প্রচ্ছদ চিত্র

মিরাকল অব জমজম- পানিরও আছে নিজস্ব ভাষা

3.5
(4)
Bookmark

No account yet? Register

টিনের চালে পরা বৃষ্টির আওয়াজ অথবা কচু পাতার উপর টলটলে জল দেখে কখনো কি মনে হয় না পানিরও একটা সুর আছে, ভাষা আছে, জীবন আছে? মনে হয় না পানিও যেন কিছু বলতে চাইছে? 

উপরের কথাগুলো কোনো সাহিত্যিকের কথা মনে হলেও আজ আক্ষরিক অর্থেই পানির ভাষা নিয়ে কথা বলব। তবে সে ভাষা মানুষের মুখের কথার মতোই হবে এমনটা যেমন নয় তেমনি কেবল একমুখীও নয়; অর্থাৎ পরিবেশ বা মানুষের ভাষা বা সিগন্যালের প্রত্যুত্তর করবার ক্ষমতাও পানির আছে। 

ড. মাসারু এমোতো (Dr. Masaru Emoto), একজন জাপানিজ বিজ্ঞানী, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে পানির ভৌত বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে পানির ক্রিস্টাল নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি মূলত পরীক্ষামূলকভাবে গবেষণা করেছেন কিভাবে পানির আণবিক গঠনে পরিবর্তন আসে যখন এই পানি মানুষের মুখের ভাষা, তার চিন্তা, উদ্দেশ্য  অথবা অন্য যেকোনো প্রকার শব্দের সামনে উন্মুক্ত হয়।

ড. মাসারু এমাতো
ড. মাসারু এমাতো ; চিত্রসূত্র- Infomistico

প্রথমেই এখানে প্রশ্ন আসবে যে “পানির আণবিক গঠনে পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব? আর পরিবর্তন যদি ঘটে তবে কি সেটি আর পানি তথা H2O থাকবে?” প্রথমেই পানির আণবিক গঠন নিয়ে বলি। পানির অণুতে মূলত হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু পোলার সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। আবার ‘হাইড্রোজেন বন্ড’ নামক একটি দুর্বল প্রকৃতির বন্ধন পানির অণুগুলোকে আবদ্ধ করে। এই হাইড্রোজেন বন্ড পানিতে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের জোগান দেয় যা একই রকম অন্যান্য তরল পদার্থে দেখা যায় না এবং এই বৈশিষ্ট্য গুলি পানির কঠিন অবস্থা তথা ক্রিস্টালে সবচেয়ে বেশী লক্ষ করা যায়। অনেক উপর থেকে একই রকম দেখতে দুটি মানুষের যেমন ভিতরটা সম্পূর্ণ এক হয় না তেমনি তরল অবস্থায় পানির আণবিক গঠন অধিকাংশ ক্ষেত্রে একই রকম হলেও সেই পানিকেই যখন ক্রিস্টালাইজ করে তার গঠন দেখলে প্রতিটি ক্রিস্টাল ভিন্ন একটি অপরটি থেকে ভিন্ন এবং এই পার্থক্য কেবল পানির উৎস বা অন্যান্য ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নয় বরং ঐ পানির সামনে মানুষ কী শব্দ উচ্চারণ করল তার উপরও নির্ভর করে।

বরফের মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধন
বরফের মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধন ; চিত্রসূত্র- Chemistry Stackexchange

