প্রিন্স ফিলিপ

প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (তৃতীয় পর্ব)

0
(0)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে প্রিন্স ফিলিপ, ডিউক অফ এডিনবার্গের মৃত্যু সংবাদ, ব্রিটিশ রাজপরিবারে চলমান ভাঙনের ডাক, রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপের বিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি উঠে এসেছে। দ্বিতীয় পর্বে প্রিন্স ফিলিপের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চলমান পর্বে প্রিন্স ফিলিপের পারিবারিক ইতিহাস এবং প্রিন্সেস (বর্তমানে রাণী) এলিজাবেথের সাথে প্রণয়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

প্রিন্স ফিলিপ: এক বিলুপ্ত রাজবংশের উত্তরাধিকারী

প্রিন্স ফিলিপ ১৯২১ সালের ১০ জুন গ্রিসের করফু দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গ্রিস এবং ডেনমার্ক উভয় রাজবংশের যুবরাজ প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং তাঁর স্ত্রী জার্মান রাজকুমারী প্রিন্সেস অ্যালিস অফ ব্যাটেনবার্গের পঞ্চম সন্তান। গ্রিসের তৎকালীন রাজা প্রথম কনস্টান্টাইন ছিলেন প্রিন্স ফিলিপের চাচা।

বাবা প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং মা প্রিন্সেস অ্যালিস অফ ব্যাটেনবার্গের সাথে শিশু প্রিন্স ফিলিপ
চিত্র: বাবা প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং মা প্রিন্সেস অ্যালিস অফ ব্যাটেনবার্গের সাথে শিশু প্রিন্স ফিলিপ; চিত্রসূত্র – বিবিসি

যদিও জাতীয়তার দিক দিয়ে প্রিন্স ফিলিপ কখনোই গ্রিক ছিলেন না, বরং ছিলেন ডেনিশ। তা সত্ত্বেও উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে তাঁর পরিবার ঘটনাচক্রে গ্রিসের শাসনক্ষমতায় চলে আসে। গ্রিক ভাষা সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো জ্ঞান না থাকা প্রিন্স ফিলিপ, গ্রিসের সিংহাসনের দাবিদারদের তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন। 

মাতৃবংশের দিক দিয়ে প্রিন্স ফিলিপ সরাসরি ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার সাথে সংযুক্ত। প্রিন্স ফিলিপ এবং তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের স্ত্রী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, উভয়েই রাণী ভিক্টোরিয়ার চতুর্থ প্রজন্মের বংশধর। 

প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ উভয়েই রাণী ভিক্টোরিয়ার চতুর্থ প্রজন্মের বংশধর
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ উভয়েই রাণী ভিক্টোরিয়ার চতুর্থ প্রজন্মের বংশধর; অলঙ্করণ – লেখক 

প্রিন্স ফিলিপের বয়স যখন এক বছর, তখন তুর্কিদের হাতে প্রিন্স ফিলিপের চাচা রাজা প্রথম কনস্টান্টাইন পরাজিত হন এবং গ্রিসের বিপ্লবী জান্তা তাঁর সামরিক পদে চাকুরিরত পিতাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। 

প্রিন্স ফিলিপ: রূঢ় এবং কঠিন শৈশব

প্রিন্স ফিলিপের শৈশবকাল নিয়ে লেখা ‘Prince Philip: The Turbulent Early Life of the Man Who Married Queen Elizabeth II’ বইয়ে লেখক ফিলিপ এড বলেছেন যে, এই চাকরিচ্যুতির পরে মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে প্রিন্স ফিলিপের পুরো পরিবার মিলে গ্রিস থেকে পালিয়ে আসে। এমনকি ছোট্ট প্রিন্স ফিলিপকে একটি ফলের ঝুড়িতে করে গ্রিস সীমান্ত পার করানো হয়। সবাই মিলে প্যারিসে চলে আসেন এবং সেখানে শরণার্থী হিসেবে জীবন শুরু করেন। 

প্রিন্স ফিলিপের বাবা প্রিন্স অ্যান্ড্রুর কিছুটা ইংরেজি প্রীতি ছিল, যেকারণে মাতৃভাষা ডেনিশ না শিখিয়ে এক ব্রিটিশ শিশুপরিচারিকা রেখে ইংরেজি শেখানো হয়। যদিও প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাঁর নীল চোখ এবং সোনালি রঙের চুল দেখে সহজেই তাঁর ডেনিশ জাতিসত্তার আভাস পাওয়া যেত। 

বাবা মায়ের বিচ্ছেদের পরে প্রিন্স ফিলিপ চলে আসেন তাঁর নানী প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া মাউন্টব্যাটেনের কাছে। সেখান থাকা অবস্থায় তাঁর স্কুলজীবন শুরু হয়। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর জীবনের দুইটি স্কুলই ছিল যথেষ্ট কঠোর এবং পরিশ্রমী প্রকৃতির। প্রতিটি ছাত্রকে প্রচণ্ড কায়িক পরিশ্রম করে সেখানে টিকে থাকতে হতো। একজন প্রিন্স হিসেবে সেখানে মানিয়ে চলতে তাঁর কষ্ট হয়। যদিও পরবর্তীতে জীবনে প্রিন্স ফিলিপ এরূপ রূঢ় এবং কঠিন শৈশবের উপযোগিতা তুলে ধরেছেন। এমনকি পুরো পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রিন্স ফিলিপ তাঁর বড় ছেলে প্রিন্স চার্লসের স্কুল হিসেবে নিজের দুই স্কুলকেই বাছাই করেছিলেন। 

