প্রচ্ছদ চিত্র অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প বই

‘অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প’: এক গণিতবিদের পাওয়া না পাওয়ার আখ্যান

মার্শাল আশিফ
4.3
(11)
Bookmark

No account yet? Register

  • বইয়ের নাম; অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প
  • লেখক: ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
  • ভাষা: বাংলা
  • প্রকাশক: সময় প্রকাশন
  • পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১১২
  • আইএসবিএন: ৯৮৪৪৫৮৫৮৭২
  • মুদ্রিত মূল্য: ১২০ টাকা
  • প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি বইমেলা ২০০৭

সব পরিবারেই কিছু মানুষ থাকে যাঁরা গুড-ফর-নাথিং’, ব্যর্থতার মূর্ত প্রতীক বলা যায়, আমাদের পরিবারে এমনটি ছিলেন মেজোকাকু।

গল্পের শুরুতেই মেজোকাকু চরিত্রটি সম্পর্কে এভাবেই আমাদের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলা হয়। ফুলের পাপড়ি প্রস্ফুটিত করার মত ধীরে ধীরে মেজোকাকু চরিত্রটির মোড়ক উন্মোচন করতে থাকেন লেখক। এর ফলশ্রুতিতে সাসপেন্স থ্রিলার গল্পের মতই পাঠককে চুম্বকের মত আকৃষ্ট করে রাখতে সফল হন লেখক।

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
চিত্র: লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী; চিত্রসূত্র: অংশুমালী

গল্পের প্রায় বেশিরভাগ অংশ বর্ণিত হয়েছে মেজোকাকুর প্রিয় ভাস্তের জবানবন্দীতে। তাই ভাইপো এ গল্পের উত্তম পুরুষ।

মেজোকাকুর পারিবারিক অনুষ্ঠানে না থাকা কিংবা সমাজ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখার যে চেষ্টা তাকে তাঁর ভাইপো মানে গল্পের কথক ‘অমাবস্যার চাঁদ’ বলে কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু মেজোকাকু কেন নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইতেন? গল্প যত এগোবে এই প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছে তত পরিষ্কার হবে।

কিছু নাটকীয়তার পর আমরা মেজোকাকু মোস্তাফিজুর রহমানের ছোটবেলার কাহিনী জানতে পারি। গণিত বিষয়ে মেজোকাকু যে ‘ওয়ান্ডার চাইল্ড’ তা তাঁর পরিবার বুঝতে পেরেছিল। মেজোকাকুর অন্তর্মুখী স্বভাব আর ছোট থেকেই গণিতের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ফুটে উঠে এই দুই লাইনে – অন্য দুই ভাই যখন খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত তিনি (মেজোকাকু) তখন অঙ্কের বইয়ে মুখ ডুবিয়ে বসে (আছেন)। অন্যেরা যখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডায় ব্যস্ত তিনি তখন ঘরের কোণে জ্যামিতির প্রবলেম সলভ করছেন।

গণিত নিমগ্ন মেজোকাকু (কাল্পনিক)
চিত্র: গণিতে নিমগ্ন মেজোকাকু (কাল্পনিক); চিত্রসূত্র: আমেরিকান এক্সপেরিমেন্ট

মেজোকাকু সম্পর্কে অল্প অল্প জানার পর তাঁর ভাইপোর গণিতের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। পরিবারের সিদ্বান্তের বিরুদ্ধে যেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে পড়ার চিন্তাভাবনা করতে থাকে ভাইপো। এ নিয়ে আলোচনা করার জন্য ভাইপো যায় মেজোকাকুর কাছে। মেজোকাকু তাঁর প্রিয় ভাস্তের গণিত জ্ঞানের গভীরতা যাচাই করার জন্য একটি সমস্যা সমাধান করতে দেন। সাথে এই শর্তও জুড়ে দেন যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই সমস্যা সমাধান করতে না পারলে সে আর গণিত নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে না। গণিত যাঁর ধ্যানজ্ঞান সেই মেজোকাকুই কি না তাঁর প্রিয় ভাস্তেকে গণিত পড়তে নিরুৎসাহিত করছে। এর পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে? এবার গল্পের আসল চমক! 

ভাস্তে কি পেরেছিলো সেই সমস্যার সমাধান করতে? মেজোকাকু কেনই বা বলেছিলো – গণিতবিদ তৈরি করা যায় না, গণিতবিদ হয়ে জন্মাতে হয়? পরিবারের লোকজন কেন মেজোকাকুর প্রতি দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল টাইপের মনোভাব দেখান? মেজোকাকু এমন কোন অপরাধ করেছেন যে নিজেকে সমাজ থেকে গুঁটিয়ে নিয়েছেন? ছোটবেলায় যাঁর গণিত-প্রতিভা দেখে সবাই বিমোহিত হয়েছিল সেই মেজোকাকু কেন ক্যারিয়ারে কিছু করতে পারলেন না? এমন সব প্রশ্ন পাহাড়ের মত পাঠকের মনে চেপে বসে। গল্প যত এগোবে পাঠকের মনের প্রশ্নগুলো খোলাসা হতে থাকবে।

কাল্পনিক চরিত্র মেজোকাকুর সঙ্গে বাস্তব জগতের গুরুত্বপূর্ণ গণিতবিদদের কাল্পনিক মিথস্ক্রিয়া গল্পের মধ্যে এমন নেশার ঘোর তৈরি করে যার রেশ গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পাঠকের মনে থেকে যায়। এর সাথে ইতিহাসের নির্যাস যোগ হয়ে গল্পটিকে আরও উপভোগ্য, বাস্তবের কাছাকাছি করে তোলার মাধ্যমে লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়।

গল্পে উল্লিখিত বাস্তব জগতের দুইজন গণিত বিশারদ - রামানুজান (মাঝে) ও হার্ডি (সর্বডানে)
চিত্র: আলোচ্য গল্পে উল্লিখিত বাস্তব জগতের দুইজন গণিতবিদ – রামানুজান (মাঝে) ও হার্ডি (সর্বডানে); চিত্রসূত্র: উইকিপিডিয়া

শুধু এটা নিছকই গল্প নয়। জীবন সম্পর্কে, সমাজ সম্পর্কে অনেক কিছু শেখায় মেজোকাকুর জীবনকাহিনী। জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন কিছু যা করা সম্ভব। এ কথার সাথে একমত হওয়া বা না হওয়া পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।

লেখকের জ্ঞানের বিস্তৃত জগতের ঝলক পাওয়া যায় গল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্রীক পুরাণের দেবতা প্রমিথিউসের উপমা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে।

আরো পড়ুন: পাই: এক মহাকাব্যিক অমূলদ সংখ্যার কাহিনী

গ্রিক দেবতা প্রমিথিউস
চিত্র: গ্রীক দেবতা প্রমিথিউস; চিত্রসূত্র: কন্টেইনার জার্নাল

গল্পের নামেই যখন অংকের হেঁয়ালি রয়েছে তখন পুরো গল্প জুড়েই গণিতের বিভিন্ন থিওরি নিয়ে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। এক দৃষ্টিতে দেখলে উপলব্ধি করা যায় যে, গণিতকে বিশেষ করে নাম্বার থিওরি ঘিরেই পুরো গল্প আবর্তিত হয়েছে। সুতরাং, নামকরণ যে একেবারে সার্থক তা বলাই বাহুল্য।

গণিতের বিভিন্ন থিওরেম নিয়ে আলোচনা করার সময় লেখক ধরি মাছ না ছুঁই পানি কৌশল অবলম্বন করেছেন। এর পেছনের কারণটাও সহজেই অনুমেয়। কারণ এটা সাহিত্যের বই, গণিতের নিরস কোন পাঠ্যপুস্তক নয়। থিওরেমগুলো নিয়ে বেশি গভীরে আলোচনা থাকলে সাধারণ পাঠকের রস আস্বাদন ব্যহত হত।

মেজোকাকুর জীবনকাহিনী যত জানতে পারবেন ততই মেজোকাকুর প্রতি পাঠকের করুণা হবে। আবার পাঠক এই ভেবে বুকে বল পাবেন যে “যাক! এমন ঘটনা তাঁর নিজের সাথে ঘটেনি।” 

গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠক গল্পের জগতে এমনভাবে হারিয়ে যাবেন যে গল্পের ঘটনাগুলো চোখের সামনে ঘটছে বলে মনে হবে। মেজোকাকুকে তখন মনে হবে পাশের বাসার চেনা পরিচিত কেউ!

এই গল্পে মেজোকাকু এবং তাঁর ভাইপো হচ্ছেন প্রধান দুই চরিত্র। মেজোকাকু অন্তর্মুখী, শান্ত স্বভাবের মানুষ। অন্যদিকে ভাইপো সাহসী, কৌতূহলপ্রবণ ও একগুঁয়ে। এর বাইরে গল্পের খাতিরে রাহুল নামের এক চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটে। প্রথম দেখায় রাহুলকে অহংকারী বলে মনে হলেও পরে প্রতীয়মান হয় যে রাহুল সমসাময়িকদের তুলনায় একটু বেশি স্মার্ট আর আত্মনিমগ্ন।

গল্পে একজন গণিতবিদের বৃহৎ অর্থে একজন জ্ঞানতাপসের জীবনের চড়াই উৎরাই সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গণিতবিদের পাওয়া না পাওয়ার আখ্যান বাংলা ভাষা তো দূর সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যেই বিরল।

জীবনে চড়াই উৎরাই থাকবেই আপনি যতই মেধাবী হোন না কেন
চিত্র: জীবনে চড়াই উৎরাই থাকবেই আপনি যতই মেধাবী হোন না কেন; চিত্রসূত্র: ইন্টিলেজেন্স মান্ত্র

গণিতবিদ বা বিজ্ঞানীরাও যে রক্ত মাংসের মানুষ তা আমরা অনেকসময় ভুলে যায়। তাঁদের মধ্যেও যে হতাশা, হিংসা, ক্ষোভ কাজ করে এই গল্পটি আমাদেরকে আবার তা মনে করিয়ে দেয়।

এই গল্পের মূল আকর্ষণ হচ্ছে এর ক্লাইম্যাক্স। পরিণতি পর্বে লেখক যেভাবে পাঠকের মনে আশার প্রদীপ জাগিয়ে দপ করে নিভিয়ে দেন তা পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে বহুদিন। গল্পের শেষটা ইনসেপশন সিনেমার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়! কেন একথা বললাম? জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।

চিত্রনাট্যের ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয়ে এক শব্দে অসাধারণ। চিত্রনাট্যটিকে অনেকটা আইসক্রিম খাওয়ার সাথে তুলনা করা যায়। আইসক্রিম ধীরে ধীরে খেলেই এর স্বাদ পুরোপুরি আস্বাদন করা সম্ভব। আবার এত ধীরেও খাওয়া উচিত না যাতে আইসক্রিম গলে যায়। লেখক এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন। গল্পের গতি এতটাও দ্রুতগতির নয় যে অনিয়মিত পাঠক খেই হারিয়ে ফেলবেন আবার গল্পের গতি এতটাও ধীরগতির নয় যে পাঠক বিরক্ত হবেন।

আলোচ্য গল্পের মূল বই
চিত্র: আলোচ্য গল্পের মূল বই; চিত্রসূত্র: গুডরিডস

অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প বইটির মূল গল্প নেওয়া হয়েছে Uncle Petros and Goldbach’s Conjecture বইটি থেকে। মূল গল্পটির লেখক Apostolos Doxiadis। তবে এটা মূল গল্পের লাইন বাই লাইন অনুবাদ নয়। লেখক ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে মূল গল্পের কিছু অংশ বাদ দিয়েছেন, আবার নতুন কিছু অংশ সংযোজন করেছেন। অর্থাৎ শরবত একই রেখে তিনি বোতল পালটে ফেলেছেন। এর ফলে পাঠকের কাছে গল্পের চরিত্রগুলো আরও বেশি জীবন্ত ও উপভোগ্য মনে হয়।

তো আর দেরি কেন? এক কাপ কফি নিয়ে আজই বসে পড়ুন বইটি পড়তে।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: গুডরিডস

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ‘অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প’: এক গণিতবিদের পাওয়া না পাওয়ার আখ্যান

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!