সাভান্ট সিনড্রোম এবং কিছু মানুষের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প (পর্ব ২)

সাভান্ট সিনড্রোম ও কিছু মানুষের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প (পর্ব ২)

মো. রেদোয়ান হোসেন
3.8
(10)
Bookmark

No account yet? Register

এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে সাভান্ট সিনড্রোমের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কোনো বিশেষ জিনঘটিত কারণে এই সাভান্ট সিনড্রোম হয় নাকি এই সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সাভান্ট সিনড্রোমের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমীক্ষা এবং গবেষণাপত্রের উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আলোন্জো ক্লেমনস নামে একজন সাভান্টের আংশিক পরিচয় এবং দক্ষতার খানিকটা বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এই পর্বে আলোন্জো ক্লেমনসের বাকি পরিচয় এবং অন্য একজন সাভান্ট অ্যান্থনি সিকোরিয়ার সাভান্ট প্রতিভার বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে।

অসামান্যতে লিখুন

বেরি লেভিনসন পরিচালিত রেইন ম্যান চলচ্চিত্র মুক্তির পর থেকে আলোন্জো ক্লেমনসের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ডিসকভারি চ্যানেল, গেরাল্ডো, সিক্সটি মিনিটসহ আরো নানা প্রামাণ্যচিত্রে তাকে নিয়ে ফিচার তৈরি করা শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে তার পরিচিতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সাভান্ট হিসেবে তার পরিচয় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। 

নিজ প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার 

সাভান্ট হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর থেকে তিনি তার এই প্রভাব সমাজের উন্নয়নকল্পে কাজে লাগানোর চিন্তা করেন। সমাজে তার মত অন্য যেসকল সাভান্ট রয়েছেন, তাদের বিশেষ গুণাবলি সমাজের অন্য মানুষ যেন বাঁকা চোখে না দেখে, তার জন্য বিভিন্ন জায়গায় প্রচারণা চালানো শুরু করেন। 

১৯৮৬ সাল থেকে আলোন্জো ক্লেমনস বাণিজ্যিকভাবে ভাস্কর্য তৈরি করা শুরু করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি বৃহদাকৃতির ভাস্কর্য তৈরি করেন। তার অধিকাংশ ভাস্কর্যেই তার অসামান্য দক্ষতার পরিচয় ফুটে উঠে। 

আলোন্জো ক্লেমনস ছিলেন ভাস্কর্য বিষয়ে সিদ্ধহস্ত।
চিত্র: আলোন্জো ক্লেমনসের তৈরি শিল্পকর্ম, চিত্রসূত্র – Alonzo Clemons 

এছাড়াও আলোন্জো ক্লেমনস ৬ বার ভারোত্তোলন বিভাগে বিশেষ অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেন।  

অ্যান্থনি সিকোরিয়া 

আলোচনা করা যাক আরেকজন সাভান্টকে নিয়ে। তার নাম অ্যান্থনি সিকোরিয়া। 

চিত্র: অ্যান্থনি সিকোরিয়া; চিত্রসূত্র – YouTube/Fox5NY

সাধারণ মানুষের জীবন কী করে এক ঝটকায় পরিবর্তন হয়ে যায়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন অ্যান্থনি সিকোরিয়া। ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন অ্যান্থনি সিকোরিয়া। সাধারণ মানুষের মতো করে চলে যাচ্ছিল তার জীবন। মিলিটারি কলেজ অফ সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে জীববিজ্ঞানে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে তিনি এমডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বিশেষায়িত শিক্ষার অংশ হিসেবে ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া থেকে অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। 

জীবন চলছিল স্বাভাবিকভাবেই, যতদিন না অ্যান্থনি সিকোরিয়ার জীবনে সেই বিস্ময়কর রাত এসেছিল।

সেই বিস্ময়কর রাত

১৯৯৪ সালের এক সাধারণ রাত। রাস্তার পাশের টেলিফোণ বুথে এসেছেন অ্যান্থনি সিকোরিয়া। মায়ের সাথে কথা বলার জন্য। কথা বলা শেষে বুথ থেকে বের হয়েছেন মাত্র। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, সাথে ছাতা নেই বলে দ্রুত পা চালাচ্ছেন বাসায় পৌঁছানোর জন্য। হঠাৎ করেই বজ্রপাত হল, একদম তার নিজের শরীরের উপরেই বলা চলে!

সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন একজন পথচারী মহিলা। সৌভাগ্যক্রমে তিনি ছিলেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা একজন সেবিকা। দ্রুতই তিনি তাকে সিপিআর দেওয়া শুরু করলেন, যাতে করে তাকে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়। আশেপাশের মানুষ দ্রুত ৯১১ এ জরুরি সেবার জন্য ফোন দিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন। বড় ধরনের কোনো সমস্যা তিনি অনুভব করেননি বিধায় হাসপাতালে না গিয়ে পরিবারের সাথে তিনি বাসায় ফিরে আসলেন।

দুই তিন দিনের মধ্যেই তিনি একজন চিকিৎসকের সাথে দেখা করেন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী বেশ কিছু শারীরিক পরীক্ষা করেন। কোনো পরীক্ষার ফলাফলেই অস্বাভাবিক কিছু পরিলক্ষিত হয়নি। স্বভাবতই চিকিৎসক এতে কিছুটা অবাক হন এবং তাকে দুই সপ্তাহের মত সময় বিশ্রাম নিতে বলেন।  

দুর্ঘটনার দুই বা টিন সপ্তাহ পরে সাধারণ জীবনে তিনি ফেরত যান। যদিও তখনো কিছু ছোটখাটো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন তিনি, যেমন অল্প প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের নাম ভুলে যাওয়া বা খুবই দুর্লভ কোনো রোগের নাম ভুলে যাওয়া। যদিও এর জন্য তার স্বাভাবিক শল্যচিকিৎসকের ক্যারিয়ারে প্রভাব পড়েনি। এক দুই সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যাও দূর হয়ে যায় এবং তিনি ভাবছিলেন, হয়তো তার সমস্যারও ইতি ঘটেছে।

সাভান্ট প্রতিভার প্রকাশ

কিন্তু স্রষ্টার কাছে হয়তো ভিন্ন ধরনের কোনো পরিকল্পনা ছিল। প্রায় তিন চার মাস পরের ঘটনা। চলুন শুনে আসি অ্যান্থনি সিকোরিয়ার মুখ থেকেই – 

হঠাৎ করেই, দুই তিন দিন ধরে, আমার মাঝে পিয়ানো শোনার অতৃপ্ত এক ইচ্ছাশক্তি কাজ করছিল। 

অ্যান্থনি সিকোরিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে পিয়ানো বাজানো শুরু করেন।
চিত্র: সেই রাতের বজ্রপাত অ্যান্থনি সিকোরিয়ার জীবনে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই এসেছিল; চিত্রসূত্র – ডেইলি মেইল 

ছোট থাকতে, প্রাইমারি স্কুলে পড়া অবস্থায়, পিয়ানো ক্লাসে যোগ দিলেও কখনোই পিয়ানো বাজানো বা শোনার তেমন বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না। এমনকি তার নিজের বাসায় কোনো পিয়ানো পর্যন্ত ছিল না। এই হঠাৎ জেগে ওঠা আগ্রহের কারণে তিনি দ্রুততার সাথে বিভিন্ন পিয়ানো সঙ্গীতের ক্যাসেট সংগ্রহ করা শুরু করলেন। তার এরূপ আচরণ দেখে তার পরিবারের সকলেই অবাক হলেন। কারণ অ্যান্থনির এরূপ আচরণের সাথে তারা পরিচিত ছিলেন না। তার বাসার একজন বেবিসিটার তাকে একদিন জানান যে, তার নিজের বাসায় একটি পুরনো পিয়ানো পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। অ্যান্থনি চাইলে তিনি সেটি অ্যান্থনিকে দিয়ে দিবেন। তিনি রাজি হলে তার বাসার বেবিসিটার তাকে সেই পিয়ানোটি দিয়ে দেন। এভাবেই শুরু হলো তার পিয়ানো চর্চা। 

নিজের মনের থেকেই সঙ্গীত চর্চার অনুপ্রেরণা পেতেন তিনি। একটা ছোট ঘটনাই ব্যাখ্যা করবে, ঠিক কতটাই মরিয়া ছিলেন তিনি পিয়ানো চর্চার জন্য। নিউইয়র্ক শহরের দূরবর্তী এক অংশে তিনি থাকতেন। ধ্রুপদী সঙ্গীতের ক্যাসেট সংগ্রহের জন্য তাকে প্রায় ১ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে শহরের এক নির্দিষ্ট দোকানে যেতে হত। তা সত্ত্বেও শুরুর দিকে তিনি প্রায় দুই সপ্তাহ পরপর দোকানে যেতেন পিয়ানো ক্যাসেট সংগ্রহ করতে। 

