ফাস্টফুড ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে

ফাস্টফুড শিল্প: স্বাদের ভিন্নতা নাকি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি? (পর্ব ৩)

5
(2)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে ফাস্টফুড ইন্ডাস্ট্রির শুরুর দিকের কথা উঠে এসেছে। কীভাবে ফাস্টফুড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ঘাঁটি স্থাপন করলো, তাই ছিল প্রথম পর্বের উপজীব্য।

আর কীভাবে ফাস্টফুড ইন্ডাস্ট্রি সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লো, সেই আলোচনা রয়েছ দ্বিতীয় পর্বে

চলমান পর্বে গত শতাব্দীর শেষের দশকে ফাস্টফুড ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিজের ঝাণ্ডা উড়ালো এবং কীভাবে নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিলো, সেই আলোচনার সাথে সাথে ফাস্টফুড এবং পৃথিবীব্যাপী ক্রমবর্ধমান স্থূলতার সম্পর্কও আলোচিত হয়েছে।

সোভিয়েত মুলুকে ফাস্টফুড

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে মার্কিন ও সোভিয়েত পরস্পর বিপরীতমুখী দাঁড়িয়ে ছিল। এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনৈতিক ছিল না, ছিল সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এমনকি মূল্যবোধ নিয়েও। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মতাদর্শে
চিত্র: সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মতাদর্শের; চিত্রসূত্র – গেটি ইমেজ

সোভিয়েত যেখানে ছিল রক্ষণশীল সংস্কৃতি এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ব্যবস্থায় বিশ্বাসী, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল উদার সংস্কৃতি এবং পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। 

তবে ১৯৮০ এর দিক থেকে সোভিয়েতের লাগামের জোর ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। এর পিছনে মূল ভূমিকা ছিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের।

 সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ
চিত্র: সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ; চিত্রসুত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তার উদারকরণ নীতির আওতায় একটি অন্যতম পদক্ষেপ ছিল ‘Perestroika’। ‘Perestroika’ সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যক্তিগত উদ্যোগকে সীমিত পরিমাণে পরিচালনার অনুমতি দেয়। যদিও মূল নিয়ন্ত্রণ সমাজতান্ত্রিক সরকারের হাতেই ছিল। 

গর্বাচেভ এবং তাঁর প্রণীত ‘Perestroika’ নীতি
গর্বাচেভ এবং তাঁর প্রণীত ‘Perestroika’ নীতি; চিত্রসূত্র – দ্য মেডিয়ান

সময় গড়াতে থাকে, ধীরে ধীরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থাও দুর্বল হতে থাকে। এই পরিস্থিতিকে পূর্বের উল্লেখিত ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ’ ধারণাটিকে সম্প্রসারিত করে ‘বিদেশি ব্যক্তিগত উদ্যোগ’ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

ফাস্টফুড চেইন স্টোরগুলো যেন এই সুযোগের জন্য মুখিয়ে ছিল।

১৯৯০ সালের ৩১ জানুয়ারি, সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে প্রথম ম্যাকডোনাল্ডের চেইন স্টোর চালু করা হয়। প্রায় ২৫ হাজার তরুণ-তরুণী ম্যাকডোনাল্ডে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের নানা প্রান্ত থেকে মানুষেরা এসে অপেক্ষা করছিল কেবল ম্যাকডোনাল্ড কী তা জানার জন্য বা এখানে কী হয়, তা দেখার জন্য। 

১৯৯০ সালের ৩০ জানুয়ারি সোভিয়েতে প্রথম ম্যাকডোনাল্ড স্টোরের উদ্বোধনের দিন
চিত্র: ১৯৯০ সালের ৩০ জানুয়ারি সোভিয়েতে প্রথম ম্যাকডোনাল্ড স্টোরের উদ্বোধনের দিন; চিত্রসূত্র – Russian Beyond 

জনস্বাস্থ্যের উপরে ফাস্টফুড এর প্রভাব

তবে ফাস্টফুডের এই একচেটিয়া আধিপত্য খুব বেশিদিন থাকেনি। না না, তাদের নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্প গড়ে উঠেনি। বরং, বাধাটি এসেছিল সম্পূর্ণ অন্য একটি দিক থেকে। 

১৯৪০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থূলতার হার ছিল গড়ে ১২ শতাংশ, যা ১৯৯০ এর দশকে বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে, যা প্রায় দ্বিগুণ। একই পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে লাগলো। স্থূলতা যেমন নিজেই একটি সমস্যা, সাথে সাথে এটি অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সার সহ আরো নানা রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। 

পুষ্টিবিদেরা লেগে পড়লেন এই স্থূলতার কারণ অনুসন্ধানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে সারা বিশ্বে জীবনব্যবস্থার যে পরিবর্তন ঘটেছে, তাকেই এর পিছনে দায়ী করা হলো। তবে মূল দোষটা ফাস্টফুডের দিকেই গেলো।

১৯৯০ সালের ৩০ জানুয়ারি সোভিয়েতে প্রথম ম্যাকডোনাল্ড স্টোরের উদ্বোধনের দিন
চিত্র: ফাস্টফুড এবং স্থূলতা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি পরস্পর সম্পর্কিত; চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

