প্রিন্স ফিলিপ

প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (চতুর্থ পর্ব)

5
(1)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে প্রিন্স ফিলিপ, ডিউক অফ এডিনবার্গের মৃত্যু সংবাদ, ব্রিটিশ রাজপরিবারে চলমান ভাঙনের ডাক, রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপের বিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি উঠে এসেছে। দ্বিতীয় পর্বে প্রিন্স ফিলিপের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে প্রিন্স ফিলিপের পারিবারিক ইতিহাস এবং প্রিন্সেস (বর্তমানে রাণী) এলিজাবেথের সাথে প্রণয়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। চলমান পর্বে প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বিবাহ এবং রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুতে এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের বর্ণনা উঠে এসেছে।

প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিবাহ পূর্ববর্তী প্রস্ততি 

পাত্র-পাত্রী রাজি দেখে বিয়ের কথা তো হলো! কিন্তু রাজনৈতিক নানা জটিলতা আছে। প্রিন্স ফিলিপ একজন বিদেশি নাগরিক। রাজপরিবারের রীতি অনুযায়ী প্রিন্সেস এলিজাবেথই ষষ্ঠ জর্জের পরে সিংহাসনে আসীন হবেন। এই পরিস্থিতিতে একজন বিদেশি নাগরিককে বিবাহ করা তাঁর জন্য সমীচীন নয়। 

তাছাড়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নিজেদের ‘ব্রিটিশ’ পরিচয় বজায় রাখার জন্য রাজপরিবারের জার্মান নাম ‘হাউস অফ স্যাক্সে-কোবার্গ ডি গোথা’ থেকে পরিবর্তন করে ‘হাউস অফ উইন্ডসর’ রাখা হয়। এই পরিস্থিতিতে একজন বিদেশি নাগরিক যদি রাজপরিবারে প্রবেশ করেন, তবে তা সাধারণ জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

এ অবস্থায় প্রিন্স ফিলিপ তাঁর মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরামর্শে নিজের ডেনিশ এবং গ্রিক রাজকীয় পদবি পরিত্যাগ করেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন করেন। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে রাজা ষষ্ঠ জর্জ তাঁর নাগরিকত্বের আবেদন মঞ্জুর করেন। তখন তিনি নিজের পদবি হিসেবে তাঁর মায়ের বংশপদবি মাউন্টব্যাটেন যুক্ত করেন।

কেন প্রিন্স ফিলিপ তাঁর মায়ের বংশপদবি যুক্ত করলেন? এমন একটি প্রশ্ন মাথায় আসা স্বাভাবিক। কারণ হিসেবে বলা যায়, লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখন নৌবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। এই অবস্থায় প্রিন্স ফিলিপের এই পদবি গ্রহণ তাঁকে সাধারণ ব্রিটিশ জনগণের কাছে কিছুটা হলেও আপন করবে। তাছাড়া, হাউস অফ মাউন্টব্যাটেনের উৎপত্তি জার্মানিতে হলেও বিবাহসূত্রে রাণী ভিক্টোরিয়ার নাতনী এই পরিবারের পূর্বপুরুষ। তাই আশা করা হচ্ছিল যে, এই মাউন্টব্যাটেন পদবি গ্রহণই উক্ত পরিস্থিতিতে যথাযথ হবে। 

১৯৪৭ সালের ৯ জুলাই প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বাগদানের খবর সর্বসমক্ষে ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে প্রিন্স ফিলিপকে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

১৯৪৭ সালের ১৯ নভেম্বর রাজা ষষ্ঠ জর্জ প্রিন্স ফিলিপকে রাজপরিবারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মোট তিনটি পদবি প্রদান করেন। এগুলো হলো ডিউক অফ এডিনবার্গ, ব্যারন অফ গ্রিনিচ এবং আর্ল অফ মেরিওনিথ। এছাড়া রাজা ষষ্ট জর্জের আদেশক্রমে প্রিন্স ফিলিপের নামের পূর্বে ‘His Royal Highness’ যুক্ত করা হয়। 

বিয়ের অনুষ্ঠান

১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে’তে প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিয়ে হয়। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি) এই বিয়ের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে এবং সারা পৃথিবী থেকে ২০ কোটি মানুষ সেই বিয়ের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে। 

ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে’তে প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিয়ের অনুষ্ঠান
চিত্র: ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে’তে প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিয়ের অনুষ্ঠান; চিত্রসূত্র – দ্য রয়্যাল ফ্যামিলি 

তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কথা চিন্তা করে প্রিন্স ফিলিপের তিন বোনকে তাঁর বিয়েতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কারণ তারা তিনজনই বিবাহসূত্রে জার্মান রাজপরিবারের সাথে সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানদের সম্পর্কে ব্রিটিশদের খুব একটা ভালো ধারণা ছিল না। তাই কেবলমাত্র প্রিন্স ফিলিপের মা প্রিন্সেস অ্যালিস অফ মাউন্টব্যাটেন, তাঁর মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন  এবং মামাত ভাই ডেভিড মাউন্টব্যাটেন উপস্থিত ছিলেন। 

প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিয়ের পরে আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা ছবি
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিয়ের পরে আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা ছবি; চিত্রসূত্র – মেন্টাল ফ্লস 

প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথ

বিয়ের এক বছরের মাথায়, ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথ দম্পতির প্রথম সন্তান প্রিন্স চার্লসের জন্ম হয়। দুই বছর পরে, ১৯৫০ সালে জন্ম হয় প্রিন্সেস অ্যানের। 

প্রিন্সেস অ্যান এবং প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে প্রিন্স ফিলিপ
চিত্র – প্রিন্সেস অ্যান এবং প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে প্রিন্স ফিলিপ; চিত্রসূত্র – এ গুড হাউসকিপিং

বিয়ের পরপরই প্রিন্স ফিলিপ ব্রিটিশ রয়্যাল নেভিতে নিজের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যান। অন্যদিকে প্রিন্সেস এলিজাবেথ নিজে থেকে যান লন্ডনে। 

রাজা ষষ্ঠ জর্জের ফুসফুসে ক্যানসার ছিল। এই পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে নিজের যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম ঠিকঠাকভাবে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রিন্স ফিলিপ নিজের নৌবাহিনীর দায়িত্ব সাময়িকভাবে স্থগিত করে প্রিন্সেস এলিজাবেথ সহ রাজা ষষ্ঠ জর্জের কাজে সহায়তা করবেন।

তবে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসের শেষদিকে কেনিয়াতে কমনওয়েলথ ট্যুরে রাজা ষষ্ঠ জর্জ নিজে অংশগ্রহণ না করে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথকে পাঠান। 

১৯৫২ সালের কমনওয়েলথ ট্যুরে প্রিন্সেস এলিজাবেথ
চিত্র: ১৯৫২ সালের কমনওয়েলথ ট্যুরে প্রিন্সেস এলিজাবেথ; চিত্রসূত্র – ওভারব্লগ

ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যু এবং পরবর্তী ঘটনাবলি

এই ট্যুর চলাকালীন অবস্থায়ই রাজা ষষ্ঠ জর্জ ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। প্রিন্সেস এলিজাবেথের ব্যক্তিগত সচিব মার্টিন চার্টারিসের পক্ষ থেকে প্রিন্স ফিলিপ এলিজাবেথকে এই সংবাদ দেন। তখন অতি দ্রুত এই ট্যুর সমাপ্ত করে লন্ডনে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

লন্ডনে ফেরার বিমান ধরার আগে মার্টিন চার্টারিস এলিজাবেথের কাছে তাঁর রাজকীয় নাম সম্পর্কে জানতে চান। এলিজাবেথ বলেন যে, তিনি এলিজাবেথ হিসেবেই পরিচিত হতে ইচ্ছুক। তখন থেকেই তাঁকে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ হিসেবে অভিহিত করা শুরু হয়। 

৭ জানুয়ারি প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ লন্ডনে ফিরে আসেন। পরের দিন, ৮ ফেব্রুয়ারি, সেন্ট জেমস প্যালেসে খুবই সাদামাটা একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলিজাবেথকে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। 

১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে ষষ্ঠ জর্জকে সমাহিত করা হয়। 

 রাজা ষষ্ঠ জর্জের শবদেহ নিয়ে শোভাযাত্রা
চিত্র: রাজা ষষ্ঠ জর্জের শবদেহ নিয়ে শোভাযাত্রা; চিত্রসূত্র – টাইম

মাত্র ৫৬ বছর বয়সে রাজা ষষ্ঠ জর্জের অকাল মৃত্যু প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের ব্যক্তিগত এবং দাম্পত্য জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। 

শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

প্রচ্ছদ চিত্র অলঙ্করণ – লেখক

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (চতুর্থ পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!