মাসারু এমোতো তার ২০ বছরের গবেষণাকালে পানির সামনে বিভিন্ন রকম ইতিবাচক শব্দ যেমন “Thank you (Arigato)”, “Love you” ইত্যাদি উচ্চারণ করে ঐ পানির ক্রিস্টাল পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে সুন্দর সুগঠিত ষড়ভুজাকৃতি ক্রিস্টাল গঠন করে। অন্যদিকে নেতিবাচক শব্দ যেমন ” You idiot”, “It’s no good” ইত্যাদির উচ্চারণের ফলে ক্রিস্টাল হয় বিকৃত। তার লেখা The Miracle of Water বই অনুসারে সবচেয়ে সুন্দর যে ক্রিস্টাল প্যাটার্ন তিনি পেয়েছেন সেটি ছিল “Love and gratitude” উচ্চারণে। তিনি তার গবেষণায় এও দেখিয়েছেন যে পানির ক্রিস্টালে অন্য সব ফ্যাক্টরকে একই রেখে একই পানির বিশুদ্ধ ও দূষিত অবস্থায় ক্রিস্টাল তৈরী করলেও খুব বেশী পার্থক্য দেখা যায় না যতটা দেখা যায় পানির সামনে বিভিন্ন রকম শব্দের উচ্চারণে। কিন্তু শব্দের কারণে কেন এই পরিবর্তন? উত্তর: কম্পন বা vibration। কারণ পানি সহ সমস্ত পদার্থের নিজস্ব একটি তরঙ্গ বা কম্পন আছে, এই কম্পন আশেপাশে তৈরী শব্দ কম্পন বা আলোর প্রভাবে পরিবর্তন হয়, অনেকটা আমরা যে কলেজে থাকতে অনুনাদ (Resonance) সম্পর্কে পড়েছি সেরকম।

আরো পড়ুন: বুখারি শরিফ: মনুষ্য সংকলিত সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ

বিভিন্ন ধরণের পানির ক্রিস্টাল
বিভিন্ন ধরণের পানির ক্রিস্টাল ; চিত্রসূত্র- Thewellnessenterprise

যেকোনো প্রকার শব্দ তা সে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা সাগরের ঢেউয়ের আছড়ে পরা অথবা মানুষের মুখের ভাষা- সবই বিভিন্ন রকম কম্পন বা vibration। আদিমকাল থেকে প্রকৃতি থেকে মানুষ ভাষার অনুপ্রেরণা পায়, হয়তো সে কারণে একই কথা যে ভাষাতেই বলা হোক না কেন আমাদের স্বরতন্ত্রীর কম্পন প্রায় একই থেকে যায়। এমোতো তার রিসার্চে এও দেখিয়েছেন যে টক্সিক বা দূষিত পানির সামনে যখন যেকোনো ভাষায় দোয়া বা মন্ত্র উচ্চারণ করা হয় তাহলে এই পানির ক্রিস্টাল বিশুদ্ধ পানির ক্রিস্টালের মতোই হয় (তিনি দাবি করেন নি যে দূষণ মুক্ত হয়ে যায়)। জাপানের ফুজিওয়ারা ড্যামের পানির স্বাভাবিক অবস্থার ক্রিস্টাল এবং সেখানের Jyohouin Temple এর ধর্মযাজকের এক ঘন্টা যাবত ঐ পানির সামনে মন্ত্র পড়ার পর পানির ক্রিস্টাল কেমন হয় তার তুলনা নিচের ছবিতে দেখা যাবে।

মন্ত্র পড়ার পর পানির ক্রিস্টাল
মন্ত্র পড়ার পর পানির ক্রিস্টাল ; চিত্রসূত্র- Thewellnessenterprise

মিউজিকের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রকম ক্রিস্টাল দেখা যায়, ক্লাসিকাল মিউজিকে যেখানে সুন্দর প্যাটার্ন দেখতে পাওয়া যায় সেখানে হেভি মেটাল মিউজিকে ক্রিস্টালটি বিকৃত প্যাটার্ন নেয়।

বিভিন্ন ধরণের মিউজিকের ক্ষেত্রে পানির ক্রিস্টাল প্যাটার্ন
বিভিন্ন ধরণের মিউজিকের ক্ষেত্রে পানির ক্রিস্টাল প্যাটার্ন ; চিত্রসূত্র- Thewellnessenterprise

