সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (শেষ পর্ব)

5
(1)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম, তাঁর পরিবার এবং কৈশোর জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। কৈশোর বয়স থেকেই তিনি নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর পরিচয় হয় শিশির ভাদুড়ি এবং অহীন্দ্র চৌধুরীর সাথে। এই দুইজনের সংস্পর্শে তাঁর নাট্য প্রতিভার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। ২০ বছর বয়সেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের চোখে ধরা পড়েন। তাঁর পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সৌমিত্রের অভিষেক ঘটে। এসমস্তই প্রথম পর্বের উপজীব্য। দ্বিতীয় পর্বে ‘৬০ এবং ‘৭০ দশকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত চলচ্চিত্র, যেগুলোর দ্বারা মোটামুটিভাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়া শুরু হয়েছিল, সেসকল চলচ্চিত্রের বর্ণনা এসেছে। বিশেষ করে ‘দেবদাস’ এবং ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয় বিশেষভাবে বিধৃত হয়েছে। প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ভারত সরকার প্রদত্ত’পদ্মশ্রী’ প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। তৃতীয় পর্বে ‘৮০ এর দশকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর কথা উঠে এসেছে, বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের সাথে করা তাঁর কিংবদন্তিতুল্য চলচ্চিত্রগুলো। চলমান পর্বে তাঁর শেষ জীবনের দিকগুলো ফুটে উঠেছে। 

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সাথে সাথেই সমাপ্তি ঘটে বাংলা সাহিত্যের একটি যুগের।

চিত্র: সত্যজিৎ রায় ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি; চিত্রসূত্র – Dailyo.in

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় ‘উত্তরণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্র তাঁর ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। 

সৌমিত্র অভিনীত 'উত্তরণ' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: ‘উত্তরণ’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – আইএমডিবি

গোটা ‘৯০ এর দশক জুড়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে বেশ পরিপক্বতা লক্ষ্য করা গেছে। বয়স এবং অভিজ্ঞতার মিশেল তাঁর মাঝে যেন এক আলোকছটার জন্ম দিয়েছিল। এরই প্রতিফলন ঘটেছে পুরো দশক জুড়ে সৌমিত্রের অভিনয়ের মধ্যে। ১৯৯৫ সালে পিনাকী চৌধুরির পরিচালনায় ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন?’, ১৯৯৬ সালে প্রভাত রায়ের পরিচালনায় ‘লাথি’ বা ১৯৯৯ সালে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য’ চলচ্চিত্রে তাঁর পরিপক্বতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। 

১৯৯৯ সাল ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের একটি বিশেষ বছর। সেই বছরে ফ্রান্স সরকার এই মহান প্রতিভাকে সম্মান জানানোর জন্য সেদেশের সাহিত্যকলার সর্বোচ্চ পুরস্কার Commandeur de l’ Ordre des Arts et des Lettres দ্বারা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মানিত করে। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্স সরকার প্রবর্তিত এই পুরস্কার সারা বিশ্বের শিল্প সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পুরস্কার। 

Commandeur de l' Ordre des Arts et des Lettres পদক
চিত্র: Commandeur de l’ Ordre des Arts et des Lettres পদক; চিত্রসূত্র – france-phaleristique

ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বরাবরই বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কের শীর্ষে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, সিলেকশন বোর্ডের স্বজনপ্রীতি এবং হিন্দিভাষী চলচ্চিত্রকে তুলনামূলক অধিকতর সুবিধা প্রদান করা। সময়ে সময়ে অনেকে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। তবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বোধহয় এক্ষেত্রে সবার থেকে ব্যতিক্রমি ছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর অভিনীত ‘দেখা’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আয়োজনের স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েও পুরো ব্যবস্থার প্রতি প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। 

 ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার;
চিত্র: ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার; চিত্রসূত্র – ইউটিউব

২০০৪ সালে ভারত সরকার ভারতের এই গুণী সন্তানকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ দ্বারা সম্মানিত করে।

 ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা
চিত্র: ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা; চিত্রসূত্র – Blogpost

এর কিছুদিন পরে, ২০০৬ সালে তাঁর ‘পদক্ষেপ’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে তিনি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

সৌমিত্র অভিনীত 'পদক্ষেপ' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: সৌমিত্র অভিনীত ‘পদক্ষেপ’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

২০০৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে নিজের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। 

