সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (তৃতীয় পর্ব)

4
(4)
Bookmark

No account yet? Register

আলোচ্য ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম, তাঁর পরিবার এবং কৈশোর জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। কৈশোর বয়স থেকেই তিনি নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর পরিচয় হয় শিশির ভাদুড়ি এবং অহীন্দ্র চৌধুরীর সাথে। এই দুইজনের সংস্পর্শে তাঁর নাট্য প্রতিভার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। ২০ বছর বয়সেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের চোখে ধরা পড়েন। তাঁর পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সৌমিত্রের অভিষেক ঘটে। এসমস্তই প্রথম পর্বের উপজীব্য। দ্বিতীয় পর্বে ‘৬০ এবং ‘৭০ দশকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত চলচ্চিত্র, যেগুলোর দ্বারা মোটামুটিভাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়া শুরু হয়েছিল, সেসকল চলচ্চিত্রের বর্ণনা এসেছে। বিশেষ করে ‘দেবদাস’ এবং ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয় বিশেষভাবে বিধৃত হয়েছে। প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ভারত সরকার প্রদত্ত’পদ্মশ্রী’ প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। চলমান পর্বে ‘৮০ এর দশকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর কথা উঠে এসেছে।  

১৯৭৯ সালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পুনরায় আবার জোড় বাঁধলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ যেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল, আর তা হলো চলচ্চিত্রের খলনায়ক এবং ফেলুদার প্রতিদ্বন্দ্বী ‘মগনলাল মেঘরাজ’, মূল উপন্যাসে যে কখনো কখনো ফেলুদাকে পর্যন্ত টক্কর দিয়েছে। এরূপ চরিত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে তিনি অভিনয় করেছিলেন।

ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কোনো বিকল্প ছিল না।
চিত্র: ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

অরাজকতায় ভরা সমাজে কেউ না কেউ থাকেন, যারা স্রোতের বিপরীতে চলেন। সমাজের অধোগতি দেখে তারা ব্যথায় কুঁকড়ে যান। কিন্তু সাধারণ মানুষের মত উটপাখির ন্যায় বালিতে মুখ লুকিয়ে ফেলেন না, বরং দৃঢ়চিত্তে চলমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়ে যান। যুগে যুগে এমন মানুষদের, এরূপ সমাজ সংস্কারকদের মানবজাতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় হয়তো তাঁদের নাম উঠেনি, কিন্তু মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায় তাঁরা স্থান করে নিয়েছেন। 

উদয়ন পণ্ডিত চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় ছিল নিখুঁত।
চিত্র: ‘উদয়ন পণ্ডিত’ চরিত্রে সৌমিত্র; চিত্রসূত্র – Satyajit Ray organization

এমনই একটি চরিত্র নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছিলেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৮০ সালের দিকে সুযোগ এসে গেলো। ১৯৬৮ সালে তাঁর পরিচালনায় নির্মিত ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ এর সিক্যুয়েল বানানোর পরিকল্পনা করলেন। এই চলচ্চিত্রের ‘উদয়ন পণ্ডিত’ চরিত্রটিই ছিল পূর্বে বর্ণিত সেই সমাজ সংস্কারকের। এই চরিত্রের জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পছন্দ করলেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৮০ সালের ১৯ ডিসেম্বর মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ-সৌমিত্র জুটির এই কাজ সমালোচকদের বাহবা কুড়িয়ে নিলো।  

ততদিনে মোটামুটি বাঙালির জনমানসে তিনি নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। হয়তো ঠিক উত্তম কুমারের মত রোমান্টিক হিরো হিসেবে নয়, কিন্তু নিজের মত করে একটা জায়গা তিনি তৈরি করে ফেলেছিলেন। তাই জননন্দিত সত্যজিৎ রায়, দিলীপ রায় কিংবা তপন সিনহার মত পরিচালকদের থেকে কিছুটা মনোযোগ সরিয়ে সমকালীন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অঞ্জন দাস, অপর্ণা সেন এবং গৌতম ঘোষের মত পরিচালকদের সাথে কাজ করা শুরু করেন। সেই হিসেবে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নির্মাণ না করলেও তাঁদের পরিচালনায় করা চলচ্চিত্রগুলো বরাবরই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। 

ঠিক এমনই একটি চলচ্চিত্র ছিল সরোজ দে’র পরিচালনায় ‘কোনি’।

কোনি' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র” ‘কোনি’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে সৌমিত্রের ভূমিকা ছিল একজন সাঁতার প্রশিক্ষকের। কলকাতার এক অখ্যাত বস্তির বালিকার মাঝে সাঁতারের জন্য তীব্র ইচ্ছা দেখে প্রশিক্ষক তাঁকে তুলে নিয়ে আসেন। জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় তাকে সফল করার জন্য প্রশিক্ষকের চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অদম্য চেষ্টা সকলের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একে নিজের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২০১২ সালের দিকে এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছিলেন, 

নিজের কঠিন সময়ে নিজে নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে আমি ‘ফাইট কোনি ফাইট’ শব্দবন্ধটি বিড়বিড় করতাম। তৎকালীন বাঙালি সমাজে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। 

১৯৮৬ সালে পরিচালক বিজয় চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে বলিউডে অভিষেক হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেনা পাওনা’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে বানানো ‘নিরুপমা’ নামের এই চলচ্চিত্রে সৌমিত্রের সহ অভিনেত্রী হিসেবে ছিলেন রূপা গাঙ্গুলি। যদিও এই চলচ্চিত্রটি তেমন সাফল্যের মুখ দেখেনি। 

কিছুদিনের বিরতি নিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আবার জোট বাঁধেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। তবে এবারের চলচ্চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের। সমাজের এক বিশেষ শ্রেণির মানুষের অপরাধ চক্রকে চিত্রায়িত করাই ছিল এই চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য। 

সমাজের সাধারণ মানুষ অধিকাংশই ধর্মভীরু। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির আড়ালে নিজেদের অবৈধ অর্থনৈতিক এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে ঠিকই নিজেদের আখের গুটিয়ে নেয় তারা। ধর্মীয় কার্যক্রমের ছত্রছায়ায় রাজনীতিবিদ এবং অসৎ সরকারী কর্মকর্তারাও এরূপ প্রভাবশালীদের সহায়তা করে। এরূপ প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রটি যাতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

গণশত্রু' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

সমালোচকেরা সত্যজিতের পরিচালনা এবং সৌমিত্রের অভিনয়, দুইয়েরই ভূয়সী প্রশংসা করে। 

বাঙালির মনে ফেলুদার জায়গা পাকাপোক্তভাবে দখল করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাই, সত্যজিৎ রায়ের জীবদ্দশায় যখন ফেলুদাকে অন্যান্য পরিচালকেরা ছোট পর্দায় আনতে চাচ্ছিলেন, তাদেরও প্রথম পছন্দ ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন সংস্থা দূরদর্শন বাংলাতে ফেলুদার ‘ঘুরঘুঁটিয়ার ঘটনা’ এবং ‘গোলকধাঁম রহস্য’তে অভিনয়ের জন্য সৌমিত্র ছিলেন বিভাস চক্রবর্তীর ভরসা। 

বিভাস চক্রবর্তী
চিত্র: বিভাস চক্রবর্তী; চিত্রসূত্র – Daily Star

১৯৯০ সালে তিনি এবং সত্যজিৎ রায় আবার একত্র হন ‘শাখা প্রশাখা’ চলচ্চিত্রের জন্য। এক উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের গল্প এটি। একই সুতায় টানা চার প্রজন্মের গল্প বলেছেন তিনি। যদিও মূল আলোকপাত ছিল তৃতীয় প্রজন্মের উপরে। তৃতীয় প্রজন্মের প্রশান্ত মজুমদারের চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র।

সৌমিত্র - সত্যজিৎ জুটির সর্বশেষ চলচ্চিত্র
চিত্র: ‘শাখা প্রশাখা’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – আইএমডিবি

দুঃখজনকভাবে এই চলচ্চিত্রই ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রের বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিচালক – অভিনেতা জুটি সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ কাজ। ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর আগে তাঁরা দুইজনে আর কোনো চলচ্চিত্রে একসাথে কাজ করেননি।

… … … (চলবে)

প্রথম পর্ব পড়ুন: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (প্রথম পর্ব)

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (দ্বিতীয় পর্ব)

তথ্যসূত্র –

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স  

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ (তৃতীয় পর্ব)

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!