মিশরীয় সভ্যতাতে হায়রোগ্লিফ সংক্রান্ত বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে।

‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ – গল্পের ছলে মিশরীয় সভ্যতার জানা অজানা রহস্যের সন্ধান

2.6
(7)
Bookmark

No account yet? Register

  • বইয়ের নাম: হায়রোগ্লিফের দেশে
  • ভাষা: বাংলা
  • লেখকের নাম: অনির্বাণ ঘোষ
  • মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ ভারতীয় রুপি
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৫৫
  • প্রথম সংস্করণ: ডিসেম্বর, ২০১৮
  • আইএসবিএন: ৯৭৮৯৩৮৩২০০৯১৭
  • প্রকাশক: খোয়াবনামা প্রকাশনী

চরিত্র এবং প্রেক্ষাপট

‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ বইটিতে লেখক প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা এবং মিথলজির এক অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন। ২০০১ সালে হাওড়ার ‘শ্যামাশ্রী’ সিনেমা হলে লেখক এবং তার বড় ভাই ‘দ্যা মমি রিটার্নস’ সিনেমার বিশাল পোস্টার দেখতে পান। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মনে তখন থেকেই মিশর সম্পর্কে কৌতুহল জন্মায়। আর এই কৌতুহলের কারণে তারা ধীরে ধীরে মিশরকে জানার চেষ্টা শুরু করে এবং মিশর যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। আর সেই স্বপ্নের রুপায়নই আলোচ্য গ্রন্থ। 

সাধারণ ইতিহাসভিত্তিক বইয়ের মত নয়, বরং লেখক গ্রন্থটি সাজিয়েছেন ফিকশন আকারে। গ্রন্থের তিনটি প্রধান চরিত্রের মধ্যকার কথপোকথনের মাধ্যমেই মিশরীয় ইতিহাস এবং পৌরাণিক কাহিনী উপস্থাপন করেছেন লেখক।

'হায়রোগ্লিফের দেশে' গ্রন্থের প্রচ্ছদ
চিত্র: ‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ; চিত্রসূত্র – গুডরিডস

চরিত্রসমূহ

ভবেশ সামন্ত (যাকে গ্রন্থে কথকের ভূমিকায় দেখা যাবে), স্পন্দন বসু এবং প্রদীপ্ত ঘোষ। স্পন্দন এবং পিজিকে পাঠকেরা পাবেন শ্রোতা হিসেবে।

কাহিনি সংক্ষেপ

স্পন্দন এবং পিজি নামে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়া দুই বন্ধুর খুব আগ্রহ মিশরীয় ইতিহাস এবং পুরাণ সম্পর্কে জানার। এসম্পর্কিত বইগুলোর খোঁজ করতে তারা প্রায়ই কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারে। 

একবার তারা যায় উইলবার স্মিথের রিভার গড বইয়ের খোঁজে! কিন্তু কোনো দোকানে বইটা পাওয়া যাচ্ছিলো না। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তাদের হাতে আসে কাঙ্খিত বইটি। যে দোকানে তারা বইটি পায়, সে দোকানের মালিকের নাম ভবেশ সামন্ত। পেশায় বই বিক্রেতা হলেও রক্তে মিশে আছে মিশরীয় সভ্যতার অজানার প্রতি টান। সে কথা তিনি স্পন্দন এবং পিজিকে জানালে, দুই কিশোর তা খুব একটা আমলে নেয়নি। ভবেশ সামন্ত তাদেরকে সন্ধ্যার আড্ডায় মিশরীয় সভ্যতার গল্প শুনতে আমন্ত্রণ জানান।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুই কিশোর ভবেশের আমন্ত্রণ স্বীকার করে, আর শুরু হয় ভবেশ সামন্তের গল্প বলা।

ভবেশ সামন্ত শুরু করেন তার গল্প বলা। একদিকে যেমন চলতে থাকে মিশরীয় সভ্যতার জানা-অজানা কথা, অন্যদিকে দুই কিশোর স্পন্দন ও পিজি পরিচিত হতে থাকে কলকাতার বিখ্যাত খাবার এবং দর্শনীয় স্থানগুলোর সাথে।

বিষয়বস্তু 

বইটার মূল বিষয়-ই হচ্ছে প্রাচীন মিশর। আর এই ইতিহাসকে বইটিতে লেখক ২৫টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। প্রতিটি অধ্যায় ছিলো ভবেশ সামন্তের বলা এক একটা গল্প! প্রতিটি অধ্যায় শুরুর আগে লেখক সে অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়ের উপর ভিত্তি করে একটি কাহিনি সাজিয়েছে যা বইটি পাঠকে আরও সুখময় করে তুলেছে!

মিশরীয় সভ্যতার গর্বিত প্রতীক পিরামিড
চিত্র: মিশরীয় সভ্যতার গর্বিত প্রতীক পিরামিড; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

উল্লেখযোগ্য কয়েকজন দেবতা

আলোচনার সুবিধার্থে লেখক গ্রন্থের সূচনায় মিশরীয় পুরাণের কিছু দেবতার নাম ও সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি উল্লেখ করেছেন –

  • শু হলেন তেনুতের স্বামী, নুত আর গেবের বাবা। তেফনুত আর শু -ই প্রথম দেবদেবী, যাদের জন্ম দেন আতুম। শু আলাে আর বাতাসের দেবতা।
  • আমুন দেবতার অন্য নাম হলো আমেন বা আমন। মিশরের থেবস শহরের প্রধান দেবতা।
মিশরীয় পৌরাণিক দেবতা আমুন
চিত্র: মিশরীয় পৌরাণিক দেবতা আমুন; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স
  • রা হলেন সূর্য দেবতা। মাথাটা বাজপাখির, মুকুটে সূর্য আর একটা সাপ থাকে। রাতের বেলায় রা যখন মাটির নিচে যাত্রা করেন তখন তার মাথাটা হয়ে যায় ভেড়ার।
মিশরীয় সূর্য দেবতা রা
চিত্র; মিশরীয় সূর্য দেবতা রা; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স
  • আনুবিস হলেন শেয়াল দেবতা। বাবা সেথ , মা নেফথিস। আনুবিসই প্রথম মমি তৈরি করেন।
  • বেস অন্যান্য দেবদেবীর থেকে একদম আলাদা। বেঁটে, অদ্ভুত রকমের দেখতে, জিভ বেরিয়ে আছে বাইরে।
  • বাস্তেত দেবীর মাথাটা বিড়ালের। বাস্তেত সুখ ও আনন্দের দেবী। বাস্তেতের মন্দির ছিল বুবাস্তিস নামের এক শহরে।

স্ফিংস যদিও মিশরীয় সভ্যতায় বর্ণিত কোনো দেবতা নন, তবে তার অদ্ভূত আকৃতি এবং বিস্ময়কর মৃত্যুর ঘটনার জন্য অনুসন্ধানী মনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

স্ফিংসের মাটি এবং পাথর নির্মিত ভাস্কর্য
চিত্র: স্ফিংসের মাটি এবং পাথর নির্মিত ভাস্কর্য; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তুতানখামেন ফারাও রাজত্বের কনিষ্ঠতম শাসক। মাত্র দশ বছর বয়সে তুতানখামেন রাজ্যের হাল ধরেন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩২ থেকে ১৩২৩ সাল পর্যন্ত ছিল তার রাজত্বকাল। ন’বছর সিংহাসন সামলানোর পর খ্রিস্টপূর্ব ১৩২৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তরুণ ফারাওয়ের। কিন্তু তার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে ব্যাপক রহস্য। মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও বিজ্ঞানীরা উদঘাটন করতে পারেননি। তার মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ববিদের রয়েছে নানা মত। কেউ মনে করেন তুতানখামেন সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিলেন। কেউ বা বলেন তাকে খুন করা হয়েছে। কারো মতে ম্যালেরিয়াতে তিনি মারা যান। আবার প্রত্নতত্ত্ববিদদের একাংশ বিশ্বাস করেন, ভারী কিছুতে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলেন এই ফারাও।

তুতানখামেন
চিত্র: তুতানখামেন; চিত্রসূত্র – মিডিয়াম

কিশোর সম্রাটকে নিয়ে যেন রহস্যের অন্ত নেই। নীল নদের বাসিন্দাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, যে বা যারা তুতানখামেন মমিকে বিরক্ত করবে, তাদের মৃত্যু অনিবার্য। এই বিশ্বাসটা গাঢ় হওয়ার পিছনে রয়েছে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনা।

তাদের মতে এই সমাধিতে ঢোকার চেষ্টার ফল কখনো ভালো হয় না। তাদের আশঙ্কা, তুতানখামেনের সমাধিতে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে ফের ১৯২২ সালের মত বিভীষিকাময় ঘটনা আবার ফিরে আসবে না তো! নতুন করে অভিশাপের ছায়া পড়বে না তো মিশরবাসীদের উপর ! বিজ্ঞানমনস্ক মন এসবকে অস্বীকার করলেও বিশ্বাসকে কি অত সহজে টলানো যায়!

