হ্যারি পটার: এক বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক জাদুকর চরিত্রের অখ্যান

4.3
(9)
Bookmark

No account yet? Register

ইংল্যান্ডের দক্ষিণে ছোট্ট একটি শহর, নাম ইয়েট। যে সময়ের কাহিনী সম্পর্কে জানবো সে সময়ে ইয়েটের আকাশ পথে কোন পঙ্খিরাজ পার হচ্ছিলো কিনা জানা নেই। তবে এটুকু জানা যায় যে, সে সময় কোন এক ঘরে এক শিশু তার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে জানান দেয় তার পৃথিবীতে আগমনের বার্তা। পঙ্খিরাজের পিঠে চড়ে শিশুটি কোন স্বপ্নের জগৎ পেয়েছিলো কিনা তাও আমাদের জানা নেই। তবে কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও অধ্যবসায় দিয়ে এই শিশুটি বাস্তব জীবনকে করেছে স্বপ্নময় এবং তা পৃথিবীবাসী জেনে গেছে। আজকে আমরা সেই রোমাঞ্চকর গল্পটি শুনবো।

অসামান্যতে লিখুন

ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তখন ৩১ জুলাই, ১৯৬৫ সাল। মাস ঘুরে বছর, শিশুটি কিছুটা বড় হয়। লাজুক স্বভাবের এই শিশুটি হৈ হুল্লোড় না করে চুপচাপ বসে মজার মজার বই পড়তে ভালোবাসতো। একদিন পরিবারে তারও খেলার একজন সাথী যোগ হলো, দুষ্ট-মিষ্টি একটি ছোট বোন। বড় বোনের কাছে ছোট বোনের আবদারের শেষ নেই। কিন্তু বড় বোন অন্য দশজন শিশু-কিশোরের মতো ছোট বোনটিকে খেলাধুলার চেয়ে বই থেকে গল্প শোনাতে বেশি পছন্দ করতো। একদিকে ছোট্ট মানুষটার গল্পের ঝুলি শেষ, অন্যদিকে ছোট বোন তো গল্প না শুনে ঘুমাবেই না। অন্য কোন উপায় না দেখে বড় বোনটি মনের মাধুরি মিশিয়ে নিজেই মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করলো। কিছু গল্প অবশ্য লিখেও রাখলো। এইভাবে শুরু হয়ে গেলো বড় বোনটির গল্প লেখা। সেই বড় বোনটি আজ জগৎ বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, হ্যারি পটার চরিত্র সৃষ্টিকারী, অন্যন্য এক প্রতিভার অধিকারী, জে কে রাউলিং

অনেকটা গ্রাম্য জীবনের অবহেলায় বেড়ে উঠেছেন রাউলিং। তার বাবা-মায়ের আর্থিক অবস্থা মোটেও সুবিধের ছিলো না। তিনি গল্প লেখা শুরু করেছিলেন বোনকে শোনানোর জন্য। এভাবেই তার মনের মধ্যে বাসা বাঁধে লেখক হওয়ার স্বপ্ন। তার স্বপ্ন ছিলো তার বই বাজারে আসা মাত্র পাঠকেরা লুফে নেবে। কী আশ্চর্য! তার সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানের উপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। ক্লাসের বিষয়ে তিনি সব সময় মনযোগী না থাকলেও পরীক্ষায় ভালো ফলাফলে ছিলেন অনড়। তার বন্ধুরা যখন আড্ডা, ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত থাকতো তখন তিনি গল্প লিখতে বসে যেতেন; স্বপ্নের পেছনে তার শ্রম আর একাগ্রতাই তাকে একটু একটু করে বড় করে তুলেছে।

হ্যারি পটার এর রূপকারের সাথে অন্যতম প্রধান চরিত্র
চিত্র: ড্যানিয়েল রেডক্লিফ ও জে কে রাউলিং ; চিত্রসূত্র: Sky News

লেখালেখি করা রাউলিংয়ের স্বপ্ন হলেও বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিলো তিনি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরিবারের আর্থিক অনটন ঘোচাবেন। বাবা-মায়ের ইচ্ছাকে মেনে নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর সচিব হবার প্রশিক্ষণও নিতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুকাল পর বুঝতে পরেন সচিব হওয়া তার কাজ নয়। কারণ তিনি প্রচুর অগোছালো। গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যখন তার নোট নেয়ার কথা তখন তার মাথায় গল্প ভর করতো। তারপর মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আফ্রিকান অনুবাদ বিভাগে কাজ করেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তার লেখক জীবনের জন্য ছিলো অত্যন্ত বৈচিত্রপূর্ণ। এই সময় তার সাথে এক পর্তুগিজ সাংবাদিকের সাথে পরিচয় ঘটে। তারা বিয়ে করে পাড়ি জমান পর্তুগাল। কিন্তু কিছুকাল পর বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

