heart

হৃদপিণ্ড: বিস্ময় ও সমস্যা, পর্ব ১ – সাধারণ পরিচিতি

এন মাহমুদ
5
(5)
Bookmark

No account yet? Register

সিনেমায় চিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর কারণের জন্যই হোক বা প্রেমিকার নাম লেখার জন্যই হোক, মানবদেহের সবচেয়ে জনপ্রিয় অঙ্গ কিন্তু হৃদপিণ্ড বা হার্ট। মানুষের মন মানসিকতা ব্রেইন নিয়ন্ত্রণ করলেও এখনও মনের কথা বলতে গিয়ে হাত চলে যায় বুকের বাম পাশে ঠিক হার্টের উপরে। তবে নিজেদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, এককালে বিজ্ঞানীরাও বিশ্বাস করতেন যে মানুষের দেহের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে হার্ট তথা হৃদপিণ্ড। আর তাই তো আদি থেকে এখন পর্যন্ত প্রেমিকাকে ভালবাসা বোঝানোর জন্য বলা হয়-

অসামান্যতে লিখুন

হৃদয়ে লিখেছি তোমারই নাম
হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে দিলাম
তুমি আমার অনন্ত আশা
তোমায় নিয়ে নীল স্বপ্নে ভাসা
এক পৃথিবী প্রেম তুমি আমার আকাশ ছোঁয়া ভালবাসা

তবে সে যাইহোক হৃদপিণ্ড যে, দেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তা মানতে কারো দ্বিমত নেই। তবে নিজেদের অলসতার জন্যই হোক বা খাওয়া দাওয়ায় অসতর্কতার জন্য হোক এ অঙ্গটিকে আমরা সুস্থ রাখতে পারিনা, বাধিয়ে দেই নানা রোগ। আজ আমরা জানব এই হৃদপিণ্ড নিয়ে। পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব এর পরিচিত রোগ হার্ট অ্যাটাক নিয়ে ইনশাআল্লাহ৷ 

হৃদপিণ্ড কি?

হৃদপিণ্ড হলো মানবদেহের একটি অঙ্গ যা রক্ত পাম্প করে এবং সারা দেহে রক্ত পৌঁছে দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। হৃদপিণ্ড হৃদপেশি নামক এক বিশেষ পেশি নিয়ে গঠিত যার গঠন ঐচ্ছিক পেশির মতো হলেও কাজ অনৈচ্ছিক পেশির মতো। হার্ট এর একটা খোলস থাকে যাকে বলে পেরিকর্ডিয়াম। পেরিকার্ডিয়ামকে ঢালের সাথে তুলনা করা যায়, কেননা বাইরে কোন আঘাত আসলে প্রথমে সে-ই প্রতিরোধ করে। 

সদ্য বের করা হৃদপিণ্ড
সদ্য বের করা হৃদপিণ্ড। চিত্রসূত্র: Flickr

হৃদপিণ্ডকে বাড়ির সাথে তুলনা করলে বলা যায় হৃদপিণ্ড এর রয়েছে চারটা ঘর। যার দুটো ঘর ডান দিকে আর দুটো ঘর বাম দিকে।

হৃদপিণ্ডের চারটি অংশ
হৃদপিণ্ডের চারটি অংশ । চিত্রসূত্র: Wikimedia commons

ডানদিকের ঘরগুলোকে বলে ডান অলিন্দ আর ডান নিলয় অন্যদিকে বাম দিকের ঘরগুলোকে বলে বাম অলিন্দ আর বাম নিলয়।

হৃদপিণ্ড থাকে কোথায়?

আনোয়ার হোসেনের সিনেমা দেখে থাকলে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কোন দরকারই নেই। সবাই জানে হার্ট থাকে দেহের বাম দিকে। তবে আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলা যায় বুকের ডান দিকের ২য় পাঁজর থেকে বাম দিকের ৫ম পাঁজরের দিকে কিছুটা বাঁকা হয়ে থাকে এ হার্ট। 

দুই ফুসফুসের মাঝে হৃদপিণ্ডের অবস্থান
দুই ফুসফুসের মাঝে হৃদপিণ্ডের অবস্থান । চিত্রসূত্র: Alamy

তবে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ এর শজারুর কাঁটা পড়ে থাকলে কিছুটা হলেও প্রতিবাদ করে উঠবেন। কেননা শজারুর কাঁটা দেবাশীষ সাহেবের বুকের ঠিক বাম দিকে বাঁধলেও তাঁর হার্ট এ কোন আঘাত লাগেনা। কারণ তার হার্ট বুকের বাম দিকেই নেই ; আছে বুকের ডান দিকে। হ্যাঁ গল্পটিতে সত্য কথাই বলা হয়েছিল, হার্ট সব সময় যে বাম দিকে থাকবে তা নয় অনেক সময় ডান দিকেও থাকতে পারে। এটিকে বলা হয় ডেক্সট্রোকার্ডিয়া ৷ ডেক্সট্রোকার্ডিয়া কি তা যদি একটু ভালোভাবে যদি বলি তাহলে বলা যায় যে, আপনার হার্টকে যদি আপনি আয়নায় দেখেন তবে সেটাকে ডান দিকে দেখে ঠিক যেমন মনে হবে সেটাই কারও কারও ক্ষেত্রে সত্য আর সেটাই ডেক্সট্রোকার্ডিয়া৷ হার্টের ওজনের কথা বললে বলা যায় ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩০০ গ্রাম আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ২৫০ গ্রাম।

হৃদপিণ্ডের কাজ

পেট শুধু খায় আর দেহের সব অঙ্গ কাজ করে। মনে পড়ে সেই গল্প? তবে গল্পের শেষে দেখা যায় যে পেটও কাজ করে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে হার্ট বসে থাকে না, কাজ করে। তবে হার্ট প্রেমিকার  নাম লেখার ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যবহার হয় না, হার্ট এর প্রধান কাজ হল রক্ত সারা দেহে পৌঁছে দেওয়া, এটা পাম্পার হিসেবে কাজ করে।

পাম্প করা অবস্থায় হৃদপিণ্ড
পাম্প করা অবস্থায় হৃদপিণ্ড চিত্রসূত্র: Wikimedia commons

সাইকেল বা মোটরসাইকেল চাকায় যেমন পাম্পার দিয়ে বাতাস ঢোকানো হয়, অনেকটা সেরকম কাজ করে হার্ট রক্ত সারা দেহে পাঠানোর ক্ষেত্রে। যারা হাতের চালিত পাম্পার ব্যবহার করেছেন তারা মনে করতে পারেন সেই কাজটাই করে হার্ট।

হার্ট সারা দেহ থেকে রক্ত নেয়, তারপরে তা ফুসফুসে পাঠায়, ফুসফুস থেকে অক্সিজেন যুক্ত রক্ত নেয় এবং পরবর্তীতে সারা দেহে পাম্প করে রক্ত পৌঁছে দেয়। রক্ত পরিবহন এর কাজটিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়-

একটিকে বলা হয় সিস্টেমিক পরিবহন এবং অন্যটিতে বলা হয় পালমোনারি তথা ফুসফুসীয় পরিবহন। 

হৃদপিণ্ড থেকে সারা দেহে রক্ত পরিবহন
হৃদপিণ্ড থেকে সারা দেহে রক্ত পরিবহন । চিত্রসূত্র: Pixabay

পালমোনারি পরিবহনের মাধ্যমে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত বাম নিলয় থেকে গিয়ে সারা দেহ সরবরাহ করে এবং পরবর্তীতে সারা দেহ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড যুক্ত রক্ত নিয়ে এসে ডান অলিন্দে রেখে দেয়৷ অন্যদিকে ফুসফুসীয় পরিবহনে ডান নিলয় থেকে রক্ত ফুসফুসে প্রবেশ করে, যেটা সেই কার্বন ডাই অক্সাইড যুক্ত রক্তকে শুদ্ধ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড মুক্ত করে এবং অক্সিজেন যুক্ত হয়ে আবার ফিরে আসে বাম অলিন্দে। এই হল তার কাজ। 

