সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (দ্বিতীয় পর্ব)

মো. রেদোয়ান হোসেন
2.3
(3)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম, তাঁর পরিবার এবং কৈশোর জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। কৈশোর বয়স থেকেই তিনি নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর পরিচয় হয় শিশির ভাদুড়ি এবং অহীন্দ্র চৌধুরীর সাথে। এই দুইজনের সংস্পর্শে তাঁর নাট্য প্রতিভার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। ২০ বছর বয়সেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের চোখে ধরা পড়েন। তাঁর পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সৌমিত্রের অভিষেক ঘটে। এসমস্তই প্রথম পর্বের উপজীব্য। চলমান পর্বে ‘৬০ এবং ‘৭০ দশকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত বিভিন্ন চলচ্চিত্রের বর্ণনা এসেছে। তাছাড়া, তাঁর ‘পদ্মশ্রী’ প্রত্যাখ্যান করার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে।

অসামান্যতে লিখুন

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অপু’ চরিত্রে অভিনয় সকলের মন জিতে নিয়েছিল। এক শান্ত, সৌম্য যুবক, যে কিনা জীবনের মানে খোঁজায় ব্যস্ত; তার চারপাশের জীবন, তারুণ্য, তার সন্তানকে নিয়ে তার স্বপ্ন সবকিছুকেই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর স্বভাবজাত অভিনয় এক্ষেত্রে যেমন অবদান রেখেছিল, তেমনি বিভূতিভূষণের লেখা ‘অপু’ চরিত্রের প্রাঞ্জলতারও ভূমিকা ছিল। তাই, চলচ্চিত্র সমালোচকদের একাংশ বেশ জোরেসোরেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, অভিনয়ের এরূপ প্রাঞ্জলতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীতে বজায় রাখতে পারবেন কী না। ভবিষ্যতের গর্ভে সৌমিত্রের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা জানার জন্য সবাই উৎসুক হয়ে ছিল। 

‘অপুর সংসার’ এর সাফল্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রের জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নির্বাচন করলেন। সাথে সেই শর্মিলা ঠাকুর, অপুর সংসারে যার স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অনবদ্য অভিনয়ে সবাই বিমোহিত ছিল।

শর্মিলা ঠাকুর ছিলেন 'দেবী' চলচ্চিত্রের মূল আলোকপাতকৃত চরিত্র।
চিত্র: শর্মিলা ঠাকুর; চিত্রসূত্র – Film Corporation

‘দেবী’ চলচ্চিত্রটি তখনকার সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চলচ্চিত্রে যদিও সম্পূর্ণরুপে দেবী কালীর রুপে দয়াময়ী চরিত্রে অভিনয় করা শর্মিলা ঠাকুরের উপরে আলোকপাত করা হয়েছিল; তবুও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বেশ প্রকৃতিজাত অভিনয় করেছিলেন। সমালোচকেরা তাঁর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

সৌমিত্র 'দেবী' চলচ্চিত্রে মুখ্য পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
চিত্র: ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

টানা দুইটি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনা করা চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করলেন। ততদিনে তিনি মোটামুটি আকারে পরিচিত। এবার তাঁর প্রতিভা ধরা পড়লো তপন সিনহার চোখে।

তপন সিনহা সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ভারত তখন কেবল নিজেকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে কোনো এক পরিচালকের কেবলমাত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ শেখার জন্য যুক্তরাজ্য গমন নিতান্তই অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু তপন সিনহা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র এক ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন। 

তপন সিনহার হাত ধরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এক নতুন যাত্রা শুরু হয়।
চিত্র: তপন সিনহা; চিত্রসূত্র – Learning & Creativity

ব্যক্তিগতভাবে তপন সিনহা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় একজন ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে, রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী উপন্যাসগুলো ছিল তাঁর আগ্রহের মূল লক্ষ্যবস্ত। 

১৯৬০ সালের দিকে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ নিয়ে কাজ শুরু করার মনস্থির করেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে তপন সিংহের মনে ধরে। এতদিন পর্যন্ত তিনি যেসকল চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তারা ছিল কিছুটা আত্মমগ্ন এবং সামাজিক প্রথার সাথে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ চলচ্চিত্র ছিল কিছুটা নিরীক্ষাধর্মী। তাই তাঁর উপস্থিতিও ছিল কিছুটা ভিন্ন ধরনের। কিন্তু ‘অমূল্য’ চরিত্রে এই পরীক্ষাও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সফলতার সাথে উতরে যান। 

সত্যজিৎ রায় এরপরে আসেন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘তিন কন্যা’ নিয়ে। তিনটি সমান্তরাল ঘটনাবলি নিয়ে সাজানো এই চলচ্চিত্রে সৌমিত্র নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। তাঁর সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন অপর্ণা সেন। তাঁদের অভিনয় দর্শক এবং সমালোচক, উভয় পক্ষেরই প্রশংসা পায়। 

চিত্র: ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

আবার সৌমিত্র দল বাঁধেন তপন সিনহার সাথে। তপন সিনহা তখন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝিন্দের বন্দী’কে পর্দায় আনতে চাচ্ছিলেন। মূল চরিত্রে উত্তম কুমার অভিনয় করলেও খলনায়কের চরিত্রে সৌমিত্রের অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়। 

পরবর্তীতে বহু পরিচালকের অধীনে তিনি বহু চরিত্রে অভিনয় করেন। পুরো ৬০ এবং ৭০ এর দশক জুড়ে তিনি পূর্ণোদ্যমে চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। 

