ডেটা স্টোরেজ হিসেবে ডিএনএ: কেন এবং কীভাবে?

মার্শাল আশিফ
4.8
(5)
Bookmark

No account yet? Register

একটু চোখ খুলে তাকালেই সবদিকে ডেটার সমারোহ দেখতে পাওয়া যায়। আপনি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বন্ধুদের সাথে ছবি ভাগাভাগি করছেন, কিংবা গুগলে মাথা ব্যথার ওষুধ কী তা জানার জন্য সার্চ দিচ্ছেন, আবার মনটা খারাপ থাকলে ইউটিউবে ভিডিও দেখে সময় কাটাচ্ছেন। সুতরাং বুঝে হোক কিংবা না বুঝে, আমরা ডেটার সমুদ্রে ভেসে আছি। মজার ব্যাপার হল, এই ডেটা সংরক্ষণে ডিএনএ দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে!

বিশাল পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণ করে রাখার জন্য বিজ্ঞানীরা নতুন একটি পদ্ধতির কথা ভাবছেন। শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি যে ডিএনএ দ্বারা ডেটা সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব! কীভাবে সম্ভব তা জানার আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক ডেটা সংরক্ষণের জন্য কেন ডিএনএ প্রয়োজন।

এইটুকু ডিএনএ এর মধ্যে কয়েকশত সিনেমা রাখা সম্ভব
এইটুকু ডিএনএ-র মধ্যে কয়েকশত সিনেমা রাখা সম্ভব ; চিত্রসূত্র – IEEE Spectrum

কেন প্রয়োজন?

Necessity is the mother of invention.

বর্তমানে ডেটা বা তথ্য সংরক্ষণের জন্য হার্ড ডিস্ক, পেনড্রাইভ, মেমোরি কার্ড প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। এগুলোর অসুবিধা হচ্ছে কয়েক দশকের মধ্যে এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এসব যন্ত্রাংশে থাকা ডেটাগুলোও কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

ধরা যাক, আপনি আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়ের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রাখতে চান যা ভবিষ্যৎ কয়েক প্রজন্মকে দেখাতে চান। তাহলে এমন কোনো জায়গায় সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে যা কয়েক শতাব্দী ধরে ডেটাগুলোকে (এক্ষেত্রে ছবি ও ভিডিও) অক্ষুণ্ণ রাখবে।

আবার, যেকোনো ডেটাই ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশ কিংবা রাষ্ট্র সংক্রান্ত কোন ডেটা। দূর ভবিষ্যতে দুইটি দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে অতীতের এসব তথ্য প্রমাণ বিরোধের মীমাংসা করতে পারবে।

এছাড়াও বিজ্ঞানের গবেষণার কাজেও এটি কাজে আসবে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বালুকণা পরিমাণ তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

দিনে দিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা যে হারে বেড়ে চলেছে তাতে তিল ধারণের জায়গা নেই। যেখানে কৃষি কাজের জন্য ফাঁকা জমি পর্যন্ত পাওয়া যায় না সেখানে বিশাল বিশাল ডেটা স্টোরেজ ব্যবহার করা দূরহ।

পরীক্ষামূলকভাবে পানির নিচে ডেটা স্টোরেজ পরিচালনা করেছিল মাইক্রোসফট
পরীক্ষামূলকভাবে পানির নিচে ডেটা স্টোরেজ পরিচালনা করেছিল মাইক্রোসফট ; চিত্রসূত্র- মাইক্রোসফট নিউজ

এ সমস্যার সমাধানের জন্য আমাদের এমন কিছু প্রয়োজন যা অল্প জায়গায় অনেক পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণ করতে পারে। সেই সাথে মিডিয়ামটিকে টেকসই হতে হবে যাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই ডেটাগুলো অপরিবর্তিত থাকে।

এসবকিছুর মুশকিল আসান হিসেবে হাজির হয়েছে ডিএনএ। আপনি হয়ত ভেবে অবাক হচ্ছেন ডিএনএর মধ্যে কিভাবে ডিজিটাল ডেটা রাখা সম্ভব ! সেই আলোচনায় এবার যাওয়া যাক।

কীভাবে এটি কাজ করে?