এবার আসা যাক ১৯৯০ সালের এক ঘটনায়। একদিন তিনি ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনে যাচ্ছিলেন পাতাল ট্রেনে চড়ে। ট্রেনটিতে ছিল প্রচুর ভিড়। সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর এক অবস্থা বিরাজ করছে পুরো ট্রেনজুড়ে। এই ট্রেনেই দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা অতিবাহিত করতে হয়েছে জে কে রাউলিংকে। এই অবস্থাতে তিনি চিন্তা করছিলেন নতুন কোন একটি লেখা নিয়ে। হঠাৎ তার চোখে ভেসে উঠলো এক এতিম ছেলে। যে এতিম ছেলেটি পালিত হচ্ছে তার খালা-খালুর কাছে। যারা দুজনই খুব নীচুমনের অধিকারী। ছেলেটি শত অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করলেও সে জানে না যে তার মধ্যে রয়েছে এক মায়াবী জাদুকরী ক্ষমতা। সাথে সাথেই তিনি তার মনের ক্যানভাসে এঁকে ফেলেন সেই এতিম ছেলেটির মুখাবয়ব। মোটা ফ্রেমের চশমা পরিহিত কালো চুলের হ্যারিকে নিয়ে ওই সময় থেকেই লেখা শুরু করেন জে কে রাউলিং।

হ্যারি পটার ড্যাথলি হ্যালোজ
চিত্র: হ্যারি পটার ড্যাথলি হ্যালোজ ; চিত্রসূত্র: Discogs

হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম গল্পটি ১৯৯৫ সালে লেখা শেষ করলেও এই চরিত্রটির পরিকল্পনা তার মাথায় আসে প্রায় পাঁচ বছর আগে। লেখা শেষ হওয়ার পরের কাজ প্রকাশ করা। ১৯৯৬ সালে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন প্রকাশকদের হাতে দেয়া হয়। প্রকাশকদের কাছে গিয়ে খুব ভালো অভিজ্ঞতা হয়নি রাউলিংয়ের। কেউ তার বইটি প্রকাশ করতে রাজি হচ্ছিলো না। তাদের ধারণা ছিলো, এই বই প্রকাশ করলে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। একে একে তিনি আটটি প্রকাশনীর কাছে যান। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি বরং চেষ্টা চালিয়ে যান। টানা এক বছর ধরে চেষ্টার পর একজন প্রকাশক পাওয়া গেলো।

শেষবার ক্রিস্টোফার লিটল নামক একজনের মাধ্যমে তিনি চেষ্টা করেন। ক্রিস্টোফার লিটল রাউলিংকে সাথে সাথে লিখে জানান পাণ্ডুলিপি তার পছন্দ হয়েছে এবং তিনি তাকে সাহায্য করবেন। এই এজেন্ট পাণ্ডুলিপি ব্লুমসবারির কাছে পাঠান। ব্লুমসবারিতে চেয়ারম্যান নিগেল নিউটনের হাতে পড়ে এবার। তিনি বইটি নিয়ে উৎসাহী ছিলেন না। মি. নিউটন পাণ্ডুলিপিটি বাসায় নিয়ে যান কিন্তু নিজে এটি পড়েননি বরং তার আট বছর বয়সী মেয়ে এলিসকে এটি পড়তে দেন। পাণ্ডুলিপিটি পড়ে এলিস নিউটন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পিতাকে বই প্রকাশ করতে তাগাদা দেয়। মেয়ের চাপে পরিশেষে বইটি প্রকাশে বাধ্য হলো নিগেল নিউটন। অন্য আট প্রকাশক বইটি প্রকাশে অসম্মতি জানানোর পর ব্লুমসবারি রাউলিংকে অগ্রিম ২,৫০০ ডলার এর প্রস্তাব দেয়।