ড. এমোতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে পানির স্যাম্পল নিয়ে গবেষণা করে করেছেন। তার একজন স্টুডেন্ট তাকে জমজম কূপের পানি এনে দিলে ঐ পানির ক্রিস্টাল ও কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস করে দেখেন যে পৃথিবীর আর কোনো স্থানের পানি জমজমের পানির মতো নয় এবং এর ক্রিস্টাল সবচেয়ে নিখুঁত। তারা ভাষ্যে, জমজম কূপের পানির আশ্চর্যজনক রোগ প্রতিকারের ক্ষমতা আছে কারণ এর চারপাশে সারাক্ষণ প্রার্থনা চলতে থাকে।” আরেকজন জার্মান ডাক্তার Dr. Knut Pfeiffer আবিষ্কার করেন যে মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষের উপর জমজমের পানি যতটা ভালো প্রভাব ফেলতে পারে তেমনটা আর কোনো পানি পারে না। নবীজি (সঃ) ও বলেছেন, “জমজমের পানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানি।“

জমজমের পানির ক্রিস্টাল
জমজমের পানির ক্রিস্টাল ; চিত্রসূত্র– Pinterest

তিনি NANO নামক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেন যে যদি ১ ফোঁটা জমজমের পানি ১০০০ ফোঁটা পাতিত (distilled) পানির সাথে মিশানো হয় তবে ঐ সাধারণ পাতিত পানিও জমজমের পানির মতো ক্রিস্টাল তৈরী করে। জমজমের পানিকে তিনি রিসাইকেল করেও দেখেছেন যে পানির ধর্মে কোনো পরিবর্তন আসে না। জমজমের পানিতে মিনারেলের অনুপাতও অন্য কোনো পানির সাথে মিলে না এবং পরিবর্তনও হয় না। অনুপাতটি এরকম

খনিজ পদার্থঅনুপাত
ক্যালসিয়াম১৯৮
ম্যাগনেসিয়াম৪৩.৭
ক্লোরাইড৩৩৫
সালফার৩৭০
আয়রন০.১৫
ম্যাঙ্গানিজ০.১৫
কপার ০.১২

এমোতো তার The Hidden Messages in Water বইতে দেখান যে মুসলমানরা যে পানি পান করবার আগে বিসমিল্লাহ উচ্চারণ করে তাতেও পানির ক্রিস্টাল বিশুদ্ধ পানির মতো প্যাটার্ন নেয় অর্থাৎ পানি তার প্রতি দেওয়া মেসেজকে ম্যাগনেটিক টেপের মতো করে ধরে রাখতে পারে। একে তিনি নাম দেন “পানির স্মৃতিশক্তি” অর্থাৎ পানি তার আশেপাশের ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার রেকর্ড রাখতে সক্ষম।

The Hidden Messages in Water বইয়ের প্রচ্ছদ
The Hidden Messages in Water বইয়ের প্রচ্ছদ ; চিত্রসূত্র- Wikimedia

আজকের দুনিয়াতে আমরা চারপাশে যেসব এনার্জি বা সিগন্যাল পাই এমনটা সবসময় ছিল না। ব্রহ্মাণ্ডের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক শক্তি আমাদের আজকের এই পৃথিবীতে এনেছে। হতে পারে পানির ক্রিস্টাল ধরেই আমরা সেই শক্তি বা অনুনাদকে ট্রেস করতে পারি সৃষ্টির শুরু অবধি, সেই মুহূর্তকে দেখতে পারি যখন প্রথম কম্পন তৈরী হয়েছিল। অনেক প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এই পানিতে যে পানি দিয়ে আমাদের শরীরের ৭০-৮০% পূর্ণ।  হতে পারে যে পানিই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত সময়ের সমস্ত ঘটনার একমাত্র জীবিত সাক্ষী, কেবল তার ভাষাকে বুঝতে হবে। ড. মাসারু এমোতোর ভাষায়,

To understand water is to understand the cosmos, the marvels of nature and life itself

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র- Kaheel7

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on মিরাকল অব জমজম- পানিরও আছে নিজস্ব ভাষা

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!