এক রাজকীয় লাইব্রেরি ও তার সূচনালগ্ন

রেদোয়ান আহমেদ
4.2
(14)
Bookmark

No account yet? Register

লাইব্রেরি এমন একটা শব্দ যে শব্দটার উৎপত্তি হওয়ার আগেই মানুষ প্রয়োজনীয় পুস্তক, পুঁথি, কিতাব সংগ্রহ ও অন্যের প্রয়োজনে তা ব্যবহারের নিয়মনীতি শিখে গিয়েছিলো। জীবনের তাগিদেই মানুষ নতুন যা কিছু উৎঘটন করতো বা জানতে পারতো তাই সংগ্রহ করে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ঠিক এরই পরিক্রমায় তথ্য লিপিবদ্ধকরণ ও সংগ্রহ করার তাগিদে শুরু হয় সংগ্রহশালা তথা লাইব্রেরির পথচলা।

 আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। চিত্রসূত্র: Ancient World Magazine

‘Library’ শব্দটির উৎস গ্রীক শব্দ ‘Libre’ থেকে, যার অর্থ বই। যার সংস্কৃতি ও বাংলা প্রতিশব্দ হলো গ্রন্থাগার। Library শব্দটি উচ্চারণ হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে একটা বড়সড় আবদ্ধ ঘরে সারি সারি শেলফে সাজানো বইয়ের তাকে নান রকমের বই। এছাড়াও ঘরের মাঝে থাকে মুক্ত পড়ার টেবিল ও ছোট বড় নানা মানুষের আনাগোনা। সর্বপ্রথম আধুনিক লাইব্রেরির নাম শোনা যায় আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন রাজ-গ্রন্থাগার এর। মিশরের টলেমিক রাজবংশের হাতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫ অব্দে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে এটি গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে রোমান কর্তৃক মিশর আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত এটি কার্যকর ছিল।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এরকম আরো বেশ কিছু প্রাচীন ও বৃহত্তর গণগ্রন্থাগার কেন্দ্রের কথা আমরা জানতে পারি। যুগের উন্নতি সাধনের পাশাপাশি লাইব্রেরির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। মূলত বর্তমানে গ্রন্থাগারকে চার ভাগে ভাগ করা হয়, যথা- জাতীয় গ্রন্থাগার, গণগ্রন্থাগার, একাডেমীক গ্রন্থাগার, বিশেষ গ্রন্থগার। 

তবে আজ কথা বলবো সংগ্রহ সংখ্যার ভিত্তিতে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও আধুনিক সাজসজ্জিত লাইব্রেরি Library of Congress বা লাইব্রেরি অব কংগ্রেস নিয়ে।

ইতিহাস

লাইব্রেরি অব কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ২৪ এপ্রিল ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে। মূলত প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস কংগ্রেসের একটি নতুন আইন পাস করার মাধ্যমে  Philadelphia কে বাদ দিয়ে Washington, D.C কে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজধানী পরিবর্তন আইনের আনুষাঙ্গিক খরচের মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের ব্যবহার্য বইয়ের জন্য $৫,০০০ বরাদ্দ করা হয়। এরপর টমাস জেফারসনের অধীনে কংগ্রেস আরেকটি বিল পাস করে। যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের অধীনে রেখে কিছু মানুষকে গ্রন্থগারের অফিসিয়াল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস। চিত্রসূত্র: দি হোয়াইট হাউজ  

মূলত Philadelphia Washington, D.C উভয় অঞ্চলেই মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের বিশাল সংগ্রহশালার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে ১৯ শতকে এসে সেসব ঘনীভূত হতে থাকে ওয়াশিংটন ডিসি তে। তবে বেশ কিছু ছোট ছোট সংগ্রহশালা ১৮৯০ পর্যন্ত ফিলাডেলফিয়াতেই রয়ে যায়।

লাইব্রেরি অব কংগ্রেস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম ফেডারাল সংস্কৃতির অংশ। বিশেষ করে কংগ্রেসের গ্রন্থাগারিক দ্বারা শুরু থেকে এটি পরিচালিত হতে থাকে।  

আরো পড়ুন: দ্য টাওয়ার অফ লন্ডন : ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য

