বেলা ফুরাবার আগে গ্রন্থের প্রচ্ছদ

বেলা ফুরাবার আগে: তারুণ্যের গতিপথ বদলের আলোকবর্তিকা

1.7
(11)
Bookmark

No account yet? Register

বেলা ফুরাবার আগে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইসলামিক বই। বইটিতে লেখক আরিফ আজাদ ১৮ টি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে ১৮ টি অধ্যায়ে সুন্দর ব্যাখ্যায়নের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। যুব সমাজের ধ্বংসের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তিনি এ থেকে উত্তরণের উপায়গুলোকে বেশ জোরালো ভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বইটির লেখক আরিফ আজাদ “শুরুর আগে” শিরোনামের অধ্যায়েই বলেছেন—উনার স্বপ্নের কথা। তরুণদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্নের কথা। এটি বলেই উনি প্রবেশ করেন তরুণদের হতাশার রাজ্যের আলোচনায়। 

“মন খারাপের দিনে”- অধ্যায়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন খোদার উপর ভরসা রাখলে, খোদাকে বন্ধু বানিয়ে নিতে পারলে আমাদের জীবন হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। মন খারাপের দিনে যখন আমরা কাউকে খুঁজে পাই না তখন আমাদের মন খারাপের কারণগুলো আল্লাহকে বলতে বলেছেন। লেখক মূলত এই অধ্যায়ে—আমার জন্য আমার খোদায় যথেষ্ট এই কথায় জোর দিয়েছেন।

বিপদে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের কর্তব্য ; চিত্র উৎস- Jagonews24
বিপদে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের কর্তব্য ; চিত্র উৎস- Jagonews24

“আমার এতো দুঃখ কেন?” অধ্যায়ে আমাদের প্রতি স্রষ্টার পরীক্ষণের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। কখনও ভয়ভীতি দিয়ে, কখনও সম্পদশালী করে, কখনও দারিদ্র্য দিয়ে আবার কখনও ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা নেন। আর সেই ক্রান্তিকালে আমাদের উচিত ধৈর্য্য ধারণ করা। খোদার কাছে দোয়া করা। আমরা তার উল্টোটি করি বলেই আমাদের অতো দুঃখ। মূলত ধৈর্য্য ধারণ করার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে আলোচ্য অধ্যায়ে।

ধন-সম্পদ মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ ; চিত্র উৎস- Ekushey-TV
ধন-সম্পদ মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ ; চিত্র উৎস- Ekushey-TV

“বলো, সুখ কোথা পায়”- অধ্যায়ে আমাদের রঙিন দুনিয়ায় লোভের বিষয়টি আলোকপাত করেছেন। কড়ি কড়ি টাকা থাকলেই যে সুখে থাকা যায় সেই ভাবনা থেকে সরে আসার বিষয়টি পরিস্কার করেছেন। লেখক  এই অধ্যায়ে সন্ধান দিয়েছেন আসলে সুখ কোথা পাওয়া যায় ! 

আপনার রব জানাচ্ছেন এই দুনিয়া হলো নিছক খেল-তামাশার ক্ষেত্র। একটা ধোঁয়াশা। একটা কূপ। একটা ফাঁদ। এখানে যা সুখ বলে ধরা হয় তা আসলে মরীচিকা। সুখ তাে নিহিত আছে স্রষ্টার আনুগত্যে।

“জীবনের ইঁদুর দৌড় কাহিনী”- অধ্যায়ে আমরা যে ধন সম্পদ তথা ইহকালের সাময়িক সুখের জন্য প্রতিযোগিতায় মত্ত আছি—এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের আসলে কি করা উচিত; যা করছি তা সঠিক নাকি ভুল—তা কোরআনের ‘সূরা আত তাকাসুর’ এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

দৃষ্টি সংযত রাখা মুমিনদের জন্য কর্তব্য ; চিত্র উৎস- Trickbd
দৃষ্টি সংযত রাখা মুমিনদের জন্য কর্তব্য ; চিত্র উৎস- Trickbd

