নান্দনিক দৃষ্টিমাঝে ‘দিবারাত্রির কাব্য’: প্রেম ও সাহিত্যশৈলীর এক অপূর্ব মিশেল

3.8
(12)
Bookmark

No account yet? Register

‘দিবারাত্রির কাব্য’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) প্রথম রচিত উপন্যাস এবং এটি তাঁর একুশ বছর বয়সের রচনা। ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পর্যায়ে রচিত এ উপন্যাস বহুমাত্রিক কারণে তাঁর অন্যান্য রচনা থেকে স্বতন্ত্র। তাই বলে, নিছক প্রেম ফুটে উঠেছে; এই যুক্তিতে একে বাদ দেওয়া যায় না। প্রথম রচনা বলে এর রচনাকালে ঔপন্যাসিক নির্দিষ্ট কোন বিশ্ববীক্ষায় স্থির হতে পারেননি। তবে উপন্যাসটির নিরীক্ষাধর্মিতার মধ্যে আমরা ভবিষ্যতের অসাধারণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অগ্রসূচনা বা পূর্ব-অভিজ্ঞান লক্ষ করি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানামাত্রিক দৃষ্টিকোণ এ উপন্যাসে রূপকের সাহায্যে উপস্থাপিত হয়েছে। তাই দিবারাত্রির কাব্য কেবল উপন্যাসই হয়, এটি রূপকধর্মী উপন্যাস। উপন্যাসটির ভূমিকায় ঔপন্যাসিক সে কথাই বলেছেন –

“দিবারাত্রির কাব্য’ আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি।

‘দিবারাত্রির কাব্য’ পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক-তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয়, উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ”

মানিক গ্রন্থাবলি, (কলকাতা, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯শে মে, ১৯৮২) পৃ: ৯২।

শৈলীর মধ্য দিয়েই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিষয়কে আবিষ্কার, উদঘাটন ও বিকশিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাই অতি সংক্ষিপ্ত এ আলোচনায় আমরা এ উপন্যাসের গাঠনিক শৈলীকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চেষ্টা করব।

তার আগে বলে রাখা ভালো, এ আলোচনাটি শুধু সে সকল পাঠকদেরই অনুধাবনের মাঝে আসবে, যাঁরা এ উপন্যাসটি আগে পড়েছেন। স্বল্পদৈর্ঘ্যের এ উপন্যাসটি এক বসাতে পড়ে নেয়ার মত এবং দারুণ উপভোগ্য। উপন্যাসটি ইতোমধ্যে পড়া হয়ে থাকলে শুধু তাঁদের পক্ষেই এ আলোচনাটি সহজ ও প্রাঞ্জল বলে মনে হবে। অন্যথায় পাঠক অকারণে বিরক্তই হতে পারেন।

‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। চিত্রসূত্র: টুইটার

দিবারাত্রির কাব্য তিনটি ভাগে বিভক্ত: প্রথম ভাগে ‘দিনের কবিতা’ দ্বিতীয় ভাগে ‘রাতের কবিতা’ এবং তৃতীয় ভাগ ‘দিবারাত্রির কাব্য’

উপন্যাসের নায়ক হেরম্ব প্রতিটি ভাগেই উপস্থিত ও তাকে কেন্দ্র করেই কাহিনী এগিয়ে চলেছে। দিবারাত্রির কাব্য কোনো কাহিনীনির্ভর উপন্যাস নয়, ফলে ‘গল্পভুক’ পাঠকের আনন্দের পাঠে তেমন নেই। কেন্দ্রীয় চরিত্র হেরম্ব তার পূর্ব পরিচিতা সুপ্রিয়ার সংসার দর্শনে আসে পাঁচ বছরের ব্যবধানে এবং একটিমাত্র দিবসে দু’জনের সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন, জটিলতা, পারস্পরিক আসক্তি ও আসক্তিহীনতা এবং সর্বোপরি মনোজাগতিক নানা বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ‘দিনের কবিতা’ অংশটির সমাপ্তি। উপন্যাসখানির প্রতিটি ভাগ কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে। এ কবিতা রূপকধর্মী এবং কবিতার রূপক মূল বক্তব্যের ইঙ্গিতবাহী।

