প্রচ্ছদ চিত্র

চীনা–ইরানি চুক্তি: ভূরাজনৈতিক বিস্ফোরণ, না কূটনৈতিক অলঙ্করণ?

2.6
(5)
Bookmark

No account yet? Register

২০২১ সালের ২৭ মার্চ পূর্ব এশীয় অর্থনৈতিক মহাশক্তি চীন এবং পশ্চিম এশীয় আঞ্চলিক শক্তি ইরানের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটিকে অভিহিত করা হচ্ছে চীনা–ইরানি ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (Comprehensive Strategic Partnership) চুক্তি হিসেবে। এই চুক্তিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। কারণ, চীনা ও ইরানি সরকারদ্বয় উৎসাহের সঙ্গে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সংবাদ প্রচার করেছে ঠিকই, কিন্তু চুক্তিপত্রটির প্রতিলিপি  জনসমক্ষে প্রকাশ করা থেকে তারা সযত্নে বিরত থেকেছে। তারা যেটা প্রকাশ করেছে, সেটা চুক্তিপত্রটির একটি সারাংশ মাত্র, যেটিতে কার্যত কোনোকিছুই স্পষ্ট করে বলা হয় নি। বলাই বাহুল্য, এহেন গোপনীয়তার কারণে চুক্তিটি নিয়ে নানান বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

চীনা–ইরানি চুক্তিটি ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছে, কিন্তু এটির সম্পর্কে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল মূলত ২০১৬ সালে। ২০১৬ সালে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ইরান সফর করেন এবং এটি ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে কোনো চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের ইরান সফর। জিনপিংয়ের সফরের পর থেকে চীন ও ইরানের মধ্যে একটি বিস্তৃত চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, এরকম গুজব শোনা যাচ্ছিল। ২০২০ সালের ২৪ জুন চীনের বেইজিংয়ে উভয় পক্ষ এই সংক্রান্ত একটি খসড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। অবশেষে ২০২১ সালের ২৭ মার্চ ইরানের তেহরানে চুক্তিটির চূড়ান্ত খসড়ায় উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করে। চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাভেদ জারিফ।

চীনা–ইরানি চুক্তির শর্তাবলী

উক্ত চুক্তির চুক্তিপত্রটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় নি, কিন্তু চুক্তিটির একটি খসড়া প্রচারমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই খসড়াটি প্রকৃতপক্ষেই চীনা–ইরানি চুক্তির অংশ, নাকি কোনো উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত, সেটি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয় নি। কিন্তু যেহেতু এখন পর্যন্ত অন্য কোনো সূত্র থেকে চুক্তিটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয় নি, সেহেতু এই খসড়াটিকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেই বিশ্লেষকরা তাঁদের মতামত দিচ্ছেন। উক্ত খসড়া এবং এটির ভিত্তিতে করা বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে চুক্তিটির মূল শর্তাবলি সম্পর্কে যা যা জানা গেছে, সেগুলো নিম্নরূপ।

প্রথমত, এই চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরে চীন ইরানে ৪০,০০০ কোটি (বা ৪০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ করবে। মাসিক ম্যাগাজিন ‘পেট্রোলিয়াম ইকোনমিস্টে’র ভাষ্যমতে, এর মধ্যে ২৮,০০০ কোটি (বা ২৮০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হবে ইরানের তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তি খাতে, আর বাকি ১২,০০০ কোটি (বা ১২০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হবে ইরানের যোগাযোগ ও শিল্প উৎপাদন সংক্রান্ত অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য।

বিনিময়ে ইরান আগামী ২৫ বছর চীনকে স্বল্প মূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। ‘পেট্রোলিয়াম ইকোনমিস্টে’র বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ২৫ বছর ধরে ইরান প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে অন্তত ১২% কম মূল্যে চীনের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি করবে।

চিত্র: চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং ইরানি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং ইরানি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

