প্রচ্ছদ চিত্র

মাইকা খননে শিশুশ্রম: প্রসাধনীর অন্ধকার জগত

4
(8)
Bookmark

No account yet? Register

|| … চিতার আগুনরে ম্যালা ডরাইতাম। তাই মনে হয় ভগবান এমন জ্যান্ত কবর দিল আমারে। এক বালতি ভইরা মাইকা তুলছিলাম, বাপে দেইখা খুশী হয়া যাইত। কিন্তু পা টা খাজে রাখতেই দুনিয়া আন্ধার হইয়া গেল। কত ডাকলাম, কেউ কি শুনে না? নাকি আমি মইরা গেছি? মরলে পরে শ্বাস নিতেছি কেমন তরো? 

আমি মইরা গেলে কি বাপে খুশী হইব? বড় দিদির বিয়ে দেবার যৌতুক কোনোমতে জোগাড় করছিল, আমার জন্যি তো কানাকড়িও হাতে রাখে নাই। গেল বছর তো মাইন বেঁইচা যে টাকা উঠতো তাতে তিনবেলা খাইতেও পারি নাই, তার আবার বিয়া! সেবার যে দিদিমণিরা আইলো, বেবাক যে কইলো ইস্কুলে যাইতে পড়াশোনা করতে, কই একজনও তো কইলো না পড়াশোনা করলে প্যাটের ভাত কইত্তে আইবো। উনারা চলে গেলে বিজলি দিদি আমারে কইছিল আমরা যে মাটি তুলি ঐ মাটি দিয়াই নাকি দিদিমণিদের লিপিস্টিক, স্লো পাউডার বানায়। এই কালা মাটি তুইলা আমার সোনার লাহান শইলডা পুড়াইয়া ঐ দিদিমণিদের স্নো লিপিস্টিক হইলো তাও আমার প্যাটে ভাত গেল না!… ||

গল্পটা কিছুটা কাল্পনিক হলেও অবাস্তব নয়। শুধুমাত্র ঝাড়খণ্ডে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিআইএনআই (Children in Need Institution) কর্তৃক প্রকাশিত যে ৪৫ জন শিশুর মৃত্যু রিপোর্ট করা হয়েছে তাদেরই কারো গল্প হয়তো এইটা। কেবল ঝাড়খণ্ড নয়, ভারতের বিহার, রাজস্থান এবং অন্ধ্রপ্রদেশও এই মাইকার বড় উৎস। বিহার থেকেই মোট মাইকা উৎপাদনের ৭০% আসে যা রপ্তানি হয় সারা বিশ্বের প্রসাধনী ইন্ডাস্ট্রিতে। ভারতের বাইরে আফ্রিকার মাদাগাস্কার মাইকা মাইনের উৎস যা সম্প্রতি ভারতের রপ্তানিকে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু ভারত, যা কিনা বিশ্বের মোট মাইকার এক চতুর্থাংশ সরবরাহ করে থাকে সেখানে শিশু শ্রমকে ব্যবহার করে কালো বাজারে মাইকা চালান করা হচ্ছে চীন আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশের বড় বড় সব প্রসাধন ইন্ডাস্ট্রিতে। ২০১৯ সালে ভারত থেকে রপ্তানিকৃত মাইকার মূল্য ৭১.৩ মিলিয়ন ডলার

কী এই মাইকা?

মাইকা ব্যবহৃত হয় প্রসাধনী সামগ্রী তৈরিতে
প্রসাধনীতে মাইকা ব্যবহৃত হয় ; চিত্রসূত্র- cleanbeauthgals

মাইকা (mica) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘micare’ থেকে যার অর্থ shine, flash, glitter। এটি মূলত ৩৭ টি সিলিকেট ক্রিস্টাল মিনারেলের একটি মিশ্রন। ইন্ডাস্ট্রিতে এর ব্যবহার বহুল, গাড়ির রঙ থেকে শুরু করে কসমেটিক্স সামগ্রী পর্যন্ত বিভিন্ন প্রোডাক্টে তবে এর চাকচিক্যের জন্য কসমেটিক্সে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। ভেনেসা থমাস, একজন কসমেটিক্স কেমিস্ট এবং Freelance Formulations  বক্তব্য অনুযায়ী “মাইকা কসমেটিক্স সামগ্রী উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যে কোন প্রসাধন দ্রব্যে যদি সামান্যতমও চাকচিক্য থাকে তবে তার মধ্যে মাইকা অবশ্যই আছে।”

মাইকা আসে কোত্থেকে?

মাইকা খনন করা হয় যেসব দেশে
বিশ্বের যেসব দেশে মাইকা খনন হয় ; চিত্রসূত্র– squarespace

বিশ্বের কিছু অঞ্চলে মাইকা পাওয়া যায় যেমন ভারত, মাদাগাস্কার, চীন, ব্রাজিল, আমেরিকা এবং রাশিয়া তবে বাণিজ্যিকভাবে মাইকা উৎপাদন করা হয় ভারত ও মাদাগাস্কার থেকে। ভারতের যে গ্রামগুলোতে এই মাইন আছে সেখানের মাটিও চিকচিকে। তবে মাইকা মাইন স্লেট জাতীয় হওয়াতে এসব জায়গায় ভূমিধসের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফলে মাটি খুড়ে মাইন থেকে মাইকা তুলে আনতে গিয়ে শিশু থেকে বয়স্ক অনেক মানুষ মারা যায় অথবা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়ায়।

আরও পড়ুন: ‘সে যুগে মায়েরা বড়’: সভ্যতায় নারী সদস্যদের অবদান

প্রসাধনে মাইকার ব্যবহার

কেবল হাইলাইটার জাতীয় মেকাআপ সামগ্রী নয়, আপনি যদি আপনার ব্যবহৃত লোশন, ক্রিম, লিপ্সটিক, পাউডার ইত্যাদিরও উপাদানের নাম দেখেন তাহলে প্রায় সবগুলোতেই মাইকার উপস্থিতি পাবেন।

মাইকা ব্যবহৃত হয় চকচকে মেকআপের জন্য
গ্লিটার উৎসব মেকআপ ; চিত্রসূত্র- ফলিজ

মেকআপ সামগ্রীতে মাইকা ব্যবহারে অনেক সুবিধার কারণে বিগত কয়েক বছরে এর ব্যবহার এত বেড়ে গেছে যেমন-

  • অন্যান্য মিনারেলের মতো মাইকা ত্বকে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি দেয় না।
  • এর প্রাকৃতিক চকচকে ভাব ত্বকে উজ্জ্বলতা আনে যা এখনের ‘নো মেকাপ লুক’ ট্রেন্ডে খুবই জনপ্রিয়।
  • কেমিক্যাল মানুফ্যাকচারিং এ মাইকা সবচেয়ে ভাল সল্ভেন্ট হিসেবে কাজে দেয়।
  • প্রোডাক্ট ত্বকে মিশে যেতে সাহায্য করে।
  • এর কোনো সাইড ইফেক্ট নাই।

মাইকা এবং শিশু শ্রম

SOMO এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের কেবল বিহার এবং ঝাড়খণ্ডে ২২,০০০ শিশু মাইকা মাইনে কাজ করে। কিন্তু এর বেশির ভাগই অবৈধভাবে। এমনকি মাইনে কাজ করতে গিয়ে কতজন শিশু মারা যায় সে সংখ্যাটিও সঠিকভাবে জানা যায় না কারণ এই অবৈধ ব্যবসা। রাজ ভুষাণ, ঝাড়খণ্ড প্রজেক্ট কোঅরডিনেটর এর ভাষ্যে, “শিশু মৃতের সংখ্যাটি সঠিকভাবে অফিশিয়ালি পাওয়া যাবে না, তবে লোকাল সোর্স থেকে আমরা যা খবর পাই তাতে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ টি দুর্ঘটনা ঘটে এখানে। রাজস্থানের ভিলোড়া গ্রামে পাঁচ বছর বয়স থেকেই বাচ্চারা হাতুড়ি আর শাবল নিয়ে সুড়ুঙ্গের ন্যায় মাইনে নেমে যায় মাইকা তুলে আনতে কারণ বয়স্করা সেখানে নামতে পারে না। রয়টার্সের একটি ইন্টারভিউতে সেখানকার শ্রম মন্ত্রণালয়ের কমিশনার ধনরাজ শর্মা বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

মাইকা খনন কাজে নিয়োজিত একজন শিশু
মাইকা খনন কাজে নিয়োজিত একজন শিশু ; চিত্রসূত্র- anaisalife

এসব গ্রামে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বেশির ভাগ জায়গায় মাইকা মাইনে কাজ করা ছাড়া সারা বছর আর কোনো কাজ পাওয়া যায় না। যে মাইকা রপ্তানি করে একটা দেশ মিলিয়ন অব ডলার আয় করছে সেই মাইকা মাইন থেকে তুলে লোকাল দালালের কাছে বিক্রি করে দু বেলার খাবার পোষাতেই হিমশিম খেয়ে যায় এই মানুষগুলো। মেকাপ ইন্ডাস্ট্রি দিন দিন ফুলে ফেপে উঠলেও এইসব অঞ্চলের হাজার হাজার শিশু শিক্ষার সুযোগ থকে বঞ্চিত। মিডিয়াতে মাঝে মাঝে এদের গল্প উঠে আসলেও কোন লাভ হচ্ছে না বছরের পর বছর।

উপায় কী?

আফ্রিকায় কোকো উৎপাদনে শিশু শ্রমের বিষয়টি মিডিয়ার সামনে আসার পর ভোক্তাদের থেকে প্রচুর সাড়া আসে। কিছু চকলেট উৎপাদনকারী কোম্পানি প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং পরবর্তীতে আমেরিকার শিশুশ্রম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে এই ইস্যু যদিও এখনো হাজার হাজার শিশু সেখানে কাজ করছে।

আরও পড়ুন: আফ্রিকা: প্রযুক্তি খাতে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল এক অঞ্চল

কোকোয়া উৎপাদনে শিশুশ্রম
কোকোয়া উৎপাদনে শিশুশ্রম ; চিত্রসূত্র- wherefrom

মাইকা মাইনের প্রসঙ্গেও যদি ভোক্তা প্রতিবাদ না করে তাহলে পুঁজিবাদী মেকাপ ইন্ডাস্ট্রি একে ধামা চাপা দিয়েই রাখবে। তাই আমাদের উচিত সচেতন হওয়া, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং প্রয়োজনে শিশুর রক্তমাখা যে মাইকা দিয়ে আমাদের রোজকার প্রসাধনী তৈরী হচ্ছে সেগুলোকে বর্জন করা।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র- rtd.rd

তথ্যসূত্র-

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
One Thought on মাইকা খননে শিশুশ্রম: প্রসাধনীর অন্ধকার জগত
    Redwan Ahmed
    8 Apr 2021
    1:40pm

    ছোট ছোট শিশুদের তোলা মাইকাতে আজ রঙিন এই পৃথিবী।
    রঙিন দুনিয়ার পেছনে দুঃখজনক এক কালো দুনিয়া সম্পর্কে জানলাম।

    0
    0

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!