নানামূখী ভাঙন ও পুনর্গঠন

লাইব্রেরি অব কংগ্রেস মূলত মার্কিন কংগ্রেসের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রকাশ পায় এবং পরবর্তীতে এটি আমেরিকার জাতীয় গ্রন্থাগারে রূপ নেয়। প্রতিষ্ঠার পরপরই লাইব্রেরিটি তাদের সংগ্রহশালার বৃদ্ধি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

নির্মাণাধীন লাইব্রেরি অব কংগ্রেস মূল ভবন। চিত্রসূত্র: C-SPAN/Youtube

১৮১২ সালে শুরু হওয়া ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৮১৪ তে এসে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের মূল স্থাপনা ও এর বেশির ভাগ অরিজিনাল ডকুমেন্ট, বই, তথ্যাদি ধ্বংস হয়। তবে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ ১৮১৫ তে এসে আবার লাইব্রেরিটি পুর্ণগঠন ও সংস্কার করে। এই সংস্কারের সময় তারা প্রায় $২৩,৯৫০ ডলারে টমাস জেফারসনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় ৬ হাজার ৪৮৭ টি বই কিনে নেয়। যার মাধ্যমে পুনরায় লাইব্রেরিটি বর্ধিত হতে শুরু করে।

টমাস জেফারসন। চিত্রসূত্র: টাইম ফর কিডস

কিন্তু ১৮৫১ সালে ক্যাপিটল চেম্বারে অগ্নিকান্ডের ফলে লাইব্রেরিটি চুড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ওই অগ্নিকান্ডের ফলে প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের অধিকাংশ বই এবং প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহদি সহ প্রায় ৩৫ হাজার ভলিউম পুড়ে যায়। যা লাইব্রেরিটির জন্য ছিলো অপূরণীয় ক্ষতি।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর থেকেই এই লাইব্রেরিটির কদর বাড়তে শুরু করে। তখন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ পুড়ে যাওয়া তথ্যাদি, বই, ডকুমেন্টের অনুলিপি কেনার প্রচারণা চালায়। এরপরই গ্রন্থাগারটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত ২টো বই, মানচিত্র এবং ডায়াগ্রামের কপিরাইট পায়। এটিই তাদের অন্য সংগ্রহ গুলো সংরক্ষণে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে সহয়তা করে।

লালাইব্রেরিতে অগ্নিকাণ্ডের প্রতিকী ছবি। চিত্রসূত্র: অ্যামাজন

গৃহযুদ্ধের আগে এটি শুধু মাত্র কংগ্রেসের সদস্যদের ব্যবহারের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সেই ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন আনেন আইনওয়ার্থ র‍্যান্ড স্পফফোর্ড । বলা যায় তার হাত ধরেই লাইব্রেরি অব কংগ্রেস এক নতুন রূপে প্রকাশিত হতে শুরু করে। তিনি কংগ্রেস সদস্যদের এটা বোঝানো শুরু করেন যে এটি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হতে পারে। যা জনগণ ও কংগ্রেসের সদস্যরা নির্বিঘ্নে ব্যবহার করতে পারবে। পরবর্তীতে তিনিই ১৮৭০ এর কপিরাইট আইনের প্রচার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট অফিসকে এই লাইব্রেরির আওতাধীন করেন। এবং তার হাত ধরেই লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠার প্রায় এক শতাব্দী পর ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় রেনেসাঁ ধরণে একটি নতুন বিল্ডিং নির্মাণের অনুমোদন পায়। 

রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও সংগ্রহশালার প্রসার  

বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে এসে লাইব্রেরির তুমুল পরিবর্তন হতে শুরু করে। মূলত এই সময়টাতেই এসে লাইব্রেরির সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শনগুলো সংগ্রহশালায় জমা হতে শুরু করে।

১৯০৩ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট একটি নির্দেশ জারি করেন। তাতে কংগ্রেসের কন্টিনেন্টাল রেকর্ড ও ওয়াশিংটনের ছয় প্রতিষ্ঠাতা- জর্জ ওয়াশিংটন, আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, জেমস ম্যাডিসন ও জেমস মনরো এর ব্যক্তিগত সংগ্রহ, বই, ডায়েরি লাইব্রেরিতে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন জি হার্ডিং আরেকটি নির্দেশ জারি করেন। যে নির্দেশের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মূল অনুলিপি লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে সংগ্রহ ও জনগণের সামনে প্রদর্শন করা শুরু হয়।