আরও পড়ুন: কুকুর, তার ভেজা নাক ও গন্ধশোঁকার খ্যাতি

অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হৃদপিণ্ড

হৃদপিণ্ডের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। হৃদপিণ্ডের পেশির গঠন ঐচ্ছিক পেশির মতো হলেও কাজ করে অনৈচ্ছিক  পেশির মত। তবে এর সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো হৃদপিণ্ড বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে, হৃদপিণ্ড নিজের জন্য নিজে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে আর এর মাধ্যমেই হার্ট নিজে নিজে কাজ করতে পারে। বিদ্যুৎ তৈরি করার জন্য এর রয়েছে তিনটি বিশেষ অংশ যার মধ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করে সায়ানো অ্যাট্রিয়াল নোড। এছাড়া অন্য দুটি হল অ্যাট্রিও ভেন্ট্রিকুলার নোড ও পারকেন্জি ফাইবার৷ তবে প্রধান হিসেবে কাজ করে সায়ানো অ্যাট্রিয়াম নোড, যার কারণে একে বলা হয় পেসমেকার।

হৃদপিণ্ডের দরজা

হার্টের কপাটিকা তথা দরজা রয়েছে চারটি। যার মধ্যে ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে একটি তিন পাল্লা বিশিষ্ট কপাটিকা রয়েছে, যাকে বলে ট্রাইকাসপিড ভাল্ব৷ অন্যদিকে বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে রয়েছে দুই পাল্লা বিশিষ্ট মাইট্রাল ভাল্ব।

হৃদপিণ্ডের ভাল্ব তথা দরজা
হৃদপিণ্ডের ভাল্ব তথা দরজা । চিত্রসূত্র: Pixabay

আবার ডান নিলয় ও পালমোনারি শিরা এবং বাম নিলয় ও মহাধমনীর মাঝে রয়েছে সেমিলুনার ভাল্ব। কপাটিকাগুলো একমুখী, এদের প্রধান কাজ কাজ হল রক্ত যেন পিছনে ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করা। আপাতত এগুলোই হল হৃদপিণ্ডের নিজের সম্পর্কে কথাবার্তা৷ 

তবে আরও কিছু কথা বলে নেয়া যাক-

হৃদপিণ্ড কি সব প্রাণীর আছে?- না। হার্ট সব প্রাণীর নেই। যেমন: কোরাল, জেলিফিস, পলিপ ইত্যাদি প্রাণীর কোন হার্ট নেই৷ আবার এমন অনেক প্রাণী রয়েছে যাদের একাধিক হার্ট রয়েছে। যেমন: হ্যাগফিস, ব্যাঙ ইত্যাদি। এখানে আরও একটা মজাদার কথা বলে নেই যে, গ্লাস ফ্রগ নামের এক ব্যাঙ রয়েছে যাদের হার্ট বাইরে থেকেই দেখা যায়। 

এই ব্যাঙের হৃদপিণ্ড বাইরে থেকেই দেখা যায়
এই ব্যাঙের হৃদপিণ্ড বাইরে থেকেই দেখা যায় । চিত্রসূত্র: Wikimedia commons

১. আমি যুবক মানুষ হৃদপিণ্ড নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই- আসলে আজ আপনি কেমন জীবনযাপন করছেন তার উপর নির্ভর আপনার হৃদপিণ্ড কেমন থাকবে। বর্তমানে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এর প্রবণতা থাকায় হার্ট নিয়ে অবহেলা করার কোন সুযোগই নেই। 

