মুঘল সম্রাট আকবর

রুলার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড: মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণালী যুগের কারিগর সম্রাট আকবর

2.8
(4)
Bookmark

No account yet? Register

  • গ্রন্থের নাম: এম্পায়ার অব দ্য মোগল: রুলার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড
  • ভাষা: ইংরেজি
  • লেখক: অ্যালেক্স রাদারফোর্ড
  • মূল আলোকপাতকৃত চরিত্র: তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর
  • অনুবাদের ভাষা: বাংলা
  • অনুবাদক: এহসান উল হক
  • প্রকাশক: রোদেলা প্রকাশনী
  • আইএসবিএন: ৯৮৭-৯৮৪-৮৯৭৫-৭০-১

তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর হিন্দুস্তানে জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুঘল সম্রাট। পিতা সম্রাট হুমায়ুনের পুনরুদ্ধার করা মুঘল সাম্রাজ্যকে তিনি ক্ষমতা এবং গৌরবের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ নতুন এক ভূখণ্ডে আগমনকারী মুঘল সাম্রাজ্য সম্রাট আকবরের সময় যেন পরিপূর্ণরুপে হিন্দুস্তানের সাথে একীভূত হয়ে যায়। ১৩ বছর বয়সের কিশোর থেকে ৬৩ বছরের পরিণত এবং দূরদর্শী বৃদ্ধ; দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে সম্রাট আকবর হিন্দুস্তানের সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পদে পদে অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি সমস্যাসমূহকে নিজের সেনাবাহিনীর সামরিক দক্ষতা এবং নিজের কূটনৈতিক প্রতিভা দিয়ে সমাধান করেছেন। তবে পারিবারিক জীবনে তিনি সফল ছিলেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। প্রথম স্ত্রী যোধা বাই (যিনি পরবর্তীতে ‘মারিয়াম-উজ-জামানি’ উপাধিতে ভূষিত হন)। জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পরবর্তী মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সাথেও তাঁর সম্পর্ক অতটা ভালো ছিল না। মানুষের ভালো-মন্দ এমন সকল গুণ মিলিয়েই ছিলেন সম্রাট আকবর।

লেখনীর প্রকৃতি

এই রচনাকে উপন্যাস হিসেবে অভিহিত করা যায়। সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে এটি আসলে এক ধরনের প্রামাণ্য-কথাচিত্র (ডকু-ফিকশন)। এই রচনায় ঔপন্যাসিক ইতিহাসের মূল ধারা বজায় রাখলেও কাহিনির প্রয়োজনে মূল কাহিনির সমান্তরালে বেশ কিছু কাল্পনিক ঘটনার আশ্রয় নেন। ঔপন্যাসিকের সফলতা তখনই, যখন তাঁর এই কাল্পনিক ঘটনা মূল ঘটনার সাথে সমন্বিত হয়ে যায়। আলোচ্য রচনাও এমন একটি ডকু-ফিকশন।

লেখকের পরিচিতি 

অ্যালেক্স রাদারফোর্ড আসলে কোনো একজন মানুষের নাম না। ডায়ানা প্রিস্টোন এবং তাঁর স্বামী মাইকেল প্রিস্টোন একত্রে এই ছদ্মনামে লিখেন। তাঁরা উভয়েই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা সমাপ্ত করেছেন। ডায়ানা প্রিস্টোনের মেজর ছিল ইতিহাস এবং মাইকেল প্রিস্টোনের মেজর ছিল ইংরেজি ভাষা।

এই দম্পতি প্রচণ্ড ভ্রমণপিপাসু। বিশ্বের নানা প্রান্তে তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে সবচেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন তাজমহল পরিদর্শন করে। তাজমহলের প্রেমে পড়ে যান তাঁরা। ইতিহাসের পাতায় পাতায় খুঁজতে শুরু করেন তাজমহলকে। খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে সেই মহান রাজবংশ – মুঘল সাম্রাজ্যের কথা। দুজনে মিলে শুরু করেন গবেষণা। তারই ফসল হলো মুঘল রাজবংশ বিষয়ে তাঁদের দুইজনের সম্মিলিত লেখা অ্যাম্পেয়ার অব দ্য মোগল সিরিজের ছয়টি বই। 

কেন তাঁরা অ্যালেক্স রাদারফোর্ড নামকেই বাছাই করলেন? এই প্রশ্নের জবাবে তাঁদের উত্তর ছিল, 