কম্পিউটার ০ আর ১ বাদে কিছু বোঝে না। আপনি কম্পিউটারে সিনেমা, গান, গেম, পিডিএফ যাই রাখুন না কেন কম্পিউটার সেগুলো ০ আর ১ এ রূপান্তর করে নেয় নিজের জন্য।

তাই যদি আমরা ডিএনএর মধ্যে কোন সিনেমা রাখতে চাই তাহলে আমাদেরকে সেই সিনেমাকে ০ এবং ১ দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। এরপর সেই ০ এবং ১ গুলোকে ক্রমানুযায়ী ডিএনএর মধ্যে সংরক্ষণ করতে হবে।

কোন তথ্যকে (এক্ষেত্রে সিনেমা) ০ আর ১ দিয়ে উপস্থাপন করা খুবই সহজ। এর জন্য বিভিন্ন অ্যালগরিদম ইতোমধ্যেই আছে যেগুলো ব্যবহার করে কম্পিউটার কোন কিছুকে ০ আর ১ দিয়ে চিন্তা করে। অ্যালগরিদম মানে হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অনুসরণ করে কোনো কাজ করার পদ্ধতি।

তাহলে ডিএনএর মধ্যে ডেটা সংরক্ষণের প্রথম ধাপ কোন প্রকার চড়াই উৎরাই ছাড়াই পার হয়ে এলাম। এবার দ্বিতীয় ধাপ (সেই ০ আর ১ গুলোকে ডিএনএর মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখা) অতিক্রম করতে পারলেই কেল্লাফতে।

আমরা যারা ডিএনএর গঠন একটু হলেও জানি তারা নিশ্চয়ই অ্যাডিনিন (A), থায়মিন (T), গুয়ানিন (G) আর সাইটোসিন (C) নামক নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষারকগুলোর নাম শুনেছি। এই ক্ষারকগুলোর সাথে ডি-অক্সিরাইবোজ সুগ্যার আর ফসফেট মিলে তৈরি হয় নিউক্লিওটাইড।

ডিএনএ এর গঠন
ডিএনএ-র গঠন ; চিত্রসূত্র- লেখক

এই ক্ষারকগুলোকে আমরা ০ আর ১ এর রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে ধরতে পারি। যেমন- অ্যাডিনিন মানে ০ কিংবা থায়মিন মানে ১।

সমস্যা হচ্ছে আমাদের সংখ্যা দুইটি, কিন্তু নাইট্রোজেন ক্ষারক চারটি। এর সমাধান খুব সহজেই করা যাবে। আমরা দুইটি বাইনারি সংখ্যার জোড়া বানিয়ে তা নাইট্রোজেন ক্ষারক দিয়ে প্রতিস্থাপন করব।

দুইটি করে বাইনারি সংখ্যা নিয়ে জোড়া বাঁধলে ০০, ০১, ১০ ও ১১ এই চারটি সংখ্যা পাওয়া যায়। এই চারটি সংখ্যাকে যথাক্রমে অ্যাডিনিন (A), থায়মিন (T), গুয়ানিন (G) ও সাইটোসিন (C) হিসেবে চিন্তা করতে পারি। তাহলে মূল ফাইলে ০ আর ১ মিলে ১০০০ টি অংক (ডিজিট) থাকলে আমাদের ৫০০ টি নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারক লাগবে তথ্য সংরক্ষণের জন্য।

ধরে নেওয়া যাক, আমাদেরকে এমন একটি তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে যার বাইনারি রূপ হচ্ছে ০০০০১০১১১০ । এর জন্য আমদের AAGCG ক্রমের নিউক্লিওটাইড লাগবে।

কৃত্রিম ডিএনএ সিন্থেসিস প্রক্রিয়ায় আমরা আমাদের ইচ্ছামতো যেকোনো ক্রমের নিউক্লিওটাইড বানাতে পারি। কৃত্রিম ডিএনএ তৈরির প্রক্রিয়া এ নিবন্ধে আলোচনা করলে নিবন্ধটি অনেক বড় হয়ে যাবে। আপনারা যদি এ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বর্ণনা নিয়ে নিবন্ধ চান তাহলে কমেন্ট করে জানাতে পারেন।

অবশেষে আমাদের মিশন সফল। আমরা ডিএনএর মধ্যে তথ্য সংরক্ষণ করতে পেরেছি।

নিচের চিত্রটি দেখলে আরও পরিষ্কারভাবে বিষয়টা বোঝা যাবে।

ডিএনএ তে ডেটা সংরক্ষণের ধাপগুলো এক নজরে
ডিএনএ-তে ডেটা সংরক্ষণের ধাপগুলো এক নজরে ; চিত্রসূত্র- লেখক

ডিএনএর মধ্যে তথ্য তো আমরা সংরক্ষণ করে ফেললাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা সেই তথ্য ফিরে পাব কীভাবে?

