সাইকোলজিক্যাল-ইভিল-ফিচার

সাইকোলজিক্যাল ইভিল: মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে মানসিক শয়তান

4
(26)
Bookmark

No account yet? Register

আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন ধরণের কাজ করি। যার মধ্যে চেতন কিংবা অবচেতন মনে আমরা অনেক কাজ করে ফেলি কিংবা করতে পছন্দ করি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কিন্তু জানিনা এই কাজ গুলো আমরা কেন করি! নিজেকে জানো মতবাদ নিয়ে মনোবিজ্ঞানী সক্রেটিস বেশ মুক্ত আলোচনা করেছিলেন। সারাজীবন তিনি ব্যয় করেছেন এই নিজেকে জানার মধ্যে। বেশ চাঞ্চল্যকর হলেও সত্যি যে, আমরা নিজের সম্পর্কে যা জানি অন্যের সম্পর্কে তার চেয়েও বেশি জানি। অন্যের ভালো, খারাপ, প্রশংসা, নিন্দাসহ বেশ কিছু উপর্সগ কিংবা অনুসর্গ আমরা ধরতে পারলেও নিজের সম্পর্কে আমরা আসলে অনেক কিছুই জানিনা।

অসামান্যতে লিখুন

মনোবিজ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে আমরা কীভাবে পৃথিবীকে উপলব্ধি করি এবং আমাদের আচরণকে কে কে নিয়ন্ত্রণ করে তার উত্তর জানার চেষ্টা করে আসছেন। বিজ্ঞানের এই পর্যায়ে এসে তারা বেশ সফল হয়েছেন এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অনেক কাজের কারণ তারা উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। আজকের আলোচনায় আমরা বেশ কয়েকটি হিউম্যান বিহ্যাভিয়ার কিংবা মানুষের সাধারণ কয়েকটি প্রবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করবো। যা সচরাচর আমরা করে থাকি। তা হতে পারে চেতনে কিংবা অবচেতনে।

আমাদের সকলের মন্দ কিছু ক্ষমতা রয়েছে

কারাগারে বন্দী একজন লোক
চিত্র: কারাগারে বন্দী একজন লোক ; চিত্রসূত্র: Did you know

শুনতে অবাক লাগলেও এটিই সত্যি। হ্যাঁ, আমাদের সবারই মন্দ কাজ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এবং সুযোগ পেলেই আমরা মন্দ কাজ করতে বেশ পছন্দ করি। আপনি হয়তো আশেপাশের জীবন থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা অনেক আগেই পেয়ে গিয়েছেন। জীবনের এই চলার পথে আমাদের এই অভিজ্ঞতাগুলো বেশ তিক্ত এবং অবিশ্বাস্যও বটে! তাহলে আসুন জেনে নিই এই বিষয়ে একটি গবেষণার সারমর্ম।

মনোবিজ্ঞান এর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত পরীক্ষা ছিলো এটি। ১৯৭১ সাল সামাজিক অবস্থা কীভাবে মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে তার উপর একটি মনোবিজ্ঞান গবেষণা করতে দেয়া হয়েছিল স্ট্যানফোর্ড কারাগারকে। গবেষকরা এক হয়েছিলেন স্ট্যানফোর্ড সাই বিল্ডিং এর বেসমেন্টে। সেখানে একটি জেল ছিল। সেই জেলে বন্দী এবং রক্ষীবাহিনী হিসাবে কাজ করার জন্য ২৪ জন স্নাতকোত্তর স্বেচ্ছাসেবককে বেছে নেয়া হয়েছিলো। তাদের পূর্বে কোন আপরাধ-ধর্মী কাজে লিপ্ত ছিল না এবং তারা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।

গবেষকরা লুকানো ক্যামেরা ব্যবহার করে বন্দীদের (যাদের ২৪ ঘণ্টাই জেলে কাটাতে হয়) এবং রক্ষীদের (যারা ৮ ঘণ্টা করে সময় ভাগাভাগি করে) পর্যবেক্ষণ করে। যে গবেষণাটি দুই সপ্তাহ ধরে হবার কথা ছিলো, তা ৬ দিনের মাথায় স্থগিত করা হয়। আসলে করা হয় বললে ভুল হবে। কর্তৃপক্ষ স্থগিত করতে বাধ্য হয়। রক্ষীদের তীব্র কঠোর আচরণ এবং অনেক সময় তারা বন্দীদের উপর জঘন্য মানসিক অত্যাচার চালাতো।