১৯৯৭ সালের ২৬ জুন হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম বই হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশে ছাপা হয়েছিল এক হাজার কপি, যার মধ্যে ৫০০ কপিই বিক্রি করা হয়েছিল বিভিন্ন স্কুলের লাইব্রেরির কাছে। হ্যারি পটারের প্রথম সংস্করণের সেই বইগুলো আজ পৃথিবী জুড়ে সংগ্রাহকদের কাছে এক অমূল্য, দুষ্প্রাপ্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। আর প্রতিটি বইয়ের বর্তমান দাম ২৫ হাজার পাউন্ড; যা বাংলাদেশি প্রায় ৩৩ লাখ টাকা।

হ্যারি পটার
চিত্র: হ্যারি পটার ; চিত্রসূত্র: Stillwater

মজার ব্যাপার হলো রাউলিং হ্যারি পটার সিরিজ নিয়ে লেখার সময় কোন নির্দিষ্ট বয়সী পাঠকের কথা তার মাথায় ছিলো না। প্রকাশক প্রথমে বইটিকে এগারো বছর বয়সী পাঠকের উপযোগী হিসেবে ধরে নেন। বইটি প্রকাশের সময় অন্যান্য লেখিকাদের মতো রাউলিংকে প্রকাশক আরো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ কোন ছদ্মনাম ব্যবহার করতে বলেন যাতে এই বয়সী ছেলেরা আকৃষ্ট হয়। এর স্বপক্ষে প্রকাশক যুক্তি দেখান যে, ছেলেরা সাধারণত নারী লেখকদের বই কিনতে আগ্রহী হয় না। শেষে তিনি জায়ান জো রাউলিং ওবিই এর পরিবর্তে জায়ান ক্যাথলিন রাউলিং সংক্ষেপে জে কে রাউলিং নামটি নির্বাচন করেন।

এরপর রাউলিংকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। হ্যারি পটার সিরিজের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণে হ্যারি পটার শুধু বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ও ভিডিও গেমস। এখন পর্যন্ত ছয়টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। এছাড়া শেষ বইয়ের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে দুই পর্ব বিশিষ্ট চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র ছাড়াও এখন পর্যন্ত ছয়টি ভিডিও গেমস বের হয়েছে। পাশাপাশি হ্যারি পটার সিরিজের সাতটি বই গোটা পৃথিবীতে বিখ্যাত।

আরো পড়ুন: জোকার: বিশ্বখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক খলনায়ক চরিত্রের ইতিকথা

হ্যারি পটার সিরিজের উপন্যাসগুলোয় কাহিনি মূলত জনসাধারণের কাছে গোপনে থাকা জাদুবিশ্বকে নিয়ে। কাহিনি অনুসারে, অনেক বছর ধরে জাদুবিশ্ব কালো জাদুকর লর্ড ভোলডেমর্টের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। একরাতে ভোলডেমর্ট গোপনে থাকা পটার পরিবারের সন্ধান পায় এবং হ্যারি পটারের মা-বাবা লিলি ও জেমস পটারকে হত্যা করে। মা-বাবার মৃত্যুর পর অনাথ হ্যারি তার নিষ্ঠুর খালা-খালু ডার্সলিদের কাছে বড় হয়। হ্যারির জাদুশক্তি থেকে রক্ষা পেতে ডার্সলিরা হ্যারির কাছ থেকে তার জাদুকর মাতা-পিতার কথা লুকিয়ে রাখে এবং তার সাথে যে জাদুবিশ্বের সম্পর্ক রয়েছে তাও গোপন রাখে। এই কারণে হ্যারির মধ্যে অসাধারণ কোনো জাদুগুণ দেখলে তারা হ্যারিকে শাস্তি দেয়। পরবর্তীতে হ্যারি তার এগারতম জন্মদিনে প্রথম জাদুবিশ্বের কথা জানতে পারে, যখন সে হগওয়ার্টস স্কুল অব উইর্চক্যাফট এন্ড উইজার্ডরি থেকে ভর্তি চিঠি পায়।

দ্য উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড
চিত্র: দ্য উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড ; চিত্রসূত্র: Chronique Disney

