প্রচ্ছদচিত্র

রুমি: শিক্ষক থেকে সুফিবাদী, ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুসলিম কবি

3.1
(7)
Bookmark

No account yet? Register

অনেক নামেই পরিচিত জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি। তবে ইংরেজিতে রুমি নামেই পরিচিত। তাঁর পুরো নাম জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ বালখী বা জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি। বালখী এবং বালখা দুটোই তাঁর পরিচিত নাম।  

অসামান্যতে লিখুন

জালাল উদ্দিন রুমি ১২০৭ ওয়াখশ অথবা বালখা খায়ারিজমীয় সম্রাজ্যে জন্মগ্রহন করেন। বর্তমানে যা আফগানিস্থান নামে পরিচিত। তাঁর বাবা ছিলেন বাহা-উদ্দিন ওলাদ। তিনি ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, আইনজীবী এবং অতীন্দ্রিয়বাদী। তিনি রুমির অনুসারীদের কাছে সুলতান আল-উলামা নামে পরিচিত।  রুমির মায়ের নাম ছিল মুমিনা খাতুন।

সাদাকালো রুমি
সাদাকালো রুমি। Source: Steviestao

ভ্রমণ

এশিয়ার সাথে মোঙ্গলদের যুদ্ধ সংক্রান্ত কারণে ১২১৫-১২২০ সালে রুমি তাঁর পরিবারের সাথে বালখা অতিক্রম করেন। বালখা অতিক্রম করার পর, তাঁরা একটি কাফেলার সন্ধান পান যাদের উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিম দেশগুলো ভ্রমণ। রুমির পরিবার কাফেলাদের সাথে যোগ দেন এবং কাফেলাদের সাথে মুসলিম দেশগুলো যেমন: বাগদাদ, দামেস্ক, মালায়তা, এরযিঞ্চান, সিভাস, কেয়সারি এবং নিগদে ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ শেষে রুমির পরিবার কেনিয়াতে স্থায়ী হবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে তাঁরা মক্কার দিকে যাত্রা করে। পথিমধ্যে,  নিশাপুর থেকে ওয়ালাদ এবং তাঁর লোকজন বাগদাদের দিকে রওনা হন এবং অনেক পণ্ডিত ও সুফিদের সাথে সাক্ষাত করেন। তাঁরা বাগদাদ থেকে হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং মক্কায় হজ্জ পালন করেন।

দন্ডায়মান রুমি ও তার সমাধিস্থল|
দন্ডায়মান রুমি ও তার সমাধিস্থল| চিত্রসূত্র: institut-cultures-islam.org

ক্যারিয়ার গঠন

বালখা অতিক্রম করার আগে রুমি’র বাবা ছিলেন একজন ইসলামিক ধর্মতত্ত্ববিদ, শিক্ষক এবং  প্রচারক।

রুমির ক্যারিয়ার গঠন হবার আগেই রুমি সায়্যেদ বুরহান উদ্দিন মুহাককিক তেরমাযির শিষ্য ছিলেন। সায়্যেদ বুরহান উদ্দিন মুহাককিক তেরমাযি মূলত ছিলেন রুমি’র বাবা বাহা-উদ্দিন ওলাদ এর ছাত্র। সৈয়দ তেরমাযির শিষ্য থাকা অবস্থায় রুমি সুফিবাদ এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ের উপর প্রচুর জ্ঞান লাভ করেন। ১২৩১ সালে পিতার মৃত্যুর পর রুমি তাঁর পিতার পেশায় নিয়োজিত হন এবং কেনিয়ার একটি মসজিদে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। ২৪ বছর পদার্পণের পর রুমি নিজেকে একজন যাথার্থ জ্ঞানসম্পন্ন ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে প্রমাণিত করেন।  

সুফিবাদ এবং রুমি

রুমি ইতোমধ্যেই একজন শিক্ষক এবং একজন ধর্মতত্ত্ববিদ। সে সময়ে দরবেশ শামস তাবরিজি এর সাথে সাক্ষাৎ হয় ১৫ নভেম্বর ১২৪৪ সালে। এটি তাঁর জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়। একজন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষক এবং আইনজ্ঞ থেকে রুমি একজন সাধুতে রূপান্তরিত হন।

দরবেশ শামস মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ভ্রমণ করে খুঁজছেন এবং বলছেন, 

কে আমার সঙ্গ সহ্য করিবে?

