হৃৎপিণ্ড: বিস্ময় ও সমস্যা, পর্ব ২ – হার্ট অ্যাটাক

এন মাহমুদ
4.8
(4)
Bookmark

No account yet? Register

হার্ট তথা হৃদপিণ্ড নিয়ে গত পর্বে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। হৃদপিণ্ড যে স্রষ্টার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি তাতে কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে মানবজাতি হার্টকে আশীর্বাদ হিসেবে মেনে নিলেও এর সদ্ব্যবহারে তার আগ্রহ খুব একটা দেখা যায় না। নানা কারণেই বুকের বাঁ পাশের এই পাম্প করার যন্ত্রে রোগব্যাধি যে লেগেই থাকে তা কিন্তু নয়। কিন্তু একবার সমস্যা দেখা দিলে তা নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। যার কারণে সারাবিশ্বে হার্ট অ্যাটাক রোগটি বেশ পরিচিত শব্দ হয়ে গিয়েছে। 

আজকের এই পর্বে আলোচনা করা হবে এই হার্ট অ্যাটাক নিয়েই। তবে এ পর্ব শুরু করার আগে গত পর্ব একটু ঢুঁ দিয়ে আসলে মন্দ হয় না। 

শুরু করার আগে একটা গান গেয়ে নেয়া যাক। দ্বিজ ভূষণ এর এক বিখ্যাত গান

তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব

ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়

ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়

আমরা আর পাব না, আর পাব না।

তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না

তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না। 

যারা গত পর্ব একবার হলেও ঢুঁ মেরে এসেছেন তারা এতক্ষণ বুঝে গেছেন যে হৃদপিণ্ডের মাঝে প্রমিকার নাম খুঁজে না পাওয়া গেলেও পাওয়া যাবে গোলাপের মতে টকটকে লাল রক্ত। রক্তকে সারা দেহে পাঠানোর কাজই করে থাকে এই হৃদপিণ্ড। তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না যে সারাদেহের মধ্যে হৃদপিণ্ড নিজেও একটি অংশ। হ্যাঁ, এ কারণে হৃদপিণ্ডের নিজেরও রক্তের প্রয়োজন। আর এজন্য হৃদপিণ্ডেও রয়েছে নানা ধমনি ও শিরা। হৃদপিণ্ডের ধমনি ও শিরাকে যথাক্রমে করোনারি ধমনি ও করোনারি শিরা বলা হয়। এগুলোর সাহায্যে হৃদপিণ্ড রক্তের মাধ্যমে তার প্রয়োজন বস্তু পেয়ে থাকে। 

রক্তিম বর্ণের অংশগুলোই হল হার্ট এর ধমনী তথা করোনারী ধমনী
রক্তিম বর্ণের অংশগুলোই হল হার্ট এর ধমনি তথা করোনারি ধমনি। চিত্রসূত্র: পিক্সাবে

নিশ্চয়ই ভাবছেন এত কথা কেন বলছি।  আসলে হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে জানার জন্য এগুলো জানা দরকার। যাইহোক এবার জানা হয়ে গেছে। এখন মূল আলোচনায় আসা যাক।

হার্ট অ্যাটাক কী?

হার্ট অ্যাটাক হল হার্ট এর রক্ত সরবারহ বন্ধ বা অনেক কম হওয়ার কারণে হার্ট এর কোষগুলোর মরণ ঘটতে শুরু করা। 

কোলেস্টেরল জমে এভাবেই রক্ত চলাচলে বাঁধা দেয় এবং হার্ট অ্যাটাক ঘটায়
কোলেস্টেরল জমে এভাবেই রক্ত চলাচলে বাঁধা দেয় এবং হার্ট অ্যাটাক ঘটায়।  চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে এই রক্ত কিন্তু অলিন্দ ও নিলয়ের রক্ত নয়, এই রক্ত তার নিজের পেশিতে প্রবাহিত রক্ত, যার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় বা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম প্রবাহিত হয়। এর ফলে হার্ট এর পেশির পঁচন ঘটে বা মৃত্যু ঘটে। আর একেই হার্ট অ্যাটাক বলে। উল্লেখ এই হার্ট অ্যাটাককে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন। যেখানে ‘মায়োকার্ডিয়াল’ শব্দের অর্থ হৃদপিণ্ডের পেশি এবং ‘ইনফ্রাকশন’ শব্দের অর্থ মারা যাওয়া বা পঁচে যাওয়া।  

লক্ষণ

হার্ট অ্যাটাকের সুনির্দিষ্ট বেশকিছু লক্ষণ রয়েছে যা দেখে বোঝা যায় রোগীর হৃৎপিণ্ড আক্রান্ত হতে চলেছে। 

