ফাস্টফুড ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে

ফাস্টফুড শিল্প: স্বাদের ভিন্নতা নাকি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি? (পর্ব ১)

3.5
(6)
Bookmark

No account yet? Register

২০১১ সালের মে মাস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক অবসরপ্রাপ্ত জেলরক্ষী ডন গরস্কে হঠাৎ করেই সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। বিষয় হচ্ছে ফাস্টফুড। জানা গেল যে, এই মার্কিন ভদ্রলোক মে মাসের ৪ তারিখে তার জীবনের ২৫ হাজার তম ম্যাকডোনাল্ড বার্গার (যা ম্যাকডোনাল্ডের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় বিগ ম্যাক নামে পরিচিত) নিজের পাকস্থলিতে চালান করেছেন। 

২০১১ সালের ১৭ মে ম্যাকডোনাল্ড তাদের এই একনিষ্ঠ ভোক্তাকে স্বীকৃতি দেয়।
চিত্র: ২০১১ সালের ১৭ মে ম্যাকডোনাল্ড তাদের এই একনিষ্ঠ ভোক্তাকে স্বীকৃতি দেয়; চিত্রসূত্র – Duluth News Tribune

ডন গরস্কে ১৯৭২ সালে এই মহাযজ্ঞের শুরু করেন। তার বয়স যখন ১৯, ততদিনে তিনি প্রায় ১ হাজার বিগ ম্যাক সাবাড় করে ফেলেছেন। এই ৩৯ বছরে গড়ে ডন গরস্কে প্রতিদিন দুইটি করে বিগ ম্যাক খেয়েছেন।

এই ২৫ হাজার বিগ ম্যাক বার্গারের শক্তি মূল্য প্রায় ১৪ মিলিয়ন কিলোক্যালরির সমান। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন ২৫০০ কিলোক্যালরি প্রয়োজন পড়ে, প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের মোট আহার্য এই ২৫ হাজার বিগ ম্যাক বার্গার।

প্রাপ্তবয়স্ক নর নারীর দৈনিক শক্তি চাহিদা
চিত্র: প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর দৈনিক শক্তি চাহিদা; চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

এক আলোচনায় ডন গরস্কে বলেন যে, তিনি মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিন এই বিগ ম্যাক খাওয়া চালিয়ে যাবেন। 

ডন গরস্কে হয়তো ফাস্টফুড প্রীতির এক চরম উদাহরণ। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, ছেলে হোক বা বুড়ো; ফাস্টফুড প্রায় সারা বিশ্ব জুড়েই সকলের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে। 

ফাস্টফুডের প্রথাগত সংজ্ঞা

ফাস্টফুড এমন এক ধরনের খাবার যা হবে কাস্টমাইজড, অর্থাৎ ভোক্তার পছন্দমত সেই খাবারের মৌলিক বা সাহায্যকারী উপাদান পরিবর্তন করা যাবে।

আরেকটি শর্ত হলো, ফাস্টফুড খুব দ্রুতই ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে। 

দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এর অধিকাংশ উপাদান আগে থেকেই রান্না করে রাখা হয় যাকে বলা যায় Pre-cooked খাবার। আবার যেহেতু ভোক্তার সুযোগ আছে নিজের পছন্দমত উপাদান বেছে নেওয়ার, তাই একই খাবারের অনেক রকম বিকল্পের সুযোগ থাকে।

যেহেতু এখানে মুখ্য উদ্দেশ্য ব্যবাসায়িক মুনাফা অর্জন, তাই বিশাল পরিমাণে এসব পণ্য উৎপাদন করা হয় যাতে লাভের পরিমাণও সর্বোচ্চ থাকে। 

ফাস্টফুড শিল্পের বিশাল বাজার

২০১৯ এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ফাস্টফুড শিল্প গড়ে প্রতি বছর ৫৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণ রাজস্ব উৎপাদন করে।

যদি এই টাকার অঙ্ক কতটা বিশাল তা না বুঝতে পারেন, তবে একটা কথাই বলা যায়। ২০১৯ সালে সুইডেনের মোট অর্থনীতির আকার ছিল ৫৬৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

