প্রিন্স ফিলিপ

প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (দ্বিতীয় পর্ব)

5
(1)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে প্রিন্স ফিলিপ, ডিউক অফ এডিনবার্গের মৃত্যু সংবাদ, ব্রিটিশ রাজপরিবারে চলমান ভাঙনের ডাক, রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপের বিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি উঠে এসেছে। চলমান পর্বে প্রিন্স ফিলিপের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি ফুটে উঠেছে।

ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি

প্রিন্স ফিলিপের মূল প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ছিল তাঁর সামরিক পরিচয় যা একই সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তাঁর মায়ের পরিবারের সক্রিয় সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। তাঁর আপন মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির অন্যতম সফল সমরনায়ক এবং ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ ভাইসরয়। 

 প্রিন্স ফিলিপ এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেন
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপ এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেন; চিত্রসূত্র – দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রিন্স ফিলিপ সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রিন্স ফিলিপ
চিত্র: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রিন্স ফিলিপ; চিত্রসূত্র – এবিসি নিউজ

প্রিন্স ফিলিপকে সবসময় দূর থেকে দেখে তাঁর সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায় না। তবে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নানা অনুষ্ঠানে তাঁকে বাজে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। একবার বিতর্ক চরমে উঠে যখন প্রিন্স ফিলিপ এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ রাজনীতিবিদকে কটাক্ষ করে বলেন – 

পৃথিবীর কোন নিকৃষ্টতম অংশ থেকে তুমি এসেছ? 

সময় গড়াতে থাকে এবং তরুণ প্রিন্স ফিলিপও এক পর্যায়ে প্রৌঢ়ত্ব এবং বার্ধক্যে পর্যবসিত হন। রাজপরিবারের ভেতরের কোনো খবরই সাধারণত বাইরে আসে না। তবে যতটুকুই জনসমক্ষে আসে, তা থেকে জানা যায় যে, পরিবারের মধ্যে প্রিন্স ফিলিপ খুবই একরোখা, কর্তৃত্বপরায়ণ এবং ঠাণ্ডা স্বভাবের। দায়িত্বের অংশ হিসেবেই রাণীকে যেখানে সবসময় নিরপেক্ষ আচরণ করতে হয়, সেখানে প্রিন্স ফিলিপের এরূপ ব্যবহার ব্রিটিশ রাজপরিবারের মাঝে বেশ অস্বস্তিকর একটি আবহাওয়া তৈরি করেছিল। 

তাছাড়া ব্রিটিশ জনসাধারণের সামনে দিন দিন ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কর্মহীনতা এবং অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে শুরু হয়। এমন একটি পরিস্থিতিতে তাঁদের সামনে প্রিন্স ফিলিপ নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন কেবলমাত্র ব্রিটিশ মুকুটের স্থিতিশীলতা এবং অখণ্ডতা রক্ষা নিয়ে তাঁর প্রচেষ্টার জন্য। 

আরও পড়ুন: আলফ্রেড দ্য গ্রেট: ভাইকিং আক্রমণের বিরুদ্ধে একজন সফল রক্ষক, পর্ব ১

ব্রিটিশ রাজপরিবারকে জনসাধারণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য প্রিন্স ফিলিপের যে প্রচেষ্টা ছিল, তার জন্য অবশ্য তিনি নিজেও বেশ কয়েকবার অনুতপ্ত হয়েছেন। প্রিন্স অফ ওয়েলস চার্লস এবং লেডি ডায়না স্পেন্সারের ভঙ্গুর দাম্পত্য জীবন এবং আলোচিত বিবাহ বিচ্ছেদের সময় ব্রিটিশ রাজপরিবার ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমের সাথে শীতল একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। 

লেডি ডায়না স্পেন্সার এবং প্রিন্স চার্লসের ঘটনাবহুল বিবাহবিচ্ছেদ ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য খুবই বিব্রতকর ছিল
চিত্র: লেডি ডায়না স্পেন্সার এবং প্রিন্স চার্লসের ঘটনাবহুল বিবাহবিচ্ছেদ ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য খুবই বিব্রতকর ছিল; চিত্রসূত্র – হিস্টোরি

এই পরিস্থিতি চরমে উঠে ১৯৯৭ সালের প্যারিস শহরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ডায়না স্পেন্সারের মৃত্যুর পর। 

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্টের সড়ক দুর্ঘটনায় ডায়না মারা যান
চিত্র: ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্টের সড়ক দুর্ঘটনায় ডায়না মারা যান; চিত্রসূত্র – এবিসি নিউজ

পত্রিকা এবং গণমাধ্যম ডায়না এবং রাজপরিবারকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। ডায়নার জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। ফলে একদিকে ব্রিটিশ রাজপরিবার আর অন্যদিকে প্রিন্সেস ডায়না এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম; সব মিলিয়ে খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। 

