৫.১৪, এবং টেস্ট ক্রিকেটে এটি ছিল আরও অবিশ্বাস্য, গড় ৯৯.৯৪! যা ১০০ গড়ের চেয়ে মাত্র চার রান কম ছিল। প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ১১৭টি শতক (টেস্টে ২৯টি), প্রতি তৃতীয়বার ব্যাট করার সময় তিনি একটি করে শতক করেন। 

২১ বছর বয়সী ডন ব্র্যাডম্যানের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনে ৩০৯ রান। চিত্রসুত্র: Wisden

তাঁর শতরানের মধ্যে ছিল ৩১টি ডাবল (টেস্টে দশটি), পাঁচটি ট্রিপল (টেস্টে দুটি), এবং একটি চতুর্গুণ শতক—১৯৩০ সালে কুইন্সল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর বিখ্যাত ৪৫২!

স্ট্যান ম্যাককেব এবং ডন ব্র্যাডম্যান (১৯৩৪)। চিত্রসুত্র: Wikimedia

১৯৩৬ সালে ব্র্যাডম্যান সফরকারী ইংরেজ দলের বিপক্ষে খেলার জন্য অধিনায়ক নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ক্রিকেট খেলা থেকে পাঁচ বছর অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তিনি ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক পদে বহাল ছিলেন।

১৯৩৮ সালের ওভাল টেস্টের আগে টস-এ ব্র্যাডম্যান (বামে) ও হ্যামন্ড (ডানে)। চিত্রসুত্র: Wisden

ব্র্যাডম্যান ছিলেন সবচেয়ে সফল অধিনায়ক। তাঁর অধিনায়ক থাকাকালীন ২৪ টি টেস্টে অস্ট্রেলিয়া ১৫ টি টেস্ট জিতে নিয়েছিল, মাত্র তিনটিতে হেরেছিল এবং ড্র করেছিল ছয়টি ম্যাচে। 

ডন ব্র্যাডম্যান যখন তিন ওভারে শতরান করার সংবর্ধনা। চিত্রসুত্র: Wisden

হ্যাঁ, ব্র্যাডম্যান তিন ওভারে তার ব্যাট থেকে ১০০ রান পেয়েছেন! সেকালে আট বলের ওভার ছিল এবং এটি প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচ ছিল না, তবুও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই কৃতিত্ব সত্যিই অবিশ্বাস্য।

এক নজরে স্ট্যাট। চিত্রসুত্র: 100M টুইটার

বিদায় বেলার শুন্য

১৯৪৮ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ম টেস্টটি ছিল ব্র্যাডম্যানের সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচ।

ব্র্যাডম্যান বেশ কয়েক মিনিট ধরে চলা ঝড়ো অভিবাদনে ক্রিজে বেরিয়ে আসেন। তিনি তার দ্বিতীয় বলে এরিক হোলিসের একটি ‘গুগলি’ বল ভুল বুঝে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন। হোলিজ পরে লিখেছেন,

“I don’t think Don saw it properly. He seemed to have tears in his eyes”

 অর্থ – “আমার মনে হয়, ডন বলটি ভালোভাবে দেখতেই পাননি। তার চোখে জল ছিল বলে মনে হয়েছিল”।

মাত্র ৪ রানের জন্য ব্রাডম্যান টেস্ট ক্রিকেটে ৭০০০ রানের মাইলফলক মিস করেন; এটি তাকে ৯৯.৯৪ এর পরিবর্তে টেস্ট ক্যারিয়ার গড় ১০০ করে দিত!

ব্র্যাডম্যানের অবসরের খবর অস্ট্রেলিয়ান এক পত্রিকায়। চিত্রসুত্র: Rare and Early Newspaper

ব্র্যাডম্যান ১৯৫০ সালে ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট-এ লিখেছেন, 

 “I dearly wanted to do so well. It was not to be. That reception had stirred my emotions very deeply and made me anxious – a dangerous state of mind for any batsman to be in. I played the first ball from Hollies, though not sure I really saw it. The second was a perfect length googly which deceived me”.

 অর্থ – “আমি খুব ভালো করতে চেয়েছিলাম। এটা হওয়ার কথা ছিল না। সেই অভ্যর্থনা আমার আবেগকে খুব গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল এবং আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল – যে কোনও ব্যাটসম্যানের জন্য একটি বিপজ্জনক মানসিক অবস্থা। আমি হোলিসের প্রথম বলটি খেলেছি, যদিও সত্যিই সেটি দেখতে পেরেছি কিনা কে জানে! দ্বিতীয়টি ছিল একটি নিখুঁত গুগলি যা আমাকে ফাঁদে ফেলে দিয়েছিল।”

আরও পড়ুন: স্যার ডন ব্র্যাডম্যান: টেস্ট ক্রিকেটে যার অভাবনীয় এক ব্যাটিং গড় (পর্ব – ১)