“চোখের রোগ”- অধ্যায়ে কথায় কথায় ক্রাশ খেয়েছি কথাকে চোখের রোগের সাথে তুলনা করেছেন। কেননা খোদা কোরআনে স্পষ্ট বলেছেন আমাদের দৃষ্টি সংযত রাখতে। আর আমরা পড়ে থাকি নীল দুনিয়ায়। এটা থেকে বের হবার মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে তওবাকে।

বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক দ্বীনের পথে ফিরতে প্রধান বাঁধা ; চিত্র উৎস- Reddit
বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক দ্বীনের পথে ফিরতে প্রধান বাঁধা ; চিত্র উৎস- Reddit

“আমরা তো স্রেফ বন্ধু কেবল”- অধ্যায়ে একজন যুবক বা যুবতি দ্বীনের পথে ফিরতে প্রধান বাঁধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হারাম রিলেশনশিপকে। রিলেশনশিপ বলতে শুধু প্রেম নয়। যার সামনে পর্দাবিহীন যাবার, যার সাথে অহেতুক কথা বলার, ঘুরতে যাবার অনুমতি আমার নেই তার সাথে যে নামেই সম্পর্ক হোক সবই হারাম। এ হারাম সম্পর্ক থেকে ফেরার জন্য সহজ পথ দেখিয়ে দিয়েছেন।

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় ; চিত্র উৎস- NayaDiganta
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় ; চিত্র উৎস- NayaDiganta

“চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়”- অধ্যায়ে পরকালের জীবনকে তরুণদের মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দুনিয়ার কৃতকর্মের ফল আমরা পরকালে গিয়েও পাবো। 

“বেলা ফুরাবার আগে”- অধ্যায়ে কড়িকড়ি সম্পদ আর খ্যাতিসম্পন্ন মানুষের শেষ সময়টি আলোচনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বেলা ফুরাবার আগেই আমাদের জীবন নিয়ে আরেকবার ভাবতে বসা উচিত।

আরো পড়ুন: বুখারি শরিফ: মনুষ্য সংকলিত সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ (পর্ব ১)

জীবনের বেলা একেবারে ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের জীবনতরীকে নির্বিঘ্নে কূলে ভেড়াতে হবে। সেই কূল, যে কূলে আর কোনাে দুশ্চিন্তা নেই। নেই কোনাে মন খারাপের গল্প।”

খাঁটি তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার দুনিয়ার সব অপরাধকে গোপন রাখেন ; চিত্র উৎস- Thriveglobal
খাঁটি তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার দুনিয়ার সব অপরাধকে গোপন রাখেন ; চিত্র উৎস- Thriveglobal

“মেঘের কোলে রোদ হেসেছে”- অধ্যায়ে আল্লাহর ক্ষমা করার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। মানুষ হিসেবে স্বভাবজাত ভাবেই আমরা ভুল করি, অনেক পাপে জড়িয়ে যাই। শেষে আবার হতাশা ও অনুশোচনায়ও থাকি। এ অধ্যায়টি সে সকল মানুষগুলোর  জন্য আশার প্রদীপ। খোদা যে কত মহান, কত দয়ালু তা এ অধ্যায়ে চমৎকারভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

“বসন্ত এসে গেছে”- অধ্যায়ে বসন্ত বলতে কৃষ্ণচূড়া ফুলের কথা বলেননি। হৃদয়ে যে দ্বীনের জন্য খুশির কল্লোল। নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন এসবকেই বুঝানো হয়েছে। দ্বীনের পথে ফেরার উপায় তাকওয়াকে জোড়ালোভাবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি তা লাভ করার উপায়গুলো বলেছেন।

নামাজে একাগ্রতা না থাকলে তা বান্দার কোনো উপকারে আসবে না ; চিত্র উৎস- Jagonews24
নামাজে একাগ্রতা না থাকলে তা বান্দার কোনো উপকারে আসবে না ; চিত্র উৎস- Jagonews24

নামাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার সমস্যা কম বেশি সবারই আছে। কোরআনের সূরা ফাতেহা দিয়েই এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মোদ্দাকথা, খোদার সাথে আমরা কি বলছি নামাজে তা অনুভব করতে না পারায় মনযোগ ধরে রাখতে পারি না। “সালাতে আমার মন বসে না”- অধ্যায়ে সেটির বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।

“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখব”- অধ্যায়ে পাপের মূল হিসেবে ‘মিথ্যা’কে চিহ্নিত করেছেন। পাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে নামাজের কথা বলেছেন। এ অধ্যায়ে লেখক বুঝিয়েছেন কিভাবে নামাজের সাথে ঘনিষ্ঠতা করা যায়। লোক দেখানো মসজিদে না গিয়ে জান্নাত লাভের আশায়, পাপ মুছানোর আশায় মসজিদে গেলে কত সুখ, কত শান্তি তা বুঝানো হয়েছে। মসজিদকেই হৃদয়ে স্থান দেবার কথায় বলা হয়েছে।

মসজিদকেই হৃদয়ে স্থান দিতে হবে ; চিত্র উৎস- Nilphamaribarta
মসজিদকেই হৃদয়ে স্থান দিতে হবে ; চিত্র উৎস- Nilphamaribarta

“যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা”- অধ্যায়ে শয়তানের ধোঁকা ও তা থেকে বাঁচার পথে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান কি কি ক্ষতির পরিকল্পনা করতে পারে এবং এসব পরিকল্পনা  থেকে বাঁচার উপায়সমূহ কোরআন ও হাদিসের আলোকে  আলোচনা করা হয়েছে।

“মেঘের ওপার বাড়ি”- অধ্যায়ে হুমায়ুন আহমদের প্রিয় নুহাশপল্লীর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে—ক্ষণস্থায়ী বাসস্থানের চেয়ে স্থায়ী বাসস্থান জান্নাত হাজার কোটি গুণ উত্তম। আর এটা লাভের উপায় কত সহজ আর কি আমলের দ্বারা এ ঘর লাভ করা যায় এ অধ্যায়টিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

“আমি হব সকাল বেলার পাখি”-  অধ্যায়ে সুবহে সাদিকের সাথে ঘুম থেকে উঠার উপকারিতা আলোচনা করেছেন। 

স্রষ্টার প্রতি ইবাদাতে মগ্ন বান্দা ; চিত্র উৎস- BangladeshToday
স্রষ্টার প্রতি ইবাদাতে মগ্ন বান্দা ; চিত্র উৎস- BangladeshToday

“তুলি দুই হাত করি মোনাজাত”- অধ্যায়ে দোয়াতে কি পরিমাণ বারাকাহ রয়েছে, ফজিলত রয়েছে তা বুঝিয়েছেন। ঘটনার প্রেক্ষাপটে নবী-রাসূলদের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। খোদার কাছে কিভাবে কিছু চাইতে হয়, কখন চাইতে হয় এসব বিষয় এ অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়।

“চলো বদলায়”- অধ্যায়ে নিজেকে আগে বদলানো ও নিজেকেই জানতে বলেছেন।

প্রতিটি কাজের আগে আমরা যদি নিজেকে একবার প্রশ্ন করতে পারি, তাহলেই অনেক সমস্যা, অনেক সংকট থেকে সহজেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারব।

যৌবন বয়সের ইবাদত ও সাধনা আল্লাহ খুবই মূল্যায়ন করেন ; চিত্র উৎস- 24livenewspaper
যৌবন বয়সের ইবাদত ও সাধনা আল্লাহ খুবই মূল্যায়ন করেন ; চিত্র উৎস- 24livenewspaper

