প্রিন্স ফিলিপ

প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (প্রথম পর্ব)

3.4
(8)
Bookmark

No account yet? Register

ইংল্যান্ডের বর্তমান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী প্রিন্স ফিলিপ ডিউক অফ এডিনবার্গ ২০২১ সালের ৯ এপ্রিল শুক্রবার ব্রিটিশ রাজপরিবারের আদি নিবাস উইন্ডসর ক্যাসেলে মৃত্যুবরণ করেছেন। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ব্রিটিশ রাজপরিবারের একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ধরে রাখার এই নায়কের মৃত্যুতে রাজপরিবার গভীর শোক প্রকাশ করেছে।

২০২০ এবং ২০২১ সালের বিভিন্ন সময়ে প্রিন্স ফিলিপকে বেশ কয়েকবার তাঁর শারীরিক জটিলতার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে হাসপাতাল থেকে বাকিংহাম প্যালেসে নিয়ে আসা হয়। বাকিংহাম প্রাসাদ কর্তৃপক্ষের সংবাদ অনুযায়ী প্রিন্স ফিলিপ ৯ এপ্রিল শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে মৃত্যুবরণ করেন। 

ব্রিটিশ রাজপরিবারকে নিয়ে নানা রকম বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এমনই এক সময়ে হলো, যখন অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া প্রিন্স হ্যারি এবং তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কলের সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবার তোপের সম্মুখীন। ২০২১ সালের ৭ মার্চ ক্যালিফোর্নিয়া শহরে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে মেগান ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ আনেন। তিনি অভিযোগ করেন, তিনি এবং তাঁর পুত্র আর্চি ব্রিটিশ রাজপরিবারে বিরূপ আচরণের সম্মুখীন। 

অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মার্কলের সাক্ষাৎকার বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল
চিত্র: অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মার্কলের সাক্ষাৎকার বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল; চিত্রসুত্র – ইউটিউব

এই ঘটনার পূর্বে, ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি এক আকস্মিক ঘোষণায় প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং সংশ্লিষ্ট রাজকীয় পদবি এবং দায়িত্ব ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। এই বিষয়টি নিয়ে তখন ব্রিটিশ রাজপরিবারের ভিতরে এবং বাইরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন: ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট: দেশভাগের এক পূর্ণাঙ্গ আখ্যান

পরবর্তীতে, ২০২০ সালের ১৮ জানুয়ারি রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁদের এই দাবি মেনে নেন এবং রাজকীয় ডিক্রি জারির মাধ্যমে তাঁদেরকে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। 

১৮ জানুয়ারি, ২০২০; রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ স্বাক্ষরিত রাজকীয় ডিক্রি;
চিত্র: ১৮ জানুয়ারি, ২০২০; রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ স্বাক্ষরিত রাজকীয় ডিক্রি; অলঙ্করণ – লেখক 

ব্রিটিশ রাজপরিবারের একমাত্র জেন্টেলম্যান হিসেবে পরিচিত ছিলেন প্রিন্স ফিলিপ। তাঁর মূল চেষ্টা ছিল উনবিংশ শতাব্দীর প্রাচীনত্বের আড়ালে বন্দি থাকা ব্রিটিশ রাজপরিবারকে বিংশ শতাব্দীর মুক্ত পৃথিবীর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিবাহ এবং পরবর্তী বিবাহবিচ্ছেদ তাঁর এই উদ্দেশ্যকে পরিবর্তন করে দেয়।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রিন্স ফিলিপের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় ব্রিটেন এবং সারা পৃথিবীর সামনে পৃথিবীর শেষ সম্মানসূচক রাজপরিবারের সম্মান ধরে রাখা এবং মুকুটের অখণ্ডতা রক্ষা করা।

আরও পড়ুন: এক পৃথিবী, এক রাষ্ট্র: বাস্তব নাকি কেবলই ধূসর কল্পনা

১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে প্রিন্স ফিলিপ ২১ বছর বয়সী প্রিন্সেস এলিজাবেথকে বিয়ে করেন। 

রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপ এর বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি
চিত্র: রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপ এর বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি; চিত্রসূত্র – এবিসি নিউজ

ক্রিস্টোফার নর্থের বলা ‘The sun never sets on British Empire’ প্রবাদকে মিথ্যা প্রমাণ করে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কর্তৃত্ব তখন কেবলমাত্র কিছু দ্বীপরাষ্ট্রের উপরেই। প্রায় এক দশক আগে অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন পরিত্যাগ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আর্থিক ক্ষতিতে ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং ইউনাইটেড কিংডম তখনো জেরবার। 

অষ্টম এডওয়ার্ডের পদত্যাগ গত শতাব্দীতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা;
চিত্র: অষ্টম এডওয়ার্ডের পদত্যাগ গত শতাব্দীতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা; চিত্রসূত্র – হিস্টোরি

প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের মধ্যকার এই রূপকথার বিবাহ তখন ভঙ্গুর রাজপরিবার এবং জাতি উভয়ের মাঝেই এই আশ্বাস জন্ম দিয়েছিল, কোন এক মন্ত্রবলে জাতি তার এই দুরবস্থা কাটিয়ে উঠবে এবং প্রায় সকল ধরনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা সত্ত্বেও ব্রিটিশ রাজপরিবার নিজেদের দ্যুতিতে ব্রিটিশ জাতির মাথার উপরে অভিভাবক হিসেবে ঝলমল করবে।

আরও পড়ুন: পোপ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সূচনা থেকে সমাপ্তি

প্রিন্সেস এলিজাবেথ যদিও পূর্ব থেকেই প্রিন্স ফিলিপের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তিনি নিজেই সরাসরি তাঁর মনের কথা তাঁর পিতা তৎকালীন ব্রিটিশ রাজা ষষ্ঠ জর্জকে অবহিত করেন।  

একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রধানের সাথে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করা, মূলত এই কারণেই বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তাঁর অবস্থান ছিল বেশ অদ্ভূত। প্রকৃত দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন কর্তৃত্বের বিবেচনায় দ্বিতীয় শ্রেণির একজন ব্যক্তি যার মূল দায়িত্ব ছিল রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অধিকাংশ সরকারি সফরে তাঁকে সঙ্গ দেওয়া। 

তা সত্ত্বেও, নিজের এই কাজকেই একটি গুরুদায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন প্রিন্স ফিলিপ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন 

আমাদের লক্ষ্য থাকবে, যাতে এই রাজতন্ত্র যথাযথভাবে চালিত হয়। 

২০১৭ সালের মে মাসে, ৯৭ বছর বয়সে তিনি নিজের এই গুরুদায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার তিন মাস পরে তাঁকে শেষবারের মত একা জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। 

যদিও অবসরের প্রিন্স ফিলিপ একদম লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাননি। ২০১৮ সালের মে মাসে প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মার্কলের বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁকে এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল। 

আরও পড়ুন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং নকল প্যারিস

অবশ্য নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘দ্য ক্রাউন’ প্রিন্স ফিলিপকে ততদিনে এক নতুন জনপ্রিয়তা দিয়েছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসকে (প্রকৃত ইতিহাস কী না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে) নাট্যরূপ দিয়ে জনগণের সামনে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টায় প্রিন্স ফিলিপের এই রাজপরিবারের ভাবমূর্তি উজ্জল রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সকলের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। এই নেটফ্লিক্স সিরিজে তরুণ প্রিন্স ফিলিপকে পর্দায় উপস্থাপন করেন ম্যাট স্মিথ। 

প্রিন্স ফিলিপ এবং ম্যাট স্মিথ
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপ এবং ম্যাট স্মিথ; চিত্রসূত্র – বাজার

অন্যদিকে প্রৌঢ় প্রিন্স ফিলিপের চরিত্রে অভিনয় করেন টোবিয়াস মেনজিস। 

টোবিয়াস মেনজিস এবং প্রিন্স ফিলিপ।
চিত্র: টোবিয়াস মেনজিস এবং প্রিন্স ফিলিপ; চিত্রসূত্র – ইন্ডিয়া টুডে

প্রিন্স ফিলিপ সম্পর্কে আরো নানাবিধ তথ্য আসছে পরবর্তী পর্বে!

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

প্রচ্ছদ চিত্র অলঙ্করণ – লেখক

তথ্যসূত্র-

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (প্রথম পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!