দ্বিতীয়ত, এই চুক্তি অনুসারে চীন ইরানের মাটিতে সৈন্য/নিরাপত্তারক্ষী প্রেরণ করার এবং অনির্দিষ্ট সংখ্যক ইরানি সমুদ্রবন্দর ও দ্বীপ ইজারা নেয়ার সুযোগ পাবে। লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দি ইকোনমিস্টে’র দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তির শর্তানুযায়ী ইরানের মাটিতে অবস্থিত চীনা স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে চীন ইরানে প্রায় ৫,০০০ ‘নিরাপত্তারক্ষী’ মোতায়েন করার সুযোগ পাবে।

তৃতীয়ত, এই চুক্তি অনুযায়ী চীন ও ইরানের মধ্যবর্তী সামরিক সহযোগিতার মাত্রা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। উভয় পক্ষ যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করবে, যৌথভাবে অস্ত্রশস্ত্র সংক্রান্ত গবেষণা করবে এবং যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে অংশ নেবে। এর পাশাপাশি উভয় রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়ের মাত্রা বৃদ্ধি করবে।

চতুর্থত, ‘আরব নিউজ’ পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে চীন হরমুজ প্রণালীর সন্নিকটে ইরানি ভূমিতে একটি মুক্ত শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ করবে। এর ফলে পরোক্ষভাবে চীন হরমুজ প্রণালীর নিকটে সামরিক উপস্থিতি স্থাপনের সুযোগ লাভ করবে।

সর্বোপরি, ইরানি আইনসভা ‘ইসলামি পরামর্শসভা’র একজন সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে চীন ও ইরানের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষত আক্রমণাত্মক ওয়েবসাইট ও ডাটাবেজগুলো নির্মূল করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ একে অপরকে সহায়তা করবে।

বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের প্রচারণা অনুযায়ী, এগুলো হচ্ছে চীনা–ইরানি ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তির মূল শর্তাবলি। এছাড়াও চুক্তিটিতে উভয় পক্ষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারকরণ, পর্যটনের মাত্রা বৃদ্ধি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে সহায়তার কথা বলা হয়েছে।

চুক্তিটির সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব

সামগ্রিকভাবে, চীনা–ইরানি চুক্তির শর্তাবলি যদি বাস্তবিকই এরকম হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে এটি আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘ভূরাজনৈতিক বিস্ফোরণে’র (geopolitical explosion) সৃষ্টি করতে সক্ষম।

চিত্র: ১৯৭৯ সালে ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস অবরোধ করছে; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: ১৯৭৯ সালে ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস অবরোধ করছে; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

প্রথমত এবং প্রধানত, সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তি বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। চীন ও ইরান উভয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক ও ভূঅর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭০–এর দশকে মার্কিন–সোভিয়েত ও চীনা–সোভিয়েত ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট চীন পরস্পরের নিকটবর্তী হয়েছিল, কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর থেকে উভয় পক্ষের মধ্যেকার সম্পর্কের ক্রমশ অবনতি ঘটেছে এবং বর্তমানে উভয় রাষ্ট্র একে অপরের সঙ্গে তীব্র ভূঅর্থনৈতিক (এবং ভূরাজনৈতিক) প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। একবিংশ শতাব্দীতে চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক উত্থান এবং বিশ্বব্যাপী তাদের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ মার্কিন অর্থনৈতিক (ও পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক) একাধিপত্যকে গুরুতর হুমকির মুখোমুখি ফেলেছে।

অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালের ‘ইসলামি বিপ্লবে’র পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অত্যন্ত তিক্ত সম্পর্ক বিদ্যমান। বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দুইটি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান হচ্ছে ‘শয়তানের অক্ষে’র (Axis of Evil) অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রভূমি। অন্যদিকে, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির ‘বড় শয়তান’ (Great Satan বা ফার্সি ভাষায় ‘শয়তান–এ–বোজর্গ’), এবং তারা ‘ছোট শয়তান’ (Little Satan বা ফার্সি ভাষায় ‘শয়তান–এ–কুচাক’) তথা ইসরায়েলের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখছে।

এমতাবস্থায় চীন বা ইরানকে সামরিকভাবে ধ্বংস করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত পন্থা নয়, কারণ মার্কিন–ইরানি বা চীনা–মার্কিন যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে যেটি কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র চীন ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র দুইটিকে ধ্বংস (ইরানের ক্ষেত্রে) বা দুর্বল (চীনের ক্ষেত্রে) করে রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানি পারমাণবিক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং এর ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের বিরুদ্ধেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেত্রবিশেষে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এমতাবস্থায় ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ (The enemy of an enemy is a friend) নীতিতে চীন ও ইরানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তিটি এই প্রক্রিয়ারই চূড়ান্ত রূপ। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আওতাধীনে থাকা ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরায় শক্তিশালী করা এবং ইরানের পুরনো অবকাঠামোগুলোর নবায়ন করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এর ফলে ইরানি অর্থনীতিকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ইরানকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে রাখা এবং সম্ভব হলে ইরানি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে পরিকল্পনা মার্কিনিদের ছিল, সেটি বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। বরং ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নতি ঘটতে শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যত্র প্রভাব বিস্তারের জন্য ইরানের হাতে পর্যাপ্ত সম্পদ চলে আসবে, এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রাধান্য আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চিত্র: ২০১৫ সালে 'যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা' চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ইরান ও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিনিধিবৃন্দ; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: ২০১৫ সালে ‘যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা’ চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ইরান ও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিনিধিবৃন্দ; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে ইরান ও ৬টি বিশ্বশক্তির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন) মধ্যে ‘যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা’ (Joint Comprehensive Plan of Action, ‘JCPOA’) নামক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, এবং এই চুক্তি অনুযায়ী ইরান কর্তৃক তাদের পারমাণবিক প্রকল্প স্থগিত রাখার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। প্রত্যুত্তরে ইরান তাদের পারমাণবিক প্রকল্প পুনরায় চালু করে। বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি জোসেফ বাইডেন ‘যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা’ চুক্তিতে প্রত্যাবর্তন করতে আগ্রহী, কিন্তু এজন্য পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানকে তাদের পারমাণবিক প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন এবং চুক্তিটিতে নতুন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন।

কিন্তু ইরানি সরকার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বিনা শর্তে চুক্তিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তনের দাবি জানিয়েছে। এর ফলে এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষ চুক্তিটির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে নি। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চীনা–ইরানি চুক্তি এক্ষেত্রে ইরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কারণ এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং সেক্ষেত্রে ইরানিরা ‘যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা’ চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিনিদের ছাড় দিতে তেমন আগ্রহী হবে না। উল্লেখ্য, চীন ‘যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা’র একটি পক্ষ এবং চুক্তিটির ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থানের প্রতি তারা তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিজেদের শর্তানুযায়ী চুক্তিটিতে প্রত্যাবর্তন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: কৃষ্ণসাগরে মিসরীয় নৌবাহিনী: রুশ, মিসরীয় ও তুর্কি ভূরাজনীতির এক ঝলক

তৃতীয়ত, এখন পর্যন্ত চীন বহির্বিশ্বে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন কিংবা কোনো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ আগ্রহ প্রদর্শন করে নি। বস্তুত তাজিকিস্তান ও জিবুতিতে অবস্থিত চীনা ঘাঁটিদ্বয়ের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু ঘাঁটি ছাড়া বহির্বিশ্বে চীনের কোনো সামরিক উপস্থিতি নেই। এখন পর্যন্ত তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে

ব্যবসা করা, এবং তারা সাধারণত কোনো দ্বন্দ্বে জড়িত উভয় পক্ষের সঙ্গেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ভারতের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তান উভয়েরই দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিন্তু চীন একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অর্থাৎ, বিভিন্ন আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে চীন কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে অনাগ্রহী।