‘দিনের কবিতা’র সূচনা হয়েছে সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপাইকুড়া গ্রামে হেরম্বের পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে। রাত বারোটা থেকে বিসনা হতে রূপাইকুড়া থানার সামনে আসতে সকাল সাতটা বেজে যায়। হেরম্বের ছুটে চলার মধ্যেই উপন্যাসের শুরু এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তার শক্তি অবশিষ্ট ছিল ততক্ষণ সে ছুটেই চলেছে কিন্তু কোনো লক্ষ্যে সে পৌঁছুতে পারেনি। দিনের কবিতা অংশের ব্যাপ্তি এক মধ্যরাত থেকে আরেক মধ্যরাত পর্যন্ত। বারো ঘণ্টার মধ্যবর্তী সময়সীমায় ঘটিত ঘটনাবলি নিয়ে ‘দিনের কবিতা’। ইতোমধ্যে হেরম্বের মা মারা গিয়েছেন এবং স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।

রূপাইকুড়াতে সে ক্লান্ত, অবসন্ন, রিক্ত, শূন্য অবস্থায় পৌঁছে। কিন্তু তার আগমন সুপ্রিয়ার কাছে অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত ও আনন্দের। হেরম্বের অর্থহীন পরিক্রমা তাকে রূপাইকুড়াতে আনলেও সুপ্রিয়ার মধ্যে এ আগমন উত্তেজনা ও আগ্রহের সঞ্চার করেছে। স্বামী অশোকের অনুপস্থিতিতে সুপ্রিয়া তার প্রাক্তন ভালো লাগার মানুষটিকে নানাভাবে উদ্দীপিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু হেরম্ব নির্বিকার।

আসলে হেরম্ব নিজেই জানে না তার কর্তব্য কি। সে একটি অমীমাংসিত চরিত্র হিসেবেই উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রয়ে যায়।

উপন্যাসখানির প্রতিটি ভাগ কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে। এ কবিতা রূপকধর্মী এবং কবিতার রূপক মূল বক্তব্যের ইঙ্গিতবাহী।
উপন্যাসখানির প্রতিটি ভাগ কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে। এ কবিতা রূপকধর্মী এবং কবিতার রূপক মূল বক্তব্যের ইঙ্গিতবাহী। চিত্রসূত্র: pixabay

 ‘দিনের কবিতা’র ‘রান্নাঘর’ একটি রূপক। এ শব্দটি এখানে সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘রান্না’ ও রান্না-সম্পর্কিত শব্দ এসেছে বারবার। সুপ্রিয়া কৈশোর বয়স থেকেই ‘রহস্যময়’ পুরুষ হেরম্বকে ভালোবাসত কিন্তু হেরম্ব ‘ছেলেমানুষ’ সুপ্রিয়াকে ‘ভুলিয়ে ভালিয়ে’ বিয়ে দেয় দারোগা অশোকের সঙ্গে যা সে মন থেকে কখনোই মেনে নেয়নি।

কিন্তু যেহেতু বিয়ে হয়েছে তাই অস্বীকার করাও সম্ভব নয়। বিয়ে পরবর্তী সময়ে সুপ্রিয়া জীবন ধারণের চেয়ে টিকে থাকার দিকেই বেশি মনোযোগী হলো। আর সেই সংগ্রামের সাথী হিসেবে সে ‘রান্নাঘর’কে বেছে নিল। মানসিক শূন্যতা বা জাগতিক অন্যান্য সমস্যাকে পাশ কাটাতেই সুপ্রিয়ার এ রান্নাঘরপ্রীতি:

“গৃহকর্মকে সে সত্যসত্যই এত ভালোবেসেছে যে, মাছের ঝোলের আলু কুটতে বসেই তার মনের আঘাত মিলিয়ে আসে।”

উপন্যাসটির প্রথম ভাগে একটি বিষয়ই স্পষ্ট বোঝা যায়। তা হলো, যা সহজেই কাছে পাওয়া যায়, যাকে পেতে কোনো শ্রম ও চেষ্টার প্রয়োজন হয় না, তার প্রতি মানুষের প্রাপ্তির তীব্রতা, প্রাবল্য থাকে না। সুপ্রিয়ার প্রতি হেরম্বের দৃষ্টিকোণও তাই। হেরম্ব সুপ্রিয়াকে স্ফটিকস্বচ্ছতার মতোই জানে। তার কাছে সুপ্রিয়া রহস্যময়, অস্পষ্ট কোনো নারী নয়। তাই সুপ্রিয়ার প্রতি হেরম্ব নির্মোহ, আকর্ষণহীন। হেরম্ব যে সুপ্রিয়ার চিন্তা-চেতনার জগতের সবকিছু গভীরভাবেই বুঝতে পারে তা তার কথাতেই স্পষ্ট:

“ওই তোর প্রকৃতি। পনের বছর বয়সেই তুই একটু পেকে গিয়েছিলি, সুপ্রিয়া। বাইশ-তেইশ বছর বয়সে মেয়েরা সারা জীবনের একনিষ্ঠতা অর্জন করে, তোর মধ্যে সেটা পনের বছর বয়সে এসেছিল। তখনই তোর জীবনের দু’টো পথ তুই একেবারে স্থির করে ফেলেছিলি।”

আরো পড়ুন: বাঙলা সাহিত্যের জন্মকথা: লাল নীল দীপাবলি

হেরম্ব ও সুপ্রিয়ার মধ্যে তাই প্রথম থেকেই হেরম্ব একটা দূরত্ব সৃষ্টি করে রেখেছে। ঔপন্যাসিক তাদের দূরত্বকে রূপকের সাহায্যে তুলে ধরেছেন। ‘উঠানে চনচনে রোদ’ সুপ্রিয়া ও হেরম্বের মধ্যে দূরত্বের রূপক হিসেবে কাজ করেছে।

প্রথম ভাগ তাদের দূরত্বের আভাসটি স্পষ্ট করেই সমাপ্ত হয়েছে। আর এ ভাগের শেষে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিয়া হেরম্বের বিপ্রতীপ, অব্যাখ্যাত, জটিল এবং অমীমাংসিত সম্পর্ক একটি অসাধারণ পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করে তা বুঝে নেবার ভার পাঠক-মস্তিষ্কের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আর সে পরিপ্রেক্ষিত প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে নিম্নোক্তভাবে:

“আকাশ মেঘে ঢাকা। ওদিকে বিদ্যুৎ চমকায়। শুকনো ঘাসে-ঢাকা মাঠে হেরম্ব আস্তে আস্তে পায়চারি করে। আজ রাত্রে যদি বৃষ্টি হয় কাল হয়ত মাঠের বিবর্ণ বিশীর্ণ তৃণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।” 

যা সহজেই কাছে পাওয়া যায়, যাকে পেতে কোনো শ্রম ও চেষ্টার প্রয়োজন হয় না, তার প্রতি মানুষের প্রাপ্তির তীব্রতা, প্রাবল্য থাকে না। প্রেম সম্পর্কেও ঔপন্যাসিকের একই ভাবনা।
যা সহজেই কাছে পাওয়া যায়, যাকে পেতে কোনো শ্রম ও চেষ্টার প্রয়োজন হয় না, তার প্রতি মানুষের প্রাপ্তির তীব্রতা, প্রাবল্য থাকে না। চিত্রসূত্র: pixabay

এ ভাগে উপন্যাসের পরবর্তী ঘটনার কিছু পূর্ববর্তী ইঙ্গিত রূপকের সাহায্যে দেয়া হয়েছে। আবার রূপকের মাধ্যমেই দ্বিমুখী অবস্থানের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সুপ্রিয়ার স্বামী দারোগা অশোক বিশ্বাসহন্তী স্ত্রীর হত্যাকারী বিরসাকে গ্রেফতার করে থানায় এনেছে, অথচ তার নিজের ঘরেই তখন তার স্ত্রীর প্রণয়ী হেরম্ব উপস্থিত। এ ধরনের বিপ্রতীপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বি-মাত্রিক সম্পর্কের স্বরূপ উদঘাটনের প্রয়াস পেয়েছেন।

‘রাতের কবিতা’য় ‘আনন্দ’ চরিত্রের নামটি তাৎপর্যপূর্ণ। আনন্দ একরকম অজ্ঞাত, অস্পষ্ট এবং রহস্যময়। হেরম্বের নিকট আনন্দ তাই মোহ সৃষ্টি করতে পেরেছিল স্বাভাবিকভাবেই।