তবে ১৯৭০ সালে তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সাথে সৌমিত্রের এক তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। সরকার সৌমিত্রকে ভারতের অন্যতম বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বভাবতই, যেকোনো অভিনেতার জীবনে এটি গুরুত্বপূর্ণ এক অর্জন। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। তৎকালীন সরকার নীতিগতভাবে শিল্প-সংস্কৃতি বান্ধব ছিলনা। চলচ্চিত্র শিল্প নানাবিধ বিরূপতার সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতিতে সরকারের দেওয়া এই পুরস্কারকে স্বীকার করার অর্থ হলো, সরকারের এরূপ কার্যক্রমকে সমর্থন করা।

যদিও এসকল কথা তখন জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে এক পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের পদক স্বীকার না করার কারণ ব্যাখ্যা করেন। 

সৌমিত্রের জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৭৪ সালে। বলুন তো, কার হাত ধরে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে।

চিত্র: সত্যজিৎ রায় ;চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

সত্যজিৎ রায় তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র প্রদোষ চন্দ্র মিত্রকে (ওরফে ফেলুদা) কেবল কাগজ কলমে বন্দী না রেখে, চলচ্চিত্রের রঙিন পর্দায় সকলের সামনে উপস্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। 

ফেলুদা বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র।
চিত্র: সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ফেলুদা এবং তোপসে; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তীক্ষ্ণ ও ধারালো দৃষ্টি, সবসময় মাথা ঠাণ্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া, লম্বা চওড়া, পঁচিশোর্ধ্ব এক যুবক ফেলুদা। যার মূল শক্তি হচ্ছে তার শাণিত বুদ্ধি। হঠাৎ করে তাকালে ঠিক বোঝা না গেলেও, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখে বিদ্যমান বুদ্ধির ঝলক কারো দৃষ্টি এড়াবে না। হঠাৎ করে কাউকে দেখে অনেক কিছু বলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে যা আসলে মনোযোগী চোখের পর্যবেক্ষণের ফল। এমন চরিত্রে চল্লিশে পা দিবে এমন কাউকে মানাবে কী না, তা নিয়ে সবাই কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিল। তাছাড়া, কেবল ফেলুদা চরিত্রের একার উপরেই তো সব কিছু নির্ভর করছে না। সাথে আছে ফেলুদার সার্বক্ষণিক দুই সঙ্গী, তার খুড়তুতো ভাই তপেশ রঞ্জন মিত্র (ওরফে তোপসে) আর লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি (ওরফে জটায়ু)। এই সম্মিলনের কোনো একজনের ব্যর্থতাও চলচ্চিত্রকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কেননা সোনার কেল্লা উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে বাকি দুই চরিত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই কেবল সৌমিত্রকে ফেলুদা হিসেবে মানাবে কী না সেই চিন্তাই নয়, বরং অন্য চরিত্রগুলো নিয়েও সত্যজিৎ রায় বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। 

শুরু হলো অভিযান। সময় নিয়ে এবং যত্ন করে তোপসে এবং জটায়ুকে খোঁজা শুরু হলো। শেষে তোপসে চরিত্রে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্তকে বাছাই করা হলো।

জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্ত অভিনয় করেন।
চিত্র: জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্ত; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

বাকিটুকু ইতিহাস। সাধারণ দর্শক স্বতঃস্ফূর্তভাবে ‘সোনার কেল্লা’কে গ্রহণ করলো। আর ৪০ বছর বয়সী সৌমিত্রের অভিনয় দেখে কেউই বলবে না যে, তাঁর বয়স ২৫ বছরের থেকে একদিনও বেশি। চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যেন ঠিক অবিকল বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে ফেলুদা উঠে এসেছেন পর্দায়। বাকি দুই চরিত্রও তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন। 

সৌমিত্র অভিনীত 'সোনার কেল্লা' চলচ্চিত্রের পোস্টার।
চিত্র: ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

ফেলুদা চরিত্রে সেই যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন, বাঙালির মনে তিনি নিজের জায়গা স্থায়ী করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে সব্যসাচী চক্রবর্তী, আবির চট্টোপাধ্যায় সহ আরো অনেকেই চলচ্চিত্রের পর্দা বা টেলিভিশনে ফেলুদা চরিত্রে সামনে এসেছেন। কিন্তু তারা কেউই সৌমিত্রকে প্রতিস্থাপন করতে পারেননি। ১৯৭৪ এবং ১৯৭৫ সাল জুড়ে সোনার কেল্লা রাজ্য এবং জাতীয় পর্যায়ে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়। 

১৯৭৯ এবং ১৯৮০; এই দুই বছর ছিল সৌমিত্রের জন্য অনেকটা স্বপ্নের মতন। নিজের জীবনের সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র এই সময়েই করা। 

প্রথমে আসবে ১৯৭৯ সালে দিলীপ দাসের পরিচালনায় ‘দেবদাস’। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের দর্শকপ্রিয় কিন্তু বিয়োগাত্মক রচনা ‘দেবদাস’ বাংলা ভাষার চিরায়ত একটি রচনা। তাই চলচ্চিত্রের পর্দায়ও একে নিয়ে আসার সময় অধিকতর যত্নবান হতে হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতদিনের অভিনীত সমস্ত চরিত্রের বিপরীত ছিল দেবদাস চরিত্রটি। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজের অভিনয় প্রতিভা দিয়ে এই পরীক্ষায়ও সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।

চলবে … … …

প্রথম পর্ব পড়ুন: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (প্রথম পর্ব)

তথ্যসূত্র:

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (দ্বিতীয় পর্ব)

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!