আপনি যদি এই পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ে থাকেন তাহলে নিজেই এর উত্তর বের করতে পারবেন। আপনাকে ২ মিনিট সময় দেওয়া হল চিন্তা করে এর উত্তর বের করার জন্য। দেখেন তো আপনি পারেন কি না !

অসুবিধা

প্রথম অসুবিধা হচ্ছে এর দাম। কৃত্রিমভাবে ডিএনএ সংশ্লেষণ ছাড়াও পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। তাই বাণিজ্যিকভাবে ডিএনএকে ডেটা স্টোরেজ হিসেবে এখনই ব্যবহার করা সম্ভব নয়। আশার কথা হচ্ছে, প্রযুক্তিটি যত পরিপক্ব হবে দামও তত কমে আসবে।

দ্বিতীয় অসুবিধা হচ্ছে যেকোনো তথ্য র‍্যান্ডমলি রিড করা। ধরা যাক, আপনি দশটা সিনেমা ডিএনএর মধ্যে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এই দশটি সিনেমার একটি হচ্ছে ‘The Bicycle Thief’ । এখন আপনি শুধু এই সিনেমাটি রিড করতে চাইছেন (মানে সিনেমাটি দেখতে চাইছেন)। বাকি সিনেমাগুলো নিয়ে এই মুহূর্তে আপনার কোনো মাথা-ব্যথা নেই।

এখানে সমস্যাটি হচ্ছে AAGC…TGCAT এরকম নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্সের মধ্য থেকে কীভাবে খুঁজে বের করবেন কোন নিউক্লিওটাইড থেকে আপনার পছন্দের সিনেমাটি শুরু হয়েছে?

এর আপাত সমাধান হচ্ছে পুরো নিউক্লিওটাইড সিকোয়ন্সটাই রিড করা যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত তথ্য খুঁজে পাচ্ছেন (এক্ষেত্রে দ্য বাইসাইকেল থিফ সিনেমাটি)। বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন যেখানে নিজের ইচ্ছামতো যেকোন তথ্য সরাসরি রিড করা যাবে তা সেই তথ্য নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্সের শুরুতে থাক কিংবা মাঝে !

তৃতীয় আরেকটি অসুবিধার কথা আপনি চিন্তা করতে পারছেন কি !

আমরা ০০ কে অ্যাডিনিন (A) হিসেবে চিন্তা করেছি। কিন্তু আমরা চাইলে ০০ কে থায়মিন (T) বা অন্য কোনো নাইট্রোজেন ক্ষারক হিসেবে চিন্তা করতে পারতাম। শুধু ০০ না, বাকি তিনটি বাইনারি ফর্মের জন্যও এ কথা প্রযোজ্য।

আপনি কোন সংখ্যাকে কোন নাইট্রোজেন ক্ষারক দিয়ে রিপ্রেজেন্ট করেছেন তা যদি আপনি ভুলে যান তাহলে কী হবে ! শার্লক হোমসের মতো মাথা খাটিয়ে আপনি কি এর সমাধান বের করতে পারবেন?

বর্তমানে বিভিন্ন অ্যালগরিদম আছে যা দিয়ে সহজ কোনো এনক্রিপ্টেড তথ্য ‘কী (key)’ ছাড়াই ডিক্রিপ্ট করা যায়। সেসব অ্যালগরিদম ব্যবহার করে আমাদের আলোচ্য সমস্যার সমাধান করাও সম্ভব।

শেষ কথা

এতদূর পড়ার পর আপনার কী প্রতিক্রিয়া? আপনি কি ডিএনএ ডেটা স্টোরেজ নিয়ে আশাবাদী? নাকি মনে করছেন এ পদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে কখনোই সফলতার মুখ দেখতে পারবে না? নাকি আপনি আশাবাদী যে আমির খান অভিনীত ‘পিকে’ সিনেমার মত আমরাও একদিন আমাদের আঙ্গুলকে পেনড্রাইভের মত করে ব্যবহার করতে পারব? আপনার উত্তর নিচের কমেন্ট বক্সে জানান।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র- phys.org

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ডেটা স্টোরেজ হিসেবে ডিএনএ: কেন এবং কীভাবে?

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!