‘রাতের কবিতা’য় দিনের চেয়ে রাতের অন্ধকারেই ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বেশি। প্রথম ভাগ ‘দিনের কবিতা’র মতো দ্বিতীয় ভাগ ‘রাতের কবিতা’র শুরুতেও একটি বার পঙক্তির কবিতা যুক্ত করেছেন ঔপন্যাসিক। এ ভাগের কবিতাও পূর্বভাগের কবিতার মতৈ ইঙ্গিতবাহী, রূপকধর্মী। কবিতাটির শেষ ছয়টি চরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ:

শান্ত রাত্রি নীহারিকা লোকে,

বন্দি রাত্রি মোর বুকে উতল অধীর-

অনুদার-সঙ্কীর্ণ আকাশ।

মৃত্যু মুক্তি দেয় না যাহাকে

প্রেম তার মহামুক্তি।–নূতন শরীর

মুক্তি নয়, মুক্তির আভাস।

এ ভাগে প্রেম নিয়ে হেরম্ব ও আনন্দের মধ্যে বিস্তর আলোচনা ও তর্ক হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে যার বিশ্বাসে স্থির থেকেছে। আনন্দ নিজেকে একটা রহস্যের আবরণে ঢেকে রেখেছে এবং তা করেছে অনেকটা রাতের আঁধারের মতো। তাই উপর্যুক্ত কবিতায় ‘রাত্রি’ শব্দটি তিনবার ব্যবহার করে ঔপন্যাসিক আনন্দকেই ইঙ্গিত করেছেন।

ঔপন্যাসিক তাদের দূরত্বকে রূপকের সাহায্যে তুলে ধরেছেন।
ঔপন্যাসিক তাদের দূরত্বকে রূপকের সাহায্যে তুলে ধরেছেন। চিত্রসূত্র: pixabay

বাবা-মার প্রণয়ঘটিত বিয়ের পরবর্তীকালে একটি বিচ্ছিন্ন-বিশৃঙ্খল ও ক্লেদাক্ত পরিবেশে বসবাস আনন্দের মন ও মানসিকতাকে বিব্রত, বিপর্যস্ত, অসহায় করে তুলেছে, আনন্দ তাই কামনা করেছে চিরায়ত অবিচ্ছেদ্য প্রেম।

কিন্তু হেরম্ব এই চিরায়ত প্রেমের সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। আনন্দ হেরম্বের আলোচনাতেও বারবার এ বিপরীতমুখী স্রোত উঠে এসেছে:

আনন্দ বলল, প্রেম কতদিন বাঁচে?

হেরম্ব হেসে বলল, “কী করে বলব আনন্দ! দিন গুণে বলা যায় না। তবে বেশি দিন নয়। একদিন, এক সপ্তাহ, বড়জোর এক মাস।”

শুনে আনন্দ যেন ভীতা হয়ে উঠল।

‘মোটে।’

হেরম্ব আবার হেসে বলল, “মোটে হলো? এক মাসের বেশি প্রেম কারো সহ্য হয়? মরে যাবে আনন্দ-এক মাসের বেশি হৃদয়ে প্রেমকে পুষে রাখতে হলে মানুষ মরে যাবে। মানুষ একদিন কি দু’দিন মাতাল হয়ে থাকতে পারে। জলের সঙ্গে মদের যে সম্পর্ক মদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তাই-প্রেম এক তেজী নেশা।”

আনন্দের প্রেম নিবেদন হেরম্বের কাছে তাই উপেক্ষণীয়। তাছাড়া হেরম্ব ‘প্রেম চিরকাল বাঁচে’ কোনোদিন কোনো অবস্থাতে কোনো মানুষকেই এ শিক্ষা দিতে চায় না। তাই-

মানুষের মধ্যে যতখানি মানুষের নাগালের বাইরে, প্রেম তারই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

অর্থাৎ, একটি অস্পষ্ট, রহস্যময় ও দুষ্প্রাপ্যকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন সত্যিকার প্রেম। ‘দিনের কবিতা’র সুপ্রিয়া ‘দিন’ আর ‘রাতের কবিতা’র রহস্যময় অস্পষ্ট দুষ্প্রাপ্য আনন্দ ‘রাত’।