আরো পড়ুন: বিচিত্র মানুষের বিচিত্র স্বভাব নিয়ে ব্যোমকেশের চিড়িয়াখানা

আরো পড়ুন: একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়: লাখো তরুণের স্বপ্নজয়ের শক্তি

লেখক পরিচিতি

কর্মসূত্রে লন্ডননিবাসী অনির্বাণ ঘোষ পেশায় সার্জন হলেও সাহিত্যের প্রতি তাঁর দুর্বলতা সেই ছোটো বয়স থেকেই। ২০১৫ সালে বন্ধু অরিজিৎ গাঙ্গুলির সঙ্গে তৈরি করেন নিজেদের ব্লগ আনাড়ি মাইন্ডস

সেখানেই লেখালিখির সূত্রপাত। এরপর বেশ কিছু ছোটগল্প, রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনি আর প্রবন্ধ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকের মন জয় করে নিতে শুরু করে। ২০১৮ সালের বইমেলায় দুটি পৃথক গল্প সংকলনে অনির্বাণের দুটি ছোটোগল্প প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পায়। একই বছরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয় তাঁর ছোটোগল্প ‘আবর্ত’।

অনির্বাণ ঘোষ
চিত্রসূত্র: অনির্বাণ ঘোষ; চিত্রসূত্র – readbengalibooks.com

অনির্বাণের জন্ম ১৯৮৫ সালে হাওড়ার শিবপুরে। মেধাবী ছাত্র হিসেবে হাওড়া বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনের গণ্ডি অতিক্রম করেই ছোটোবেলার এক স্বপ্ন সফল করার নেশায় মেতে ওঠেন অনির্বাণ। ফলস্বরূপ ২০০৮ সালে এম বি বি এস, ২০১০ সালে এম এস, এবং ২০১৩ সালে এম আর সি এস ডিগ্রি লাভের পর শল্যচিকিৎসার আধুনিক পীঠস্থান ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে। কলকাতাকে ছেড়ে গেলেও বাঙালির আদবকায়দা ও সাহিত্যপ্রীতিকে ভুলতে পারেননি অনির্বাণ।

তাই শখের ইউরোপ ভ্রমণের পাশাপাশি অনির্বাণের কলমের জাদুতে একের পর আসতে থাকে ‘স্ক্যালপেল’, ‘আদতে আনাড়ি’, ‘হিস্ট্রির মিস্ট্রি’-র মতো একাধিক জনপ্রিয় সিরিজ। মূলত নিজের ডাক্তারি অভিজ্ঞতা আর ইতিহাসভিত্তিক রিসার্চধর্মী এইসব লেখা পাঠকমহলে যথেষ্ট সমাদৃত হয় এবং অপেক্ষা বাড়তে থাকে অনির্বাণের প্রথম বইয়ের। হায়রোগ্লিফের দেশে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ঘরানা থেকে অনেকটাই আলাদা। 

প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও পৌরাণিক আখ্যান এমন সুকৌশলে পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ মনে হয় বাংলায় এই প্রথম। গল্পের ছলে মিশরের রোমহর্ষক সব আখ্যান জীবন্ত হয়ে ওঠার মধ্যেই তৈরি হতে থাকে আর একটি থ্রিলারধর্মী গল্প।

বইটির বিশেষত্ব হচ্ছে, বইটি প্রথমত দারুণভাবে ফিকশন আকারে লেখা। তার ওপর বইটিতে লেখক প্রতিটি লেখার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেশ কিছু ছবি যোগ করেছেন যা বইটিকে সুখপাঠ্য করে তুলেছে।

বাংলা ভাষায় গল্পে গল্পে প্রাচীন মিশরীয় ইতিহাস এবং পুরাণ সম্পর্কে জানতে পড়ে ফেলুন ‘অনির্বাণ ঘোষ’ রচিত  ‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ বইটা।

প্রচ্ছদ সূত্র : wallpapertip.com

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ – গল্পের ছলে মিশরীয় সভ্যতার জানা অজানা রহস্যের সন্ধান

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!