কাকাবাবু সমগ্র ১: কিশোর সন্তুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার গল্প

মার্শাল আশিফ
3.7
(7)
Bookmark

No account yet? Register

কিশোর বয়স থেকেই যাদের গল্পের বই পড়ার অভ্যাস আছে তাদের কাছে কাকাবাবু এক জনপ্রিয় চরিত্র। আবার যাঁদের দেহের বাইরের খোলকটার বয়স অনেক হয়ে গেছে কিন্তু মনটা এখনও কিশোর বয়সে আটকে আছে তাঁরাও কাকাবাবুকে চিনেন।

কিন্তু যাঁরা চিনেন না তাঁদের নিকট কাকাবাবুকে কিভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে? একজন উচ্চ পদস্থ সরকারি অফিসার যিনি অবসরে আছেন। নাকি এমন একজন ব্যক্তি যিনি ইতিহাসের বড় ভক্ত।

কাকাবাবুর এহেন পরিচয় দিলে তা অন্যায্য হবে বৈ কি! পৃথিবীতে যেসব রহস্য অন্য কেউ সমাধান করতে পারে না, সেগুলো কাকাবাবু সমাধান করার চেষ্টা করেন। এক পা অকেজো হলে কি হবে! যেমন উনার জ্ঞান, তেমনি সাহস!

এই যে কাকাবাবু কাকাবাবু করা হচ্ছে তিনি কার কাকা? তিনি হচ্ছেন সন্তুর কাকা। কাকাবাবুর প্রকৃত নাম হচ্ছে রাজা রায়চৌধুরী। আর সন্তুর ভাল নাম হচ্ছে সুনন্দ রায়চৌধুরী।

কাকাবাবু যখন কোন রহস্য সমাধানে যান তখন সাধারণত সন্তুকে সাথে নিয়ে যান। সন্তু অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোর। কাকাবাবুর সাথে নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ তার জন্যও হয়ে উঠে দারুণ অ্যাডভেঞ্চার। ফেলুদার কাহিনীতে যেমন তোপসে, তেমনি কাকাবাবুর সাথে সন্তু।

  • বইয়ের নাম: কাকাবাবু সমগ্র ১
  • লেখক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
  • প্রকাশনী: আনন্দ
  • প্রথম সংস্করণ: জুন ১৯৯৩
  • আইএসবিএন: 81-7215-208-6
  • মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা
সন্তু ও কাকাবাবু চরিত্রের স্রষ্টা
সন্তু ও কাকাবাবু চরিত্রের স্রষ্টা; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া

কাকাবাবু সিরিজের অনেকগুলো গল্প আছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে এ সংখ্যাটি ৪২। এর মধ্যে প্রথমদিকের ৬টি গল্প স্থান পেয়েছে ‘কাকাবাবু সমগ্র ১’ বইটিতে। গল্প ছয়টি হল- ‘ভয়ংকর সুন্দর’, ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’, ‘পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক’, ‘খালি জাহাজের রহস্য’, ‘মিশর রহস্য’ ও ‘কলকাতার জঙ্গলে’। একে একে এই ছয়টি গল্প নিয়ে দু-চারটি কথা জেনে নেওয়া যাক।

ভয়ংকর সুন্দর

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাকাবাবু চরিত্রের আগমন ঘটে এই গল্পের মধ্য দিয়ে। এ গল্পটির পটভূমি কাশ্মীরে সেট করা হয়েছে। প্রথম গল্পেই বাজিমাত করতে সক্ষম হন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সন্তুর বর্ণনায় কাকাবাবুর রোমাঞ্চকর অভিযান সকলের মনে দাগ কেটে যায়।

রূপসী বাংলা চ্যানেলে একসময় সন্তু কাকাবাবুর গল্পগুলোকে নিয়ে বাংলা কার্টুন অ্যানিমেশন বানানো হত। সেগুলো এখন ইউটিউব থেকে এই লিংকে দেখা যাবে।

