- বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়: ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় - October 21, 2020
- খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য, শেষ পর্ব - October 1, 2020
- খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য (পর্ব-২) - September 27, 2020
আটলান্টিস! জগদ্বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর লেখা দুটি বই টাইমাউস ও ক্রিটিয়াসে বর্ণনা করেন এই শহরের কথা। তাঁর বর্ণনামতে, পানির নিচে তলিয়ে যায় সমৃদ্ধ এই শহরটি।
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী !
প্লেটো আটলান্টিস শহরটিকে একটি উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেটি ৯৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে একদিন ও একরাতের মধ্যে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
অনেকের মতে এই শহরটি শুধুই পৌরাণিক কল্পকথা! আবার অন্যদিকে প্লেটোর এই বর্ণনা অনেককেই ভাবাচ্ছে, সত্যিই কি এই শহরটির অস্তিত্ব ছিল, যেটা আমাদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে? আটলান্টিস রহস্যটা ২,৩০০ বছরের বেশি আগে লেখা সত্ত্বেও আজও বেশ লোকপ্রিয় এক রহস্য।
আটলান্টিসের উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিণতি


প্লেটোর লেখা গ্রন্থদ্বয় অনুসারে সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন আটলান্টিস শহরটি তৈরি করেন। তিনি ভয়ংকর নৌশক্তিসম্পন্ন একটি ইউটোপিয়ান সভ্যতার উত্থান করেন।
এই শহরটির নামকরণ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে করা হয়নি বরং পোসাইডনের বড় সন্তান অ্যাটলাসের নামানুসারে শহরটির নামকরণ করা হয়েছে; যদিও অনেকেই মনে করে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আটলান্টিস নামটি এসেছে।
শহরটি পোসাইডন দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র অ্যাটলাস এই অঞ্চলটি শাসন করেন। প্লেটোর বর্ণনা মতে, হারকিউলিস স্তম্ভের ঠিক বাইরে জিব্রাল্টার প্রণালি এলাকায় অবস্থিত দ্বীপে ছিল এই শহরের অস্তিত্ব। লিবিয়া ও এশিয়া মাইনরের মিলিত আয়তনের চেয়েও বড় ছিল আটলান্টিস!
আটলান্টিস শহরে ছিল উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, যা তৎকালীন সময়ে অন্যান্য অঞ্চলগুলোর চাইতে অনেক গুণ বেশি উন্নত ছিল। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে যে কাউকে মুগ্ধ করার মতো, সম্পদের দিক দিয়ে বেশ ধনী ছিল, প্রাকৃতিক সম্পদে ছিল ভরপুর।
আটলান্টিস শহরটি যে দ্বীপগুলোতে অবস্থিত সেই দ্বীপগুলো সোনা, রূপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু এবং বিরল ও বহিরাগত বন্যপ্রাণীতে ভরপুর ছিল। মূল শহরের কেন্দ্র একটি খাল দ্বারা সংযুক্ত এবং দ্বীপটি বেশ কিছু খাল দ্বারা বেষ্টিত যাতে অবাধে জাহাজ চলাচল করতো।
শহরটিতে একটি পোসাইডন মন্দির ছিল। সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও বেশ এগিয়ে ছিল আটলান্টিস। আর সামরিকভাবে শক্তিমত্তা ছিল অনেকটা অতুলনীয়। নৌবিদ্যা, জাহাজ চালনায় ছিল সুদক্ষ।


আটলান্টিস এর বাসিন্দারা সমাজ, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে উন্নত হওয়ার কারণে তাদের নৈতিকতা হ্রাস পায়। তারা স্রষ্টার আনুগত্য থেকে সরে আসে। শহরটি হয়ে উঠে তৎকালীন সময়ের বিশ্বের প্রমোদ নগরী হিসেবে। আর তারা আগ্রাসী হয়ে ওঠে সাম্রাজ্য দখলের।
