লাস ভেগাস: মায়াজালের যে শহরে পাপ কুড়ানো হয়

4.8
(21)
Bookmark

No account yet? Register

লাস ভেগাস! নামটা অনেকেই শুনে থাকবেন, আবার অনেকের নামটার সাথে পরিচয় এই প্রথমবার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে ঘনবসতি পূর্ণ শহর এটি। আন্তর্জাতিকভাবে রিসোর্ট নগরী হিসেবে পরচিত এই শহরটি বিশ্বের প্রমোদনগরী হিসেবে বিখ্যাত মূলত এখানকার বহুমুখী প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন, ক্যাসিনো ইত্যাদির জন্য। লাস ভেগাসকে বলা হয় “সিন সিটি” বা “পাপের শহর”।

অসামান্যতে লিখুন

লাস ভেগাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র মহানগরী যেটা বিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মরুভূমিতে একটা রেল সার্ভিস স্টেশন থেকে এই শহর বৃদ্ধি পেতে থাকে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বর্ধমান শহরে পরিগণিত হয় এই শহরটি।

কী এমন ছিল যা, লাসভেগাসকে দ্রুত মহানগরীতে পরিণত করে? সুবিস্তৃত পরিবহন ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, কৌশলি উদ্যোক্তা আর জনবান্ধব আইন ব্যবস্থা ইত্যাদি এই শহরের দ্রুত বৃদ্ধিতে কি যথেষ্ট নয়!

একসময় এ শহরটি “যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহবিচ্ছেদের রাজধানী” নামেও পরিচিত ছিল। এর নেপথ্যে ছিল অন্যান‌্য শহরের চাইতে এ শহরের বিবাহ বিচ্ছেদের হার।

লাস ভেগাস যেভাবে পাপের শহর

লাস ভেগাস এর প্রবেশদ্বারে স্বাগত সাইন
ছবি: স্বাগত সাইন; ছবিসূত্র: Pixabay

যখন কেউ ক্যাসিনোর জন্য বিখ্যাত স্থানগুলোর দিকে নজর দেয়, তখন সবার আগে যে নামটা আসে সেটা হচ্ছে লাস ভেগাস! যেখানে যে কেউ মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়নিয়ার হয়ে যেতে পারে আবার মুহূর্তের মধ্যে গৃহহীনও। লাস ভেগাস শহরটি এমন যে, আপনাকে বাস্তব জীবন থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দিতে পারে, বিনোদনের সীমাহীন তৃপ্তি পাইয়ে দিয়ে। ফলশ্রুতিতে বাস্তব পৃথিবী থেকে আপনি ছিটকে যাবেন অনেক দূরে।

লাস ভেগাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এটি নেভাডা অঙ্গরাজ্যের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। এই শহরে মানুষ আসে লাগামহীন স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে, লাগামহীন এই স্বাধীনতা অনেকটা স্বেচ্ছাচারিতাও বটে! যা সম্ভব করে দিয়েছে এখানকার অপরাধ সহনশীল আইন কানুন। বিশ্বের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ এই শহরটিতে আছে বিশ্বের বড় বড় সব ক্যাসিনো। একসময় এ অঞ্চলে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ছিল কিন্তু এখন সে জুয়াই এই শহরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধানতম হাতিয়ার।

নেভাডা অঙ্গরাজ্যে ১৯১০ সালে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু জুয়া একেবারেই বন্ধ করা যায়নি, অবৈধ ক্যাসিনো গুলোতে জুয়া খেলা অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে শহরটির স্থানীয় ব্যবসা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য জুয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করে জুয়া খেলাকে বৈধ করে দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালে সর্বপ্রথম নর্দান ক্লাবকে জুয়ার জন্য লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র দেওয়া হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য ক্লাব ও হোটেল গুলোকেও ক্যাসিনোর অনুমতি দেওয়া হয়।

এখানে সবাই জুয়া খেলতে আসে এমনটাও নয়, অনেকেই আসে শহরটাকে দেখতে। এই শহরে আসা প্রতিটি মানুষের উদ্দেশ্যে জুয়া খেলা না হলেও সবাই আর জুয়া খেলার লোভ সামলে উঠতে পারে না। কেউ কেউ আসে নিজের শেষ সম্বল নিয়ে ধনী বনে যেতে, আর কেউ আসে ধনী থেকে আরো ধনী হতে কিন্তু সবার ভাগ্য তো আর সহায় হয় না।