একটি কন্ঠ তাঁকে বলল,

বিনিময়ে তুমি কী দিবে?

শামস উত্তর দিলেন,

আমার মস্তক!

কন্ঠটি আবার বলল,

তাহলে তুমি যাকে খুঁজছ সে কেনিয়ার জালাল উদ্দিন।

শামস তাবরিজি
শামস তাবরিজি| চিত্রসূত্র:  Pinterest

সেখানে রুমির সাথে শামসের অনেক আলোচনা হয়। সেই আলোচনা তাঁর জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। তারপর থেকে শামসুদ্দিন এবং রুমি গভীর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। শামসের প্রথম সাক্ষাতের বিষয়ে রুমি লিখেছিলেন,

আমি সৃষ্টিকর্তা হিসাবে আগে যা ভেবেছিলাম আজ তা মানুষের মাঝে খুঁজে পেলাম।

কিন্তু তাঁদের এই বন্ধুত্ব ছিল অল্প সময়ের। কেননা শামসুদ্দীন কোন কারণে দামেস্ক গিয়েছিলেন। ১২৪৮ সালের ৫ ডিসেম্বর রাতে রুমি এবং শামস কথা বলছিলেন। এমন সময় কেউ শামসকে পিছনের দরজায় ডাকে। তিনি বের হয়ে যান এবং এরপর আর কোথাও কখনো দেখা যায়নি। গুজবে শোনা যায় যে রুমির পুত্র আলাউদ্দিন এর মৌনসম্মতিতে শামসকে হত্যা করা হয়। যদি তাই হয় তাহলে শামস এই রহস্যময় বন্ধুত্বের জন্য তাঁর মাথা দিয়েছেন যা তিনি ইতোমধ্যে কথা দিয়েছিলেন। শামসুদ্দিনের এ দুর্দশার মৃত্যুর কারণে রুমি তা গান, নাচ এবং সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশিত করেন।

কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ 

শামসের জন্য রুমির ভালবাসা এবং তাঁর মৃত্যুতে শোকের প্রকাশ তিনি করেছেন দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজী কাব্যগ্রন্থে। তিনি নিজে শামসের খোঁজে বের হয়ে গেছেন এবং দামেস্ক ভ্রমণ করেছেন। সেখানে তিনি নিজেকে বুঝতে পারলেন এবং লিখলেন-

আমি তাঁকে কেন খুঁজব? সে আর আমি তো একই! তাঁর অস্তিত্ব আমার মাঝে বিরাজ করে, আমি নিজেকেই খুঁজছি!

রুমি অনায়াসে গজল রচনা করতে শুরু করলেন এবং সেগুলো দেওয়ান-ই কবির বা দেওয়ান শামস তাবরিজীতে সংগৃহীত হয়।

আত্মমগ্ন রুমি ও তার লেখালেখি মনোভাব
আত্মমগ্ন রুমি ও তার লেখালেখি মনোভাব। চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

লেখালেখি

রুমি কবিতার বিষয়ে ছিল উৎসাহী, আধ্যাত্মিক এবং প্রগাঢ়। তাঁর কবিতা যেন বিস্ফোরণের মতো, যা আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটায়। তিনি এমন ভাবে লিখতে পারতেন যেকোন বিষয়ের উপর যেমনটা মানুষের প্রত্যাশা থাকে প্রকৃতি নিয়ে। তাঁর কবিতা বেশ ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। তেমন কয়েকটি লেখা হল- 

মৃত হও, নতুন এই ভালোবাসা মৃত হও এর অভ্যন্তরে; তোমার যে পথ, তার শুরু ঠিক এর অন্যপাশে। বিস্তৃত আকাশ হও তুমি; কুঠারে আঘাত হানো কারাগার দেয়ালে;