শুধুমাত্র বন্দী হবার অপরাধে কয়েকটি নিরপরাধ মানুষকে পেতে হয়েছিলো নির্মম সাজা। অন্যদিকে নিরপরাধ জেনেও রক্ষীরা মানসিক কিংবা দায়িত্ত্বজনিত কারণে হোক তাদেরকে নিপীড়িত করেছে। এটাই আসলে মানুষের একটি অন্যতম সাধারণ প্রবৃত্তি। আমরা সুযোগে অন্যায় করতে দ্বিধাবোধ করি না। আর একেই বলে মানুষের সাধারণ মন্দ হবার কিংবা নষ্ট হবার অদ্ভুত ক্ষমতা।

আশেপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার অভাব

একজন পরিপাটি লোক
চিত্র: একজন পরিপাটি লোক ;  চিত্রসূত্র: Unsplash

হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী চরিত্র হিমু একদিন কোট-টাই-স্যুটের সাথে স্যান্ডেল পরে ঢাকার রাস্তায় বের হয়েছিলো। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলো এত মানুষের বসবাসের শহর ঢাকাতে একটি শিশু ছাড়া আর কেউ তার দিকে সেভাবে তাকাচ্ছেই না! ব্যাপারটি উপন্যাসে হলেও আসলে সত্যি। আমাদের একটা সাধারণ প্রবৃত্তি হচ্ছে আমরা আমাদের আশেপাশের পরিবেশকে ভালো ভাবে অবজার্ভ কিংবা পর্যবেক্ষণ করি না। 

১৯৯৮ সালে হার্ভার্ড এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকগণ একটি কলেজ ক্যাম্পাসে পথচারীদেরকে  নিয়ে একটি মনোবিজ্ঞান বিষয়ক পরীক্ষা করলেন। পরীক্ষাটির উদ্দেশ্য ছিল তাদের মধ্যে কতজন মানুষ আশেপাশের পরিবেশের দিকে লক্ষ করে। পরীক্ষায়, একজন অভিনেতাকে গবেষকগণ তাদের গবেষণা কাজে ব্যবহার করেছিলেন। গবেষণার সময় সেই অভিনেতা পথচারীর কাছে গিয়েছিলেন এবং কোন একটা পথের খোঁজ করছিলেন।

যখন পথচারীরা সেই পথের নির্দেশনা দিচ্ছিলো, ঠিক সেই সময় দুইজন লোক ঐ অভিনেতা এবং পথচারীর মধ্যে একটি বড় কাঠের দরজা নিয়ে চলে গেলেন এবং যার কারণে  কয়েক সেকেন্ডের জন্য অভিনেতা এবং পথচারী একে অপরকে দেখতে পায়নি এবং এই সময়ের মধ্যে আগের অভিনেতাকে সরিয়ে সেখানে একই উচ্চতা এবং স্বাস্থ্যগত মিল আছে এমন অন্য একজন অভিনেতাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। অবাক ব্যাপার হচ্ছে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশী এই পরবর্তন লক্ষ্য করেননি।

এই গবেষণাটি চেঞ্জ ব্লাইন্ডনেস ঘটনাটি ব্যাখ্যা করে, দেখায় যে আমরা যে কোনো প্রদত্ত দৃশ্যের মধ্যে দৃশ্য থেকে কীভাবে গ্রহণ করি এবং এই ঘটনা নিশ্চিত করে যে, আমরা মেমোরি এবং চিন্তার চেয়েও প্যাটার্ন এর উপর অনেক বেশি নির্ভর করি। যার কারণে অর্ধেকের বেশি পথচারীই অভিনেতাদের মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায়নি। 

ধৈর্যশীলরাই সফল হয়

অপেক্ষারত ব্যক্তি
চিত্র: অপেক্ষারত ব্যক্তি ; চিত্রসূত্র: Pixabay

এটি অনেকটা সবুরে মেওয়া ফলে ধরনের। অর্থাৎ আপনি যত বেশি অপেক্ষা করবেন, অন্যদের তুলনায় ততবেশি সফল হবেন। ব্যাপারটি আবার লোভের দিক থেকেও ব্যাখ্যা করা যায়। আপনি যদি আপনার লোভ দমন করতে পারেন, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, ভবিষ্যৎ আপনার জন্য বিশেষ পুরষ্কার নিয়ে অপেক্ষা করছে।

