লিনাস টোরভাল্ডস : যিনি হতে পারতেন বিল গেটস

মার্শাল আশিফ
4.6
(8)
Bookmark

No account yet? Register

আপনি বিল গেটস, স্টিভ জবসকে হয়ত চিনে থাকবেন। কিন্তু আপনি কি লিনাস টোরভাল্ডসকে চেনেন?

না চেনারই কথা। তিনি তাঁর আবিষ্কার বিনামূল্যে বিলিয়ে দিলেন বলে, তিনি তাঁর আবিষ্কার দিয়ে প্রযুক্তির জেলখানা বানালেন না বলে আজ প্রযুক্তি দুনিয়ার বাইরে তাঁর খুব একটা খ্যাতি নেই। 

কে এই লিনাস টোরভাল্ডস যাকে টাইমস ম্যাগাজিন এই শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় ১৭তম স্থান দিয়েছে?

আশি শতাংশেরও বেশি সম্ভাবনা রয়েছে যে আপনার হাতের স্মার্টফোনটি লিনাস টোরভাল্ডসের আবিষ্কারের ছোঁয়ায় প্রাণ পেয়েছে। বিশ্বের বড় বড় সুপার কম্পিউটার চলে তাঁর আবিষ্কারের শক্তিতে। নাসার বিজ্ঞানীদের মহাকাশ গবেষণায় সাহায্য করে তাঁর আবিষ্কার। গুগল, আইবিএম এর মত কোম্পানি তাঁর আবিষ্কার ব্যবহার করে। প্রযুক্তি দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটানো লিনাস টোরভাল্ডসকে জানতে কি আপনার একটুও ইচ্ছে করে না? 

অসামান্যতে লিখুন

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

আপনি কি বলতে পারবেন অ্যাপোলো-১১তে করে মানুষ কত সালে চাঁদে পা রেখে ছিল? আপনি যদি ১৯৬৯ সাল বলে থাকেন, তবে আপনাকে অভিনন্দন। কিন্তু আপনি হয়ত ভাবছেন লিনাস টোরভাল্ডস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কেন আমি চন্দ্র অভিযানের কথা নিয়ে আসছি। কারণ, ঠিক সেই বছরই ক্রিসমাসের তিন দিন পর বাবা মার কোল আলো করে জন্মে ছিলেন লিনাস টোরভাল্ডস

সাংবাদিক বাবা মায়ের ছেলে সাংবাদিক হবে এমনটাই সবার ধারণা ছিল। কিন্তু সবার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। দেখা গেল, লিনাসের সমবয়সীরা যখন মাঠে খেলাধুলা করছে, লিনাস তখন হয়ত ঘরের কোণে বসে রুবিক্স কিউব মেলাচ্ছেন। তিনি এতটাই আত্মমুখী স্বভাবের ছিলেন যে তিনি তার ছোট ভাইয়ের সাথে সময় কাটানোর চেয়ে রুবিক্স কিউব বেশি পছন্দ করতেন। দাদার সাহচর্যে এসে ধীরে ধীরে ছোট্ট লিনাসের মনে গণিত আর প্রোগ্রামিং এর প্রতি ভালোবাসা তৈরি হতে থাকে।

সালটা তখন ১৯৯১। লিনাস টোরভাল্ডস ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তিনি নিজের কাজের জন্য তখন একটা অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেল তৈরি করেছেন। শুরুতে তাঁর এই কার্নেল সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু ভাগ্যের লিখন তো অন্য কথা বলছে। 

লিনাস টোরভাল্ডস
লিনাস টোরভাল্ডস । চিত্রসুত্র : Wikimedia Commons

মুক্ত সফটওয়্যারের জগতে লিনাসের প্রবেশ

লিনাসের সঙ্গে আরেক কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী লার্স উইরজিনিয়াস (Lars Wirzenius) এর বন্ধুত্ব ছিল। এই লার্স একদিন তাকে রিচার্ড স্টলম্যানের বক্তৃতা শোনানোর জন্য নিয়ে যান। রিচার্ড স্টলম্যান ছিলেন মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের পথিকৃৎ। তিনি বিশ্বাস করতেন সফটওয়্যার হবে মুক্ত ও স্বাধীন। এর সোর্স কোড (সোর্স কোড মানে হচ্ছে যেসব কোড লিখে একজন প্রোগ্রামার কোন সফটওয়ার তৈরি করে) হবে উন্মুক্ত। যে কেউ এই সফটওয়্যারের ডেভেলপমেন্টে অংশ নিতে পারবে। লিনাস টোরভাল্ডস স্টলম্যানের কথা শুনে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে তিনি তাঁর তৈরি করা লিনাক্স কার্নেল ওপেন সোর্স করে দিলেন।

এতদিন ধরে একটি অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেলের অপেক্ষায় হাহাকার করছিল ওপেন সোর্স কমিউনিটি। লিনাস তার কার্নেল ওপেন সোর্স করে দেওয়ায় সেই চাহিদা পূরণ হল। সেই সাথে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনও বেগবান হল। ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রোগ্রামাররা মিলে লিনাক্স কার্নেলের আরও উন্নতি সাধন করলেন। এর ফলশ্রুতিতে মুক্তি পেল লিনাক্স কার্নেলের ভার্সন ১। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেদিন ছিল ১৯৯৪ সালের ১৪ই মার্চ। সেই দিনটির পর দুই দশক পার হয়ে গেছে। আজ প্রতি ২-৩ মাস পর পর লিনাক্স কার্নেলের নতুন ভার্সন মুক্তি পায়। আর এর পেছনে কাজ করে হাজার হাজার প্রোগ্রামার। 

একজন মানুষ সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইলে শুধু তাঁর নামধাম আর স্কুল কলেজ সম্পর্কে জানলেই চলে না, তাঁর আবিষ্কার আর কাজ সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন। 

লিনাক্স কার্নেল

লিনাস টোরভাল্ডসকে নিয়ে কথা হবে আর লিনাক্স কার্নেল নিয়ে কথা হবে না তা হয় নাকি! আজকে তাঁর যে খ্যাতি তার পুরো ক্রেডিট যাবে লিনাক্স কার্নেলের প্রতি। হয়ত ভাবতে পারেন কী এই কার্নেল। পুরো লেখাজুড়ে কার্নেল কার্নেল করে যাচ্ছে, কিন্তু কার্নেল দ্বারা কী বোঝায় সেটাই তো বুঝতে পারছি না। আসলে কার্নেলের কাজ হল কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়ার এর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা।

যেমন : মনে করুন আপনি একটা ফাইল পেনড্রাইভ থেকে হার্ডডিস্কে পেস্ট করার নির্দেশনা দিলেন। কিন্তু কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক তো আপনার দেওয়া নির্দেশনা বুঝতে পারবে না। তাকে তার ভাষায় বোঝাতে হবে। আর এই বোঝানোর  কাজটি করে থাকে অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেল।

এই লেখার একদম শুরুতে যে আবিষ্কারের কথা বলেছিলাম তা ছিল এই লিনাক্স কার্নেল। আমাদের সবার প্রিয় অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স কার্নেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এই কার্নেল শত শত ডেস্কটপ অপারেটিং সিস্টেমের প্রাণ জোগায়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে উবুন্টু। অনেকেই লিনাক্স বলতে লিনাক্স কার্নেল না বুঝিয়ে লিনাক্স কার্নেল ভিত্তিক ডেস্কটপ অপারেটিং সিস্টেম বুঝিয়ে থাকে। 

linux logo
লিনাক্স লোগো । চিত্রসুত্র : Wikimedia Commons

গিট

বিশ্বায়নের এই কালে লাখো সফটওয়্যার ডেভেলপারদের চোখের মণি হচ্ছে গিট। এটা জেনে অনেকে আশ্চর্য হয়ে যাবে যে এই গিট লিনাস আর তাঁর সহযোগী ডেভেলপারদের দ্বারা তৈরি। আপনারা হয়ত ভাবছেন গিট কী। গিট হচ্ছে এক ধরনের ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম। আপনার মনে আবারো প্রশ্ন জাগবে ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম কী। তাহলে চলুন সেটাও আপনাকে জানিয়ে দিই। 

মনে করুন, আপনাকে একজন (আপনার ক্লায়েন্ট) একটা সফটওয়্যারের কোড লিখে দিতে বলেছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আপনি কোডিং করলেন; তারপর কোডটা ক্লায়েন্টকে দেখালেন। ক্লায়েন্ট দেখে বলল ভালো হয়েছে কিন্তু এই জিনিসটা একটু পরিবর্তন করতে হবে। আপনি সেটা পরিবর্তন করলেন। তারপর আপনার ক্লায়েন্ট আবার আপনাকে অন্য কিছু একটা পরিবর্তন করতে বলল। আপনি সেটাও পরিবর্তন করলেন। 

এভাবে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করার পর আপনার ক্লায়েন্ট আপনাকে বলল একেবারে শুরুতে যেরকম ছিল সেটাই সবচেয়ে ভালো লাগছিল, আমি যেন কোডটা আবার আগের মত করে দিই। আপনি হয়ত রেগে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবেন। এখন আপনাকে কোডে যেসব পরিবর্তন এনেছিলেন তা ডিলিট করতে হবে। এখন আপনার তো মনে নাও থাকতে পারে একদম শুরুতে কোড কেমন ছিল। 

এখানেই ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হবে ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম। ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেমে আপনি  কোন কিছুর যখনই কোন পরিবর্তন করেন তখনি তা নতুন একটা ভার্সন হিসেবে তৈরি হয়। পরে আপনার যখন যেভাবে ইচ্ছে হবে এক ভার্সন থেকে অন্য ভার্সনে যেতে পারবেন। সাদামাটা ভাষায় এটাই হচ্ছে ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম। এই একবিংশ শতাব্দীতে গিট এই সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম। 

সবচেয়ে জনপ্রিয় ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম গিট
সবচেয়ে জনপ্রিয় ভার্সন নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম গিট । চিত্রসুত্র : Wikimedia Commons

সাবসারফেস

ক্লায়েন্টের জন্য সফটওয়্যারের কোড লিখতে লিখতে আপনি ক্লান্ত। চলুন, এবার স্কুবা ডাইভিং করতে যাওয়া যাক।  ওই যে এয়ার ট্যাংক কাঁধে নিয়ে সমুদ্রের নিচে ঘোরাফেরা করে আর সমুদ্রের নিচের সৌন্দর্য দেখে আমাদের মন বলে উঠে ইশ, আমারও যদি এমন করার সুযোগ হত। 

লিনাসের প্রিয় হবি হচ্ছে স্কুবা ডাইভিং। একদিন তিনি ভাবলেন আমি আমার প্রোগ্রামিং জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আমার প্রিয় হবির জন্য কোন সফটওয়ার বানাতে পারি কি না। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি বানিয়ে ফেললেন সাবসারফেস। এটা দিয়ে আপনি পানির কতটা গভীরে আছেন, সিলিন্ডার থেকে কতটুকু গ্যাস খরচ করছেন তার প্রতিটি হিসাব-নিকাশ রেকর্ড হয়ে থাকে। লিনাসের অন্য দুটি আবিষ্কারের তুলনায় এটি কম জনপ্রিয় হলেও শখের বসে তৈরি করা প্রোগ্রামের প্রতি তো অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করবেই। 

লিনাস টোরভাল্ডস অন্যদের মত বড় বড় স্বপ্ন দেখেন না। তাঁর মতে, 

পাঁচ বছর পর কী হবে তা আমি ভাবিনা, বরং আমার সামনে এই মুহূর্তে যে সমস্যা আছে আমি সেটা সমাধানেই বেশি আগ্রহী।

লিনাস টোরভাল্ডস, যাকে সম্মান দেখিয়ে একটি গ্রহাণুর নামকরণ করা হয়েছে, খুব প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। গুগল প্লাস ছাড়া তাঁর কোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নেই। এখন গুগোল প্লাস তো বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াই তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সুখের দিনযাপন করছেন। কারণ, এখন লিনাক্স কার্নেলের এত বেশি ডেভেলপার রয়েছে যে তাঁকে আর কোডিং করতে হয় না। 

লিনাস টোরভাল্ডস আর পাঁচ-দশটা মানুষের মত টাকা-পয়সা উপার্জনের পেছনে ছুটে বেড়ান না। স্টিভ জবস তাঁকে ম্যাক ওএস ডেভেলপ করার জন্য চাকরির অফার করেন। তিন কন্যার জনক লিনাস টোরভাল্ডস তা হাসিমুখে প্রত্যাখান করেন। বিনামূল্যে কোটি কোটি মানুষের জীবন পরিবর্তন করতে পারার আনন্দ তাঁকে যে শান্তির ঘুম এনে দেয়, কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের নরম গদি কি তা পারত !

ফিচার ইমেজ : Wikimedia Commons

তথ্যসূত্রঃ 

  1. Encyclopedia Britannica
  2. It’s FOSS
  3. TED

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
One Thought on লিনাস টোরভাল্ডস : যিনি হতে পারতেন বিল গেটস
    Moshiur Rakib
    12 Aug 2020
    9:06pm

    পুরো সময়টা মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলাম! সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল তার করা উক্তিটি। সত্যি অসাধারণ একটা আর্টিকেল পড়লাম।

    2
    1

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!