পালাও, মুক্ত হও; বেড়িয়ে পড়ো অসীমে; বেড়িয়ে পড়ো এমন, যেনো কেউ মাত্রই জন্ম নিয়েছে হঠাৎ রঙে; জলদি, এক্ষুণি; ঘন মেঘাবৃত তুমি;

সরে পড়ো অন্যপাশে মৃত হও এবং স্থির; স্থিরতা একটি নিশ্চিত নিদর্শন যে তুমি মারা গিয়েছ; তোমার অতীত জীবন যা ছিলো নিরবতা থেকে এক ক্ষিপ্র দৌড়;

আশ্চর্য-নির্বাক করা পূর্ণিমার চাঁদ দেখো— বেরিয়ে এসেছে এখন! এছাড়া তাঁর জনপ্রিয় আর একটি লেখা হল: আমি পাথর হয়ে মরি আবার গাছ হয়ে জন্মাই; গাছ হয়ে মরি আবার পশু হয়ে জাগি; পশু হয়ে মরি আবার মানুষ হয়ে জন্মাই

তাহলে ভয় কিসের? কি বা হারাবার আছে মৃত্যুতে?  পরবর্তী পদক্ষেপে আমি মানুষের প্রকৃতিতে মারা যাব; যাতে স্বর্গদূতের সাথে আমার মাথা এবং আবার ডানা উঁচু করতে পারি; এবং অবশ্যই স্বর্গদূতদের নদী থেকে লাফ দিব,

সবকিছু নশ্বর শুধুমাত্র; তিনি (সৃষ্টিকর্তা) ছাড়া; আবারও আমি স্বর্গদূতদের মধ্য থেকে উৎসৃষ্ট হব; আমি কি হব তা আমার কল্পনার বাইরে,

তারপর আমি অস্তিত্বহীন হব; অস্তিত্বহীন আমকে বলে বাঁশির ন্যায়; প্রকৃতপক্ষে, তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন।

দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজী - ১৫০৩ সালের একটি পৃষ্ঠার অনুকরণ।
দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজী – ১৫০৩ সালের একটি পৃষ্ঠার অনুকরণ। চিত্রসূত্র: rankly.com

রুমি ও তাঁর মনোভাব

প্রতিদিনের দৃশ্য, কোরআনের আয়াত এবং ব্যাখ্যা, জটিল এবং বিশাল আধ্যাত্নবাদ থেকে মসনবী রচিত হত। প্রাচ্যে তাঁর সম্পর্কে বলা হয় যে

সে একজন নবী নয় কিন্তু এটা নিশ্চিত যে সে একটি ধর্মশাস্ত্র নিয়ে এসেছে

রুমি প্রচন্ডভাবে বিশ্বাস করতেন যে সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছানোর রাস্তা হচ্ছে সঙ্গীত, কবিতা এবং নৃত্য। রুমির কাছে, সঙ্গীত সাহায্য করে সমস্ত সত্তাকে কেন্দ্রীভূত করে পবিত্র করতে এবং এতই তীব্রভাবে যে আত্না একই সাথে ধ্বংস এবং পুনরুত্থিত হয়। এই ধারণা থেকে সুফি নৃত্য গড়ে উঠে। তার শিক্ষা মৌলভি তরিকার ভিত্তি হয়ে উঠে, যেটি তাঁর ছেলে সুলতান ওয়ালাদ পূর্ণাঙ্গ করেছিলেন। রুমি সামা এর পৃষ্ঠপোষক এটি সঙ্গীত শোনার মাধ্যমে পবিত্র ভাবে নর্তন করা। মৌলভি ঐতিহ্যের মধ্যে সামা প্রতিনিধিত্ব করে মন এবং ভালবাসার মাধ্যমে একের নিকট আধ্যাত্মিক আরোহণের এক রহস্যময় ভ্রমণ। এই ভ্রমণে অন্বেষক সত্যের দিকে ফিরে, ভালবাসা বৃদ্ধি পায়, অহং পরিত্যাগ করে, সত্যের সন্ধান পায় এবং নির্ভুল একের নিকট পৌঁছায়। এরপর অন্বেষক আধ্যাত্মিক ভ্রমণ থেকে ফেরে, পরিপক্কতা লাভের মাধ্যমে সৃষ্টিকে ভালবাসতে এবং সেবা করতে।

আরও পড়ুন: শাহ সিকান্দার জুলকারনাইন: একজন দিগ্বিজয়ী বীর (১ম পর্ব)

রুমি এবং তাঁর সমৃদ্ধি 

এতকাল পরেও জালালুদ্দিন রুমি বেশ সমাদৃত একজন লেখক। কেননা মৃত্যুর প্রায় ৮০০ বছর পরেও তিনি প্রসিদ্ধ। তার মূল কারণ হিসেবে বলা যায় তাঁর কাজের চিরন্তন বার্তা। এ জন্য এখন রুমি বেশ জনপ্রিয় একজন কবি। তাঁর লেখা এখন বেশ সমৃদ্ধ। তাঁর লেখা সবসময় প্রকৃতি এবং জীবনকে ফুটিয়ে তোলে। বিবিসির এক জরিপে বলছে আমারিকান সভ্যতায় রুমি সবথেকে জনপ্রিয় একজন কবি। রুমি তাঁর বেশীরভাগ লেখা লিখেছেন ৩৭-৬৭ বছরের মধ্যে। প্রতি বছর তাঁর বিপুল পরিমাণ লেখা বিক্রি হয় এবং আমেরিকায় তাঁর জ্নপ্রিয়তা কল্পনাতীত। এখনো তিনি সেরা লেখক উপাধিতে রয়েছেন আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র সহ বেশ কিছু দেশে।

রুমির শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম মসনবি পারসিক সাহিত্য হিসেবে যাতে প্রায় ২৭০০০ লাইন রয়েছে। তাঁর আরেকটি কাব্যগ্রন্থ দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজ। এর বাইরে তিনি আনুমানিক ৩৫০০০ পারসিক শ্লোক এবং ২০০০ পারসিক রুবাইয়্যাৎ লিখছেন।

ধারণা করা হয় কবিতার উপর সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই রুমির। এখন পর্যন্ত পঞ্চাশেরও বেশি ভাষায় রুমির কবিতা অনুদিত হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষদিকে কবিতার অনুবাদের পর থেকে পাশ্চাত্যে রুমি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। Harperone এর Essential Rumi সারা বিশ্বে ২৩ টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে এবং প্রায় দুই মিলিয়নের অধিক বই বিক্রি হয়েছে। গত দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আমেরিকায় সর্বাধিক বিক্রিত বই রুমির। রুমির কবিতা সবথেকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কোলম্যান বার্কসের অনুবাদের পর থেকে। ইউনেস্কো তাঁর নামে একটি মেডেল চালু করে এবং ওই বছরকে আন্তর্জাতিক রুমি বছর হিসেবে ঘোষণা করে। আমারিকায় লেখক, সাহিত্যিক শিল্পী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সিনেমা গল্প সাহিত্যে যুক্ত হচ্ছে রুমির কর্ম। প্রায় ১২ টি দেশের কবি রুমির দ্বারা প্রভাবিত। এর মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম এবং পাকিস্তানের স্যার আল্লামা ইকবাল অন্যতম।