একই কথা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে চীন ইরানের সুন্নি আরব প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে চীন ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। চীন কর্তৃক ইরানের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো উপসাগরীয় আরব–ইরানি দ্বন্দ্বে ইরানের প্রতি চীনের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে এবং এর ফলে চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করতে পারে। অন্যদিকে, চীনা সমর্থন (বা চীন ইরানকে সমর্থন করছে এরকম বিশ্বাস) ইরানি সরকারকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে অধিকতর বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করতে পারে। সুতরাং চীনা–ইরানি চুক্তি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করতে পারে, এরকম সম্ভাবনা রয়েছে।

চিত্র: ইরানের আরাক পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স। চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল খাতে বিপুল বিনিয়োগ করবে; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: ইরানের আরাক পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স। চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল খাতে বিপুল বিনিয়োগ করবে; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

চতুর্থত, ইরানে চীনা সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কোনো সামরিক উপস্থিতি নেই, এবং এই অঞ্চলের সঙ্গে চীনের মূল সম্পর্কের ধরন বাণিজ্যিক। কিন্তু চীন যদি ইরানে এবং বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিকটে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে সক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে এই অঞ্চলে চীন আকস্মিকভাবেই একটি শক্তিশালী কর্মক হিসেবে আবির্ভূত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো (এবং ইরানি জনসাধারণ) এই ধরনের চীনা পদক্ষেপকে কীভাবে দেখবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করতে আগ্রহী এবং এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলই (ডেমোক্র‍্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি) একমত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতদঞ্চল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং রাশিয়া ও চীনের উত্থানকে প্রতিহত করার জন্য যথাক্রমে ইউরোপ ও দক্ষিণ চীন সাগরের প্রতি নিজেদের মনোযোগ বৃদ্ধি করছে। এর ফলে এতদঞ্চলে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে, রাশিয়া সেটির সুযোগ গ্রহণ করেছে এবং এতদঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তির পর বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, চীনও এই অঞ্চল থেকে মার্কিন প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট শূণ্যতাকে ব্যবহার করে এতদঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে আগ্রহী।

পঞ্চমত, চীনের বিরাট শিল্প উৎপাদন খাতের জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন এবং যেহেতু চীন তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সিংহভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে, সেজন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বরাবরই তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীনের আমদানিকৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ আসে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য থেকে, তাই এতদঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি ও সামরিক উপস্থিতি স্থাপন এই অঞ্চল থেকে চীনে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরান ২৫ বছরের জন্য চীনকে সস্তায় জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দীর্ঘ মেয়াদে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তেমনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন ইরান চীনের কাছে তেল রপ্তানির মধ্য দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বহুলাংশে হ্রাস করতে সক্ষম হবে।

চিত্র: ইরান 'বিআরআই' প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত 'চীন–মধ্য এশিয়া–পশ্চিম এশিয়া করিডোরে'র অংশ; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: ইরান ‘বিআরআই’ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ‘চীন–মধ্য এশিয়া–পশ্চিম এশিয়া করিডোরে’র অংশ; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

ষষ্ঠত, ইরানি সরকার সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তিকে অভিহিত করেছে চীনা–কর্তৃত্বাধীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (Belt and Road Initiative, ‘BRI’) প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিআরআই’–এর অংশ এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইউরেশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলের সঙ্গে ইরানের সংযোগ বৃদ্ধি পাবে, যেটি ইরানি বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য লাভজনক হবে। ইরান ইতোমধ্যেই রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ–সাউথ ট্র‍্যান্সপোর্ট করিডোর’ নির্মাণের জন্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। চীনের ‘বিআরআই’ প্রকল্পে ইরানের সক্রিয় অংশগ্রহণ বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আরো ত্বরান্বিত করবে।

সপ্তমত, বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনা–ইরানি চুক্তির ফলে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল, এজন্য চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কোন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানও একই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত হবে বলে কিছু কিছু বিশ্লেষকের ধারণা। তদুপরি, ইরান ও পাকিস্তান সম্মিলিতভাবে আফগানিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে এবং এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক এই সমীকরণে কাবুলকে নিজেদের অক্ষে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের ‘বিআরআই’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা তাদের জন্য অধিকতর সহজ হয়ে উঠবে।