রাদারফোর্ড নাম দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নোবেলপ্রাপ্ত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডকে শ্রদ্ধা জানানো। আর অ্যালেক্স নামের উদ্দেশ্য ছিল এমন কোনো নাম খুঁজে বের করা যা পুরুষ বা মহিলা যে কারোরই নাম হতে পারে।

ডায়ানা প্রিস্টোন এবং তাঁর স্বামী মাইকেল প্রিস্টোন।
চিত্র : ডায়ানা প্রিস্টোন এবং তাঁর স্বামী মাইকেল প্রিস্টোন, চিত্রসূত্র – srutis.blogpost

স্থান এবং কাল

১৫৫৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ। বৈরাম খান এবং অন্যান্য সভাসদদের সাথে মিলে কিশোর সম্রাট আকবর পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের প্রস্ততি নিচ্ছেন। প্রতিপক্ষ হলো হিমু, যে আকবরের পিতা হুমায়ুনের হাতে পরাজিত শের শাহের ভাস্তে আদিল শাহ সুরির প্রধানমন্ত্রী।

হিমুর তৈলচিত্
চিত্র: হিমুর তৈলচিত্র; চিত্রসূত্র – History For Exams

১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে পিতৃপ্রদত্ত রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন হিন্দুস্তানে জন্ম নেওয়া প্রথম মুঘল সম্রাট আকবর।

জয়পুরের শাসক ভগবান দাসের বোন যোধা বাইকে বিয়ে করেন আকবর। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিলেন সেলিম। দিল্লির শেখ সেলিম চিশতির ঐশ্বরিক মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি পুত্রের এরূপ নামকরণ করেন। শেখ সেলিম চিশতির সম্মানে তিনি ফতেহপুর শিক্রি নামে প্রাসাদোপম অট্টালিকা তৈরি করেন যা মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

আরও পড়ুন: ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট: দেশভাগের এক পূর্ণাঙ্গ আখ্যান

ফতেহপুর শিক্রি আকবর এর তৈরি করা এক অনন্য মুঘল স্থাপত্য
চিত্র: ফতেহপুর শিক্রি আকবর এর তৈরি করা এক অনন্য মুঘল স্থাপত্য; চিত্রসূত্র – তাজমহল

যদিও অন্য আরেক স্ত্রী থেকে আকবর মুরাদ এবং দানিয়েল নামে আরো দুই পুত্রের জন্ম দেন।

সম্রাট আকবর এবং যোধা বাই
চিত্র: সম্রাট আকবর এবং যোধা বাই; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট

আকবরের সময়কালে মুঘল শাসন তাঁর সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌছায়। বাংলা এবং গুজরাট তিনি দখল করেন। রাজস্থানের অধিকাংশ অঞ্চলও এই সময়ে মুঘল শাসনাধীনে আসে। যে সমস্ত অঞ্চল আকবর জয় করতে পারেননি, সেই সকল অঞ্চলের শাসকদের সাথে তিনি কূটনৈতিক মিত্রতা গড়ে তোলেন। এমনকি সাফাভি শাসকেরা নিজেদের জাহাজে করে ভারতবর্ষের মুসলিমদের হজ্জ করার জন্য মক্কায় নিয়ে যেত।

আকবর মুঘল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যান।
চিত্র: আকবর মুঘল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যান; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট

জ্যেষ্ঠ পুত্র সেলিমের সাথে প্রথম জীবনে আকবরের সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে তা জটিল আকার ধারণ করে। আনারকলি প্রশ্নে আকবর এবং সেলিম পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থানে চলে আসেন। অবস্থা এত বাজে হয় যে, আকবর বাধ্য হয়ে সেলিমকে দূরের সীমান্তবর্তী রাজ্যে পাঠিয়ে দেন। এমন ছোটখাট অনেক বিষয় নিয়েই তাদের মাঝে সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতি ঘটতে থাকে। যদিও আকবরের মা হামিদা বেগম মৃত্যুর আগে আকবর এবং সেলিম উভয়কেই সম্মিলিতভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বার্থে কাজ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

আকবরের সময়কালে তার সভায় পর্তুগিজ এবং ইংল্যান্ড থেকে অনেক প্রতিনিধি যোগ দেন। তাদের মধ্যে যেমন বণিক ছিল, তেমনিভাবে খ্রিষ্টধর্মের প্রধান দুই শাখা ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের অনেক প্রতিনিধিও ছিলেন। এদের মধ্যে ইংরেজ বণিক জোন নিউবেরি, রালফ ফিটস এবং জেসুইট পুরোহিত ফাদার অ্যান্টোনিও মনসেরাট অন্যতম।