ফাস্টফুড শিল্পের আকার সবাইকে চমৎকৃত করবে
চিত্র: ফাস্টফুডের বাজারের আকার সবাইকে চমৎকৃত করবে; চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

আরো একটি উদাহরণ উপস্থাপন করা যায়।

১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা নাসা চন্দ্র অভিযানের জন্য মোট ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে। বর্তমান সময়ের মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে সেই সংখ্যাটা দাঁড়াবে ২৮৩ মিলিয়নে।

চন্দ্রাভিযানে মোট খরচ ফাস্টফুড শিল্পের বার্ষিক আয়ের অর্ধেক
চিত্র: চন্দ্রাভিযানের মোট খরচ ফাস্টফুড শিল্পের বার্ষিক আয়ের অর্ধেক; চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

ফাস্টফুড শিল্পের আকার প্রতিদিন যেন লাফ দিয়ে বাড়ছে। ২০১০ এর দিকে ফাস্টফুড শিল্পের আকার ছিল ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

মাত্র ১০ বছরেই প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই এই শিল্পের আকার ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়াবে। 

২০২৭ সাল নাগাদ ফাস্টফুড শিল্পের বাজার ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে
চিত্র: ২০২৭ সাল নাগাদ ফাস্টফুড শিল্পের বাজার ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে; চিত্রসূত্র – অ্যালাইড মার্কেট রিসার্চ 

ফাস্টফুডের যেভাবে শুরু 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে এক নতুন ধরনের শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।

এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা করতে সুদূর জার্মান থেকে অটোম্যাট নিয়ে আসা হয় মার্কিন মুলুকে।

আরো পড়ুন: কৃত্রিম মাংস: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সম্ভাব্য আমিষ উৎস (পর্ব ১)

সাধারন ভেন্ডিং মেশিনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৮৯৫ সালে জার্মানির রাজধানী বার্লিনে অটোম্যাট প্রযুক্তি যাত্রা শুরু করে।

আগে থেকে খাবার রান্না করে সেখানে রেখে দেওয়া হতো। মানুষেরা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করে খাবার নিয়ে নিত। তবে এখানে কিন্তু ফাস্টফুডের উপাদান বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য প্রস্তুতের সময়কে অপচয়ের থেকে বাইরে রাখা। 

অটোম্যাট থেকে খাবার নিচ্ছেন এক ভোক্তা
চিত্র: অটোম্যাট থেকে খাবার নিচ্ছেন এক ভোক্তা; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

এই প্রযুক্তিকে ধরা হয় ফাস্টফুড প্রযুক্তির পূর্বপুরুষ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আসে ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’। যেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল ফাস্টফুডের মূল ভোক্তা, তারাই এই অর্থনৈতিক মন্দার সবথেকে বড় শিকার। তাই ফাস্টফুডের প্রসার বেশ কিছু বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। 

‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর সময়ে পৃথিবী এযাবতকালের সবচে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হয়
চিত্র: ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর সময়ে পৃথিবী এযাবতকালের সবচে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হয়; চিত্রসূত্র – ThoughtCo.

দ্য গ্রেট ডিপ্রেশনের প্রভাব ধীরে ধীরে কেটে যাওয়া শুরু করে।

তখন মানুষ ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে খাওয়া-দাওয়া করাকে এক ধরনের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। 

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১৯৪০ সালের ১৫ মে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের দুই ভাই রিচার্ড ম্যাকডোনাল্ড এবং মরিস ম্যাকডোনাল্ড প্রথম তাদের speedy সিস্টেমের আওতায় ১৫ সেন্টের বিনিময়ে (বর্তমান বাজারমূল্য হিসেবে ১ ডলার ৬০ সেন্ট) বার্গার বিক্রি শুরু করে। 

তাদের এই দ্রুত খাবার ডেলিভারি সিস্টেম মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তার সৃষ্টি করে। শুরু হয় ফাস্টফুডের অপ্রতিরোধ্য পথচলা।

এই ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন এখান থেকে

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ফাস্টফুড শিল্প: স্বাদের ভিন্নতা নাকি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি? (পর্ব ১)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!