সবুজ দ্বীপের রাজা

কাকাবাবু সিরিজের গল্পগুলো কেউ পড়ে না থাকলেও সবুজ দ্বীপের রাজা সিনেমাটি প্রায় সবাই দেখেছেন। এই গল্পের কাহিনী আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের জারোয়া জাতিকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে। কাকাবাবু আন্দামানে এসেছেন এক গোপন মিশনে। সাথে কাকাবাবুর সঙ্গী সন্তু। অপরদিকে কুখ্যাত অপরাধী পাঞ্জা আর তিনজন ভাড়াটে গুণ্ডাও এসেছে আন্দামানে।

ছেলে-বুড়ো সকলের প্রিয় ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ চলচিত্রের পোস্টার
ছেলে-বুড়ো সকলের প্রিয় ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ চলচিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র- উইকিমিডিয়া

যাঁরা এখনও ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ সিনেমাটি দেখেন নি তাঁরা চাইলেই ফ্রি তে ইউটিউব থেকে এই লিংকে গিয়ে দেখে আসতে পারেন। আশা করা যায় সময়ের যথাযথ ব্যবহারই হবে।

পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক

কাকাবাবু তাঁর খোঁড়া পা নিয়ে নাকি এভারেস্টে উঠবেন! অন্য সবাই এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও কাকাবাবু একগুঁয়ে। তিনি যা করবেন বলে মনে মনে ঠিক করেন তা করেই ছাড়েন। কিন্তু এভারেস্টে না চড়ে কাকাবাবু একটি গম্বুজ থেকে রাত্রিবেলা বাইনোকুলার নিয়ে কী যেন খুঁজছেন। তাহলে কি কাকাবাবু এভারেস্টে উঠার নাম করে কোন রহস্যের সন্ধানে এসেছেন?

পৃষ্ঠাসংখ্যার বিবেচনায় এ গল্পটি এই বইয়ের মধ্যে বৃহত্তম। এ গল্পটিকে নিয়েও সিনেমা বানানো হয়েছে ‘ইয়েতি অভিযান’ নামে। এই চলচিত্রে কাকাবাবুর চরিত্র অলংকৃত করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সন্তুর চরিত্রে দেখা যায় আরিয়ান ভৌমিককে।

‘ইয়েতি অভিযান’ সিনেমার পোস্টার
ইয়েতি অভিযান’ সিনেমার পোস্টার; চিত্রসূত্র- উইকিমিডিয়া

খালি জাহাজের রহস্য

সুন্দরবনে একটি বিদেশি জাহাজের দেখা পাওয়া গেছে। কিন্তু জাহাজের মধ্যে কোন লোকজন নেই। জাহাজের ভেতরে খাবারের টেবিলে খাবার রাখা আছে। কেউ যেন খেতে খেতে উঠে গেছে। একটা রেডিও বাজছিল। জাহাজটি কীভাবে সুন্দরবনে এল? এটা কি জলদস্যুদের জাহাজ নাকি কোন বিদেশি গুপ্তচরের জাহাজ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোন রহস্য।

এই গল্পে সন্তু কাকাবাবু ছাড়াও বিমানদা নামক এক চরিত্র বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। বিমানদা এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট। সন্তুদের পাড়াতেই থাকেন।

মিশর রহস্য

মিশরের পিরামিড আর হায়ারোগ্লিফিক্স যাঁদের মুগ্ধ করে তাঁরা এই  গল্পটি পড়ে ষোল আনা মজা পাবেন এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

আরো পড়ুন: ‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ – গল্পের ছলে মিশরীয় সভ্যতার জানা অজানা রহস্যের সন্ধান