অবশ্য হ্যারি সেই চিঠি পড়তে পারেনি কারণ তার খালু ভার্নন তার কাছ থেকে চিঠি কেড়ে নিয়েছিলেন। এগারতম জন্মদিনে হগওয়ার্টসের পক্ষ থেকে হ্যাগ্রিড হ্যারিকে নিতে আসেন। তখনই হ্যারি জানতে পারে সে একজন জাদুকর। হ্যারি স্কুলে যোগদান করে এবং জাদুবিদ্যা আয়ত্ত্ব করে। তবে যখন সে আভাডা কেদাভ্রা বা মৃত্যু অভিশাপ দিয়ে হ্যারি পটারকে হত্যা করার চেষ্টা করে তখন অভিশাপটি আশ্চার্যজনকভাবে হ্যারির কাছ থেকে প্রতিফলিত হয়ে তার দিকে ছুটে আসে। ফলে ভোলডেমর্ট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী একটি স্থানে আটকে যায়। সে আত্মার মত কিছুতে পরিণত হয়। হ্যারির কোন ক্ষতি হয় না, শুধু তার কপালে একটা বজ্রপাতের মত কাটা দাগ থেকে যায়। ভোলডেমর্টের কাছ থেকে হ্যারির এ রহস্যময়ভাবে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং হ্যারি পটার নামে পরিচিত হয়।

সপ্তম বই হ্যারি পটার অ্যান্ড ড্যাথলি হ্যালোজ ছাড়া প্রতিটি বইয়ের সময়সীমা থাকে এক বছর এবং প্রতিটি বইয়ের শুরুতে হ্যারি জাদুর দুনিয়ায় তার খালা-খালু ডার্সলি পরিবারের সাথে থাকে। পরে হ্যারি জাদুর দুনিয়ার ডায়াগন এলি, ওয়িজলিদের বাসা কিংবা বারো নাম্বার, গ্রিমল্ড প্লেস এলাকায় যায়। এরপর বিদ্যালয়ের রেলগাড়িতে করে সে হগওয়ার্টসে ফিরে আসে। হগওয়ার্টসে আসার পর কাহিনি পূর্ণতা লাভ করে এবং অন্যান্য চরিত্র বর্ণনায় আসে। প্রতি বইতেই দেখা যায় বিদ্যালয়ে পাঠের সময় কঠিন রচনা, কষ্টসাধ্য জাদু, অসহনশীল শিক্ষকের সাথে হ্যারির মানসিক যুদ্ধ। ঘটনা শেষ হয় যখন হ্যারির হাতে ভোলডেমর্ট পরাস্থ হয় এবং অ্যালবাস ডাম্বলডোর হ্যারিকে কাহিনীর বিভিন্ন তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। এর বেশিরভাগ অংশেই হ্যারি হগওয়ার্টসে থাকাকালীন বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার, জাদুবিদ্যা শেখা, বন্ধুদের সাথে আচরণ, ভোলডেমর্টের সাথে লড়াই, তার মানসিক অবস্থা প্রভৃতির বর্ণনা থাকে।

এই সিরিজের উপন্যাসগুলো প্রায় কল্পসাহিত্য ধরনের, কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক উপন্যাসের সাথে এর মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে যেখানে হগওয়ার্টসের কথা বলা হয়েছে, যেটি একটি ব্রিটিশ স্কুল এবং যার পাঠ্যক্রমে যাদুর বিভিন্ন ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই অর্থে থমাস হিউগসের টম ব্রাউনস স্কুল ডেজ উপন্যাসের সাথে এর মিল পাওয়া যায়। একজন সাহিত্য সমালোচক স্টিফেন কিংয়ের ভাষায়, বইটি রহস্যময় গল্পের এবং প্রতিটি বই শার্লক হোমস সিরিজের মত রচনার ভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়।

হ্যারি পটার ড্যাথলি হ্যালোজের একটি দৃশ্য
চিত্র: হ্যারি পটার ড্যাথলি হ্যালোজের একটি দৃশ্য ; চিত্রসূত্র: Pinterest

বইটির বর্ণনাতে বিভিন্ন ঘটনার সূত্র লুকায়িত থাকে এবং উপন্যাসের চরিত্ররা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সন্দেহভাজনের তালিকায় রাখে এবং কাহিনীর শেষের দিকে ঘটনার মোড় একদম ঘুরে যায়। বইটি তৃতীয় পুরুষের ভাষায় লেখা; তবে বইয়ের কিছু কিছু স্থানে এর ব্যতিক্রম রয়েছে (যেমন, গবলেট অব ফায়ার, ফিলোসফার্স স্টোনহাফ ব্লাড প্রিন্স এর শুরুর দিকের কিছু অধ্যায়)। ঘটনার গোপনীয়তাগুলো পাঠক তখনই জানতে পারেন যখন হ্যারি তা জানতে পারে। প্রধান চরিত্র হারমায়োনি ও রনসহ অন্যান্য চরিত্রের চিন্তা-চেতনা হ্যারির কাছে প্রকাশের আগে পর্যন্ত পাঠকের কাছে গোপন থাকে।