১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষায় তাৎক্ষনিক সন্তুষ্টির প্রলোভন রোধ করার একটি মনোবিজ্ঞান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় এমন শিশুদের নির্বাচন করা হয়েছিলো যারা এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। সেই গবেষণাটি শিশুদের প্রলোভন (লোভ) ক্ষমতা পরীক্ষা করে। এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও স্ব-শৃঙ্খলা সম্পর্কেও ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

পরীক্ষায় চার বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে একটি প্লেটের উপর অনেক মাশরুম দিয়ে রাখা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যে, তারা এখন এই মাশরুমগুলো খেয়ে ফেলতে পারে অথবা গবেষকরা ১৫ মিনিট পরে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। যদি অপেক্ষা করতে পারে তাহলে পুরস্কারের ব্যবস্থাও ছিলো। কেননা গবেষকরা ফিরে এসে তাদের অতিরিক্ত আরো দুইটি মাশরুম দিবে।

যদিও রিপোর্ট অনুযায়ী বেশির ভাগ শিশু বলেছিল যে তারা অপেক্ষা করবে। তারা প্রায় সবাই তাদের লোভকে দমন করার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত না পেরে গবেষকদল ফিরে আসার পূর্বেই অনেকে মাশরুম খেয়ে ফেলে। যেসব শিশুরা ১৫ মিনিট তাদের লোভকে দমন করতে পেরেছিলো তারা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিল। যেমন: চোখ বন্ধ করে কিংবা উল্টা ঘুরে বসে থেকে।

গবেষণাটির দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল বেশ আশ্চর্যজনক ছিলো। পরবর্তীতে সেসব শিশু যারা অপেক্ষা করে ছিল তাদের মাঝে যেসব বৈশিষ্ট্য পাওয়া গিয়েছিল তা হলো তাদের আচরণগত সমস্যা, মাদকদ্রব্যে আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা এবং স্থূলতা এসব অন্যদের তুলনায় অনেকাংশে কম ছিল এবং তারা পরবর্তীতে জীবনে অন্যরা যারা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেনি তাদের তুলনায় সফল ছিল। অর্থাৎ আপনি যদি অপেক্ষা করেন কিংবা সবুর করেন, তবে আপনার জীবনে মেওয়া ফলবেই।

ক্ষমতার অপব্যবহার

একজন ক্ষমতাশীল লোক
চিত্র: একজন ক্ষমতাশীল লোক ; চিত্রসূত্র: Holiday Inn

ক্ষমতা থাকলে সে ক্ষমতার অপব্যবহার করা আমাদের একটা মানসিক ব্যাধি। সাধারণ ভাবে আমরা জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পছন্দ করি কিংবা করতে ভালোবাসি। এটার পিছনে একটি সাইকোলজিক্যাল কিংবা মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যা ও রয়েছে। ২০০৩ সালের এক গবেষণায় প্রকাশিত এক জার্নালের রিভিউ লেখার জন্য তিনজন ছাত্রকে পাঠানো হয়েছিলো। কাগজপত্র লেখার জন্য দুই ছাত্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্যজনকে কাগজটির মূল্যায়ন করতে এবং প্রতিটি ছাত্রকে কতটা অর্থ প্রদান করা হবে তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছিল।

তাদের কাজের মাঝখানে গবেষক একটি প্লেটে করে ৫টি কুকি (এক ধরণের খাবার) রেখে গেল। সাধারণ ভাবেই  শেষ কুকিটা কখনও খাওয়া হয় না (কারণ ওরা সব মিলে চারজন ছিলো)। তবুও তাদের মধ্যে যে লিডার, সে প্রায় সবসময় চতুর্থ কুকি খেয়ে থাকেন এবং শেষের কুকিটাও তার ভাগ্যেই থাকে। ব্যাপারটা অনেকটা মানসিকভাবেই সবাই মেনে নেয় যে যিনি লিড দিবেন তিনিই বেশি ভাগ পাবেন। আবার লিডারও তাদের মনের মধ্যে এই ধারণা পুষে রাখেন। সমাজের প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এই উদ্ভট ধারণা বিদ্যমান। একজন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে একজন পিয়ন পর্যন্ত এই নীচ কাজে জড়িত। এটা মানুষের এক ধরণের মানসিক ব্যাধি।

