আরণ্যক: অরণ্যের মায়ায় জীবনকে ভাবায় যে উপন্যাস

এন মাহমুদ
4.8
(16)
Bookmark

No account yet? Register

“এক শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের চোখে কল্পনা সব সময়ই মোহ-অঞ্জন মাখিয়ে দিয়ে রেখেছে। অতি সাধারণ পাখির অতি সাধারণ সুরও তাদের মনে আনন্দের ঢেউ তোলে, অস্তদিগন্তের রক্তমেঘস্তুপ স্বপ্ন জাগায়, আবার হয়তো তারা অতি দুঃখে ভেঙে পড়ে। এরাই হয় লেখক, কবি, সাহিত্যিক। এরা জীবনের সাংবাদিক ও ঐতিহাসিক। এক যুগের দুঃখ-বেদনা আশা-আনন্দ অন্য যুগে পোঁছে দিয়ে যায়।”

  • বইয়ের নাম: আরণ্যক
  • লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • ধরণ: উপন্যাস
  • প্রকাশনী: জয় প্রকাশন
  • প্রচ্ছদ: মশিউর রহমান
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৮৫
  • মুদ্রিত মূল্য: ২২০ টাকা
  • ISBN: 984-70154-0129-0

চারপাশের অট্টালিকা আর উঁচু উঁচু দালান-কোঠা দেখতে দেখতে আমাদের প্রজন্ম যেন অদৃশ্য খাঁচার মধ্যে বন্দী পাখি। তবে কখনও কখনও আবার শখ জাগে এই অদৃশ্য খাঁচা ছেড়ে চলে যায় কোন বনে; শখ জাগে বনের নতুন নতুন গাছ-গাছালিতে নিজের মানিয়ে নিতে; যেখানে থাকবে পাখ-পাখালি, নতুন অচেনা কোন পশু-পাখি; যেখানে মানুষ থাকলেও তারা হবে প্রকৃতি-প্রেমী।

ছবি: 'আরণ্যক' এর প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: উইকিপিডিয়া
ছবি: ‘আরণ্যক’ এর প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: উইকিপিডিয়া

এমন আশা করা বর্তমানে অনেকটা অসম্ভবকে নিয়ে চিন্তা করা। তবে বই প্রেমীদের কাছে এটা অসম্ভব নয়।  তারা বই পড়ে আর কল্পনা করে গল্পের নায়ককে, বিভিন্ন চরিত্রকে আর আশেপাশের পরিবেশকে। এখন নায়ক-নায়িকাদের বাদ দিয়ে শুধুতো পরিবেশকে উপভোগ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু যেখানে নায়ক-নায়িকা বা অন্য চরিত্র সকলেই প্রকৃতির সাথে মিলে যায় সেখানে কল্পনাতেই উপভোগ করা যায় বাস্তবের পরিবেশকে। 

এমনই এক ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যার অমর কীর্তির মধ্যে অন্যতম হল ‘আরণ্যক’। ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে প্রথম প্রকাশ পাওয়া এই উপন্যাসটির পরিকল্পনার অভিনবত্ব বিস্ময়কর। প্রকৃতির সূক্ষ্ম বর্ণনা প্রকাশ করতে এই ঔপন্যাসিক কেন বিখ্যাত তা জানতে এই একটি উপন্যাসই যথেষ্ট।

আরও পড়ুন: জাগরী – রাজনৈতিক উপন্যাসে স্নেহ ও আদর্শের মনস্তাত্তিক দ্বন্দ্ব

উপন্যাসের নায়ক সত্যচরণ বিএ পাশ করে কলকাতায় ঘুরে চাকুরীর খোঁজে। অনেক চেষ্টার পরে চাকরি পায় বিঘা ত্রিশেক জঙ্গলের তদারকির কাজে।