বইটি মূলত তরুণ সমাজের উদ্দেশ্যে লেখা। একজন মানুষ তরুণ বয়সে যে যে সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে এবং সেটার সমাধানের প্রয়াস ছিল এই বইটিতে। 
জীবনের ক্ষতি ও ভুল পথে পা বাড়িয়ে কিভাবে তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং এর শেষ পরিণতি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে— বইটিতে তা নিঃসন্দেহে সুস্পষ্টভাবে ওঠে এসেছে।

তরুণ প্রজন্মের জন্য বেলা ফুরাবার আগে—মুক্তি সঞ্চারী দূত ; চিত্র উৎস- Islamic Online Media
তরুণ প্রজন্মের জন্য বেলা ফুরাবার আগে—মুক্তি সঞ্চারী দূত ; চিত্র উৎস- Islamic Online Media

বইটিতে লেখক আরিফ আজাদ বেশ সুনিপুণ ও প্রাণবন্ত ভাষায় একেকটি অধ্যায়ের মাধ্যমে আমাদের ভুলগুলো পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছেন। কর্পোরেট দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল জগতের অন্ধকার বাস্তবতাও উঠে এসেছে। সারাদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যস্ততা, অনৈতিক কার্যকলাপ, ইসলাম বিরোধী মনোভাবে নিজেকে জড়িয়ে আমরা যে  জাহান্নামের পথে হাঁটছি— সেই ব্যাখ্যাও আছে  স্পষ্টতর ভাবে । 

অবৈধ সম্পর্ক, নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া,সারারাত জেগে মোবাইলে ব্যস্ত থাকার ফলে নামাজ আদায় করতে না পারা,ইহকালের মোহে পড়ে অশালীন চলাফেরায় এমনকি নীতিবহির্ভূত যতসব কার্যকলাপ সবকিছুতে আমরা তরুণ সমাজের যে হারে ব্যস্ত হচ্ছি তার সাবলীল সমালোচনা করেছেন।

লেখক অতি যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় সমস্যা  থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায়গুলো দেখিয়ে গেছেন। কোরআনের একেকটি আয়াতকে তিনি অর্থসহ বইটিতে তুলে ধরে তার ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। প্রতিটি ব্যাখ্যায়  কোরআন ও হাদিসের পরিপূর্ণ নিদারুণ উপস্থাপন পাঠকমাত্রই বুঝতে ও পাঠক হৃদয়কে নিশ্চিন্তে ছুঁয়ে যেতে বাধ্য করবে।

তারুণ্যের ভার্চুয়াল জগতের ব্যস্ততা ; চিত্র উৎস- ParsToday
তারুণ্যের ভার্চুয়াল জগতের ব্যস্ততা ; চিত্র উৎস- ParsToday

অন্ধকার জগৎে যুবকদের ও তরুণ সমাজের জন্য বইটি বেশ যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। বইটির সুবিন্যস্ত, ও ধারাবাহিকতায় পড়ে নিজেকে পরিবর্তন করার একটা আলাদা মন-মানসিকতা তৈরি হবে ও বইটি সবার নিকট একটা মুক্তির সঞ্চারী দূত বলেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস। “বেলা ফুরাবার আগে” সবার মনে  শিক্ষা দিয়ে যায়-

“জন্মিলে মরিতে হইবে” —যেমন চিরন্তন সত্য তেমনি বেলা ফুরাবার আগে নিজেকে শুধরাতে হবেই এটাও বাস্তব সত্যি।

সর্বোপরি, বলা যায় যে,বেলা ফুরাবার আগে বইটি সত্যিই বর্তমান যুবসমাজের নিকট একটি আলোকবর্তিকা ও জেগে উঠার মশাল।

বই সম্পর্কে একনজরে

  • বইয়ের নাম: বেলা ফুরাবার আগে
  • লেখক: আরিফ আজাদ
  • প্রকাশনী: সমকালীন প্রকাশন
  • মুদ্রিত মূল্য: ২৮৭ টাকা
  • পৃষ্ঠা: ১৮৬
  • প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০২০

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on বেলা ফুরাবার আগে: তারুণ্যের গতিপথ বদলের আলোকবর্তিকা

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!