হ্যারি পটার বইতে চরিত্রের নামকরণে লেখিকার পারদর্শিতা লক্ষ্য করার মতো। প্রথম পাতা থেকেই এর প্রকাশ দেখা যায়। ভোলডেমর্ট থেকে শুরু করে মৃত্যু অভিশাপ আভাডা কেডাভ্রা, সব নামেরই কোন না কোন অর্থ রয়েছে। রাউলিং সাধারণত একাধিক অর্থ আছে এমন নাম ব্যবহার করেছেন। ভোলডেমর্ট শব্দটি নিজেই মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত। ফরাসি ও ক্যাটালান ভাষায়, ভোল অর্থ আকাশে ওড়া, ডে অর্থ থেকে এবং মোর্ট অর্থ মৃত্যু, তাই ভোলডেমর্ট-এর পুরো অর্থ দাঁড়ায়- মৃত্যু থেকে (উড়ে) পালানো। যদিও রাউলিং এর মতে ভালোবাসা, আত্মম্ভরিতা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রভৃতি ভাব মূল কাহিনীর গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে।

তবে লেখিকা একই সাথে এগুলোর প্রকাশ না করে ধীরে ধীরে হ্যারি ও অন্যান্য চরিত্রে প্রকাশ করেছেন, যা বাস্তবতার সাথে অধিকতর মানানসই। এসব থিমের মধ্যে বন্ধুত্ব ও আনুগত্য সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে, যা প্রধানত হ্যারি, রন ও হারমায়োনিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কাহিনর চরিত্রদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের সম্পর্ক আরো পরিপক্ক হয়েছে, এবং হগওয়ার্টসের বিভিন্ন ঘটনার অভিজ্ঞতায় সবসময় এদের আনুগত্য পরীক্ষিত হয়েছে।

ড্যানিয়েল রেডক্লিফ ও রুপার্ট গ্রিন্ট
চিত্র: ড্যানিয়েল রেডক্লিফ ও রুপার্ট গ্রিন্ট ; চিত্রসূত্র: The Atlantic

হ্যারির মধ্যে সেসকল গুণ লক্ষ্য করা গেছে, যা সঠিক ও যা সহজ এদের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়- এই গুণটিই হ্যারির জীবনকে ভোলডেমর্টের জীবন থেকে ব্যতিক্রমী করেছে। ভোলডেমর্ট ও হ্যারি উভয়েই অনাথ হিসেবে বড় হয়েছে এবং তাদের মধ্যে অনেক গুণাবলিরও মিল রয়েছে। ভোলডেমর্টের বিভিন্ন দক্ষতার একটি হলো পার্সেলটাং বা সাপের সাথে কথা বলার ক্ষমতা, যেটা হ্যারি পেয়েছে। এছাড়া হ্যারির মধ্যে ভোলডেমর্টের ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ও নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা দেখা যায়। এছাড়া হ্যারি বন্ধুত্ব, দয়া, ভালবাসা প্রভৃতি গুনাবলি হ্যারির চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছে।

পরিশেষে বলা যায়, হ্যারি পটার সিরিজের সমালোচনায় সাহিত্য গুণের অভাব রয়েছে বটে, তবে এটি মানুষের হারানো শৈশবের নতুন বিশ্বাস পাঠকদের মাঝে জাগাতে পেরেছে বলেই ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে। টেইলর বইটিতে কালো জাদুর দিকে জোর দিয়েছেন, যাতে সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হত্যার এবং এর ফলে সৃষ্ট মানসিকতা ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা দেখানো যায়। টেইলরের মতে, রাউলিংয়ের সাফল্যের মূল কারণ তিনি কাহিনি বর্ণনা করতে সিদ্ধহস্ত। স্টিফেন কিংও টেইলরের সাথে একমত প্রকাশ করে বলেছেন, সিরিজটি কেবল সুদূর কল্পনাশক্তি সম্পন্ন মস্তিষ্ক থেকেই লেখা সম্ভব এবং তিনি রাউলিংয়ের হাস্যরসকে অনন্য আখ্যা দিয়েছেন।

প্রচ্ছদ সূত্র: British GQ

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on হ্যারি পটার: এক বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক জাদুকর চরিত্রের অখ্যান

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!