সুখী হবার জন্য প্রয়োজন শুধু একটি জিনিস

নগদ অর্থ
চিত্র: নগদ অর্থ; চিত্রসূত্র: Alamy

জীবনে সুখী হবার জন্য আমরা কত কী না করি! টাকা কামাই, বাড়ি বানাই, গাড়ি কিনি। অনেকে আবার মোটিভেশনাল স্পীকারদের দরজায় নিয়মিত কড়া নাড়ে! কিন্তু আমরা কি কখনোই জানতে চেয়েছি কোথায় আমাদের প্রকৃত সুখ! সুখী হবার জন্য বেশি কিছু না, মাত্র একটি জিনিষের খুব প্রয়োজন। আর মনোবিজ্ঞান গবেষকরা ভালবাসা নামক অনুভূতিটিকেই সেই একটি জিনিস হিসেবে অ্যাখায়িত করেছেন। জীবনে কিছুই দরকার নেই। যদি আপনার জীবনে ভালবাসা থাকে, তবে জীবন আপনাকে বারবার স্বাগত জানাবে।

৭৫ বছর ধরে হার্ভাডের গ্রান্ট গবেষণাটি পরিচালিত হয়ে আছে। এটি পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘতম মনোবিজ্ঞান গবেষণা। ১৯৩৮-১৯৩৯ সালের হার্ভাডের পুরুষ গ্রাজুয়েটদের নিয়ে এটি শুরু হয়েছিলো (নব্বইয়ের দশকে এটি আরো জোরদার হয়েছিল)। এই গবেষণাটি গ্র্যাজুয়েটদের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়মিত সংগ্রহ করে। নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে গবেষণার ফলাফল কি! এতদিনের মনোবিজ্ঞানের উপর করা বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বলে যে, আপনি যখন দীর্ঘমেয়াদী সুখ এবং জীবনে কি পেলেন আর কি হারালেন তার হিসেব কষবেন, তখন  ভালবাসাই সব বিষয়ের প্রকৃত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

গবেষণার দীর্ঘমেয়াদী পরিচালক মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ জর্জ ভ্যালেন্ট বলেন, সুখের দুটি স্তম্ভ আছে: একটি হলো ভালোবাসা এবং অন্যটি জীবনের সাথে লড়াই করার উপায় খুঁজে বের করা। আর এই লড়াই করার উপায় এমন ভাবে খুঁজে নিতে হবে যেন সেটা ভালোবাসাকে জীবন থেকে দূরে সরিয়ে না দিতে পারে। যারা একা থাকে তারা নিজেদের সুখী ভাবতে পারেন না, আবার একটা বয়সের পর একা থাকা মানুষগুলো শারীরিক, মানসিক অসুস্থতা যে অনেকের সাথে থাকে তার চেয়ে বেশি হয়।

আরও পড়ুন: সাভান্ট সিনড্রোম ও কিছু মানুষের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প (পর্ব ২)

বিভিন্ন নিয়ম শৃঙ্খলা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের অনুকরণ

একজন হাসি-খুশি লোক
চিত্র: একজন হাসি-খুশি লোক ; চিত্রসূত্র: Pinterest

আমরা যে বাস্তবতায় বাস করি তা কোন একক ফিল্ডের নিয়মে চলে না। কেবল রসায়ন বিদ্যা দিয়ে বাস্তবে ঘটতে থাকা কোন সমস্যা, যেমন টিলাগড় পয়েন্টে রাজনৈতিক কারণে দুই ছাত্র সংগঠনের মারামারি ব্যাখ্যা করা যাবে না। কেবল পদার্থবিদ্যা দিয়ে ঘটনাটি যাবে না বোঝা। কিন্তু সাইকোলজি, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি নানা উৎসের জ্ঞান থেকে ঘটনাটি বুঝার চেষ্টা করলে বুঝা যেতে পারে।

কিন্তু বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রগুলোর এই ভাগ বিভাজন মানুষের তৈরী। প্রকৃত পৃথিবী এমন ভাগ হয়ে কাজ করে না। পৃথিবীর কোন ঘটনা এক জ্ঞানের উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা দুরূহ। এই ঘটনায় নানা উৎসের প্রভাব থাকবে। আপনি আমি কিংবা ফিল্ডগুলোতে এক্সপার্ট বা অভিজ্ঞ হতে চাই না। অভিজ্ঞ তারা আছেন যারা ঐসব উৎসে গবেষণা করছেন, জ্ঞান তৈরী করছেন। আমরা আমাদের দরকার মত বড় উৎসের বড় জ্ঞানগুলো জেনে নিতে পারি এবং এই জানা আমাদের পৃথিবীর কোন ঘটনা ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্ব

একজন লোক পছন্দ করে পোশাক পরিধান করছে
চিত্রসূত্র: একজন লোক পছন্দ করে পোশাক পরিধান করছে ; চিত্রসূত্র: iStock