এই বিবাহবিচ্ছেদ পরবর্তী ঘটনাবলি ব্রিটিশ রাজপরিবারের অভ্যন্তরে সুস্থ এবং স্বাভাবিক পারিবারিক চর্চার ঘাটতি তুলে ধরে। এর পিছনে মুখ্যভাবে প্রিন্স ফিলিপই দায়ী, কেননা রাষ্ট্র এবং রাজতন্ত্রের প্রয়োজনেই রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের পক্ষে পরিবারের পেছনে সময় দেওয়া অনেকটা অসম্ভব ছিল। 

প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্স চার্লস

১৯৯৪ সালে জোনাথন ডিম্বলেবি প্রিন্স চার্লসের সহায়তায় তাঁর একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। বইটির নাম ছিল ‘The Prince of Wales’

প্রিন্স চার্লসের জীবনীগ্রন্থ The Prince of Wales
চিত্র: প্রিন্স চার্লসের জীবনীগ্রন্থ ‘The Prince of Wales’; চিত্রসূত্র – গুডরিডস

এই বইয়ে প্রিন্স চার্লস খোলাখুলিভাবে তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন এবং সঙ্গতভাবেই তাঁর পিতা প্রিন্স ফিলিপের কথাও এখানে উঠে এসেছে। প্রিন্স চার্লস সেখানে তাঁর নিজের বোন প্রিন্সেস অ্যানকে তাঁর পরিবারের মাঝে প্রিন্স ফিলিপের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রায়শই প্রিন্স অ্যানের একরোখা এবং জেদি মনোভাবকে তাঁর পিতা প্রিন্স ফিলিপ মার্জনা করলেও তাঁকে প্রায়ই অবহেলা করতেন এবং তাঁর সামান্য ধরনের অপরাধের জন্য তাঁকে সকলের সামনে অপমান করতেন।

প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্স চার্লসের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল না
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্স চার্লসের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল না; চিত্রসূত্র – শোবিজ চিট শিট

এমনকি ডায়না স্পেন্সারের সাথে তাঁর বিয়েতেও তাঁর বাবা তাঁকে জোর করেছিলেন বলে প্রিন্স চার্লস দাবি করেছেন। 

রাণী এলিজাবেথের সাথে বিয়ের পড়ে প্রিন্স ফিলিপ যখন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাথে যুক্ত হলেন, ততদিনে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাদের রূপকথার রাজত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সারাদিন বসে পোলো খেলা, ঘোড়দৌড় আর জাহাজে ভেসে ভেসে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মত সচ্ছলতা না ছিল রিন্স ফিলিপের আর না ছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারের। তাই একদিকে প্রিন্স ফিলিপ যেমন নিজের রাজকীয় দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনই তরুণদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকেছেন, যাতে তাঁর নামের ব্র্যান্ডিং থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হতে পারে।  

তাছাড়া, প্রিন্স ফিলিপ রাজপরিবারের কাজে দ্রুততা আনয়ন করেন। বাকিংহাম প্যালেসে তিনি প্রথম ইন্টারকম প্রচলন করেন। তাঁর আগে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদের মাঝে নিজের কাজ নিজে করার প্রচলন ছিল না। তিনি যে কেবলমাত্র নিজের কাজ করতেন তা নয়, তাঁর সন্তান এবং বর্ধিত পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের মাঝে তিনি এই অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। 

আরও পড়ুন দ্য টাওয়ার অফ লন্ডন : ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য

প্রথাবিরোধী প্রিন্স ফিলিপ

ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রথা ভেঙ্গে তিনি সর্বপ্রথম প্রিন্স চার্লস এবং প্রিন্সেস অ্যানকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে পাঠান। এর আগ পর্যন্ত, রাজপরিবারের মূল শাখার অধিকাংশ সদস্য ঘরেই কোনো অভিজ্ঞ শিক্ষকের থেকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতেন। রাজতন্ত্রের দায়িত্ব নির্বাহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ই কেবল এই পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং তাঁর ছোট বোন প্রিন্সেস মার্গারেট এইভাবেই শিক্ষা লাভ করেন। প্রিন্স ফিলিপ এই ধারা ভেঙ্গে দেন এবং নতুন নিয়মের প্রচলন করেন। 

প্রিন্স ফিলিপের পাসপোর্ট নাম্বার ছিল ১; যেহেতু ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রধান হিসেবে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের কোনো পাসপোর্ট প্রয়োজন হয় না। রাজপরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে প্রিন্স ফিলিপ ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। এছাড়াও রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অধিকাংশ সফরে প্রিন্স ফিলিপ তাঁর সাথে ছিলেন। 

১৯৬১ সালে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ
চিত্র: ১৯৬১ সালে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট

২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজকীয় দায়িত্ব ত্যাগ করার পরে প্রিন্স ফিলিপ আর কোনো রাষ্ট্রীয় ভ্রমণে অংশ নেননি।

তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

প্রচ্ছদ চিত্র অলঙ্করণ – লেখক

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (দ্বিতীয় পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!