বলা হয়ে থাকে বর্তমানে ইউরোপের টাস্কানি শহর থেকে আফ্রিকার মিশর পর্যন্ত তাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এই অমিতাচারের প্রতিফল হিসেবে দেবতারা তাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে, এবং শাস্তি হিসেবে একরাত ও একদিনের মধ্যে এই সমৃদ্ধ দ্বীপ শহরটি সমুদ্রগর্ভে বিলীন করে দেয়।
প্লেটোর আটলান্টিস


প্লেটো তাঁর গ্রন্থে অবশ্য স্বীকার করেন, আটলান্টিস গল্পটি তিনি বিখ্যাত গ্রিক কূটনীতিক ও কবি সোলনের কাছ থেকে পেয়েছেন। প্লেটোর জন্মের প্রায় ১৫০ বছর আগে সোলন মিশর ভ্রমণে যান। সেখানে এক পুরোহিত তাঁকে এই শহরের গল্পটি শোনায় এবং মিশরের প্রাচীন এক মন্দিরে সোলনকে নিয়ে গিয়ে আটলান্টিস সম্পর্কে লিখিত বিবরণ দেখিয়েছিলেন।
সোলন এই বিষয়ে তার আত্মীয় ড্রপাইডসকে বলেছিল, ড্রপাইডস তার পুত্র ক্রিটিয়াসকে বলেছিল; এভাবে সর্বশেষ প্লেটো আটলান্টিস সম্পর্কে জানতে পারেন তাঁর পিতামহ থেকে। প্লেটো তাঁর বইতে উল্লেখ করেন, আটলান্টিসের গল্পটা কোনো ইতিহাস থেকে সংগ্রহ না করা হলেও এই ঘটনাটি সত্য।
এখানে উল্লেখ্য, আটলান্টিস সম্পর্কে প্লেটোর লেখা টাইমাউস ও ক্রিটিয়াস ছাড়া প্রাচীন আর কোনো গ্রন্থে কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি।
পৌরাণিক নাকি বাস্তব
আটলান্টিস কি আদৌ কোনো বাস্তব শহর যেটা আমাদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে নাকি এটা পৌরাণিক উপাখ্যান, নাকি প্লেটো নিজেই গল্পটি সৃষ্টি করেছেন তৎকালীন বিপথগামী এথেন্সবাসীকে অপকর্মের পরিণতির বার্তা দেয়ার জন্য! যদি প্লেটো গল্পটি নিজে সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে তাঁর উদ্দেশ্য কী হতে পারে?
আদর্শ সমাজ সম্পর্কে তাঁর ধ্যানধারণাগুলো ছড়িয়ে দেয়া? এথেন্সবাসীকে বোঝানো, লোভ ধ্বংস ডেকে আনে? নিজেদের অর্জনে আত্ম-অহংকারী হয়ে আগ্রাসী মনোভাবের ফলাফল ধ্বংস? সবকিছু নিয়মের বেড়াজালে চললে প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, নিয়মবহির্ভূত কোনো কিছুই প্রকৃত সফলতা পায়না? এথেন্সের জন্য একটা নৈতিক উদাহরণের জন্য গল্পটি সৃষ্টি করেছেন প্লেটো? তাছাড়া আর কী হতে পারে একজন দার্শনিকের বার্তা থেকে, নিশ্চয় কেবল বিনোদন দেয়া নয়!
লোকমুখে যখন কিছু একটা প্রচারিত হয়, তখন তার মূল প্লটটা অপরিবর্তিত থাকলেও বর্ণনা কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এভাবেই তো জন্ম নেয় কিসসার।
এখনো পর্যন্ত আটলান্টিস শহরের অস্তিত্বের সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অনেকের মতে, প্লেটো আটলান্টিস বলতে গ্রিসের নিকটবর্তী দ্বীপ সান্তোরিনিকে (প্রাচীন থেরা) বুঝিয়েছেন। যেই দ্বীপটির একটা অংশ ১৫০০ বি.সি. এর কাছাকাছি সময়ে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়। এই মিনোয়ান সভ্যতাটিতেও উচ্চ মানের, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল, কৃষিকাজ ও নৌবিদ্যায় ছিল সুদক্ষ। সান্তোরিনি দ্বীপটির অবস্থান এজিয়ান সাগরে। তবে, এটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না, যে সান্তোরিনিই হচ্ছে আটলান্টিস দ্বীপ। যদিও সান্তোরিনি প্লেটোর বর্ণনার আটলান্টিসের মতোই ধ্বংস হয়ে গেছে।
প্লেটো এই একটি গল্প তাঁর দু দুটো বইতে লিখেছেন। টাইমিয়াসের চরিত্র ও সংলাপ অনুযায়ী ক্রিটিয়াসেও আটলান্টিস এর বিষয়ে বর্ণনা করলেও ক্রিটিয়াসে সংলাপ অসম্পূর্ণ রেখে দেন তিনি। যেটা আটলান্টিস এর গল্পটিকে আরো বিতর্কিত ও রহস্যময় করে তুলেছে।