যে কারণে সমাদৃত

রুমিকে বলা হয় প্রেম ও ভালবাসার মহান কবি। ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তাবাদ নির্বিশেষে তিনি ঈশ্বর, মানুষ, আত্মা এবং মহাবিশ্বের প্রেমের গান গেয়েছেন। তাঁর উদ্দীপনামূলক কবিতাগুলো প্রচণ্ড শক্তি এবং অনুরণন নিয়ে বৈশ্বিক কণ্ঠে প্রতিটি মানব হৃদয়কে আন্দোলিত করে। তিনি চিত্রকল্প রুপক হিসেবে তুলে ধরেছেন মানুষের অতি পরিচিত অনুষঙ্গ। বিষয়বস্তু নির্ধারণে তিনি সূক্ষ্ম অর্ন্তদৃষ্টিতে তুলে এনেছেন ফুল, পাখি, নক্ষত্র, চাঁদ, সূর্য, নদী ও মাছ ইত্যাদির দার্শনিক চিত্রকল্প যা একইভাবে জীবন্ত রয়ে গেছে শত শত বছর পরেও। অনেকেই রুমির কবিতাকে পারসিক অনুবাদ হিসেবে অভিহিত করেন। প্রায় কয়েক সহস্রাধিক লাইন কোরআন থেকে পারসিক অনুবাদ হিসেবে তিনি তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন। ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, মহাবিশ্ব থেকে শুরু করে মানব জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে তুলে এনেছেন কবিতায়। দাতব্য সেবা, স্রষ্টার অনুভূতি, ধৈর্য্য, ভালোবাসার মাধ্যমে তিনি ৮০০ বছর পরেও পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে রয়েছেন। 

কবিদের ধারণা এবং রুমি

রুমি’র সম্পর্কে ব্রাড গুছ বলেছেন- রুমি সাহিত্য রচনার সময় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দ্রুততার সহিত নিজেকে পরিচালিত করতেন, যেটি তিনি ঠিক মনে করতেন

রুমির এই লেখালেখির বিষয়ে অনেক কবি অনেক মন্তব্য করেন যা তাকে আরো প্রসিদ্ধ করেছে। যা তার খ্যাতি ও শান বাড়াতে অনেক ভুমিকা পালন করে।

এছাড়াও ব্রাড গুছ বলেছেন: সে (রুমি) হল আনন্দ এবং ভালবাসার কবি

শাহারিন শিবা দাবি করেন-  রুমি উচ্চ ব্যক্তিসত্ত্বা সম্পন্ন এবং মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত ব্যক্তি ও বুদ্ধির জগতকে গুলিয়ে ফেলেন একটি স্পষ্ট এবং সরাসরি ছন্দে। তিনি কখন কারো উপর ক্ষুদ্ধ হন না এবং তিনি সবাইকে অন্তভূক্ত করেন। 

রুমির আরেক বন্ধুলাভ

দরবেশ শামস তাবরিজির সাথে আলোচনা হবার দশ বছরে রুমি একাগ্রচিত্তে গজল লিখা শুরু করেন। পরবর্তীতে যা দিওয়ানে কাবির এনং দিওয়ানে সামস তাবরিযি নামে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা করেন।  রুমি আরেকজন সঙ্গীর খোঁজ পান সালা উদ্দিন-ই জারকুব, যিনি একজন স্বর্ণকার। সালা উদ্দিন এর মৃত্যুর পর রুমির কেরাণী এবং প্রিয় ছাত্র হুসাম-এ চালাবি রুমির সঙ্গীর ভূমিকা পালন করেন। একদিন তাঁরা কোনিয়ার বাইরে একটি আঙুরক্ষেতে বিচরণ করছিলেন, হুসাম রুমিকে বললেন, “আপনি একটি বই লিখেতে পারেন যা সানাই এর এলাহিনামা বা আত্তার এর মাতিক উত-তাইর এর মত”। রুমি মুচকি হেসেছিলেন এবং এক টুকরো কাগজ বের করে এর প্রথম আঠারো লাইন লিখেছিলেন।  যা পরবর্তীতে মসনবী  নামে নামকরণ করেছিলেন।

বাঁশের বাঁশি যখন বাজে, তখন তোমরা মন দিয়া শোন, সে কি বলে, সে তাহার বিরহ বেদনায় অনুতপ্ত হইয়া ক্রন্দন করিতেছে …