চরিত্র বিশ্লেষণ

সন্দেহাতীতভাবে আকবর এই রচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র। ভারতবর্ষে মুঘল শাসনকে তিনি সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। মুঘলরা ভারতবর্ষে বহিরাগত, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগণ কখনোই তাঁর কার্যক্রমের কারণে এরূপ প্রশ্ন করার সুযোগ পায়নি। তিনি যোদ্ধা কম, কূটনীতিক ছিলেন বেশি। সীমান্তবর্তী সকল সাম্রাজ্য এবং ভারতবর্ষের অভ্যন্তরেও তিনি নিজের কূটনীতিক দক্ষতা দিয়ে শান্তি বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

আবুল ফজল আল্লামা, আকবরের প্রধান সভাসদ; এই রচনার গুরুত্বপূর্ণ একজন চরিত্র। তিনি আকবরের জীবনী সংকলন করেন এবং তাঁর লেখা ‘আইন-ই-আকবরি’ মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। তাছাড়া, আকবরের সৈন্যবাহিনীর শৃঙ্খলা আনয়নের ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন। তবে, মাঝে মাঝে তাঁর চাটুকারি মনোভাব সভার সকলের বিরক্তির উদ্রেক করতো। এমনকি এই বিষয় নিয়ে শাহজাদা সেলিমের সাথে তার বাক-বিতণ্ডা পর্যন্ত হয়েছিল।

যত বড় হতে থাকেন আকবর, ততই ক্ষমতা এবং অধিকারের প্রশ্নে অভিভাবক বৈরাম খানের সাথে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে তাঁর। যদিও তাঁর মা হামিদা বেগম এবং ফুফু গুলবদন বেগম চাইতেন যে, আকবর বৈরাম খানের উপদেশ মেনে চলুক।

আকবরের অভিভাবক বৈরাম খান
চিত্র: আকবরের অভিভাবক বৈরাম খান; চিত্রসূত্র – কোরা

এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নেয় আকবরের দুধ-মা মাহাম আঙ্গা এবং তার ছেলে আদম খান। তারা বৈরাম খানের নামে আকবরের কান ভারী করতে থাকে। আকবর তখন শাস্তিস্বরূপ বৈরাম খানকে বাধ্যতামূলকভাবে হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় প্রেরণ করেন, যাতে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বৈরাম খান সরে যান। হজ্জ করে ভারতবর্ষে ফেরার সময় বৈরাম নৃশংসভাবে খুন হন। অনেকের মতে, পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত হিমুর সমর্থক বৈরাম খানকে খুন করলেও কোনো কোনো ঐতিহাসিক এর পেছনে আকবরকে দায়ী করেন। মাহাম আঙ্গা এবং আদম খান উভয়েই আকবরের সাথে তাদের নৈকট্যের ফায়দা নিতে শুরু করে। পরবর্তীতে ঘটনাচক্রে ধরা পড়ে গেলে আকবর আদম খানকে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুদণ্ড দেন।

 আকবরের দুধ-মা মাহাম আঙ্গা;
চিত্র: আকবরের দুধ-মা মাহাম আঙ্গা; চিত্রসূত্র – Wise Muslim Women

আকবরের সভার নর্তকী আনারকলি এবং সেলিমের মাঝে প্রণয় গড়ে উঠে। এই ঘটনায় আকবর মারাত্মকভাবে ক্রুদ্ধ হন। তিনি আনারকলিকে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুদণ্ড দেন। শাস্তিস্বরূপ সেলিমকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। অবশ্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইতিহাসবেত্তা আনারকলির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।

মুঘল শাসনের স্বর্ণালি যুগের কারিগর আকবরের সাম্রাজ্যের খুঁটিনাটি বিস্তারিত বিবরণ জানতে এখনই পড়ে আসুন অ্যালেক্স রাদারফোর্ড ছদ্মনামে ডায়ানা প্রিস্টোন এবং তাঁর স্বামী মাইকেল প্রিস্টোনের লেখা এম্পায়ার অব দ্য মোগল: রুলার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড

তথ্যসূত্র

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব পরিমার্জিত চিত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on রুলার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড: মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণালী যুগের কারিগর সম্রাট আকবর

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!