প্রিন্স ফিলিপ

প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (শেষ পর্ব)

4
(4)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে প্রিন্স ফিলিপ, ডিউক অফ এডিনবার্গের মৃত্যু সংবাদ, ব্রিটিশ রাজপরিবারে চলমান ভাঙনের ডাক, রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপের বিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি উঠে এসেছে। দ্বিতীয় পর্বে প্রিন্স ফিলিপের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে প্রিন্স ফিলিপের পারিবারিক ইতিহাস এবং প্রিন্সেস (বর্তমানে রাণী) এলিজাবেথের সাথে প্রণয়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। চতুর্থ পর্বে প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বিবাহ এবং রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুতে এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের বর্ণনা উঠে এসেছে। চলমান বা শেষ পর্বে প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের দাম্পত্য জীবনের নানা সমস্যা এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিব্রতকর পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।

এই বিষয়টি মোটামুটিভাবে সকলেই জানতো যে, রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পরে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথই ক্ষমতায় আসবেন এবং তখন প্রিন্স ফিলিপকে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মজীবন ছেড়ে রাজকীয় দায়িত্ব এবং পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিতে হবে। এই বিষয়টি প্রিন্স ফিলিপও জানতেন। কিন্তু প্রিন্স ফিলিপ কখনোই ভাবতে পারেননি যে, মাত্র ৩১ বছর বয়সেই তাঁকে এই বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

তাই ১৯৫২ সালের দিকে নৌবাহিনী থেকে যখন প্রিন্স ফিলিপ বাধ্য সরে আসেন, তখন এই বিষয়টি প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের দাম্পত্য জীবনেও বেশ বড় একটি ঝামেলার সৃষ্টি করে। এই পুরো ব্যাপারটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তখন প্রিন্স ফিলিপকে নিজের অভিষেক অনুষ্ঠান পরিচালনার কমিটির প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। 

১৯৫৩ সালের ২রা জুন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়। 

রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক অভিষেক অনুষ্ঠান
চিত্র: রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক অভিষেক অনুষ্ঠান; চিত্রসূত্র – বায়োগ্রাফি  

১৯৩৭ সালে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষিক্ত হন, তখন পুরো অভিষেক অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করার অনুমতি ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি) কে দেওয়া হয়নি। কেবলমাত্র অভিষেক অনুষ্ঠানের খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ সম্প্রচার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। 

ধারণা করা হচ্ছিল, রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক অনুষ্ঠানেও এমনটাই ঘটবে। কিন্তু এরূপ পরিস্থিতিতে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটলো প্রিন্স ফিলিপের। 

প্রিন্স ফিলিপ বুঝতে পেরেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিবর্তিত পৃথিবী, যেখানে রাজতন্ত্র কেবলমাত্র সাংবিধানিক হিসাবেই টিকে আছে; সেখানে মানুষের সমর্থন আদায় করতে হলে সাধারণ মানুষকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসতে হবে। প্রিন্স ফিলিপ নানা উপায়ে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে রাজি করান সরাসরি সম্প্রচারের জন্য। 

এবং এর ফলাফলও ছিল চমকপ্রদ। বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রায় ২৮ কোটি লোক টিভির পর্দায় রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে। এর চার বছর পরে, ১৯৫৭ সালে একইভাবে প্রিন্স ফিলিপ সকলকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যাতে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বড়দিনের শুভেচ্ছা টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। এই প্রচেষ্টাটিও যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। 

রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ প্রিন্স ফিলিপের সামরিক বাহিনীর প্রতি আগ্রহের বিষয়টি অনুধাবন করে তাঁকে নৌ এবং বিমান  বাহিনীতে সম্মানসূচক পদবি প্রদান করেন। প্রিন্স ফিলিপ ২০০২ সাল পর্যন্ত বিনা বেতনে তাঁর এই দায়িত্ব নির্বাহ করেন। 

 বিমানবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ মার্শাল অফ দ্য এয়ার ফোর্স এবং নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ অ্যাডমিরাল অফ দ্য ফ্লিট
চিত্র: বিমানবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ মার্শাল অফ দ্য এয়ার ফোর্স এবং নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ অ্যাডমিরাল অফ দ্য ফ্লিট; অলঙ্করণ – লেখক 

১৯৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়া অলিম্পিকের উদ্বোধনের জন্য প্রিন্স ফিলিপ রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতিনিধি হিসেবে নৌবাহিনীর একটি বিশেষ দল এবং অলিম্পিক মশাল নিয়ে ৩৬০০০ মাইলের একটি দীর্ঘ সমুদ্রাভিযানে বের হন। তবে এই নৌযাত্রায় প্রিন্স ফিলিপের ব্যক্তিগত সচিব এবং বন্ধুদের নিয়ে জাহাজে ব্যাচেলর পার্টি সহ নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির সংবাদ পাওয়া যায়। এই সংবাদ একইসাথে রাজপরিবার এবং সাধারণ ব্রিটিশ জনগণের জন্য বিব্রতকর ছিল। 

এই বিব্রতকর পরিস্থিতি ফিলিপ এবং দ্বিতীয় এলিজাবেথের দাম্পত্য জীবনেও বাজে প্রভাব ফেলে। তাই নৌযাত্রা অসমাপ্ত রেখেই ফিলিপ লন্ডনে ফেরত আসেন। 

এছাড়াও, আরো একটি বিষয় নিয়ে ফিলিপ এবং দ্বিতীয় এলিজাবেথের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় এলিজাবেথের সকল সন্তান তাঁদের পিতৃবংশ মাউন্টব্যাটেনের নামে পরিচিত হবে। সেই হিসেবে লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখন হাউস অফ উইন্ডসরের নাম পরিবর্তন করে হাউস অফ মাউন্টব্যাটেন করতে পরামর্শ দেন। অন্যদিকে ফিলিপ নিজে তাঁর সন্তানদের পিতৃপদবি হিসেবে হাউস অফ এডিনবার্গ রাখতে ইচ্ছা পোষণ করেন।

কিন্তু আপত্তি নিয়ে হাজির হন দ্বিতীয় এলিজাবেথের দাদি কুইন মেরি। কুইন মেরি দ্রুত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে নির্দেশ দেন এই নাম পরিবর্তনে বাধা দেওয়ার জন্য। এরকম আরো নানা বিষয় নিয়ে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং ফিলিপের মধ্যে মনোমালিন্য চলতে থাকে। 

আরও পড়ুন: ইলন মাস্ক: বিশ্বের অন্যতম একজন সফল উদ্যোক্তা

 প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সন্তানদের পদবি নিয়ে রাজপরিবারে ব্যাপক দ্বন্দ্বের সূচনা হয়
চিত্র: প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সন্তানদের পদবি নিয়ে রাজপরিবারে ব্যাপক দ্বন্দ্বের সূচনা হয়; অলঙ্করণ – লেখক

নৌযাত্রা থেকে ফিরে আসার বেশ কয়েক সপ্তাহ পরে ১৯৫৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাজকীয় ডিক্রি জারি করেন। 

The Queen has been pleased by Letters Patent under the Great Seal of the Realm bearing date 22nd February, 1957, to give and grant unto His Royal Highness the Duke of Edinburgh, K.G., K.T., G.B.E., the style and titular dignity of a Prince of the United Kingdom of Great Britain and Northern Ireland, Whitehall.

The Queen has been pleased to declare her will and pleasure that His ‘Royal Highness the Duke of Edinburgh shall henceforth be known as His Royal Highness The Prince Philip, Duke of Edinburgh.

এই ডিক্রির মাধ্যমে ফিলিপ যুক্তরাজ্যের একজন প্রিন্স হিসেবে আবির্ভূত হন এবং রাজকীয় পদমর্যাদায় তাঁর ছেলে প্রিন্স চার্লসের থেকে উপরে থাকেন।

পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে, কুইন মেরির মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরে, আলাদা একটি রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ‘His Royal Highness’ বাদে অন্যান্য সকল পদবীধারী তাঁর সকল সন্তানের পদবি হিসেবে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর রাখেন। অর্থাৎ, প্রিন্স চার্লস বাদে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপের বর্তমান সকল উত্তরসূরি পদবি হিসেবে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর ব্যবহার করবে। যদিও হাউস অফ উইন্ডসরের নাম অপরিবর্তিত থাকবে। 

প্রিন্স ফিলিপ এবং রাজপরিবারে ভাঙন

পুরো পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক জুড়ে প্রিন্স ফিলিপ এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের দাম্পত্য জীবন নিয়ে ভেতরে বাহিরে প্রচুর গুঞ্জন শোনা গেছে। কিন্তু এই দম্পতির পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্মানের জন্য এই সম্পর্ক টিকে যায়। আশা করা হচ্ছিল যে, ভবিষ্যতে তাঁদের দুইজনের সন্তানসন্ততি হয়তো এরূপ তিক্ত সম্পর্কের সম্মুখীন হবে না।

কিন্তু সে আশায় গুঁড়ে বালি। ১৯৯২ সালে রাজকুমারী অ্যান ও তাঁর স্বামী মার্ক ফিলিপের মধ্যকার বিবাহবিচ্ছেদ এবং ১৯৯৬ সালে প্রিন্স অ্যান্ড্রূ ও সারাহ ফারগুসনের বিবাহবিচ্ছেদ ব্রিটিশ রাজপরিবারকে আবার বিতর্কের জন্য পত্রপত্রিকার প্রথম পাতায় নিয়ে আসে। 

 ১৯৯২ সালে প্রিন্সেস অ্যাণ এবং মার্ক ফিলিপের বিবাহবিচ্ছেদ হয়
চিত্র: ১৯৯২ সালে প্রিন্সেস অ্যাণ এবং মার্ক ফিলিপের বিবাহবিচ্ছেদ হয়; চিত্রসূত্র – টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি ম্যাগাজিন

তবে সকল কিছুকে ছাপিয়ে যায় প্রিন্স চার্লস এবং প্রিন্সেস ডায়নার বিবাহবিচ্ছেদ। ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার হিসেবে প্রিন্স চার্লস এবং ডায়নার বিয়েতে যেমন মানুষের আগ্রহ ছিল প্রচুর, তেমনি তাঁদের দাম্পত্য জীবনও মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। 

তাই ১৯৯৬ সালে এই দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ নিয়েও সাধারণ মানুষের আগ্রহের কমতি ছিল না। 

 প্রিন্স চার্লস এবং প্রিন্সেস ডায়নার বিচ্ছেড ব্রিটিশ রাজপরিবারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল
চিত্র: প্রিন্স চার্লস এবং প্রিন্সেস ডায়নার বিচ্ছেড ব্রিটিশ রাজপরিবারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল; চিত্রসূত্র – হিস্টোরি

তাছাড়া, প্রিন্সেস ডায়না রাজপরিবারের বাইরেও নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন এবং তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল ঈর্ষণীয়। ব্রিটিশ রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে বাইরে নিয়ে এসে তিনি এর অন্ধকার দিকটি সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন।

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়না মারা জান। অভিযোগের আঙুল উঠে ব্রিটিশ রাজপরিবারের দিকে। ধারণা করা হয় যে, প্রিন্সেস ডায়নাকে নিশ্চুপ করানোর এটিই ছিল সবচেয়ে সহজ পথ।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের এহেন দুরবস্থাতেও ঢাল হয়ে ছিলেন প্রিন্স ফিলিপ। গণমাধ্যমের হাজারো প্রশ্নের তীর সামলেছেন দক্ষ হাতে। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের ‘দ্য জেন্টেলম্যান’। 

প্রচ্ছদ চিত্র অলঙ্করণ – লেখক

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু এবং একটি রাজকীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি (শেষ পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!