রুমি ও সুফিবাদ

জালালুদ্দিন রুমির কবিতার কেন্দ্রে যা আছে তা হচ্ছে সূফিবাদ। ধারণা করা হয় সুফিবাদের বা সুফিজমের প্রথম চর্চা করেন হযরত আলী (রা.)। আমাদের দেশের বড় কবিরা বলে থাকেন, কবিতায় ধর্ম লেগে গেলে জাত যায়, কবিতা আর কবিতা থাকে না, নষ্ট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে রুমির কবিতায় কি ধর্ম নেই? আসলে রুমির কবিতার মূল বিষয় হলো সুফিবাদ। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাই সুফিচর্চার মূল লক্ষ্য। অনেকেই এখনও এই চিন্তার সমর্থক। বাহ্যিক ইবাদত ছাড়া আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব বলে যারা মনে করে সুফিজম এসেছে তাদের কাছে ভিন্ন রূপে। সুফিজমকে কেউ গান বাজনার সাথে মিলিয়ে ফেলেন। শুধু আধ্যাত্মিক উপায়ে গান বাজনা করলেই হয়না; সেটিকে খোদা ভজনের সাথে নিয়ে যেতে হবে এমনটাই সুফিবাদের চর্চাকারীরা মনে করেন। রুমি এসব বিষয়ে বিশ্বাস করতেন বলে তাঁকে সুফিবাদি বলা হয়।

সুফি নৃত্য বা সেমা
সুফি নৃত্য বা সেমা। চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

রুমি ও তাঁর কিছু অমর বাণী

  • মোমবাতি হওয়া সহজ কাজ নয়, তার জন্য নিজেকেই আগে পুড়তে হয়।
  • বৃক্ষের মতো হও, আর মরা পাতাগুলো ঝরে পড়তে দাও।
  • ঘষা খেতে যদি ভয় পাও, তবে চকচক করবে কিভাবে?
  • যে কখনো বাড়ি ছাড়েনি, তার কাছ থেকে যাত্রার উপদেশ নিও না।
  • শুধু তৃষ্ণার্ত পানি খুঁজে না, পানিও তৃষ্ণার্তকে খোঁজে।
  •  যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজের ভিতরের আগুন খুঁজে না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি জীবনের বসন্ত খুঁজে পাবে না।
  • জীবনের অর্ধেককাল কেটে যায় অন্যকে মুগ্ধ করার প্রচেষ্টায়; বাকি অর্ধেক কাটে অন্যের দেয়া দুশ্চিন্তার ভারে।

এমন অনেক উপদেশমূলক কথা জালালুদ্দিন রুমি বলে গেছেন যা তাঁকে আরো স্মরণীয় করে রেখেছে।

রুমি এবং তাঁর জীবনাবসান 

১৭ ডিসেম্বর ১২৭৩ সালে রুমি কোনিয়ায় মারা যান। তাঁকে তাঁর পিতার কাছে সমাহিত করা হয়। চমকপ্রদ স্থাপত্যকীর্তিতে তৈরি ইয়াসিল তুর্ব  (সবুজ সমাধি, যা বর্তমানে মাওলানা মিউজিয়াম), তাঁর কবরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর সমাধিফলকে লেখা:

যখন আমি মৃত;

পৃথিবীতে আমার সমাধি না খুঁজে,

আমাকে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও।

ইয়াসিল তুর্ব (সবুজ সমাধি) রুমি ও তাঁর সবুজ মাজার
ইয়াসিল তুর্ব (সবুজ সমাধি) রুমি ও তাঁর সবুজ মাজার। চিত্রসূত্র: Taticflickr.com

জর্জিয়ার রানী গুরসু খাতুন ছিলেন রুমির উৎসাহদাতা এবং কাছের বন্ধু। তিনি কোনিয়াতে রুমির সমাধি নির্মাণে তহবিল প্রদান করেন। ১৩ শতকের মাওলানা মিউজিয়াম সহ তাঁর মসজিদ, থাকার জায়গা, বিদ্যালয় এবং মৌলভি তরিকার অন্যান্য ব্যক্তিদের সমাধি দেখতে এখনো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম-অমুসলিমরা ছুটে যায়।

তথ্যসূত্র:

প্রচ্ছদ চিত্র: Integrallife

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on রুমি: শিক্ষক থেকে সুফিবাদী, ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুসলিম কবি

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!