স্কুলজীবনেই তাঁর মাঝে সমুদ্রপ্রীতির সূচনা ঘটে। কোস্টগার্ডের ভলান্টিয়ার হিসেবে প্রিন্স ফিলিপ নৌকা এবং ছোট আকৃতির জাহাজ চালানোর অধিকাংশ কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেন। সহজেই বুঝা যাচ্ছিল যে, ভবিষ্যতে প্রিন্স ফিলিপ তাঁর মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং নানা প্রিন্স লুইস আলেকজান্ডার অফ ব্যাটেনবার্গের আদর্শ অনুসরণ করে নৌবাহিনীতে যুক্ত হবেন। 

প্রিন্স ফিলিপের নানা প্রিন্স লুইস আলেকজান্ডার অফ ব্যাটেনবার্গ এবং মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন উভয়েই নৌবাহিনীতে ছিলেন
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপের নানা প্রিন্স লুইস আলেকজান্ডার অফ ব্যাটেনবার্গ এবং মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন উভয়েই নৌবাহিনীতে ছিলেন; অলঙ্করণ – লেখক

সামরিক জীবন

প্রিন্স ফিলিপ ১৯৩৯ সালে ডার্টমাউথে ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানে নিজের ব্যাচের শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট হিসেবে স্বীকৃতি পান। পরবর্তী বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯ বছর বয়সী প্রিন্স ফিলিপ একজন সাবলেফট্যানেন্ট হিসেবে ভূমধ্যসাগরে দায়িত্ব পান। 

১৯৪২ সালের জুন মাসে প্রিন্স ফিলিপ লেফট্যানেন্ট হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৪৩ সালে তিনি তাঁর মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের অধীনে প্যাসিফিক সাগর অভিযানের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখন দক্ষিণ এশিয়ায় মিত্রশক্তির সর্বোচ্চ নৌ কমান্ডার ছিলেন। 

১৯৪৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর প্রিন্স ফিলিপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধরত অবস্থায় ছিলেন, যখন জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই প্রিন্স ফিলিপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামরিক জীবনের ইতি ঘটে। 

প্রিন্সেস এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপের প্রণয়  

ঠিক কখন এবং কোথায় প্রথম প্রিন্সেস এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপের সাক্ষাৎ হয়, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয় যে, ১৯৩৮ বা ১৯৩৯ সালের দিকে কোনো এক রাষ্ট্রীয় নৌবহরে রাজা ষষ্ঠ জর্জের সম্মানে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় এবং সেখানে রাজা ষষ্ঠ জর্জ সপরিবারে আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানেই প্রিন্সেস এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। 

আবার হাউস অফ মাউন্টব্যাটেন এবং হাউস অফ উইন্ডসর পরস্পরের আত্মীয় ছিল রাণী ভিক্টোরিয়ার সূত্রে এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেন একইসাথে তৎকালীন রাজা ষষ্ঠ জর্জের জ্ঞাতি ভাই এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। 

হাউস অফ উইন্ডসর এবং হাউস অফ মাউন্টব্যাটেন রাণী ভিক্টোরিয়ার সূত্রে আত্মীয়
চিত্র: হাউস অফ উইন্ডসর এবং হাউস অফ মাউন্টব্যাটেন রাণী ভিক্টোরিয়ার সূত্রে আত্মীয়; অলঙ্করণ – লেখক

এই বিবেচনায় প্রিন্স ফিলিপ বেশ কয়েকবার স্কটল্যান্ডের বালমোরাল ক্যাসেল এবং বারকশায়ারের উইন্ডসর ক্যাসেলে ঘুরতে গিয়েছিলেন এবং নৌবাহিনী থেকে ছুটি পেলেই সেখানে চলে যেতেন। 

এভাবেই প্রিন্সেস এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠে। প্রিন্সেস এলিজাবেথ তাঁর বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জকে জানান যে, সে কেবলমাত্র প্রিন্স ফিলিপকেই বিবাহ করবে।

ষষ্ঠ জর্জ বেশ কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি এলিজাবেথকে বলেন আরো কিছুটা সময় নিয়ে নিজের জীবনের এমন অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেবে দেখতে। 

রাজপরিবারের অন্যান্য অনেক সদস্য, বিশেষ করে রাজা ষষ্ঠ জর্জের স্ত্রী, রাণী এলিজাবেথ ব্রয়েস-লয়েন প্রিন্স ফিলিপকে পছন্দ করতেন না; কিন্তু ষষ্ঠ জর্জ প্রিন্স ফিলিপকে বেশ পছন্দ করতেন। 

১৯৪৬ সালের গ্রীষ্মকালে প্রিন্স ফিলিপ তৎকালীন রাজা ষষ্ঠ জর্জের কাছে প্রিন্সেস এলিজাবেথকে বিবাহের অনুমতি প্রার্থনা করেন। ষষ্ঠ জর্জ শর্তসাপেক্ষে রাজি হন। শর্ত ছিল যে, ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রিন্সেস এলিজাবেথের ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার পরেই এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে। প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথ উভয়েই এই শর্ত মেনে নেন। 

প্রচ্ছদ চিত্র অলঙ্করণ – লেখক

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (তৃতীয় পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!