চিত্র: আরণ্যকের মূলচরিত্র অরণ্য; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স
চিত্র: আরণ্যকের মূলচরিত্র অরণ্য; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে বাস্তবে এই উপন্যাসের মূল চরিত্র ‘অরণ্য’। হ্যাঁ, ‘অরণ্য’ -ই। যেখানে সে তার রূপ, রস, মহিমা দিয়ে আবদ্ধ করে দিয়েছে সত্যচরণকে। অরণ্যের রূপ, রস, নতুনত্বকে উপভোগ করতে করতে হারিয়ে যেতে হয়। তবে অরণ্যের অংশ শুধু গাছপালা, পশুপাখি নয়। এর সাথে রয়েছে প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত বেশ কিছু অতি সাধারণ মানুষ। যারা শহরকে অনুভব করে কল্পনা হিসেবে, যারা ভাত খেতে পেলে মাইলের পর মাইলও পার করে আসতে পারে, যাদের খাবার বলে চীনা ঘাসের দানা ছাড়া কিছু নয়!

সেখানে রয়েছে ধাতুরিয়ার মতো বালক, যে কিনা শুধু চীনা ঘাসের দানা ও শাকসবজি খেলে পেলেই নাচ দেখিয়ে সন্তুষ্ট হয়। 

সেখানে রয়েছে রাজু পাড়ের মতো প্রকৃতি কবি, যে তার বেশিরভাগ সময় পার করে শুধু পূজো অর্চনা করেই পার করে।

রয়েছে সুদের ব্যবসা করা ধাওতাল সাহুর মতো দয়ালু মানুষের চরিত্র।

চিত্র: লেখকের ৪র্থ উপন্যাস 'আরণ্যক'; চিত্রসূত্র: এন মাহমুদ
চিত্র: লেখকের ৪র্থ উপন্যাস ‘আরণ্যক’; চিত্রসূত্র: এন মাহমুদ

রয়েছে রাজ্য হারানো, গরীব অসহায় রাজা দেবরু পান্না, রয়েছে রাজকন্যা ভানুমতি। যাদের জানতে গিয়ে পাঠকের মনে তৈরি করতে অজানা ভাবনা। যাদের সাথে চলতে গিয়ে দেখবে রাজাদের প্রকৃতি ঢাকা কবরস্থান। 

যে কোন চরিত্রের সাথে পথে চলতে গিয়ে পাঠক অনুভব করে প্রকৃতির নানা খেলা। দেখা পাবে প্রকৃতি প্রেমী যূগল প্রসাদের।

আরও পড়ুন: বরফ গলা নদী: জহির রায়হানের লেখনীতে নিম্ম মধ্যবিত্তের দুঃখগাঁথা

পাঠক অনুভব করে অরণ্যের অজানা আশঙ্কাকে, ভয় ধরাবে অশরীরীকে। পাঠক পাঠের মাঝে এমনভাবে ডুবে যেতে বাধ্য হবে যেন সে নিজেই চলছে রাস্তাঘাটবিহীন কোন গহীন অরণ্যে; যেখান থেকে আর ফিরে আসতে মন চাইবে না দালানকোঠার শহরে।

বনের প্রকৃতি দেখতে দেখতে মন বলবে-

কত রূপে কত সাজেই যে বন্যপ্রকৃতি আমার মুগ্ধ অনভ্যস্ত দৃষ্টির সম্মুখে আসিয়া আমায় ভুলাইল!

মূর্খ মানুষগুলোর সাথে থাকতে থাকতে মনে হবে-

পূর্বে কি জানিতাম মানুষের মধ্যে থাকিতে এত ভালোবাসি। মানুষকে এত ভালোবাসি!

এই ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালে রচিত উপন্যাস এর ভাবগত দিকে মিলে যাওয়ায় ঔপন্যাসিক তাঁর দিনলিপি-গ্রন্থ ‘স্মৃতির রেখা’য় বলেন-