স্থূলতার কারণ বিশ্লেষণ 

অতিরিক্ত পরিমাণে স্থূলতার পিছনে ফাস্টফুড স্টোরগুলোও অনেকাংশে দায়ী। কারণ, তারা যেমন একদিক দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্যকর খাবারের উপস্থিতি কমিয়ে দেয়, ঠিক তেমনই ফাস্টফুডের গড় পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। 

একটি উদাহরণ উল্লেখ করা যাক। ১৯৫৫ সালে, ফাস্টফুড শিল্পের প্রাথমিক দিকে, ম্যাকডোনাল্ডের একটি বার্গারের ওজন ছিল ৩.৯ আউন্স বা ১১০ গ্রামের মত।

আজ ২০২০ সালে, সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ আউন্সে বা প্রায় ৩৫০ গ্রামে। 

সময়ে সময়ে বার্গারের আকার এবং পরিমাণ
চিত্র: সময়ে সময়ে বার্গারের আকার এবং পরিমাণ; চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

একই রকম কৌশল অনুসরণ করা হয় ফ্রেঞ্চ ফ্রাই পরিবেশনের ক্ষেত্রে।

প্রাথমিকভাবে ১৯৫০ এর দশকে যেখানে ২.৫ আউন্স বা ৭০ গ্রামের প্যাকেট আকারে পরিবেশন করা হতো, সেখানে আজ গড়ে ৮.৫ আউন্স বা ২৫০ গ্রামের প্যাকেট আকারে পরিবেশন করা হয়। 

বিভিন্ন সময়ে ফ্রেঞ্চফ্রাই পরিবেশনের পরিমাণ
চিত্র: বিভিন্ন সময়ে ফ্রেঞ্চফ্রাই পরিবেশনের পরিমাণ; চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ; তথ্যসূত্র – ফার্স্ট উই ফিস্ট

ঠিক এই কারণেই, আজ পৃথিবীর প্রাপ্তবয়স্ক জনগণের ৩৯ শতাংশ স্থূলতার শিকার।

 ফাস্টফুড শিল্পের বিকাশই স্থূলতার মূল কারণ
চিত্র: ফাস্টফুড শিল্পের বিকাশই স্থূলতার মূল কারণ; অলঙ্করণে – লেখক

মানুষের দৈনন্দিন শক্তি চাহিদা যেখানে ২৫০০ কিলোক্যালরি এর আশেপাশে, সেখানে একটি বড় আকারের ম্যাক বার্গার, এক প্যাকেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং এক ক্যান সোডা মিলে প্রায় দুই হাজার কিলোক্যালরি পুষ্টিমূল্যের সমান। 

ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের বিরাট শক্তিমূল্য
চিত্র: ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের বিরাট শক্তিমূল্য; অলঙ্করণে – লেখক

এতো বিশাল শক্তিমান, সেটা না হয় বুঝা গেলো। কিন্তু পেট তো ভরবে না। ঠিকই তখন বাসায় গিয়ে আবার ভরপেট খেতে হয়। আর এভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে স্থূলতার হার। 

খাবারের উপাদান নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল। প্রচুর অপরিশোধিত চিনি, লবণ, রঙ এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বি দিয়ে তৈরি করা এসকল ফাস্টফুড নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা শুরু হলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে ফাস্টফুড নিয়ে উন্মাদনা এক বিন্দুও কমেনি। কারণ হিসেবে বলা যায়, এসকল উপাদানই ফাস্টফুডকে সুস্বাদু এবং আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপনে সাহায্য করে।  

পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে এগিয়ে যাওয়া

স্টোরগুলো অবশ্য বুঝতে পারছিল, তারা এভাবে তাদের একচেটিয়া ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে না। কারণ ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।

তাই তারাও নিজেদের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেদের মেন্যুকার্ডে তারা শাকসবজি এবং বিভিন্ন রকম ফল-ফলাদি যুক্ত করতে শুরু করে। অপরিশোধিত তেল ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করে তারা। আগের দিনের ভাজাভাজির কাজে ব্যবহৃত তেল যাতে পরের দিন আর ব্যবহার না করা হয়, সে বিষয়েও নিয়মকানুন আরোপ করা হয়।

২০০১ থেকে ২০০৪ এর মধ্যে অধিকাংশ ফাস্টফুড স্টোর নিরামিষ উপাদান নিজেদের মেন্যুতে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মাঝে যেমন তাজা সালাদ ছিল, তেমনি ছিল ভেজিটেবল রোল বা ভেজি বার্গারের মত খাদ্যও। 

 বিভিন্ন ফাস্টফুড স্টোর কর্তৃক পরিবেশিত ভেজ বার্গার
চিত্র: বিভিন্ন ফাস্টফুড স্টোর কর্তৃক পরিবেশিত ভেজ বার্গার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র অলঙ্করণ: লেখক

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ফাস্টফুড শিল্প: স্বাদের ভিন্নতা নাকি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি? (পর্ব ৩)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!