অবসর গ্রহণের পর ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে ব্র্যাডম্যান নাইট (Knight) উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি নির্বাচক ও প্রশাসক হিসেবে খেলার সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন- অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ এবং ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এই দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। চেয়ারম্যান হিসেবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ১৯৭১-১৯৭২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি দলের সফর বাতিল করা। এর কারণ ছিল- দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যমূলক রাজনীতির বিরোধিতার সাথে জড়িত প্রত্যাশিত তিক্ততা এবং সহিংসতা। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ব্র্যাডম্যান দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্রিকেট ছাড়ার পর তার অর্থশিল্পে একটি সফল ক্যারিয়ার ছিল, অ্যাডিলেড এক্সচেঞ্জে এইচ ডব্লিউ হজটস অ্যান্ড কোম্পানির জন্য কাজ করেন।

স্যার ব্র্যাডম্যান যখন বইয়ের পাতায়

গত শতকের আশি এবং নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে ব্র্যাডম্যানের উপর জীবনীমূলক রচনার বন্যা দেখা যায়। ১৯৮৮ সালে তিনি দ্য ব্র্যাডম্যান অ্যালবামস প্রকাশ করেন এবং চার্লস উইলিয়ামসের ব্র্যাডম্যান: অ্যান অস্ট্রেলিয়ান হিরো এবং রোল্যান্ড পেরির বই দ্য ডন ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। 

ব্র্যাডম্যান বিষয়ে লেখা হয়েছে আরও অনেক কিছুই। ব্র্যাডম্যানের সবচেয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জীবনী পাওয়া যায় আরভিং রোজেনওয়াটার এর Sir Donald Bradman (1978)-এ। মাইকেল পেজের Bradman: The Illustrated Biography (1983)-ও ব্র্যাডম্যানের দেওয়া তথ্য ও স্মৃতিচিহ্নের উপর আলোকপাত করে। জে. ওয়াকলির Bradman the Great (1959)  ব্র্যাডম্যানের ক্যারিয়ারের একটি বিস্তৃত পরিসংখ্যানগত বিবরণ প্রদান করে। একটি অতিরিক্ত জীবনী হল এ জি মোয়েসের Bradman (1948)। এছাড়াও ব্র্যাডম্যান Don Bradman’s Book (1930), My Cricketing Life (1938), এবং Farewell to Cricket (1950) এ তার ক্যারিয়ারের বিবরণ প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি The Art of Cricket (1958) এবং How to Play Cricket (1935) নামে দুটি বই প্রকাশ করেন। এছাড়া  ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের প্রভাব জ্যাক পোলার্ডের Australian Cricket: The Game and the Players (1982) এও মূল্যায়ন করা হয়।

অন্যকথা

খেলার বিশ্বে সমালোচনার ঝড় নতুন কিছু নয়। এর শিকার হননি এমন খেলোয়াড়ের জুড়ি মেলা ভার। বেশ কিছদিন আগে সাকিব আল হাসান তাঁর পারফরমেন্সের জন্য আইপিএল একাদশ থেকে ছিটকে যান এবং দলের বাইরে থেকে যখন মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের জন্য পানি নিয়ে মাঠে যান অনেক তিক্ত ভাবে সমালোচনার স্বীকার হতে হয় ভক্তদের দ্বারা। কিন্তু আমরা যদি কিংবদন্তি স্যার ব্র্যাডম্যান এর ইতিহাস দেখি তবে দেখা যাবে বেশ কিছুবার তিনিও দলের প্রয়োজনে Water Boy এর দায়িত্ব পালন করেছে। আমরা এই কাজটিকে যতটকু তিক্ততার সাথে দেখি আসলে বিষয়টা মোটেও তা নয়। দলের প্রয়োজনে যে-কেউ যে-কোনো কিছুই করতে পারে যা সম্মানহানির নয় আদতে।

Water boy হিসেবে স্যার ব্র্যাডম্যান।চিত্রসুত্র:  MensXP

মৃত্যু

২০০১ সালের ২৭ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে যান এই কিংবদন্তি। তাকে, অস্ট্রেলিয়ার কেনসিংটন পার্কে সমাধি দেয়া হয়। তবে যতদিন ক্রিকেট থাকবে ততদিন এই কিংবদন্তির নাম সকল ক্রিকেটার এবং  ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কেই বা জানতো গল্‌ফ বলে ক্রিকেট অনুশীলন করা এই বালক একদিন সেরাদের সেরা হয়ে বিশ্বের ইতিহাসে নাম লেখাবে!

স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যানের স্ট্যাচু। চিত্রসুত্র: Wikimedia

ফিচার ছবি: My Khel

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on স্যার ডন ব্র্যাডম্যান: টেস্ট ক্রিকেটে যার অভাবনীয় এক গড় (পর্ব – ২)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!