আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর টাকার ঝনঝনানিতে আইপিএল বর্তমান পৃথিবীর সবথেকে জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট

যে উপায়ে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা লাভবান হয় (প্রথম পর্ব)

4.9
(7)
Bookmark

No account yet? Register

ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর হিসেবে এখনো সারা বিশ্বব্যাপী আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট সর্বাধিক জনপ্রিয়। কিন্তু গত দুই দশক ধরে এই ধারাবাহিকতায় ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেটকে পিছনে ফেলে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ বা আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার কারণে এখন তুমুল জনপ্রিয়। 

ভারত, পৃথিবীর মোট ক্রিকেট দর্শকের ৭০ শতাংশ যে দেশের, সেখানের স্থানীয় প্রিমিয়ার লীগ যে জনপ্রিয়তার নিরিখে অন্য সকল ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে পেছনে ফেলবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আজ আলোচনার বিষয় আইপিএলের জনপ্রিয়তা নিয়ে না; বরং আইপিএলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থের সমাগম হয় তা নিয়ে। 

আইপিএল মানেই যে অর্থের ছড়াছড়ি, এমন বলাটা মোটেই অত্যুক্তি হবে না। বিপুল পরিমাণ অর্থের হাতবদল হয় এই টুর্নামেন্টে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে খেলোয়াড়েরা এসে সমবেত হয় ভারতে। একেকজনের জন্য চড়া দাম হাঁকে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। পত্রিকার পাতায় কেবলই আইপিএলের ঘটনাপ্রবাহের ছবি। টেলিভিশন চ্যানেলে কেবল আইপিএলেরই খবর। কখনো কী মনে প্রশ্ন জেগেছে, এতো টাকা কোথা থেকে আসছে? ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো যে বিপুল মূল্যে খেলোয়াড়দের কিনছে, তাদেরই বা আর্থিক লাভ কোথায়? বা আদৌ আর্থিক লাভ হয় কী? 

আরো পড়ুন: মেসি নাকি রোনালদো, শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় কে এগিয়ে?

না, আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো দানছত্র খুলে বসেনি বা ক্রিকেটের প্রতি তাদের এমন মহব্বতও নেই যে, পকেটের টাকা খরচ করে আইপিএলের দল কিনবে। নির্ভেজাল এবং বিপুল আর্থিক লাভ আছে দেখেই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ‘বিনিয়োগ’ করে থাকে আইপিএলের আসরগুলোতে । 

অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি আছে, যারা মাঠের খেলায় একদম সুবিধা করতে না পারলেও ঠিকই আর্থিকভাবে লাভবান হয়। আর এ কারণেই পরবর্তী বছর দ্বিগুণ উদ্যম নিয়ে তারা আবার লড়াইয়ে নামে। 

আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মালিকেরা আর্থিক দিক বিবেচনায় বিনিয়োগ করে
চিত্র: আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মালিকেরা আর্থিক দিক বিবেচনায় বিনিয়োগ করে; চিত্রসূত্র – দ্য স্পোর্টস রাশ

চলুন জেনে নিই, আইপিএলের অভ্যন্তরে ঠিক কী পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করা হয় আর সেই চড়া বিনিয়োগ করে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো লাভ-ই বা করে কি করে!

আইপিএল মিডিয়া স্বত্ব 

আইপিএলের ব্যাপক জনপ্রিয়তার নিরিখে এই খাতটি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আয়ের সবথেকে বড় উৎস। সকল টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন সম্প্রচারকদের থেকে প্রাপ্ত অর্থ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। 

প্রাথমিকভাবে এই অর্থ গ্রহণ করে আইপিএলের কেন্দ্রীয় সংস্থা বিসিসিআই। পরবর্তীতে, টুর্নামেন্ট শেষে এই অর্থ নির্দিষ্ট আনুপাতিক হারে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। 

তবে একটি বিষয় এখানে লক্ষ্য রাখতে হবে। মিডিয়া বা সম্প্রচার স্বত্ব মূল উদ্দেশ্য দর্শক সংখ্যা। তাই যে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিজেদের ম্যাচে সর্বাধিক সংখ্যক পরিমাণ দর্শক টানতে পেরেছে, মিডিয়া ফি এর ম্যাচপ্রতি গড় মানের কয়েকগুণ পরিমাণ টাকা তারা বেশি পাবে।

সাধারণভাবে ফাইনাল ম্যাচগুলোতে দর্শকের সংখ্যা সবসময়ই বেশি হয়। তাই মিডিয়া ফি সেক্ষেত্রে আকাশ ছুঁয়ে যায়। ফাইনাল বাদেও অন্য কোনো ম্যাচে যদি বিপুল পরিমাণ দর্শক থাকে, তবে সে ম্যাচের জন্যও মিডিয়া ফি অনেক উচ্চ হয়ে থাকে।