যথাযথ বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবে বিভিন্ন পুরস্কার এবং অ্যাওয়ার্ডগুলো আমার কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে এই অ্যাওয়ার্ডগুলো দিয়ে আসলে তেমন কিছু যায় আসে না। … প্রকৃতপক্ষে এটি এক ধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার। যদি দুই বা তিন বছর আগে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হতাম, তবে আমি হয়তো তা প্রত্যাখ্যান করতাম। আমি এখন বৃদ্ধ এবং সকল বিষয়কে তাই এখন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করি।….. যদিও এটি আমার বেশ ভালো কাজ করা একটি ছবি, কিন্তু সবচেয়ে ভালো না।…… আমি সত্যজিৎ রায়ের সাথে মোট ১৪টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। এদের মধ্যে বেশ কিছু, যেমন দেবী এবং চারুলতা ছিল চিরায়ত কালোত্তীর্ণ।…… যদিও চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পুরস্কারগুলোর প্রতি আমি আমার আস্থা নেই।  

২০১০ এর পরে এসে তিনি চলচ্চিত্রের থেকে একটু দূরে আসেন। এর পিছনে বার্ধক্যই মূল কারণ ছিল। যদিও ২০১৫ সালে ‘বেলাশেষে’, ২০১৬ সালে ‘প্রাক্তন’ বা ২০১৭ সালে ‘পোস্ত’ এর মত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে প্রাসঙ্গিক ছিলেন। 

 সৌমিত্র অভিনীত 'বেলাশেষে' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: সৌমিত্র অভিনীত ‘বেলাশেষে’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – ইউটিউব

Legion d’Honneur হলো ফ্রান্স সরকারের সামরিক এবং বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মাননা।

Legion d'Honneur পদক
চিত্র: Legion d’Honneur পদক; চিত্রসূত্র – Napoleon.org

১৯৮৭ সালে সত্যজিৎ রায়কে এই সম্মাননা প্রদান করে ফ্রান্সের সরকার। এর ঠিক ৩০ বছর পরে, ২০১৭ সালে, সত্যজিৎ রায়ের সাথী এবং সুযোগ্য শিষ্য সৌমিত্র এই সম্মাননা লাভ করেন।

ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রদূত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মাননা প্রদান করছেন।
চিত্র: ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রদূত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মাননা প্রদান করছেন; চিত্রসূত্র – The Hindu

ভারতে নিযুক্ত ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসেডর অ্যালেক্সান্ডার জিগলার ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে এই সম্মানন তুলে দেওয়ার সময় উল্লেখ করেন,

১৯৮৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি এমনই এক সন্ধ্যায়, ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকোয়া মিটারেন্ডের কলকাতা সফরের সময় তিনি কিংবদন্তিতুল্য বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের হাতে এই পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন। একজন গুরু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি নিজেকে একজন কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, তাঁর হাতে একই পুরস্কার আমি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তুলে দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবো। ,

সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়ও উপস্থিত ছিলেন। 

সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়;
চিত্র: সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়; চিত্রসূত্র – টাইমস অফ ইন্ডিয়া

আমি আজ ঠিক ১৯৮৯ এর ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যার মতই আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পুরস্কার নিতে দেখা সত্যিই একটি আনন্দের অনুভূতি। মনে হচ্ছে যেন, ৩০ বছর পরে কোনো একটি চক্র পূর্ণ হতে যাচ্ছে। 

২০২০ সালের কোভিড ১৯ এর প্রাদুর্ভাবের মাঝে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত হন। ৫ অক্টোবর এই টেস্টের ফলাফল আসে। পরবর্তী দিন, অর্থাৎ ৬ অক্টোবর তাঁকে কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ২৫ অক্টোবর তিনি করোনা নেগেটিভ হিসেবে চিহ্নিত হলেও পরবর্তীতে নানা রকম জটিলতার কারণে আবারও তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। 

মাত্র ২৪ বছর বয়সে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় শুরু। দিন গড়িয়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে; সময়ের সাথে সাথে তিনি পরিণত হয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে। তাঁর প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে আমরা কেবলই বলতে পারি, 

বেলাশেষে’ যাচ্ছ ফিরে জানি

দেখা হবে ‘শেষ প্রহরের’ পরে

‘পুনশ্চ’ বলবো তোমায় ফের 

আবার কোনো ‘অপুর সংসারে‘!!

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তথ্যসূত্র

প্রথম পর্ব পড়ুন: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (প্রথম পর্ব)

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (দ্বিতীয় পর্ব)

তৃতীয় পর্ব পড়ুন: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (তৃতীয় পর্ব)

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (শেষ পর্ব)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!