প্রচ্ছদচিত্র

শ্রমিক দিবসের অন্তরালে মে দিবসের নানা ইতিহাস

3.4
(9)
Bookmark

No account yet? Register

আমাদের কাছে মে দিবসের অপর নামই শ্রমিক দিবস। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের যে ইতিহাস আমরা জানি সেটি ছাড়াও এই মে দিবসের আছে অজানা অনেক তাৎপর্য। জানা অজানা সেই সব গল্প নিয়েই আজকের নিবন্ধ।

শুরুর গল্প

মে দিবসের ইতিহাস তলিয়ে দেখতে গিয়ে ইতিহাসবিদ হেলেন কার খুঁজে পেলেন রোমান সাম্রাজ্যে এর উৎপত্তি যা ছিল প্রধানত প্যাগানদের একটি বাৎসরিক উৎসব। সেই সময় মে দিবস অর্থাৎ মে মাসের ১ তারিখে শীতের শেষে বসন্তের আগমন ও প্রকৃতির পুনর্জাগরণ উপলক্ষে হাজার বছর আগে নাচ-গানের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হতো। ধারণা করা হয় এর উৎপত্তি রোমান দেবী ফ্লোরা (Flora) এর পূজা থেকে আসা উৎসব ফ্লোরালিয়া (Floralia), যা ছিল মে মাসের পুরোটা জুড়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ঋতুর এই আশীর্বাদসূচক পরিবর্তনের প্রতীক ছিল ‘আগুন’ অর্থাৎ শীতের মৃত্যু এবং নতুন জীবনের সূচনা (আদিম কালেও একেকটি শীতকাল পার করতে পারলে গুহাবাসী আগুন জ্বালিয়ে উদযাপন করত এবং এখান থেকেই জন্মদিনের কেকের উপর মোমবাতি জ্বালানোর প্রচলনটি আসে)।

আরো পড়ুন: জন্মদিনের জন্মদিন: ইতিহাস, একটি প্যারাডক্স ও লিপ ইয়ারের যন্ত্রণা

মে দিবসে প্রাচীন প্যাগান উৎসব
প্রাচীন প্যাগান উৎসব ; চিত্রসূত্র- Ancient Origins

মে দিবস কি একটি প্যাগান হলিডে?

প্যাগানদের জন্য মে দিবস খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা গভীর ভাবে বিশ্বাস করত পৃথিবীতে জন্ম-জীবন-মৃত্যু এই তিনের চক্রের সাথে মে দিবসের যোগসূত্র আছে। বেলটেন (Beltane) নামক তাদের একটি রিচুয়াল ছিল যেটায় তারা হাড় দিয়ে আগুন জ্বালাতো নতুন ঋতুর আগমনকে প্রতীকায়িত করে। কিন্তু খ্রিস্টান চার্চের বিশপ লিংকন ১২৪০ সালে এই উৎসব পালন করা বিরোধিতা করে। ফলে তখন থেকে কেবল মুষ্টিবদ্ধ কিছু মানুষ বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমিক একে একটি সাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে পালন করত। তবে ১৫১৫ সালে রাজা অষ্টম হেনরীর প্রথম স্ত্রী ক্যাথরিন (Catherine of Aragon) কেও দেখা যেত এই দিনে ভোরের শিশিরে রোগ প্রতিকারক হিসেবে স্নান করতে।

১৬৪৯ সালের জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর মে মাসের শেষে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সিংহাসনে বসার আগ পর্যন্ত যে বিরতি পর্ব (Interregnum period) চলছিল তখন মে দিবস উদযাপনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে কিছু দেশে এখনো মে দিবসকে উৎসবের মধ্যে দিয়ে উদযাপন করা হয়।

হেবার দুর্গে মে দিবসের উৎসব
হেবার দুর্গে মে দিবসের উৎসব ; চিত্রসূত্র- kentattraction

অভিশপ্ত মে দিবস রায়ট

অভিশপ্ত মে দিবস
অভিশপ্ত মে দিবস ; চিত্রসূত্র- Smithsonian Magazine

১৫১৭ সাল। রাজা অষ্টম হেনরির আমলে লন্ডনের আনাচে কানাচে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ আরও অনেক দেশের প্রচুর প্রবাসী বসবাস করছে। লন্ডন ছিল তখন সবার জন্য উন্মুক্ত আর টাকা কামানোর সবচেয়ে সহজ জায়গা। কিন্তু ঐ সময়ের প্লেগের ছড়াছড়ি ও এক বছরের খরার পর সাধারণ মানুষের জন্য জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। হঠাৎ করেই ফুঁসে উঠলো সাধারণ ইংরেজ জনতা। জন লিংকন নামক একজন সেকেন্ড হ্যান্ড ডিলার ২৮ এপ্রিল সেইন্ট পল ক্যাথেড্রালের দরজায় লিখে এলেন, 

বিদেশীদেরকে রাজা ও তার কাউন্সিল অনেক বেশী সুবিধা দিচ্ছে

২৯ তারিখেই গুজব উঠল মে মাসের ১ তারিখ লন্ডনের মানুষ রাস্তায় নামবে ও বহিরাগতদের হত্যা করবে। শহরের দাঙ্গা ঠেকাতে মেয়র ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর কারফিউ ডাকলেন। কিন্তু তরুণরা কারফিউ না মেনে রাস্তায় নেমে পড়ে এবং প্রবাসীদের বাড়িতে গিয়ে হামলা শুরু করে। ধারণা করা ১ মে সকালে প্রায় ২০০০ লন্ডনের অধিবাসী রায়টে অংশগ্রহণ করে যা ছিল লন্ডনের তখনকার মোট জনসংখ্যার ৪%। যে হাতের কাছে যা পাচ্ছিল তাই দিয়ে আক্রমণ করেছিল বিদেশী ও রক্ষীবাহিনীর উপর, পুরো শহর বিভৎস রূপ ধারণ করেছিল।

ইভিল মে দিবস
‘ইভিল’ মে দিবস ; চিত্রসূত্র- FT Alphaville

কিন্তু দাঙ্গাবাজরা পার পেতে পারে নি। ঐদিন বিকালেই শহরে ১৩০০ সৈন্য নামানো হয় আর ২৭৯ জন দাঙ্গাবাজকে হাতেনাতে ধরা হয়। পরবর্তীতে এই গ্রেফতার করা ও মৃত্যুদন্ড দেবার কাজ আরও অনেক দিন ধরেই চলছিল। লন্ডনবাসীরা হতবাক হয়ে গেলেও রাজা অষ্টম হেনরি নূন্যতম ক্ষমা প্রদর্শন করেন নি। এই রায়টের উদ্দ্যেশ্যে প্রায় ৭৫ বছর পর শেকসপিয়ার লিখেছেন-

This is the strangers’ case, and this your mountanish inhumanity

আজও এই দিনটিকে Evil May Day বলা হয়।

আরো পড়ুন: বৃত্তাকার শহর বাগদাদ: উত্থান থেকে পতন

শ্রমিক অধিকার আন্দোলন

উনবিংশ শতাব্দিতে স্যোশালিজমের প্রতি ভীষণ ঝুঁকে পরে শ্রমিক সমাজ। ১৮৮৪ সালেই আমেরিকার শ্রমিক ফেডারেশন আট ঘণ্টা কর্ম দিবসের দাবি জানায়। কিন্তু ক্যাপিটালিস্ট গোষ্ঠী কোনো সাড়া না দিলে ১৮৮৬ সালে দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবীতে আমোরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলীবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়।

মে দিবসে হে মার্কেট
হে মার্কেট ; চিত্রসূত্র– Situciaster

১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এরপরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না খাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে’র ১ তারিখে “বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার”  সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালনের দাবী জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকরী হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিষ্ট এবং কিছু উগ্রবাদী সংগঠন তাদের দাবী জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়। কোন কোন স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সে সব দেশে এমনকি এ উপলক্ষ্যে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে।

আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদগাতা। হে মার্কেটের হত্যাকান্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যে কোন আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

জাপানের রক্তাক্ত মে দিবস

রক্তাক্ত মে দিবস
রক্তাক্ত মে দিবস ; চিত্রসূত্র- Throwoutyourbooks

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে এই দিনটি উদযাপিত হলেও শ্রমিকের অধিকার আদায় হয়নি। ১৯৫২ সালে জাপানে এই মে দিবসের রূপ ছিল একেবারে অন্যরকম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে কালোবাজারের ছড়াছড়ি, গ্যাংস্টার ও ক্রিমিনালের দৌরাত্ম্য এবং ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক শোষন নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৭ সালে কম্যুনিস্ট পার্টির পুনরুত্থানের পর ধর্মঘট লেগে থাকলেও ১৯৫২ সালের ১ মে টোকিওতে Imperial Palace এর সামনে করা ধর্মঘট ভয়ানক চেহারা ধারণ করে পুলিশের আক্রমণে। বিশ্ববাসীর কাছে Bloody May Day নামে পরিচিত এই দিনে পুলিশের হাতে একজন মারা যায় এবং আরও অনেকে আহত হয়ে মারা যায় কিছুদিন পর। এই দিনের পর জাপানে টিয়ারগ্যাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।

জাপানের রক্তাক্ত মে দিবস
জাপানের রক্তাক্ত মে দিবস ; চিত্রসূত্র- Throwoutyourbooks

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র- The Conversation

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on শ্রমিক দিবসের অন্তরালে মে দিবসের নানা ইতিহাস

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!