তৃতীয় ভাগ ‘দিবারাত্রির কাব্য’। পূর্বের মতোই যথারীতি এ ভাগেরও সূচনা কবিতার সংযোজনের দ্বারা। উপন্যাসের চূড়ান্ত পরিণতির আভাস এ কবিতায় দেয়া হয়েছে। আনন্দকে আমরা উপন্যাসের শেষে আগুনে আত্মাহুতি দিতে দেখি। সে কথা কবিতায় এসেছে ‘শ্মশানে’র রূপকে-

সব্যসাচী! আমি ক্ষুধাতরা,

শ্মশানের প্রান্ত-ঘেঁষা উত্তর-বাহিনী

নদীস্রোতে চলেছি, ভাসিয়া,

মোর সর্ব ভবিষ্যৎ ভরা

ব্যর্থতার পরপারে।– কে হে কাহিনী,

মোর লাগি রহিবে বসিয়া?

‘দিবারাত্রির কাব্য’ ভাগে দ্বন্দ্বময়তার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে। এ অধ্যায়ে সুপ্রিয়া ও আনন্দ অর্থাৎ দিবা ও রাত্রির আগমন ও দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে কাহিনী অগ্রসরমান। বস্তুত, তৃতীয় ভাগের নামকরণটিও রূপক। আত্মাহুতি বা আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনন্দ তার প্রেমকে চিরায়ত করে রাখতে চেয়েছে।

একটি অস্পষ্ট, রহস্যময় ও দুষ্প্রাপ্যকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন সত্যিকার প্রেম
একটি অস্পষ্ট, রহস্যময় ও দুষ্প্রাপ্যকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন সত্যিকার প্রেম। চিত্রসূত্র: pixabay

সুপ্রিয়া সহজলভ্য, তাই সে নির্মোহ হেরম্বের নিকট আকর্ষণহীন। আর অলভ্য ও অস্পষ্টতর জন্য আনন্দ হেরম্বের কাছে আকর্ষণীয়। প্রণয় সম্পর্কে এই কথাই দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসে বলতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক। প্রণয়ের সঙ্কটকে এবং তার ট্র্যাজিক পরিণামকে দেখানোর জন্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দিবারাত্রির কাব্য রচনা করেছেন।

নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকে দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসের অভিনবত্ব, প্রাণরূপরসময় প্রশংসার দাবি রাখে। তবে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে আঙ্গিকশৈলীর যে নব নব নিরীক্ষা করেছেন তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা-’কে মনে করিয়ে দেয়। শেষের কবিতা’র প্রণয় সঙ্কটকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তার দ্বারা হয়ত তিনি উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকবেন।

দিবারাত্রির কাব্যের গঠনশৈলিতে লেখকের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাধর্মী মনোভাব সুস্পষ্ট। এখানে প্রচলিত আদি, মধ্য, অন্ত্যরীতি (অ্যারিস্টটলীয় রীতি) ভেঙ্গে দিয়েছেন তিনি। তিনটি পৃথক ভাগে (‘দিনের কবিতা’, ‘রাতের কবিতা’ ও ‘দিবারাত্রির কাব্য’) কাহিনীর বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন তিনি।

আরো পড়ুন: আরণ্যক: অরণ্যের মায়ায় জীবনকে ভাবায় যে উপন্যাস

শিল্প বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এ উপন্যাসে নাটকীয়তা, সংলাপধর্মিতা, মাঝে মাঝে বিশ্লেষণধর্মিতা, গীতময়তা বা কাব্যিকতার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। লেখকের ভূমিকাতেই আমরা অনেকটা আঁচ করতে পেরেছি, দিবারাত্রির কাব্যের কাহিনী সুগঠিত নয় বরং বিক্ষিপ্ত, বিশ্লিষ্ট।

কিন্তু এ বিক্ষিপ্ত ও বিশ্লিষ্ট কাহিনীর উপস্থাপনেও মানিক আশ্চর্য রকমের সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। রূপকের আশ্রয় নিয়ে মানিক অনেক কথাকে অল্প কথায় প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছেন। দিনের রূপকের মাঝে তিনি সুপ্রিয়ার চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন এবং আনন্দ এসেছে রাতের রূপকের চাদর জড়িয়ে। বিষয়, বাক্য এমনকি শব্দ পর্যন্ত মানিক এ উপন্যাসে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।