লাস ভেগাস এ জুয়ার আসর;
ছবি: লাস ভেগাসে জুয়ার আসর; ছবিসূত্র: Unsplash

লাস ভেগাসকে প্রধানত প্রাপ্ত বয়স্ক আকর্ষণগুলোর কারণে পাপের শহর হিসাবে অভিহিত করা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনের স্বর্গনগরী বলা চলে এই লাস ভেগাসকে। যা এই শহরকে পাপের শহরে পরিণত করেছে। নেভাডায় অবস্থিত এই শহরটি বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় শহর। এখানে জুয়া খেলা সহ প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনের অসংখ্য স্থান রয়েছে।

বাংলা সিনেমায় হয়তো দেখে থাকবেন, জুয়া খেলার জন্য নিজের বউকে বন্ধক দিতে। রীতিমত অবাক করার বিষয়, তাই না? অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জেগেছিল “এটা কি করে সম্ভব হতে পারে!” লাস ভেগাস শহরে এটাও কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

এই পাপের শহরে সহজেই মদ্য পানীয় পাওয়া যায়। প্রায় প্রতিটি হোটেল এবং ক্যাসিনোতে একটি করে বার আছে। এমনকি অনেক ক্যাসিনো আছে, যারা জুয়া খেলছেন তাদের জন্য মদ্য পানীয় সরবরাহ করে থাকে। ক্যাসিনোগুলোর বাইরেও মদের দোকান রয়েছে যেখানে মাদক জাতীয় পানীয় পাওয়া যায়।

এসব অনৈতিক কাজগুলো বিকৃতমনাদের নিকট স্বাধীনতা হলেও বিবেকবানদের কাছে নিঃসন্দেহে এসব পাপ কাজ  হিসেবেই গণ্য। শুধু কি এসব অনৈতিক কাজের জন্যই লাস ভেগাস পাপের শহর নামে পরিচিত, নাকি আরো কারন আছে? তার জন্য লাস ভেগাসের শুরুর ইতিহাসও জানা দরকার।

আরও পড়ুন: পর্যটকদের কাছে এশিয়া ভ্রমণের সেরা ১০ টি দর্শনীয় স্থান

মরুভূমি থেকে মেট্রোপলিটন

মোজেভ মরুভূমি
ছবি: মোজেভ মরুভূমি; ছবি সূত্র: Unsplash

মোজেভ মরুভূমির অন্তর্গত লাস ভেগাস জনশূন্য মরু অঞ্চল থেকে জনবহুল মেট্রোপলিটন এ পরিণত হওয়ার পেছনেও রয়েছে পাপের গল্প।

১৯০৫ সালে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য লস এঞ্জেলসসল্টলেক সিটির মধ্যে রেল লাইন তৈরি করা হয়। লাস ভেগাসে রেললাইনটির সংযোগস্থলে একটা সার্ভিস স্টেশন খোলা হয়। সেই থেকে এখানে জনবসতি গড়ে উঠে। তখন ক্রমান্বয়ে লাস ভেগাসে শহরায়ন গড়ছিল। ১৯০৫ সালে গড়ে ওঠা অঞ্চলটি ১৯১১ সালে এসে শহর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন আশপাশ থেকে মানুষ আসতে শুরু করে কাজের সন্ধানে। বিশেষ করে কম বয়সী যুবকদের ভীড় বাড়ছিল ভাগ্য বদলানোর আশায়।

হুভার বাঁধ
ছবি: হুভার বাঁধ; ছবি সূত্র: Unsplash

১৯৩১ সালের কথা, শহরের ঠিক পূর্ব দিকে হাজার হাজার শ্রমিকের খাটুনিতে বিশাল বোল্ডার বাঁধের (পরবর্তীতে “হুভার বাঁধ” নামে নামকরণ করা হয়) নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল । বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে কর্মরত কর্মীদের আকৃষ্ট করার জন্য শহরের একমাত্র পাকা রাস্তা ফ্রেমন্ট স্ট্রিটে ক্যাসিনো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে কিছু একটা করার কথা ভাবে সেই সময়ের জুয়াড়ি, কালো পাচারি আর মাফিয়ারা। নিজেদের অবৈধ টাকা বৈধ করার লক্ষ্যে লাস ভেগাসে প্রচুর বিনিয়োগ করতে থাকে তারা। গড়ে তুলে ক্যাসিনো, থিয়েটর আর বিলাসীতার কেন্দ্র। ভাগ্যের সন্ধানে থাকা যুবকদের বিলাসীতায় ভাসিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে।