সুন্দর ব্যক্তি মানে তার ভালো গুণ আছে। অসুন্দর ব্যক্তি মানে তার খারাপ দোষ আছে। ভালো কোন জিনিসের সাথে যুক্ত থাকলে ঐ জিনিসকেও ভালো মনে করি, খারাপ জিনিসের সাথে যুক্ত থাকলে খারাপ। এরকম একটি আবিষ্কার করেছিলেন বড় মনোবিজ্ঞানী আইভান পাভলভ। কুকুরদের নিয়ে তিনি গবেষণা করছিলেন। আইভান পাভলভ দেখলেন তিনি কক্ষে ঢুকলেই তার কুকুরদের মুখে লালা চলে আসছে। এমনকি হাতে খাবার নিয়ে না আসলেও লালা ঝরতে থাকে। ব্যাপার কী তা তিনি বুঝতে চাইলেন। এরপর কুকুরদের খাবার দিতে শুরু করলেন একটি নির্দিষ্ট ঘণ্টা বাজিয়ে। তিনি লক্ষ্য করলেন, ঘণ্টা বাজালেই কুকুরদের মুখে লালা চলে আসে, এমনকী খাবার না দিলেও।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি দিলেন তার ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্ব। অর্থাৎ কিছু ব্যাপার আছে যা ঘটলে অন্য আরেকটি ঘটনা ঘটে। যেমন: ঘণ্টা বাজলেই কুকুরের মুখে লালা চলে আসে বা লোকে একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনা মিলিয়ে দেখে। এই ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিংয়ের ব্যাপার আমাদের মধ্যেও আছে। বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বড় কোম্পানিগুলো তা ব্যবহার করে। যেমন: কোনো আনন্দ উৎসব, খেলাধুলা ইত্যাদিতে যে ব্র্যান্ডগুলো স্পন্সর করে, মানুষেরা তাকে ঐসব ঘটনার সাথে মিলিয়ে দেখে। আবার কোনো শোকের দিন, বড় মানুষের মৃত্যুশোক ইত্যাদিতে যারা স্পন্সর করে, তাদেরকে ঐসব ঘটনার সাথে মিলিয়ে দেখবে মানুষ।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রেই আমরা ভুল ভাবে বিচার করি। বাস্তবে এই ঘটনার মিল নেই, কাকতালীয় মাত্র। যে খারাপ খবর নিয়ে এসেছে সে দোষী না। ধরা যাক আপনার ব্যবসা আছে, গুদামে আগুন লেগেছে, কর্মচারীরা দুঃসংবাদ দিতে ভয় পেলে সংবাদ পেতে পেতেই আপনার গুদাম পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার হলে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কর্মীরা দুঃসংবাদ আপনার কাছে আগে আগে পৌঁছায়। ওয়ারেন বাফেট তার কর্মচারীদের নির্দেশ দেন যে, তাদের কাজ হলো যত দ্রুত পারা যায় দুঃসংবাদ তার কাছে পৌছে দেয়া। সুসংবাদ নিয়ে তিনি ভাবতেন না। কারণ সুসংবাদ এমনিতেই পৌঁছাবে আমাদের কাছে, দেরীতে পৌঁছলেও সমস্যা নেই।

তাছাড়া, কোনো ব্যবসায়ী না হলেও আপনার এ বিষয়ে নজর থাকলে ভালো। অহেতুক কোনো মানুষকে অলক্ষুণে, অপয়া ইত্যাদি বলার মতো অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারবেন তাহলে। তাতে নিজের লাভও হতে পারে। যেমন, বেশী দাম মানেই ভালো জিনিস এমন একটি ব্যাপার আমাদের মধ্যে আছে। পাভলভের কুকুরের মতো আমরা এটা শিখেছি যে বেশী দাম হলে জিনিস ভালো হয়। আসলেও সাধারণত এমনই হয়। কিন্তু আমাদের এই প্রবণতার সুযোগ নিতে পারে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী। বাড়িয়ে দিতে পারে একটি পণ্যের দাম অন্যটির চাইতে, কেবলমাত্র আমাদের ঠকাতে। এক্ষেত্রে ভালো দাম মানেই ভালো জিনিস এই অন্ধ বিশ্বাস এর চাইতে গুণমান বিচার করে ভালোমন্দ বিচারই শ্রেয়।

প্রচ্ছদসূত্র: Pixabay

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on সাইকোলজিক্যাল ইভিল: মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে মানসিক শয়তান

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!