২. ভালবাসা আসে হৃদপিণ্ড থেকে –  এককালে বেশ প্রচলিত এই ধারণা আজও প্রচলিত। এমনকি জ্ঞানী মানুষেরাও এই কথা বলে থাকে। যার কোন ভিত্তি নেই। আবেগ ভালবাসা সবই নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্ক থেকে।

ভালবাসার চিহ্ন হৃদপিণ্ডের অনুরূপ
ভালবাসার চিহ্ন হৃদপিণ্ডের অনুরূপ । চিত্রসূত্র: Pixabay

৩. হৃদপিণ্ড ছাড়া মানুষ বাঁচে না – হ্যাঁ এটার যুক্তি রয়েছে৷ তবে হৃদপিণ্ড ছাড়াও মানুষ বেশ কিছু দিন বাঁচতে পারে৷ হৃদপিণ্ড ছাড়া মানুষ প্রায় ৫৫৫ দিন বেঁচে থেকেছে এমনও তথ্য রয়েছে।  

৪. পুরুষের হৃদপিণ্ড এর রোগ বেশি হয়, মেয়েদের আশঙ্কা কম এটাও অনেকাংশে সত্য তবে একেবারে সত্য বলে বিশ্বাস করা যাবে না৷ কেননা অবসাদ, স্থূলতা মেয়েদের হার্টের রোগে বেশ এগিয়েই রাখে।

৫. পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে মানেই আমি শেষ – পারিবারিক ইতিহাস থাকলে হৃদপিণ্ড এর রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে এটা সত্য৷ তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হৃদপিণ্ড এর রোগের কারণ নিজের কাজের ফসল অর্থাৎ অসচেতন জীবনযাপন।   

হৃদপিণ্ড নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য 

হৃদপিণ্ড মানেই বিস্ময়, এর কাজে কর্মে বিস্ময়ের শেষ নেই৷ এর বিস্ময়কর তথ্য হিসেবে যোগ করা যায়-

১. আপনার হাত মুষ্টিবদ্ধ করলে যত বড় হবে ঠিক তত বড়ই হল আপনার হৃদপিণ্ড এর আকার।

২. মেয়েদের হৃদপিণ্ড ছেলেদের থেকে ২৫% ছোট হয়ে থাকে৷ 

৩. হৃদপিণ্ড এর আকার থেকে আসে ভালাবাসার প্রতীক৷ আসলে গ্রিকদের ধারণা ছিল এটি সকল আত্মশক্তির উৎস, অন্যদিকে চিনাদের ধারণা ছিল, এটা হল সকল ভাললাগার উৎস- যেখানে মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো হৃদপিণ্ড সকল আবেগের উৎস৷ এ ধারণাগুলো এখনও বজায় রয়েছে। 

৪. হৃদপিণ্ড একটা বেশ ভালো পাম্পার হিসেবে কাজ করে, যার কারণে হার্ট মিনিটে প্রায় ৭২ বার বিট দেয়, সারাদিনে তা দাঁড়ায় প্রায় ১০,০০০ বারে। এর মাধ্যমে হার্ট প্রায় ২০০০ গ্যালন রক্ত পাম্প করে রক্তকে দেহের প্রায় ৬০০০০ মিটার পথ অতিক্রম করায়।  

৫. হার্টের ওজন ২৫০-৩০০ গ্রাম হয়ে থাকে।

আজ এই পর্যন্ত। পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব হার্ট এর সবচেয়ে পরিচিত রোগ হার্ট অ্যাটাক নিয়ে ইনশাআল্লাহ।

তথ্যসূত্র:

  1. Live Science
  2. Chaurasia, BD, Human Anatomy, ISBN : 978-93-88902-73-1
  3. গান: হৃদয়ে লিখেছি তোমারই নাম; কথা: কবির বকুল

ফিচার চিত্রসূত্র: Pixabay

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on হৃদপিণ্ড: বিস্ময় ও সমস্যা, পর্ব ১ – সাধারণ পরিচিতি

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!