সোফিয়া কাভালভস্কাইয়া: গণিতের ভুবনে সফল প্রথমা

4.3
(7)
Bookmark

No account yet? Register

গণিতের জয়যাত্রা দীর্ঘকালের। এই সময়কালে পৃথিবীর নানা দেশে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে জন্মেছেন বহু ব্যক্তি, যারা কিনা পরবর্তী জীবনপথে পাথেয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন গণিতকে। কিন্তু যাদের আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বিজ্ঞানের জয়স্তম্ভ, তাঁদের সবাই কি বিশ্ববাসীর কাছে আজও সমভাবে পরিচিত? বিশেষত যদি তিনি হয়ে থাকেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মতো সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্মগ্রহণকারী একজন নারী গণিতজ্ঞ? এমনই একজনের নাম সোফিয়া কাভালভস্কাইয়া।

অসামান্যতে লিখুন

মহতী জীবনের সূচনালগ্ন

রুশ দেশে নামকরণের নিয়মটা বড় অদ্ভুত। প্রতিটি মানুষের নামে থাকে তিনটি অংশ। প্রথম অংশে থাকে ব্যক্তির নিজের নাম যা প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশে থাকে যথাক্রমে পরিবার ও বংশপরিচয়। বংশপরিচয় সবসময় বাবার বংশ অনুসারেই হয়, তবে নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর সেটা হয়ে যায় স্বামীর বংশপরিচয়। সোফিয়া কাভালভস্কাইয়ার কথাই ধরা যাক। তাঁর পুরো নাম ছিল সোফিয়া ভাসিলিয়েভনা কাভালভস্কাইয়া। তাঁর বাবার প্রথম নাম ভাসিলি, যেটা তাঁর নামে স্ত্রীলিঙ্গবাচকভাবে হয়েছে ভাসিলিয়েভনা। আবার, স্বামীর বংশ নাম কাভালভস্কি হয়ে গিয়েছে কাভালভস্কাইয়া। পরবর্তী জীবনে তাঁর নামটি আরো নানা রূপে বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখিত হয়েছে।

সোফিয়ার জন্ম ১৮৫০ সালের ১৫ জানুয়ারি। বাবা মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সোফিয়া মধ্যম। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা- দুটোই সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমানে রাশিয়া) মস্কোতে। বাবার নাম ভাসিলি করভিন ক্রকভস্কি, যিনি পেশায় ছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত আর্মির আর্টিলারি জেনারেল। মায়ের নাম ভেলিজাবেতা ফেদরোভনা শুবার্ত

সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় সোফিয়া ও তাঁর অন্য দুই বোন শৈশব থেকেই কড়া শিক্ষয়িত্রীর তত্ত্বাবধানে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নির্বাহ করতেন। কিন্তু এর প্রভাব সোফিয়ার ক্ষেত্রে মোটেও ভালো ছিল না। অত্যধিক কড়া শাসনের ফলে সোফিয়ার মধ্যে সহজে বিচলিত হওয়া এবং সামাজিক কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা তৈরি হয়, যা আমৃত্যু তাঁর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে লক্ষণীয় ছিল।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমগ্র ইউরোপে তখনো আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক, মেয়েদের সব ধরনের শিক্ষাগ্রহণের প্রতিই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিরূপ। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সোফিয়ার পড়াশোনার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল। তাই যখন সোফিয়ার বয়স আট, তখন গৃহশিক্ষকের কাছে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ আরম্ভ হয়। মূলত শৈশবের শুরু থেকেই গণিতের প্রতি সোফিয়ার তীব্র আকর্ষণ গড়ে উঠতে থাকে। এর পেছনে যে মানুষটির ভূমিকা প্রধান, তিনি হলেন সোফিয়ার চাচা পিয়তার ভাসিলিয়েভিচ ক্রকভস্কি

সোফিয়ার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতি তাঁর বাবার খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। কিন্তু গণিতচর্চার জন্য অদম্য আগ্রহের কারণে তিনি ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত গৃহশিক্ষক জোসেফ ইগনাটেভিচ মালেভিচের তত্ত্বাবধানে গণিত শেখার সুযোগ পান।

সোফিয়ার শৈশবে গণিতচর্চা নিয়ে নানা ধরনের কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। তৎকালীন সময়ে ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়িগুলোর বেশিরভাগই হত ইটের তৈরি, ছাদ হত টালিতে ছাওয়া। স্বচ্ছল গৃহকর্তা বাড়ির ভেতরের দেয়াল ও ছাদে চুনকাম করিয়ে নিতেন। সাধারণ মধ্যবিত্তেরা রঙিন কিংবা সাদামাটা কাগজে দেয়াল ঢেকে দিয়ে অন্দরসজ্জার কাজ সারতেন। জানা যায়,সোফিয়া যখন একাদশী কিশোরী, তখন একবার তাঁদের বাড়িতে দেয়াল ঢাকার কাগজের স্বল্পতাজনিত সমস্যা দেখা গিয়েছিল। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করতে সোফিয়ার পড়ার ঘরের দেয়াল ঢেকে দেওয়া হয় রাশিয়ান গণিতজ্ঞ অস্ত্রোগ্রাডস্কির ক্যালকুলাস অ্যানালাইলাইসিসের নোট দিয়ে। সেখান থেকেই গণিতের ‘ক্যালকুলাস’ নামক অন্যতম জটিল শাখার সাথে সোফিয়ার পরিচয় ঘটে এবং সোফিয়ার ক্যালকুলাস চর্চার সূচনা ঘটে। 

কাভালভস্কাইয়ার প্রথম শিক্ষক অস্ত্রোগ্রাডস্কি
চিত্র: অস্ত্রোগ্রাডস্কি; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স 

সোফিয়া: বাধা পেরোনোর কাহিনি

গণিতের প্রতি সোফিয়ার অদম্য আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও সোফিয়ার প্রাচীনপন্থি বাবা একসময় সোফিয়ার পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। কিন্তু সোফিয়া দমবার পাত্রী নন। তিনি বিখ্যাত ‘বর্ডুর অ্যালজেবরা’ বইটির একটি কপি জোগাড় করে নিলেন। গভীর রাতে, যখন সবাই নিশ্ছিদ্র ঘুমে নিমজ্জিত, তখন সোফিয়া আপনমনে গণিতচর্চা করতেন। অবশ্য, এর কয়েক বছর পরে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবার গৃহশিক্ষকের অধীনে তাঁর পাঠগ্রহণ শুরু হয়।

কিশোরী সোফিয়া ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে লাগলেন। পরিণত হলেন তরুণীতে। এরপর তিনি ঠিক করলেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবেন। তার জন্য ভর্তি হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিধি বাম। তৎকালীন ইউরোপে নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য স্বামী কিংবা বাবার লিখিত অনুমতি ছিল প্রয়োজনীয়। সোফিয়ার বাবা তা দিতে নারাজ। কিন্তু সোফিয়া মোটেও দমে যাওয়ার পাত্রী নন।

বাধ্য হয়ে সোফিয়াকে অবলম্বন করতে হলো ভিন্ন উপায়। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি ডারউইন সমর্থক জীবাশ্মবিদ ভ্লাদিমির কাভালভস্কির সাথে এক ধরণের চুক্তিভিত্তিক নামমাত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির একটি লিখিত অনুমোদনের জন্য। বলা বাহুল্য, এই বিয়ে তাঁর জীবনে অসহনীয় যন্ত্রণা আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া বিশেষ কিছুই আনতে পারেনি।

কাভালভস্কাইয়ার স্বামী ভ্লাদিমির কাভালভস্কি
চিত্র: ভ্লাদিমির কাভালভস্কি; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স 

এরপর স্বামীর লিখিত অনুমতি নিয়ে ১৮৬৯ সালে সোফিয়া গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন করার জন্য জার্মানির হাইডেলবার্গে যান। কিন্তু হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তৎকালীন নিয়ম অনুসারে কোনো মহিলাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি দিত না। সোফিয়ার বহু যুক্তিতর্ক, সাধ্যসাধনা এবং অনুনয়-বিনয়ের পর অবশেষে কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোনো ডিগ্রি না দেওয়ার শর্তসাপেক্ষে ক্লাসে উপস্থিত থাকার অনুমোদন দেয়। এখানে সোফিয়া সফলভাবে দুই বছর দীর্ঘ টানা তিন সেমিস্টার ধরে পড়াশোনা করেন। তাঁর গাণিতিক দক্ষতা এবং ক্ষুরধার বুদ্ধি ছাত্র-শিক্ষক দু’পক্ষকেই বিস্মিত করে।

হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে তিনি ১৮৭১ সালে বার্লিনের পথে যাত্রা করেন। উদ্দেশ্য ছিল বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ল ওয়েরস্ট্রেসের কাছে পাঠগ্রহণ। কিন্তু ওয়েরস্ট্রেস এবং তাঁর সহকর্মীদের অশেষ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সোফিয়া বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার অনুমতি পাননি। তাই, ওয়েরস্ট্রেস স্বেচ্ছায় সোফিয়াকে পরবর্তী চার বছর তাঁর ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করার সুযোগ দেন।

সোফিয়া কাভালভস্কাইয়া কার্ল ওয়েরস্ট্রেসের কাছে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন।
চিত্র: কার্ল ওয়েরস্ট্রেস; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

১৮৭৪ সালের বসন্ত নাগাদ সোফিয়া আংশিক অন্তরজ সমীকরণ (পার্শিয়াল ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন), আবেলীয় সমাকলন (আবেলিয়ান ইন্টিগ্রাল) এবং শনির চক্রাকার বলয় বিষয়ে তিনটি আলাদা গবেষণাপত্র তৈরি করেন। ওয়েরস্ট্রেস তিনটি গবেষণাপত্রকেই আলাদাভাবে একেকটি ডক্টরেট লাভের উপযোগী হিসেবে মন্তব্য করেন। এর মধ্যে প্রথমটি তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেটি ১৮৭৫ সালে বিখ্যাত একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়। অবশ্য, তার আগের বছরই কিছু ক্লাস ও পরীক্ষায় সফলভাবে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সোফিয়াকে জার্মানির গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করে। তিনি ছিলেন এই ডিগ্রিপ্রাপ্ত প্রথম ইউরোপীয় নারী। এরপর সোফিয়া মাতৃভূমিতে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে আসার আগে ওয়েরস্ট্রেস তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা উল্লেখ করে লিখিত একটি প্রশংসাপত্র তাঁকে দেন।

আরো পড়ুন: নিকোলা টেসলা: পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিন্তু অবহেলিত এক প্রকৌশলী

সোফিয়া স্ব-ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি ও তাঁর স্বামী অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। সোফিয়া অর্থসংস্থানের জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করতে চাইছিলেন। কিন্তু নারীদের যেকোনো উচ্চ প্রতিষ্ঠানিক পদ প্রদান করার ব্যাপারে তৎকালীন রুশ সরকার অত্যন্ত অনমনীয় ছিল। ফলে, সোফিয়ার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। সবচেয়ে ভালো যে কাজের সুযোগ সোফিয়া পেয়েছিলেন তা ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাটিগণিত শেখানো। সোফিয়া এককথায় এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

এর কিছুদিন পরে সোফিয়া ও তাঁর স্বামী যৌথভাবে বাড়ি নির্মাণ ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তা বেশিদিন টেকেনি। কারণ, ১৮৭৯ সালে বাড়ি বন্ধকের অর্থমূল্য বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা দেউলিয়া হয়ে যান। আবার কিছুদিনের মধ্যেই সোফিয়ার স্বামী চাকরি পেয়ে যান, আর সোফিয়া অর্থের বিনিময়ে সড়কবাতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কাজে প্রতিবেশীদের সহযোগিতা করতে থাকেন। ফলে তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল হতে থাকে।

অজানা কারণে, কিছুদিন পর থেকে সোফিয়া ও তাঁর স্বামী পুরোদস্তুর সংসারী জীবনযাপন করতে থাকেন। ১৮৭৮ সালে সোফিয়া এক কন্যাসন্তানের মা হন। পরবর্তী একবছর মেয়েকে লালনপালন করার পর, সোফিয়া তাঁর নিজের বড়বোনের কাছে মেয়েকে রেখে আসেন এবং সেইসাথে মতবিরোধজনিত কারণে স্বামীর সাথে শেষবারের মতো সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

১৮৮০ সালের শুরু থেকেই সোফিয়া নতুন উদ্যমে গণিতচর্চা শুরু করেন। ১৮৮২ সালের মধ্যে তিনি আলোর প্রতিসরণের ওপর কাজ শুরু করেন এবং এই বিষয়ে তিনটি প্রবন্ধ লেখেন। এরপরই আবার সোফিয়ার জীবনে নেমে আসে দুঃসময়। ১৮৮৩ সালের বসন্তকালে সোফিয়ার স্বামী হতাশাজনিত কারণে আত্মহত্যা করেন। এতে সোফিয়া তীব্র মানসিক আঘাত পান এবং মনে মনে স্বামীর মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে নিজেকেই দায়ী করেন। কিছুদিন মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত থাকার পর সোফিয়া আবার পুনরোদ্দমে গণিতচর্চা শুরু করেন-যা মূলত স্বামী হারানোর শোক, আর সেই সঙ্গে স্বামীর মৃত্যুতে তীব্র আত্মগ্লানি কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা।

প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের সূচনায় সোফিয়া

গণিতচর্চা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই সোফিয়ার জীবনে আবার সুসময় ফিরে আসতে থাকল। অ্যান শার্লট সুইডেনের বিখ্যাত অভিনেত্রী, নাট্যকার এবং ঔপন্যাসিক। তাঁর সাথে সোফিয়ার হঠাৎ পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয়- যা সোফিয়ার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। তাঁর মাধ্যমে সোফিয়া তাঁর ভাই স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মিটাগ লেফলারের সাথে পরিচিত হন। প্রফেসর মিটাগ লেফলার গণিতশাস্ত্রে সোফিয়ার পাণ্ডিত্য দেখে বিস্মিত হন।

১৮৮৩ সালে তিনি সোফিয়াকে সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ পদে (Privat docent) শিক্ষকতা করার সুযোগ করে দেন। 

সোফিয়া কাভালভস্কাইয়া প্রথম স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।
চিত্র: স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়; চিত্রসূত্র – স্টকহোম ইউনিভার্সিটি 

সোফিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি

পরবর্তী বছরই তিনি “অসাধারণ অধ্যাপক” ( Professor extraordinarius) বা প্রশাসনিক মর্যাদাবিহীন অধ্যাপক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।উল্লেখ্য, প্রফেসর মিটাগ লেফলার ছিলেন সোফিয়ার পূর্বতন শিক্ষক ওয়েরস্ট্রেসের সতীর্থ।

সোফিয়ার স্টকহোমে কাটানো সময়কালে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কার্যক্রম চালিয়ে যান। একই সময়ে তিনি গণিতের তুলনামূলক নবীন শাখায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে থাকেন। এছাড়াও তিনি গণিতবিষয়ক নতুন গবেষণামূলক জার্নাল অ্যাক্টা ম্যাথমেটিকার সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। এর সুবাদে তিনি প্যারিস ও বার্লিনের গণিতবিদদের সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করার সুযোগ পান এবং গণিতের আন্তর্জাতিক অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে তৎকালীন সমাজে ধীরে ধীরে সোফিয়ার উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

১৮৮৬ সালে ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সেস প্রি-বর্ডিন পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। পুরস্কার প্রদানের শর্ত ছিল দৃঢ় বস্তুর ওপর গবেষণামূলক কাজ। সোফিয়ার একটি গবেষণা নিবন্ধ এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়। সোফিয়ার এই গবেষণা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যার কারণে পুরস্কার প্রদান কমিটি পুরস্কারের অর্থের পরিমাণ ৩ হাজার ফ্রাঁ থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ফ্রাঁ ঘোষণা করেন। একই কাজের জন্য তাঁকে “সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস” ১৮৮৯ সালে পুরস্কার প্রদান করে। একই বছর,অর্থাৎ ১৮৮৯ সালে তাঁর কর্মজীবনে আরো দুটি উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি ঘটে। 

প্রথমত,গণিতবিদ চেচিকোভের প্রচেষ্টার ফলে “ইম্পেরিয়াল একাডেমি অব সায়েন্সেস” নারীদের সদস্যপদ প্রদানের নতুন নীতি প্রবর্তন করে এবং উক্ত নীতির আওতায় সোফিয়াকে একাডেমির প্রথম নারী সদস্য হিসেবে সম্মানিত করা হয়। 

দ্বিতীয়ত, জুন মাসে তিনি স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অধ্যাপকের মর্যাদা লাভ করেন। নারী পদার্থবিজ্ঞানী লোরাবাছি এবং গণিতজ্ঞ মারিয়া গেটানা আগনেছির পর তিনি তৃতীয় নারী, যিনি কোনো ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের পদ লাভ করেন। যেকোনো বিচারেই এই ঘটনা তদানীন্তন ইউরোপের  নারীসমাজের জন্য এক বিশাল মাইলফলক।

সোফিয়ার বহুমুখী প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ

এই অসাধারণ মেধাবী গণিতবিদ শুধু গণিতচর্চাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। সাহিত্য অঙ্গনেও তাঁর দৃপ্ত পদচারণা ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির শতকে যখন তিনি সংসারধর্মের কারণে গণিতচর্চা থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন, তখন তিনি লেখালেখির প্রতি কিছুটা মনোযোগী হয়ে পড়েন। সেই সময়টায় একটি পত্রিকার জন্য তিনি লিখতেন বলে জানা যায়। আবার স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ অধ্যাপক পদে কর্মরত অবস্থায় বান্ধবী অ্যান শার্লটের সাথে যুগ্মভাবে “দ্যা স্ট্রাগল ফর হ্যাপিনেস” নামের একটি নাটকও রচনা করেন তিনি। তবে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সাহিত্যকর্মটি হলো ফিমেল নিহিলিস্ট, যা মূলত তাঁর শৈশবের অসম্পূর্ণ স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ। মৃত্যুর আগে তিনি এই কাজ সমাপ্ত করে যেতে পারেননি।

কর্মজীবনে তিনি চরম পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কখনোই সুখের ছিল না। শৈশব আর কৈশোরের কড়া শাসন তাঁর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এসেছিল। বিবাহিত জীবনেও তিনি খুব বেশিদিন স্বস্তিতে কাটাতে পারেননি। পরবর্তীতে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ অধ্যাপকের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে বিখ্যাত রুশ সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্সিম কাভালভস্কির

ম্যাক্সিম স্টকহোমে কয়েকটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য এসেছিলেন। কাকতালীয়ভাবেই পরিচয় ঘটে তাঁদের। ধীরে ধীরে তাঁদের পরিচয় পরিণত হয় প্রণয়ে। তারপর তাঁরা দুজনে কিছুদিনের জন্য একসাথে ফ্রান্সে যান। কিন্তু ফেরার সময় বাদ সাধলেন ম্যাক্সিম। ফ্রান্স থেকে সোফিয়ার যাওয়ার কথা সোজা স্টকহোমে। ম্যাক্সিম সোফিয়াকে ফ্রান্সে তাঁর সাথে বাকি জীবন কাটানোর প্রস্তাব দেন। এবং তার জন্য সোফিয়াকে অবশ্যই স্টকহোমে তাঁর কাজ ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু সোফিয়া তাঁর বহুকষ্টলব্ধ অবস্থান কিছুতেই হারাতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি একবাক্যে প্রস্তাব নাকচ করে দেন ও স্টকহোমে ফিরে আসেন।

১৮৮৯ সালে ফিরে আসার পরই মূলত তাঁর জীবনের সব বড় বড় প্রাপ্তিগুলো একসাথে ঘটতে থাকে। কিন্তু সোফিয়া এতকিছুর মধ্যেও ম্যাক্সিমকে ভুলতে পারেননি৷ তাই যতদিন ম্যাক্সিম ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন,তিনি প্রায়সময়ই ফ্রান্সে যেতেন ম্যাক্সিমের সাথে দেখা করার জন্য।

শেষের কথা

ঘনঘন ভ্রমণ, বারবার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বজনিত মানসিক চাপ এবং সেইসাথে কর্মজীবনের ব্যস্ততা সব মিলিয়ে সোফিয়া শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে একসময় তিনি তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। টানা অসুস্থতার ধারাবাহিকতায়, ১৮৯১ সালের ১০ ডিসেম্বর, মাত্র ৪১ বছর বয়সে, প্রতিভাবান গণিতবিদ সোফিয়া কাভালভস্কির অকালমৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পর তাঁকে স্টকহোমেই সমাহিত করা হয়। 

সোফিয়া কাভালভস্কাইয়ার সমাধিস্তম্ভ
চিত্র: স্টকহোমে সোফিয়া কাভালভস্কাইয়ার সমাধিস্তম্ভ; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স 

সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীমহল তাঁর এই মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়ে পরে। তিনি হাজারো বাধা ডিঙিয়ে নিজ যোগ্যতাবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক নারীবিদ্বেষী সমাজে। তাইতো আজও তিনি অমর হয়ে আছেন বিশ্ববাসীর মনের মণিকোঠায়- সব বাধা কাটিয়ে এগিয়ে চলার মূর্ত অনুপ্রেরণা হিসেবে।

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সোফিয়া কাভালভস্কাইয়া: গণিতের ভুবনে সফল প্রথমা

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!