২০১৯ সালে মিডিয়া স্বত্ব বাবদ বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়; অলঙ্করণ
চিত্র: ২০১৯ সালে মিডিয়া স্বত্ব বাবদ বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়; অলঙ্করণ – লেখক 

আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মোট আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে এই খাত থেকেই। 

ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ

আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ। এই খাত থেকে মোট আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আসে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর পকেটে।

প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের দলের জার্সি, ক্যাপ, শু এবং ব্যাগে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রচারণা চালানোর অনুমতি দেয়। এর বিনিময়ে একটি মোটা অংকের অর্থ তারা গ্রহণ করে।

তবে এই টাকার অংকের আবার রকমফের আছে। কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের লোগো উজ্জ্বল এবং স্পষ্ট আকারে উপস্থাপন করতে চায়, তবে সেক্ষেত্রে বেশি টাকা গুনতে হবে। 

আরো পড়ুন: পেলে: ফুটবল ইতিহাসে কালজয়ী এক সম্রাটের ইতিকথা (উত্থান পর্ব)

আবার খেলোয়াড়দের জার্সির সামনে বুকের কাছে, জার্সির পেছনে খেলোয়াড়দের নামের উপরে বা নিচে, খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত ব্যাগের উপরে; যেখানে মানুষের চোখ সবচেয়ে বেশি পড়ে; সেখানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম বা লোগোর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা নেয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। 

দিল্লি ক্যাপিটাল ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল ব্র্যান্ড স্পন্সর হিসেবে অ্যাপলো তাদের পোস্টার এবং জার্সিতে জায়গা করে নিয়েছে
চিত্র: দিল্লি ক্যাপিটাল ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল ব্র্যান্ড স্পন্সর হিসেবে অ্যাপলো তাদের পোস্টার এবং জার্সিতে জায়গা করে নিয়েছে; চিত্রসূত্র – বিজনেস আপটার্ন

ফ্র্যাঞ্চাইজির সাথে চুক্তি অনুযায়ী, ব্র্যান্ডগুলো চাইলে সেই ফ্র্যাঞ্চাইজির খেলোয়াড়দেরকে নিয়ে কোনো বিশেষ ইভেন্টের আয়োজনও করতে পারে। এছাড়া অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজির খেলোয়াড়েরাই তাদের প্রধান স্পন্সর ব্র্যান্ডের টিভি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়ে থাকে। এগুলোর মাধ্যমেও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো প্রচুর অর্থ পেয়ে থাকে।

আইপিএল টিকিট বিক্রি

নিজেদের মাঠে যেসকল ম্যাচ হয়ে থাকে, সেসকল ম্যাচের টিকিট থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো অর্থ উপার্জন করে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো মালিকেরাই মূলত প্রতিটি ম্যাচের টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন। তবে লক্ষ রাখা হয় যাতে টিকিটের দাম এত বেশি আবার না হয়, যাতে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে না আবার চলে যায়। 

ম্যাচের টিকেট বিক্রির টাকা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আয়ের বড় একটি উৎস
চিত্র: ম্যাচের টিকেট বিক্রির টাকা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আয়ের বড় একটি উৎস; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট 

মাঠে দর্শকের ধারণক্ষমতা, দলের সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের হার এবং ঐ শহরের মানুষের জীবনযাত্রার মান টিকেটের দামকে প্রভাবিত করে। 

টিকেট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চলে যায় বিসিসিআই এর হাতে। অল্প অংশ যায় মূল স্পন্সরের কাছে। আর সিংহভাগই থেকে যায় ফ্র্যাঞ্চাইজি এর কাছে। 

আরো পড়ুন: মগজের লড়াই: শতরঞ্জ

তবে পরিস্থিতি সবসময় একরকম থাকে না। আইপিএল কর্তৃপক্ষ চায়, যেকোনো ভাবেই হোক, গ্যালারির একটি আসনও যেন ফাঁকা না থাকে, এবং টিভিতে বসে খেলা দেখা দর্শকদের যেন মনে হয় এবারের আসর খুবই হিট হয়েছে।

এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা অনেক সময় টিকিট বাবদ ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণেও বাধ্য হয়, যাতে খুব বেশি আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও দর্শক স্টেডিয়ামে এসে খেলা দেখে।

আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মোট আয়ের ৮ থেকে ১০ শতাংশ আসে টিকেট বিক্রির টাকা থেকে।

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – Fran9

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on যে উপায়ে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা লাভবান হয় (প্রথম পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!