অনেকের মতে প্লেটো তাঁর নিজের সৃষ্ট গল্পটিকে সম্পূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি, তাই সংলাপ সম্পূর্ণ করেননি। প্লেটো কি সত্যিই আটলান্টিস এর গল্পটি বিশ্বাস করতেন, এ নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে! এ বিষয়ে আটলান্টিসে বিশ্বাসীদের মতে, প্লেটো আটলান্টিসের গল্পটি বিশ্বাস না করলে, এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিতেন না। যদিও অনেকের ধারণা, প্লেটো আটলান্টিসের ঘটনাটি প্রাচীন যুদ্ধ বিগ্রহের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছেন।
১৬৭৯ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী ওলাউস রুডবেক “আটল্যান্ড” নামে একটি চার খণ্ডের গবেষণাকর্ম প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে সুইডেনই আটলান্টিসের মূল স্থান এবং সমস্ত মানব ভাষা সুইডিশ থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। স্বভাবতই এটা স্বদেশী সাফাই হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল; সুইডেনের বাইরে খুব কম লোকই এটি বিশ্বাস করেছিল।


১৮৮২ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য ইগন্যাটিয়াস এল ডোনেলি একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। “আটলান্টিস : দ্য অ্যান্টিল্ডুভিয়ান ওয়ার্ল্ড”, যা একটি ঐতিহাসিক আটলান্টিসের সন্ধান নিয়ে। ডোনেলি এমন একটি উন্নত সভ্যতার অনুমানের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যার অভিবাসীরা প্রাচীন ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ জনবসতি গড়ে তুলেছিল এবং যেখান থেকে গ্রিক, সনাতন এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান পুরাণ অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
আটলান্টিস শহরটি নিয়ে মানুষের আগ্রহের যেমন কমতি নেই, ঠিক তেমনি আটলান্টিস নিয়ে গবেষণা ও এটি খুঁজে পাওয়ার দাবিরও অন্ত নেই। প্লেটোর বর্ণনার পর থেকেই হাজার হাজার গবেষণাপত্র বের হচ্ছে আটলান্টিস এর খুঁজে পাওয়ার দাবি নিয়ে কিংবা ঘটনাটি ভিত্তিহীন দাবি নিয়ে। বাহামাসে একটি সন্দেহজনক আন্ডারসির শিলাগঠনকে অনেকেই মনে করছে এটি আটলান্টিসের গল্পের উৎস হতে পারে।
প্রাচীন আটলান্টিসের বিষয়ে লিখেছেন রাশিয়ান মাদাম বাভাৎস্কি তাঁর বই “দ্য সিক্রেট ডকট্রিন”-এ। দুই খণ্ডের বইটিতে লেখিকা প্রাচীন আটলান্টিসকে উল্লেখ করেন হারিয়ে যাওয়া লেমুরীয় সভ্যতার উত্তরসূরি হিসেবে।
আটলান্টিসকে যেভাবে সহজে একটি পৌরাণিক কাহিনি হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় না, ঠিক সেভাবে প্লেটোর বর্ণনা করা এই গল্পটিকে সত্যও বলা যায় না, যতদিন পর্যন্ত না আটলান্টিসের সুনির্দিষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়।
মানুষের এই আগ্রহের খোরাক জোগাতে গবেষকরা চষে বেড়াচ্ছেন সম্ভাব্য জায়গাগুলো যেখানে মিলতে পারে আটলান্টিসের খোঁজ, আবার এই গল্পটি কোনো তৈরি করা বা পৌরাণিক উপকথা কী না তার সন্ধানেরও ঘাটতি নেই।
আটলান্টিস কোনো হারিয়ে যাওয়া শহর নয়, এই শহরটি বাস্তবে প্লেটোর বইয়ের পাতায় চিরকাল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। হয়তো আবারো দেখা হবে নতুন কোনো তথ্য নিয়ে যখন আটলান্টিস রহস্য পুরোদমে উন্মোচন হবে!
ফিচার ছবিসূত্র: Flickr
তথ্যসূত্র :
১। History
২। National Geographic
৩। Live Science
৪। Ancient
৫। History
সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ: