কালের পরিক্রমায় সুনীলের সেই সময়

সিদরাতুল মুনতাহার
3.7
(3)
Bookmark

No account yet? Register

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়” এর ‘টাইম ট্রিলজি’ এর প্রথম গ্রন্থ সেই সময়, ১৯৮১ সালে আনন্দ পাবলিশারস থেকে প্রকাশিত হওয়া গ্রন্থটি ১৯৮৩ সালে বঙ্কিম পুরস্কার এবং ১৯৮৫ সালে আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত।

সেই সময় বইয়ের প্রচ্ছদ
সেই সময় বইয়ের প্রচ্ছদ; চিত্রসূত্র: Goodreads

এই কাহিনির মূল নায়কের নাম সময়। সময় সম্পর্কে লেখক বলেছেন, “সময়কে রক্ত-মাংসে জীবিত করতে হলে  অন্তত একটি প্রতীক চরিত্র গ্রহণ করতে হয়। নবীনকুমার সেই সময়ের প্রতীক।” 

“শিশুটির জন্ম মাত্র সাত মাস ১০ দিন গর্ভবাসের পর। মাতৃজঠরেই  তার চাঞ্চল্য প্রকাশ পেয়েছিলো। সেই অন্ধকার জলধিতে সে বেশিদিন থাকতে চায়নি।” উপন্যাসের শুরুতেই এরূপ উক্তি যেন নবজাগরণের সূচনা দেয়।  

এই কাহিনির পটভূমি ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ। সেই সময় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, বৃহত্তর অর্থে সকল ক্ষেত্রেই নবজাগরণ ঘটেছিল। এক অর্থে যাকে বলা যায় বেঙ্গাল রেনেসাঁস। এই পরিবর্তনের ধারায় যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, ডেভিড হেয়ার, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ প্রমুখ চরিত্র তিনি রুপায়ন করেছেন এই গ্রন্থে। 

মেঘনাদবধ কাব্যের অমর স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন যিনি নিজ মাতৃভাষাকে তিরস্কার করে সুদূর বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন এবং পরবর্তিতে নিজ ভুল বুঝতে পেরে মাতৃভূমিতে এসে সৃষ্টি করেছেন বাংলা সাহিত্যের অমর সব সৃষ্টি। এছাড়াও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ব্রহ্মধর্মের চর্চা, কলকাতা নগরীর সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেথুন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বিটন সাহেব, “আলালের ঘরের দুলাল” খ্যাত প্যারীচাঁদ মিত্র, দীনবন্ধু মিত্রের কালজয়ী উপন্যাস “নীলদর্পণ“  ইত্যাদি সমুদয় ঘটনা ঔপন্যাসিকের দক্ষ হাতে  যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে । 

গল্পের প্রধান চরিত্র হল সময় তথা নবীন কুমার। লেখক এই চরিত্রের মাধ্যমেই তৎকালীন সমাজের যাবতীয় বিবর্তন অঙ্কিত করেছেন। উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় ব্রিটিশদের অত্যাচার আর নিপীড়নের বিবরণ।

নীল দর্পণ
দীনবন্ধু মিত্রের লেখা নীলদর্পণের ফলক; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

বর্ণিত সেই সময়ে চাষিদের জোর করে নীল চাষ করানো, ন্যায্য মূল্য না দেওয়া ইত্যাদি ফুটে উঠেছে ত্রিলোচন চরিত্রের মাধ্যমে। একজন সাধারণ শ্রেণির কৃষক হওয়ায় প্রভুকে হাজারবার ডাকলেও সাড়া পায়নি ত্রিলোচন। এখানে প্রভু বলতে বোঝানো হয়েছে জমিদার শ্রেণি  যারা ভোগ আর আনন্দ নেশায় মত্ত। শিক্ষার নতুন জোয়ারে যুবশ্রেণি যেমন নতুন নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটাচ্ছে তেমনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত “ব্রহ্মধর্মে” তথা একেশ্বরবাদী চিন্তাধারা কেশব সেনের মত তরুণকে আকর্ষণ করে যা নতুন সময়য়ের বার্তা বহন করে। 

সমাজ থেকে প্রচলিত কুপ্রথা দূরীকরণে তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকাও অঙ্কিত হয়েছে। কোন প্রকার জাতিভেদ, লোকলজ্জা, অর্থের মায়া ত্যাগকারী এই সাদামাটা ব্যক্তিটি পরবর্তীতে ‘বিদ্যাসাগর’ নামে সমগ্র ভারতবর্ষে এমনকি খোদ ব্রিটিশ রাজদরবারেও  খ্যাতি অর্জন করেন। 

লেখক যথার্থই কালীপ্রসন্ন দাসের চরিত্র রূপায়ন করেছেন নবীনকুমার চরিত্রের মাধ্যমে। বিশিষ্ট বংশের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নবীনকুমার ছিলেন প্রগতিশীল মননের ব্যক্তি। সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবর্তনে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তার সমবয়সী অনেকের চেয়ে তার চিন্তাভাবনা ছিল আলাদা। তার হাত ধরেই নাট্যচর্চার প্রসার, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ এছাড়াও  ব্যাঙ্গাত্মক রচনা ‘হুতম পেঁচার নকশা’ সহ বিধবা বিবাহে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালনে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালনের চিত্র ফুটে উঠে লেখনীতে। 

কালীপ্রসন্ন
কালীপ্রসন্ন সিংহের প্রতিচ্ছবি; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

নবীনকুমারের একটি উক্তি ছিল এমন “বারাঙ্গনারা কখনও নিজে তৈরি হয় না। সমাজই এদের তৈরি করে।” এর মাধ্যমে ফুটে উঠে সেই সময়ের নারীদের অবহেলিত হওয়ার চিত্র। নারীরা কেবল ছিল ভোগের বস্তু। তাদের শিক্ষার ব্যাপারে সমাজ উদাসীন। সংসারের চার দেওয়ালের বাইরেও পৃথিবী আছে তা তাদের কাছে অকল্পনীয়। এমনকি বিশিষ্ট ব্যক্তি হেয়ার সাহেব ও যখন  নারীদের শিক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী হন অনেকেই তা সন্দেহের চোখে দেখেন। এসকল ঘটনাই সুন্দর ভাবে রূপায়িত হয়েছে উপন্যাসে।

আরও পড়ুন: বরফ গলা নদী: জহির রায়হানের লেখনীতে নিম্ন মধ্যবিত্তের দুঃখগাথা

বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তৎকালীন নারীশিক্ষা আর বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

শিক্ষাক্ষেত্রে মানুষ যখন আগ্রহী হচ্ছে পুরো ভারতবর্ষ এই উদ্যোগে সাধুবাদ জ্ঞাপন করছে তখনই সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠীর কাছে ব্যাপারটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে, শিক্ষার নামে আসলে দেশীয় দালাল সৃষ্টিই ইংরেজ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। কারণ তারা আসলে বুঝতে পেরেছিল এই জাতিকে পদাদলতি করে রাখা অসম্ভব স্বদেশীয় দোসর ছাড়া।  সময়ের পরিক্রমায় সমগ্র ইতিহাস আলোচিত হয়েছে লেখকের দক্ষ লেখনী দ্বারা। 

সমসময়ে মাথা নাড়াচাড়া করে উঠে ইয়ং বেঙ্গল, একটি প্রগতিশীল যুবা সংঘটন। দলে দলে যুব সমাজ ঝুঁকে পড়ছে সমাজ আর রাষ্ট্রের হিত কল্যাণকর কাজে। এক্ষত্রেও নবীনকুমার যেন দীপ্তিমান জ্বলজ্বলে এক যুবক যার মাধ্যমে সুনীল মূলত সেই সময়ের যুব সমাজকেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে  ফুটিয়ে তুলেছেন । 

সময় বয়ে চলে ছন্দে ছন্দে নিত্য নতুন তালে। উপন্যাসেও উত্থান পতনের মাধ্যমে নবীনকুমার বড় হতে থাকে। তার চোখে ধরা পড়ে সমাজের নানা অন্যায়-অবিচার। জীবনকে আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে না দিয়ে ব্যতিক্রম ধর্মী চিন্তা ধারণায় ফুটে উঠে। একদিকে যেমন এক গোষ্ঠী মাতৃভূমির উন্নয়ন মূলক চিন্তা ধারণায় মগ্ন, ঠিক আরেক গোষ্ঠী ভোগ আর বিলাসিতায় মত্ত। যেন ব্যাপক সংস্কৃতিচর্চার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে টাকার গরম জানানোই মূল উদ্দেশ্য। প্রত্যেক ধনী বাবুর বিবাহিতা স্ত্রীর বাইরে নিজের লালসা চরিতার্থ করার জন্য ছিল নিজস্ব বারাঙ্গনা যেন তা নিজের শ্রেষ্ঠত্বকেই উঁচিয়ে ধরে। এরূপ নীচ ঘৃণ্য মন মানসিকতা ও কলমের ছোঁয়ায় ও লেখকের নিজস্ব চিন্তা ভাবনায় ধরা পড়ে ভিন্ন আঙ্গিকে । 

সেই সময় যিনি লিখেছেন, সুনীল
‘সেই সময়’ এর লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; চিত্রসূত্র: বাংলালাইভ 

উপন্যাসের আরেক চরিত্র চন্দ্রিদাস যেন তাদের বর্বর অমানবিক চিন্তাভাবনার শিকার। শুধুমাত্র বারাঙ্গনাপুত্র হওয়ার কারণে শিক্ষিত ভদ্র সমাজে তার স্থান হয়নি। অকালে খসে পড়েছিল এক তারা।

সেই সময় কালের শ্রেষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস। কাল, স্থান, বর্ণ সবকিছুকে একটি সুতায় বেঁধে লেখক বুনেছেন তার রচনা। এক একটি চরিত্র যেন সম্পূর্ণ নিজস্ব আদলে গড়া। প্রতিটি উক্তি সেই সময়ের সাক্ষী। বেঙ্গল রেঁনেসা যেন আমাদের চোখের সামনে ঘঠছে। প্রতিটি পৃষ্ঠা প্রতিটি নতুন বিবর্তনের দাবিদার।

“এক দুর্ভাগা জাতির আমি সন্তান, যে জাতি আজিও পর-পদানত। এখন আমি নিজেকে দিয়া সেই জাতির সকলকে বিচার করিতেছি।”

লেখক উপন্যাসের শেষোক্ত বর্ণণায় এরূপে জাতির দুর্দশাকে  চিহ্নিত করে গিয়েছেন। এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ ও বাতলে দিয়েছেন,

“ধর্ম বলো, জাতি বলো, শিক্ষা বলো আর সাহিত্য বলো, যদি সকলকে এক সঙ্গে জড়াইতে না পারি, তা হলে কোন সুফল নেই।”

সেই সময় অসাধারণ এক সৃষ্টি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, দুই খণ্ডে প্রকাশিত হওয়া এই গ্রন্থ তার সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। 

বিচিত্র রচনাশৈলীই যে এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য তা বুঝা যায় লেখকের নিজস্ব এক ভাষ্য দ্বারা,

“নবীনকুমার চরিত্রে যে আমি সকল্পিত বহু উপাদান সংযোজন  করেছি, সেজন্য অনেকের সঙ্গে মতভেদ হতে পারে। হওয়াই স্বাভাবিক। সেই সময় সম্পর্কে যদি আমি আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিতে না চাইবো, তা হলে আর আমি এত বড় একটি গ্রন্থ রচনা করলাম কেন?”

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on কালের পরিক্রমায় সুনীলের সেই সময়

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!