অষ্টমত, সাম্প্রতিক চুক্তি অনুযায়ী চীন ও ইরান সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে এবং যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণ ও যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এটিও উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক। ইতিপূর্বে চীন ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে দুইটি নৌ মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছে, এবং এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে এই ধরনের মহড়া আরো বৃদ্ধি পাবে বলা ধারণা করা যায়। শুধু তাই নয়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান পশ্চিমা বিশ্ব থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করতে অক্ষম। এজন্য ইরানি সরকার অভ্যন্তরীণভাবে অস্ত্র উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন ইরানের সামরিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করবে।

চিত্র: ইরানের তৈরি 'শাহাব–২' স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র। ইরান নিজস্ব মিলিটারি–ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী করার জন্য চীনের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনে আগ্রহী; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: ইরানের তৈরি ‘শাহাব–২’ স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র। ইরান নিজস্ব মিলিটারি–ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী করার জন্য চীনের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনে আগ্রহী; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

তদুপরি, ইরানের নিকট অস্ত্র রপ্তানির ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, ‘যৌথ বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সেটিকে তুলে নেয়া হয়েছে। এর ফলে চীন এখন কোনো ধরনের আইনি প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে। ইরানি সশস্ত্রবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারের বড় একটি অংশ অত্যাধুনিক নয় এবং এটি ইরানের জন্য বড় একটি সামরিক দুর্বলতা। সাম্প্রতিক চুক্তির ফলে ইরান কর্তৃক চীনা অস্ত্র ক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। এর ফলে একদিকে চীন একটি বৃহৎ অস্ত্র রপ্তানির বাজার পেয়ে যাবে, অন্যদিকে ইরানও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অস্ত্র ক্রয় করতে সমর্থ হবে। এবং চীনা বিনিয়োগের ফলে ইরানের যে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে ইরানের অস্ত্র ক্রয়ের সামর্থ্যও বৃদ্ধি পাবে।

সর্বোপরি, সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তি ইরানি পররাষ্ট্রনীতিকে সুদৃঢ়ভাবে রুশ–চীনা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছে, এমনটিই বিশ্লেষকদের ধারণা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানি পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম একটি মূলনীতি ছিল – ইরান পাশ্চাত্য বা প্রাচ্য কারোরই অনুগামী না হয়ে নিজস্ব পথ অনুসরণ করবে। কিন্তু এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরান উক্ত মূলনীতি থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে এবং প্রাচ্যের নিকটবর্তী হয়ে পড়েছে। ইরানি পররাষ্ট্রনীতিতে এই মৌলিক পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল কী হবে, সেটি আন্দাজ করা কঠিন।

চুক্তির সমালোচনা এবং সীমাবদ্ধতাসমূহ

অবশ্য অন্যান্য যে কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপের মতো সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এই চুক্তি নিয়ে যে ‘হাইপ’ (hype) তৈরি হয়েছে, সেটিকেও কিছু কিছু বিশ্লেষক ‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘মাত্রাতিরিক্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। চীনা–ইরানি চুক্তির সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতাগুলো নিম্নরূপ।

প্রথমত, চীন ও ইরানের মধ্যে যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি একটি ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তি। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে এই ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করা চীনা পররাষ্ট্রনীতির একটি বহুল প্রচলিত দিক, এবং এজন্য চীনা–ইরানি চুক্তিটিকে ব্যতিক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও চীন অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেগুলোর মধ্যে চীনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও রয়েছে। চীন ২০১৫ সালে ইরাকের সঙ্গে, ২০১৬ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে এবং ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অনুরূপ ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। উল্লেখ্য যে, এই রাষ্ট্রগুলো মূলত পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবাধীন হওয়া সত্ত্বেও এই রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চীন এই চুক্তিগুলোতে স্বাক্ষর করেছিল, অন্যদিকে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চীন এতদিন পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে অনুরূপ কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নি।

চিত্র: 'জেরুজালেম মার্চ' উপলক্ষে ইসরায়েলের সমর্থনে আয়োজিত চীনাদের শোভাযাত্রা। চীন একই সঙ্গে ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: ‘জেরুজালেম মার্চ’ উপলক্ষে ইসরায়েলের সমর্থনে আয়োজিত চীনাদের শোভাযাত্রা। চীন একই সঙ্গে ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

এই প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে বলা যায়, চীনা–ইরানি চুক্তি ‘অসাধারণ’ বা ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ কোনো চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে চীনের এতদিন ধরে পরিচালিত নীতিরই যৌক্তিক সম্প্রসারণ (logical extension)। এটি ঠিক যে, চীন ও ইরান চুক্তিটির পূর্ব বিবরণ গোপন রেখেছে, কিন্তু ইরানি সরকারের প্রদত্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অধিকাংশ আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রেই সেগুলোর পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয় না।

দ্বিতীয়ত, প্রচারমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে যে, চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানে ২৫ বছরে ৪০,০০০ কোটি (বা ৪০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এটি যদি বাস্তবতা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে চীনকে ইরানে গড়ে প্রতি বছর ১,৬০০ কোটি (বা ১৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, চীন কি আসলেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ইরানে এই পরিমাণ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী? অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সৌদি আরবে বর্তমানে বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ যেখানে ৫১০ কোটি (বা ৫.১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার, সেখানে ইরানে প্রতি বছর এই পরিমাণ বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু বাস্তবসম্মত, সেটি চিন্তার বিষয়।

অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিনিয়োগের হার বিবেচনা করলেও একই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ‘চায়না গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্র‍্যাকারে’র প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানে বিনিয়োগ করেছে যথাক্রমে ৩,০৬০ কোটি, ২,৯৫০ কোটি এবং ১,৮২০ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, বিগত ১০ বছরে ইরানে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে চীনা বিনিয়োগের তুলনায় অনেক কম। এমতাবস্থায় ইরানে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ আকস্মিকভাবে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, এটি অস্বাভাবিক।

শুধু তাই নয়, চীন যে তাদের বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি সবসময় কার্যকর করে, এমনও নয়। বহু ক্ষেত্রে চীনা সরকার কোনো রাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি সেভাবে বাস্তবায়িত হয় না। যেমন: ২০১৬ সালে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে চীন বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কেবল ক্ষুদ্র একটি অংশই বাস্তব রূপ লাভ করেছে। একই ঘটনা যে ইরানের ক্ষেত্রে ঘটবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

চিত্র: মানচিত্রে চীন (লাল চিহ্নিত) এবং 'বিআরআই'য়ে অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো। ইরান ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব উভয়েই এই প্রকল্পের অংশ; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons
চিত্র: মানচিত্রে চীন (লাল চিহ্নিত) এবং ‘বিআরআই’য়ে অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো। ইরান ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব উভয়েই এই প্রকল্পের অংশ; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীনা বা ইরানি সরকার এখন পর্যন্ত ৪০,০০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের এই তথ্যটি নিশ্চিত করে নি। বরং চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন যে, ইরানে চীন ঠিক কী পরিমাণ বিনিয়োগ করবে, চুক্তিতে সেটি উল্লেখ করা হয় নি। এমতাবস্থায় প্রচারমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই দাবিটি প্রকৃতপক্ষে কতটুকু সঠিক, সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

তৃতীয়ত, চীন ইরানে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে, ইরানি সমুদ্রবন্দর বা দ্বীপ ইজারা নেবে কিংবা ইরানে ৫,০০০ সৈন্য/নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করবে – এই দাবিগুলোর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উল্লেখ্য, ইরানি সংবিধানের ১৪৬ নং ধারা অনুযায়ী, ইরানের মাটিতে বিদেশি সৈন্য মোতায়েন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এমনকি সেটি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে হলেও। এজন্য ইরানে চীনা সৈন্য মোতায়েন ইরানের অভ্যন্তরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ২০১৬ সালে ইরানি সরকার সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য রাশিয়াকে ইরানি বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু প্রচারমাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানি সরকার দ্রুত এই সুযোগ বাতিল করে দেয়।