গত পর্বেই আলোচনা করা হয়েছে হার্ট থাকে আমাদের বুকের বাম পাশে। এর সাথে থাকে নানা ধরনের স্নায়ু। যার কারণে হৃদপিণ্ডে অক্সিজেনের পরিমাণ কম হলে বা হৃদপেশি মারা বা পঁচে যেতে শুরু করলেই বুকের বাম পাশে ব্যাথা শুরু হয়। এর সাথে সাথে স্নায়ুর মাধ্যমে ব্যথা দুই হাতে (বিশেষ করে বাম হাত), উপরের চোয়ালে এমনকি ঘাড়েও হয়ে থাকে৷ 

এর সাথে সাথে আরও যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তা হল –

  • কাশি
  • বমি ও বমি-বমি ভাব
  • বুকে অস্বস্তি 
  • মাথা ঘোরা 
  • ঘুমে ব্যাঘাত
  • ঘনঘন শ্বাস প্রশ্বাস নেয়া
  • অস্বাভাবিক ঘাম হওয়া 
  • মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি 

উল্লেখ বুকে ব্যাথা হতে থাকলে হার্ট অ্যাটাক হবে এমন রোগী তার অবস্থান পরিবর্তন করলেও শান্তি পায়না।  ব্যাথা চলতেই থাকে।

সর্তকতামূলক লক্ষণ

যেহেতু এটি বেশ বিপজ্জনক, তাই এর লক্ষণগুলো বুঝতে পারাও বেশ জরুরি। কেননা অনেক সময় নারী-পুরুষের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণও ভিন্ন হয়ে থাকে৷ এজন্য অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন কয়েকটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করে দিয়েছে। যেগুলো হল –

  1. বুকে অস্বস্তি, চাপ অনুভব বেশ কয়েক মিনিট পর্যন্ত হতে পারে বা একবার থেমে গিয়েছে মনে হলেও আবার ফিরে আসে
  2. বুকে ব্যথা হওয়া।
  3. ঘন নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেয়া 

এই তিনটি লক্ষণ দেখা দিলে ধরে নেয়া যায়, রোগীর হার্ট অ্যাটাক হতে চলেছে। 

হার্ট অ্যাটাক হলে তাৎক্ষণিক করণীয় 

হার্ট অ্যাটাক হলে যতদ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে
যতদ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। চিত্রসূত্র: পিক্সাবে

১. যত দ্রূত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া৷ হার্ট অ্যাটাক পরবর্তী রোগী কতটুকু ভালোভাবে জীবনযাপন করবে তার অনেকটাই নির্ভর করে রোগীকে কত দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন করতে পারা যায় তার উপর। তাই দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ব্যথানাশক ঔষধ খাওয়ানো।  অ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খাওয়ানো হয়৷ এ বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রোগীকে ঔষধ খাওয়াতে হবে। কেননা অনেক সময় রোগী ট্যাবলেট হিসেবে ঔষধ খেতে পারে না। তখন রোগীকে ঔষধ পানিতে গুলিয়ে খাওয়াতে হয়।

৩. রোগীর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। 

৪. দরকার হলে রোগীকে সিএবিজি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। 

উল্লেখ কাজগুলোর কোনটিই না পারলেও অবশ্যই রোগীকে দ্রূত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেটা যে-কোনো মূল্যে।

হার্ট অ্যাটাক হলে আরও যে জটিলতা দেখা যায়

হার্ট অ্যাটাক যে একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তা মেনে নিতে যেকেউ বাধ্য। তবে এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ৷ এমতবস্থায় রোগী আরও নানা জটিলতার সম্মুখীন হয়তে পারে৷ যার মধ্যে অন্যতম হল

১. কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া: প্রতি মিনিটে হার্ট বিটের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় বা কমে যায়

২.কার্ডিওজেনিক শক: ব্লাড প্রেশার কমে যায়

৩.হাইপোক্সিয়া: রক্তে অক্সিজেন এর পরিমাণ কমে যায়।

৪. হৃদপেশি মরে যায় বা পঁচে যায়।

৫. হাত পা এর শিরায় রক্ত জমে যায়।

৬. এছাড়াও হার্ট এর নিলয়ের আকার বড় হয়ে যায়

ইত্যাদি 

চিকিৎসা যত দেরিতে শুরু হয় এসব জটিলতা তত জটিল আকার ধারণ করে।

হার্ট অ্যাটাক এর জন্য দায়ী

মূলত এসব কারণে হৃদপিণ্ড আক্রান্ত হয় –

১. বয়স: পুরুষের বয়স ৪৫ এবং নারীর বয়স ৫৫ এর বেশি হলে হার্ট অ্যাটাক এর সম্ভাবনা বেশি থাকে।