তার এই শেখার গতি এতটাই দ্রুত ছিল যে, ১৯৯৮ সালের মধ্যে তিনি নিজের পিয়ানো চর্চা শেষ করে মানুষকে পিয়ানো শেখানো শুরু করেন। তবে একজন শল্যচিকিৎসক হিসেবে নিজের ক্যারিয়ারের সাথে সাথে নিজের অন্তরের পিয়ানো শেখার বাসনা – এই দুই বিষয়কে মিলিয়ে চলতে প্রথমদিকে তার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে সামলে নেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ছোটখাট অনুষ্ঠানে পিয়ানো বাজানোর কাজও শুরু করেন। 

২০০৬ সালে তার দেখা হয় আরেক পিয়ানো উৎসাহী এরিকা ভ্যান্ডারের সাথে। 

এরিকা ভ্যান্ডারের বন্ধু ছিলেন বিশিষ্ট স্নায়ু বিশেষজ্ঞ অলিভার স্যাক্স
চিত্র:এরিকা ভ্যান্ডার; চিত্রসূত্র – সিটিপোস্ট

এরিকা ভ্যান্ডার খুব ছোটবেলা থেকে পিয়ানো বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। পিয়ানো বাজানোর সূত্রে তার পরিচয় হয় অ্যান্থনি সিকোরিয়ার সাথে। অ্যান্থনি সিকোরিয়ার পুরো ঘটনা শুনে তিনি বুঝতে পারেন যে, এটি আসলে সাভান্ট সিনড্রোমের সাথে সম্পর্কিত। তখন তিনি অ্যান্থনি সিকোরিয়াকে পরামর্শ দেন তার পরিচিত একজন স্নায়ু বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করতে। সেই স্নায়ু বিশেষজ্ঞের নাম অলিভার স্যাক্স। 

অলিভার স্যাক্স সাভান্ট সিনড্রোম নিয়ে কাজ করছিলেন।
চিত্র: অলিভার স্যাক্স; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স 

অলিভার স্যাক্স তখন একটি বই লিখছিলেন। সেই বইয়ে তিনি স্নায়ুবিজ্ঞান এবং সঙ্গীত সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়াদি উপস্থাপন করছিলেন। তিনি বেশ কয়েক মাস ধরে অ্যান্থনি সিকোরিয়ার সাক্ষাৎকার নেন। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অ্যান্থনি সিকোরিয়া প্রকৃতপক্ষেই একজন সাভান্ট। 

এই সাক্ষাতের পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৭ সালে অলিভার স্যাক্সের লেখা মিউজিকোফিলিয়া: টেলস অফ মিউজিক অ্যান্ড দ্য ব্রেইন বই প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে অলিভার স্যাক্স বিস্তারিতভাবে অ্যান্থনি সিকোরিয়ার সাভান্ট সিনড্রোমের সম্পর্কে উল্লেখ ছিল। 

অলিভার স্যাক্সের লেখা এই বইয়ে সাভান্ট সিনড্রোম সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা ছিল।
চিত্র: মিউজিকোফিলিয়া: টেলস অফ মিউজিক অ্যান্ড দ্য ব্রেইন’ বইয়ের প্রচ্ছদ; চিত্রসূত্র – অ্যামাজন 

সাভান্ট প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার

এই বই প্রকাশিত হওয়ার পরে অ্যান্থনি সিকোরিয়া এবং তার সাভান্ট সিনড্রোমের কথা মানুষজন জানতে শুরু করে। তার পিয়ানো প্রতিভার কথাও আশেপাশের মানুষজন বড় আকারে জানতে পারেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার জীবনের অভিজ্ঞতা সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হতে থাকে।  

২০০৮ সালে তিনি প্রথম বড় আকারে জনসমক্ষে আসেন নিজের সঙ্গীত আয়োজনের অংশ হিসেবে। তার এই সাভান্ট প্রতিভার কথা মানুষকে জানানোর জন্য এবং মানুষের প্রতি সাভান্টদের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করার জন্য নানাবিধ জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমেও তিনি অংশ নিতে থাকেন। 

… … …

প্রচ্ছদ ছবি সংগ্রহ এবং অলঙ্করণ: লেখক

আরো পড়ুন: সাভান্ট সিনড্রোম ও কিছু মানুষের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প (পর্ব ১)

তথ্যসূত্র: 

প্রচ্ছদ ছাঁচ কৃতজ্ঞতা স্বীকার: Designed by StudioStock

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সাভান্ট সিনড্রোম ও কিছু মানুষের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প (পর্ব ২)

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!