এই ঘটনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইরানি সরকার এমনকি নিজস্ব স্বার্থেও ইরানের অভ্যন্তরে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার ঝুঁকি নেয় নি। সেক্ষেত্রে তারা ইরানের মাটিতে চীনা সৈন্য মোতায়েনের ঝুঁকি নেবে, এটি বাস্তবসম্মত বলে প্রতীয়মান হয় না। ইতোমধ্যে চীন ও ইরান উভয়েই দাবি করেছে যে, ইরানের মাটিতে কোনো চীনা সৈন্য মোতায়েন করা হবে না।

চতুর্থত, এই চুক্তির ফলে যে চীন ও ইরান পূর্ণ মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, এরকমটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ, এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ইরান সফর করেছেন, তখনই তিনি পার্শ্ববর্তী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন ও তুরস্ক সফর করেছেন। সৌদি আরবে তিনি একটি ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা’র রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘সিনোফার্ম’ কোভিড–১৯ টিকার ২০ কোটি ডোজ উৎপাদন সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চীনা–ইরানি চুক্তির ফলে চীন যে সম্পূর্ণভাবে ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়বে, সেই সম্ভাবনা কম।

চিত্র: মানচিত্রে চীন ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত রেল রুট; চিত্রসূত্র: On The MoS Way
চিত্র: মানচিত্রে চীন ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত রেল রুট; চিত্রসূত্র: On The MoS Way

অন্যদিকে, ইরানও যে এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পুরোপুরি চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়বে, এমনটা নাও হতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য ইরান এই চুক্তিটিকে ব্যবহার করবে। তাছাড়া, ইরানের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে, এবং চীনা–ভারতীয় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে ইরান পুরোপুরি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চাইবে না। এজন্য এই চুক্তিটির মাধ্যমে ইরান পুরোপুরি চীনা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এরকমটা ধরে নেয়া ঠিক হবে না।

সর্বোপরি, এই চুক্তিটি ইরানের অভ্যন্তরে নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই ইরানিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটির সমালোচনা করতে শুরু করে, এবং এর ফলে ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তিটি যে ইরানের স্বার্থবিরোধী নয় সেটি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করতে শুরু করেন। তা সত্ত্বেও এটির সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের প্রাক্তন শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি এই চুক্তিটির তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং এটিতে ইরানের জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।

ইরানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদও ইতিপূর্বে এই ধরনের ‘গোপন চুক্তি’ স্বাক্ষরের সমালোচনা করেছেন। ইরানি রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন আইনসভা সদস্য আলী মোতাহারি চীনের সঙ্গে চুক্তির বিনিময়ে জিনজিয়াংয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান নিষ্পেষণ বন্ধ করার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি উল্লেখ করেছেন। সব মিলিয়ে ইরানি রাজনৈতিক শ্রেণির একাংশ সাম্প্রতিক চীনা–ইরানি চুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়।

সামগ্রিকভাবে, চীনা–ইরানি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিটি নিয়ে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে এবং চুক্তিটির নানান সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কারো কারো দৃষ্টিতে, চুক্তিটি একটি ‘ভূরাজনৈতিক বিস্ফোরণ’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে সক্ষম। আবার কারো কারো দৃষ্টিতে, চুক্তিটির ভূরাজনৈতিক প্রভাব তুলনামূলক সীমিত এবং এটি একটি ‘কূটনৈতিক অলঙ্করণ’ (diplomatic decoration) মাত্র। কিন্তু এই চুক্তিটি যে চীনা–ইরানি কূটনৈতিক ভূরাজনৈতিক সম্পর্কে একটি নতুন মাত্রা সংযোজিত করেছে, এটি নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

প্রচ্ছদ চিত্রউৎস: উইকিমিডিয়া কমনস

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on চীনা–ইরানি চুক্তি: ভূরাজনৈতিক বিস্ফোরণ, না কূটনৈতিক অলঙ্করণ?

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!