২.লিঙ্গ: নারীদের চেয়ে পুরুষের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি

৩. পারিবারিক ইতিহাস: যেসব পরিবারে হার্ট অ্যাটাক এর পূর্ব ইতিহাস রয়েছে তাদের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যেসব পরিবারের সদস্যের মধ্যে ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত মেদ দেখা যায় তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। 

অতিরিক্ত মেদ দেখতে যেমন খারাপ, সুস্বাস্থ্যের জন্যও খারাপ
অতিরিক্ত মেদ দেখতে যেমন খারাপ, সুস্বাস্থ্যের জন্যও খারাপ। চিত্রসূত্র: creazilla

উপরের তিনটি  আমরা চাইলেও পরিবর্তন করতে পারি না। তবে এগুলো যে হার্ট অ্যাটাকে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে তা কিন্তু নয়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ব্যক্তির নিজের অভ্যাস ও সচেতনা। কেননা মূল নিয়ামকগুলো হলো:

  • ধূমপান 
  • অতিরিক্ত কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার খাওয়া
  • মেদ
  • ব্যায়াম না করা 
  • মানসিক চিন্তা
  • অলসতা
  • অ্যালকোহল পান করা ইত্যাদি।

প্রতিরোধ 

হার্ট অ্যাটাক যেমন বিপদজনক তেমনি হার্ট অ্যাটাক থেকে পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকাও অনেক কঠিন। কারণ রোগীকে জীবনের সব রুটিন পরিবর্তন করতে হয়। খাওয়া দাওয়া, চলাফেরা সকল কিছুতেই থাকে ডাক্তারের পরামর্শ। অথচ সাধারণ জীবনে সামান্য কিছু খারাপ অভ্যাস ত্যাগ ও কিছু ভালো অভ্যাস চর্চা করলেই হার্ট অ্যাটাক হওয়া থেকে দূরে থাকা যায়। এসব অভ্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

হার্ট অ্যাটাক এর অন্যতম কারণ এই ধূমপান
হার্ট এর সমস্যার মূল কারণ এই ধূমপান। চিত্রসূত্র: পিক্সাবে
  1. ধূমপান নয়। ধূমপানের ধারে কাছেও যাওয়া যাবে না। কারও এ বদঅভ্যাস থাকলে এখনি তা ত্যাগ করা উচিত।  কারণ শুধু ধূমপান ত্যাগ করতে পারলেই হার্ট অ্যাটাক এর ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নামানো যায়।
  2. স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাওয়া। সবুজ ও সতেজ শাকসবজি খাওয়া অভ্যাস গড়ে তোলা।
সুস্থ থাকতে ব্যায়াম
ভোরবেলা হাঁটুন, সম্ভব হলে দৌড়ান। চিত্রসূত্র: পেক্সেলস
  1. নিয়মিত ব্যায়াম করা। সম্ভব হলে সকালের সতেজ বাতাসে হাঁটা বা দৌড়ানো। তবে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এমন কাউকে বাইরে একা না যেতে দেয়াই উচিত।
  2. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  3. রক্তে কোলেস্টেরল এর মাত্রা ঠিক রাখা।
  4. মেদ বাড়তে না দেওয়া।  
  5. দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকা।

এসব অভ্যাস চর্চা করলে হার্ট অ্যাটাক এর ঝুঁকি প্রায় সম্পূর্ণই এড়ানো সম্ভব। 

এবার সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে বেশ কিছু বিস্ময়কর তথ্য

১. প্রতি ২০ সেকেন্ডে সারাবিশ্বে কেউ না কেউ হার্ট অ্যাটাক এর শিকার হচ্ছে 

২. হার্ট অ্যাটাক এর লক্ষণ নারী পুরুষের ক্ষেত্রে আলাদা হয়।

৩. অর্ধেকেরও বেশি হার্ট অ্যাটাক এর কারণে মৃত্যু হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ১ ঘন্টার মধ্যে হয়ে থাকে।

৪. যুবকরা যে হার্ট অ্যাটাক এর চিন্তা থেকে মুক্ত তা বলা যায় না৷ বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশ হার্ট অ্যাটাক হয় যুবকদের মধ্যেই।

৫. প্রতি মিনিটে একজন শুধু হার্ট অ্যাটাক এর কারণেই মারা যায়।

৬. বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে ভোর বেলা এবং সোমবার। 

প্রচ্ছদসূত্র: পিক্সাবে

তথ্যসূত্র: 

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on হৃৎপিণ্ড: বিস্ময় ও সমস্যা, পর্ব ২ – হার্ট অ্যাটাক

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!