লাইব্রেরির বিকাশ ও সংগ্রহশালার উন্নতি সাধনে ১৯৩৯ সালে একটি নতুন আর্ট-ডেকো ধরণের বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে লাইব্রেরি অব কংগ্রেস এর নিদর্শন ও সংগ্রহকৃত ভলিউমের সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পেতে থাকে। মূলত এর গ্রন্থাগারিক L. Quincy Mumford এর সময়কালে এর নিদর্শন সংখ্যা ১০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ১৭ মিলিয়নে উন্নতি হয়।

সর্বশেষ ১৯৮০ সালে জেমস ম্যাডিসনের নামে তৃতীয় মূল বিল্ডিং নির্মাণ করা হয় যা লাইব্রেরিটির আকার দ্বিগুন করে। এবং আধুনিকরণের মাধ্যমে পুরোনো দুটি ভবনকে ১৮৯৭ এর টমাস জেফারসন ও ১৯৩৯ এর জন অ্যাডামস মূল ভবনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। আজকের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস জেফারসন বিল্ডিং ও ২১ টি রিডিংরুম নিয়ে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।

বর্তমান লাইব্রেরি অব কংগ্রেস ও মূল্যবান নিদর্শন 

মূলত প্রযুক্তির ছোঁয়া বিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে আমাদের দ্রুতই পরিবর্তন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ইন্টারনেট ও অনলাইন ভিত্তিক ব্যবস্থার প্রচার ও প্রসার বেড়েছে হাজার গুন। কংগ্রেস তাদের ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি ব্যবস্থা শুরু করে ১৯৯৪ সালে।

ড. কার্লা হেডেন বর্তমান গ্রন্থাগারিক। চিত্রসূত্র: দি ডেইলি রেকর্ড

লাইব্রেরিটিকে ডিজিটাল করার প্রয়াসে ২০০৭ সালে ইউনেস্কোর সাথে একটি চুক্তিপত্র করা হয়। ২০১২ সালের মধ্যে লাইব্রেরিটি ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের শ্রেনীকক্ষে পাঠদান ও গবেষণার জন্য আমেরিকান মেমোরি সাইট হিসেবে ৩৭.৬ মিলিয়ন ডকুমেন্ট, পান্ডুলিপি, বই, ছবি, অডিও রেকর্ড সংযুক্ত করে। 

আরো পড়ুন: বুখারি শরিফ: মনুষ্য সংকলিত সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ (পর্ব ১)

২০১৬ সালে কার্লা হেডেন (বর্তমান) প্রথম মহিলা গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিয়োগ পান। তার অধীনে সাধারণ কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার এবং বইয়ের সংখ্যা  ৩৮ মিলিয়ন এবং পান্ডুলিপির সংখ্যা প্রায় ৭০ মিলিয়ন!

মূল রিডিং রুম, জেফারসন বিল্ডিং। চিত্রসূত্র: Fourth Estate/Leigh Norman  

যেহেতু লাইব্রেরি অব কংগ্রেস আমেরিকার প্রকাশিত সকল বইয়ের কপিরাইট অনুমোদন দিয়ে থাকে তাই প্রায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার বইয়ের আবেদন জমা পড়ে। এবং এর মধ্যে গড়ে ১২ হাজার অনুমোদন প্রাপ্ত হয় এবং নতুন সংযোজন হিসেবে লাইব্রেরিতে জমা হয়।

বর্তমানে লাইব্রেরিতে বেশ কিছু বিরল বইসহ ৬১ মিলিয়ন পান্ডুলিপি, আমেরিকার ১ মিলিয়ন পত্রিকা, ৫ লাখ মাইক্রোফিল্ম রিল, ১ লাখ ২০ হাজার কমিক বই, ৫৩ লাখ ম্যাপ, ৬০ লাখ মিউজিক, ৩০ লাখ সাউন্ড রেকর্ডিং রয়েছে। প্রায় ২২০ বছর পুরোনো লাইব্রেরিটি সংগ্রহ সংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীর ১ম এবং আয়তনের দিক থেকে ২য় স্থানে অধিকার করে আছে।   

লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের সাধারণ পাঠকের পাশাপাশি এর আর্ট ও প্রদর্শিত চিত্রকর্ম বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

ফিচার চিত্রসূত্র: hdwalle.com 

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on এক রাজকীয় লাইব্রেরি ও তার সূচনালগ্ন

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!