“এই জঙ্গলের জীবন নিয়ে একটা কিছু লিখবো – একটা কঠিন শৌর্যপূর্ণ, গতিশীল, ব্রাত্য জীবনের ছবি। এই বন, নির্জনতা, ঘোড়ায় চড়া, পথ হারানো অন্ধকার – এই নির্জনে জঙ্গলের মধ্যে খুপরি বেঁধে থাকা। মাঝে মাঝে, যেমন আজ গভীর বনের নির্জনতা ভেদ করে যে শুড়ি পথটা ভিটে-টোলার বাথানের দিকে চলে গিয়েচে দেখা গেল, ঐ রকম শুড়ি পথ এক বাথান থেকে আর এক বাথানে যাচ্চে – পথ হারানো, রাত্রের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া করে ঘোরা, এদেশের লোকের দারিদ্র, সরলতা, এই virile, active life, এই সন্ধ্যায় অন্ধকারে ভরা গভীর বন ঝাউবনের ছবি এই সব।”

লেখক পরিচিতি:

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ সালে। পৈতৃক নিবাস যশোর জেলায় যা বর্তমানে ২৪ পরগণা। শিক্ষা শুরু করেন পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। ১৯১৮ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ডিসটিংকশনে বি.এ. পাশ করে এম.এ. ও ল ক্লাসে ভর্তি হলেও তা শেষ করা আর হয়নি।

চিত্র: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়; চিত্রসূত্র: বাংলা পিডিয়া

তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে পড়ার সময় বিয়ে হলেও ১ বছরের পরেই স্ত্রী মারা গেলে অনেকটা সন্ন্যাসী জীবন যাপন করেন। শিক্ষকের চাকুরীর করার সময় ২৪ পরগণায় তাঁর সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় ‘উপেক্ষিত’ নামক গল্পের মাধ্যমে। তিনি দেশভ্রমণ করতেও বেশ ভালবাসতেন যা তার ‘অভিযাত্রিক’ (১৯৪০) এ লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর সৃষ্টি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- পথের পাঁচালি (১৯২৯), অপরাজিত (১ম ও ২য় খণ্ড, ১৯৩২), দৃষ্টিপ্রদীপ (১৯৩৫), আরণ্যক (১৯৩৯), আদর্শ হিন্দু হোটেল (১৯৪০), বিপিনের সংসার (১৯৪১) এর মতো অতি জনপ্রিয় উপন্যাস। গল্প-সংকলনের মধ্যে মেঘমল্লার (১৯৩১), মৌরীফুল (১৯৩২), যাত্রাবাদল (১৯৩৪), জন্ম ও মৃত্যু (১৯৩৭), কিন্নর দল (১৯৩৮), বেণীগির ফুলবাড়ি (১৯৪১), নবাগত (১৯৪৪), তালনবমী (১৯৪৪), উপলখন্ড (১৯৪৫)। কিশোরপাঠ্যের মধ্যে চাঁদের পাহাড় (১৯৩৮), আইভ্যানহো (সংক্ষেপানুবাদ, ১৯৩৮), মরণের ডঙ্কা বাজে (১৯৪০), মিসমিদের কবচ (১৯৪২), হীরা মাণিক জ্বলে (১৯৪৬)। ভ্রমণকাহিনী ও দিনলিপি অভিযাত্রিক (১৯৪০), স্মৃতির রেখা (১৯৪১), তৃণাঙ্কুর (১৯৪৩), ঊর্মিমুখর (১৯৪৪), বনে পাহাড়ে (১৯৪৫), উৎকর্ণ (১৯৪৬), হে অরণ্য কথা কও (১৯৪৮)। এই বিখ্যাত সাহিত্যিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাহিত্য সাধনায় ব্রতী ছিলেন। ১লা নভেম্বর ১৯৫০ এ ঘাটশালায় নিজ বাড়িতে ৫৬ বছর বয়সে মারা যান। রেখে যান পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক, চাঁদের পাহাড় এর মতো ক্লাসিক সৃষ্টি।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: BAARTA TODAY

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on আরণ্যক: অরণ্যের মায়ায় জীবনকে ভাবায় যে উপন্যাস
    তানসীর আলম
    17 Feb 2021
    8:27pm

    দারুণ লাগল। বেশ গোছালো রিভিউ।

    4
    0
      এন মাহমুদ
      18 Feb 2021
      10:05pm

      ধন্যবাদ ভাই

      1
      0

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!