অসুস্থ মুফতি মুহম্মদ ঘুমের ঘোরে বেশকিছু হিজিবিজি চিত্র আঁকেন। এই হিজিবিজি চিত্রগুলোকে গুপ্তধনের সংকেত মনে করে তাঁর শিষ্য আল মামুন চিত্রগুলোকে কাকাবাবুর কাছে নিয়ে যান চিত্রগুলোর অর্থ (মিনিং) বের করার জন্য। এর মধ্যেই কে বা কারা কাকাবাবুর উপর হামলা করে। এতে কাকাবাবুর প্রাণ বেঁচে গেলেও বেশ খানিকটা চোট পান।

মুফতি মুহম্মদের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই কাকাবাবু চোট পাওয়া অবস্থাতেই সন্তুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মিশরের উদ্দেশ্যে। মুফতি মুহম্মদের শেষ ইচ্ছা কী ছিল? চিত্রগুলো কি আসলেই কোন গুপ্তধনের সংকেত? কাকাবাবুকে কেই বা হত্যা করতে চেয়েছিল? রহস্য দানা বাঁধতে থাকে।

এই গল্পের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে- গল্পটিকে চুইংগামের মত টেনে টেনে লম্বা করা হয়েছে। গল্পের শুরুর দিকে সন্তুর পুকুর নিয়ে কর্মকাণ্ডের সাথে মূল গল্পের কোন যোগ নেই। তবে এটা ঠিক যে সন্তুর চরিত্র বিকাশে বেশ বড় ভূমিকা রেখেছে এটি। রিনির প্রতি সন্তুর কিশোরসুলভ ভালোলাগা এই গল্পে খানিকটা আঁচ পাওয়া যায়।

এই গল্পটিকেও বড় পর্দায় রূপায়িত করেছেন কলকাতার বিখ্যাত পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। চলচিত্রটি মুক্তির পর আট থেকে আশি সব বয়সের মানুষ সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এই চলচিত্রটি ‘হিট’ তকমা পেয়েছিল।

‘মিশর রহস্য’ চলচিত্রে কাকাবাবুর চরিত্রে প্রসেনজিৎ
‘মিশর রহস্য’ চলচিত্রে কাকাবাবুর চরিত্রে প্রসেনজিৎ; চিত্রসূত্র- উইকিমিডিয়া

কলকাতার জঙ্গলে

‘কাকাবাবু সমগ্র ১’ বইয়ের সর্বশেষ গল্প হচ্ছে এটি। গল্পটি শুরু হয় দেবলীনা দত্ত নামের এক মেয়ের সন্তুদের বাড়িতে প্রবেশের মাধ্যমে। দেবলীনা সন্তুর বয়সী এক সাহসী মেয়ে। সেও সন্তুর মতো কাকাবাবুর অ্যাডভেঞ্চারের সাথী হতে চায়। কিন্তু কাকাবাবুর হাতে তো এখন কোন কেস নেই। তাই তিনি মেয়েটিকে নিয়ে রহস্য অভিযানে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সন্তুদের বাড়ি থেকে রাগের মাথায় বেরিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর দেবলীনার নিখোঁজ সংবাদ পাওয়া যায়। দেবলীনাকে কেউ কি কিডন্যাপ করল? এ নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে কাকাবাবু জড়িয়ে পড়লেন আরও বড় এক বিপদে।

সন্তু ও কাকাবাবুর চরিত্র বিশ্লেষণ

কাকাবাবু একরোখা ও দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন মানুষ। বিভিন্ন বিষয়ে রয়েছ তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। ম্যাপ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ভালোবাসেন। কাকাবাবু অসীম সাহসের অধিকারী। প্রতিপক্ষের বন্দুকের সামনেও তিনি মাথা নত করেন না। কিন্তু তাঁর হৃদয়টি মানবিকতায় ভরা। যত বড় বিপদই হোক না কেন তাঁর কাছে পিস্তল থাকলেও সেটা দিয়ে তিনি খুন করেন না, সেটা মানুষই হোক কিংবা কুকুর।

অন্যদিকে একজন কিশোরের চরিত্র যেমন হওয়া প্রয়োজন সন্তুর চরিত্রটি ঠিক যেন তাই। এখানেই লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মুন্সিয়ানা। একারণেই পাঠক যখন গল্পগুলো পড়েন তখন সন্তুর মধ্যে দিয়ে তিনি নিজেকে দেখতে পান।

সন্তু এমনিতে খুব সাহসী ছেলে নয়। কিন্তু কেউ কাকাবাবুর সাথে খারাপ আচরণ করলে সন্তু মাথা ঠিক রাখতে পারে না। সন্তুর চরিত্রের আরও একটি দিক বেশ লক্ষণীয়। তা হল- বিপদের মধ্যেও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে। এর সবচেয়ে ভাল নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় ‘পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক’ গল্পে।

সন্তু কাকাবাবু সিরিজের সামগ্রিক বিশ্লেষণ

একটি পরিপূর্ণ থ্রিলার গল্প লিখতে যেসব উপাদান প্রয়োজন পড়ে তার সব কয়টিই লেখক ব্যবহার করেছেন। গল্পগুলোতে প্রায়শই লেখক সন্তুকে দিয়ে অগ্রিম কিছু বর্ণনা করিয়েছেন। কিন্তু দেখা যায় সেই অগ্রিম ধারণাগুলো ভুল প্রতীয়মান হয়। সেই ধারণাগুলো বাস্তব রূপ না নিয়ে দেখা যায় যে অন্য কোন ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে বলা যায় কাকাবাবু সিরিজের গল্পগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ‘হঠাৎ চমক’ (সাডেন সারপ্রাইজ)।

এর বাইরে প্রতিটি গল্পে বিভিন্ন স্থানের (যেমন: মিশর, কাশ্মীর) বর্ণনা নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। এর ফলে জায়গাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠে। পাঠকের মনে হয় তিনি যেন নিজেই ঐ জায়গা ভ্রমণ করছেন।

কাকাবাবু সমগ্র ১ বইয়ের প্রচ্ছদ
কাকাবাবু সমগ্র ১ বইয়ের প্রচ্ছদ; চিত্রসূত্র- আমার বই

গ্রন্থে গল্পের ক্রমবিন্যাস

‘কাকাবাব সমগ্র ১’ বইয়ের অন্যতম নেতিবাচক দিক হল গল্পগুলোর প্রকাশ সাল অনুসারে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘ভূপাল রহস্য’ ও ‘জঙ্গলগড়ের চাবি’ গল্প দুইটির কথা। গল্প দুইটিই ‘খালি জাহাজের রহস্য’ গল্পটি প্রকাশের আগে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বইয়ে প্রথমোক্ত গল্প দুইটি স্থান পায়নি।

পরবর্তী গল্পগুলোতে যখন ভূপালের রেফারেন্স টেনে আনা হয় তখন পাঠক খেই হারিয়ে ফেলেন। এতে গল্পের রস আস্বাদন ষোল আনা না করা গেলেও বারো আনা রস আস্বাদন করা সম্ভব হয়।

এছাড়াও ‘কলকাতার জঙ্গলে’ গল্পটির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রের রেফারেন্স ছিল ‘জঙ্গলগড়ের চাবি’ গল্পে। বইয়ে গল্পের ক্রমবিন্যাস ঠিক না থাকা পাঠকদের পাঠ প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সর্বশেষে এটাই বলব- আপনি কিশোর, যুবক, প্রবীণ যাই হয়ে থাকুন না কেন কাকাবাবুর গল্পগুলো আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে। এই কর্মব্যস্ত জীবনকে আনন্দময় করে তুলবে। যাঁদের দেশ বিদেশ ভ্রমণের খুব শখ কিন্তু টাকার জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না তাঁরা নাহয় সন্তুর চোখ দিয়েই বিশ্বভ্রমণ করলেন!

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: পিক্সাবে থেকে DariuszSankowski

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on কাকাবাবু সমগ্র ১: কিশোর সন্তুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার গল্প

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!