দিনভর কাজ করে রাতজেগে বিলাসীতায়, অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে সুখ খুঁজে নেয় সেখানকার তৎকালীন বাসিন্দারা। সেই ধারা আজও বজায় আছে। ঘড়ির কাঁটা কখনও থামে না লাস ভেগাস নামক পাপের শহরে! দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই জাগ্রত থাকে ব্যস্ত শহরটি। ক্যাসিনো বৈধ করা হলে এবং নিকটবতী হুভার বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা হলে ১৯৩১ সালে শহরটি পূর্ণগতি পায়। যা শহরটির সমৃদ্ধিতে অনেক অবদান রাখে।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, শহর কর্তৃপক্ষ শহরটির চেহারা পাল্টানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল শহরটিতে জনবসতি বাড়ানো এবং প্রমোদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। যেখানে প্রাপ্তবয়স্করা মজা করতে এবং কিছুটা পাপ কুড়াতে পারে।

পাপের শহরটির বৈশিষ্ট্য

লাস ভেগাস এর রাতের দৃশ্য
ছবি: লাস ভেগাসে রাতের দৃশ্য; ছবি সূত্র: Pixabay

লাস ভেগাস পৃথিবীর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও আলোক উজ্জ্বল শহরগুলোর মধ্যে একটি। রাতের বেলা লাখ লাখ রং বেরঙের লাইট দ্বারা সজ্জিত হয় শহরটি। আর এখানকার স্থাপত্যশৈলিও নজরকাড়া এবং মনোমুগ্ধকর।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাঁচের তৈরি পিরামিডটির অবস্থান এ শহরটিতেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় হোটেলগুলোর অনেকগুলোই শহরটিতে রয়েছে, যেগুলোর ধারণক্ষমতা ৫,০০০+ রুমের উপরে!

ভালেজিও হোটেল ও ক্যাসিনো
ছবি: ভালেজিও হোটেল ও ক্যাসিনো; ছবি সূত্র: Casino

এসব কিছু প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটককে আকৃষ্ট করে, টেনে নিয়ে আসে লাস ভেগাসের মোহনীয় টানে। সারাবছর ধরে পর্যটকরা আসেন লাস ভেগাস শহরে। একসময়কার জনমানবশূন্য মরু অঞ্চল আজ বড্ড ব্যস্ত এক নগরী, যেখানে এসে মানুষ লাগামহীন স্বাধীনতায় বিনোদন খোঁজে, আর কিছু পাপের ভাগীদার হয়ে নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে নানা ধরনের অপরাধ, আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদক গ্রহণের হার ইত্যাদির দিক দিয়ে লাস ভেগাসের অবস্থান শীর্ষতম স্থানে।

পৃথিবীর অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ ও বিলাসী আলোক উজ্জ্বল এই শহরে অন্ধকার জীবনের রেশও বিদ্যমান, সুখের মাঝে যেমন দুঃখও থাকে ঠিক তেমন! জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্য, চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য, হোটেল, ক্যাসিনো দ্বারা পরিকল্পিতভাবে সুকৌশলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে লাস ভেগাসের অন্ধকারকে। প্রাণবন্ত আলোগুলি শহরের অন্ধকার দিকটিকে লুকিয়ে রেখেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। শহরটির মাঝে রয়েছে একটি ভূ-গর্ভস্থ ট্যানেল, যেখানে হাজার হাজার মানুষের বাস। গৃহহীন, মানসিক ভারসাম্যহীন ও যারা শহরিটির বিলাসী চাকচিক্যের মোহে সব হারিয়ে নিঃস্ব তাদের আশ্রয়স্থল হয় ট্যানেলটি।

ব্ল্যাকবুক! শহরটির ক্যাসিনোগুলোর রয়েছে একটা ব্ল্যাকবুক। ব্ল্যাকবুকে যাদের নাম তালিকাভুক্ত হবে, ক্যাসিনোতে তাদের প্রবেশে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। পাপের শহরটি যেন একটা চুম্বক ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ আসে কিছুটা বিনোদন পেতে, নিজেকে বাস্তব জগত থেকে দূরে রাখতে, মোহনীয় চাকচিক্যের আড়ালে! লাস ভেগাস নামক পাপের শহর আজ বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে দাড়িয়ে আছে কিছু মানুষের আবেগ আর নেশার উপর ভর করে।

ফিচার ইমেজ সোর্স: Unsplash

তথ্যসূত্র:

  1. Britannica
  2. History
  3. Neighborhoods
  4. Oh Fact
  5. Forbes

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on লাস ভেগাস: মায়াজালের যে শহরে পাপ কুড়ানো হয়

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!