“মানুষের মধ্যে যতখানি মানুষের নাগালের বাইরে, প্রেম তারই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।”
“মানুষের মধ্যে যতখানি মানুষের নাগালের বাইরে, প্রেম তারই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।” চিত্রসূত্র: পিক্সাবে

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিত্বশক্তি সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। সেই কবিত্বশক্তিতেই ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট দিবারাত্রির কাব্য একটি ব্যতিক্রমী কাব্যধর্মী উপন্যাসে পরিণত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শাখায় যে ক’টি কাব্যধর্মী উপন্যাস রয়েছে তন্মধ্যে শেষের কবিতা’র পরেই দিবারাত্রির কাব্যের অবস্থান। উপন্যাসের বিভিন্ন ভাগের প্রারম্ভেই মানিক কেবল যে কবিতা সংযোজন করেছেন এমনটি নয়, বরং কাহিনী বা বক্তব্য বিষয়ের মধ্যেও মাঝেমাঝেই কবিতার লাবণ্য ও মাধুর্য লক্ষ করি যা আবার অনেকটাই গীতময়:

“আনন্দের ভিতরে ও বাহির সুন্দর, অপার্থিব, অব্যবহার্য সৌন্দর্যে তার দেহমন খণ্ডিত হয়ে আছে, সে রঙিন কালিতে ছাপানো অনবদ্য কবিতার মতো।” 

দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসের সমাপ্তি প্রচলিত মিলনাত্মক বা বিয়োগাত্মক কোনোটাই নয়। বরং এর সমাপ্তি অনেকটা অ্যাবসার্ডধর্মী বা প্রায় অসম্ভব।

মনোবিশ্লেষণ ও মনের জটিলতা অন্বেষণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবণতা এ উপন্যাসের প্রায় প্রতিটি চরিত্রেই লক্ষ করা যায়। দিবারাত্রির কাব্যের সুপ্রিয়া, মালতী, অনাথ, হেরম্ব-চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে করেছেন সেভাবে অশোক কিংবা আনন্দ চরিত্র দু’টো বিশ্লেষিত হয়নি।

এ চরিত্র দু’টিকে বুঝবার দায়িত্ব মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠকের মেধার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আর একথাও ঠিক যে চরিত্র দুটিই পাঠকের সহানুভূতি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে।

দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসে বিশদ বর্ণনার পরিবর্তে প্রতীক-সংকেতের প্রযুক্তিগত ব্যবহার ঘটেছে বেশি। আর এ প্রতীক সংকেতের প্রয়োগ বেশি চোখে পড়ে প্রাকৃতিক উপাদানের ক্ষেত্রে।

দিনের কবিতা অংশে হেরম্ব ও সুপ্রিয়ার মাঝখানে ‘উঠোনের ব্যবধান ভরে ঝাঁঝালো কড়া রোদ” বিস্তৃত বর্ণনায় পরিস্ফুট না হয়ে সুপ্রিয়ার মনে হেরম্ব-সুপ্রিয়ার সম্পর্কের ‘রূপক’ রূপে ব্যঞ্জিত হয়েছে। ‘দিনের কবিতা’র শেষ অংশের মেঘে-ঢাকা বিদ্যুৎ-চমকানো আকাশ ও শুকনো ঘাসে ঢাকা মাঠের অতি সীমিত চিত্রে যেন হেরম্বের অন্তর্লোকের প্রতীকী উদ্ভাসন।

‘রাতের কবিতা’ অংশে একদিকে প্রাচীন মন্দির-বাড়ির ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশ, জ্যোৎস্নাস্নাত গভীর পূর্ণিমা রাত্রি; অন্যদিকে, পূর্ণিমা রাতে পুরী-সমুদ্রের উত্তাল রূপের পটভূমিতে সুপ্রিয়া-আনন্দের মনের ক্ষুব্ধ আলোড়ন রোমান্টিক ব্যঞ্জনাধর্মী এসব উপাদান উপন্যাসের নিহিত অর্থহীনতা ও বিচ্ছিন্নতার চেতনার নেপথ্যে এক প্রতীকী প্রেক্ষাপট ছড়িয়ে রাখে।

প্রচ্ছদ অলঙ্করণ: লেখক

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on নান্দনিক দৃষ্টিমাঝে ‘দিবারাত্রির কাব্য’: প্রেম ও সাহিত্যশৈলীর এক অপূর্ব মিশেল

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!