রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা নক্ষত্র

করবী কানন শিশির
4.2
(20)
Bookmark

No account yet? Register

স্বাধীনতার চেতনা আর সংগ্রামী সুর ছিল যার কবিতায়, যিনি যুদ্ধধন্য দেশবাসীর মাঝে আশাজাগানিয়া বাণী ছড়িয়েছিলেন, তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বেড়ে ওঠা কিশোর, স্বাধীনতা উত্তর সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। যাঁর জীবন ও কবিতা ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কবিতাই তাঁর জীবন আর জীবনই কবিতা। জীবনদর্শন খুঁজলে তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। আবার সাহিত্যবৈশিষ্ট্যেই ফুটে উঠেছে তাঁর জীবনদর্শন।

আমি দুর্বিনীত, নির্ভীক সৈনিক

জন্মেছি এঁদো বস্তির দুর্গন্ধতায়

অন্ধকার কালরাতে জলন্ত স্ফুলিঙ্গ যেন-

প্রচন্ড উত্তপ্ত এক বুক উত্তপ্ত নক্ষত্র।

দ্বন্দ্বের মুখোমুখি ভাঙনের উল্লাসে

আমি অট্টহাসে কাঁপাই ভুবন,

শোষণের স্বর্ণলঙ্কা পোড়াই,

লেজের বীভৎস হনুমান অগ্নিতে।

ঘুণে ধরা সমাজের ঘরখানা

পদাঘাতে ভেঙে ফেলি চুরমার

আমি শাসন শোষন ভয় করিনা।

কবিতাটি সতের বছর বয়সী কবি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা। শৈশব থেকেই নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের সাথে তাঁর পরিচয়। কিন্তু তাঁর লেখনীতে নজরুলের প্রভাব স্পষ্ট। প্রতিবাদী রুদ্রমূর্তির কারণে তিনি নিজেই পিতৃপ্রদত্ত নামকে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে তার সাথে “রুদ্র” জুড়ে দিলেন। এই নাম নিয়েও পরে গেলেন বিপত্তিতে। অনেক প্রকাশকই রুদ্র নামে কবিতা ছাপাতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু তার জেদের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই নামেই কবিতা প্রকাশ করতে রাজি হন। পিতৃপ্রদত্ত নাম “মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ” কে পরিবর্তন করে “মুহম্মদ শহিদুল্লাহ” করেছেন। সেটি শুধু সাহিত্য অঙ্গনেই নয় তাঁর শিক্ষাজীবনের সনদেও ব্যবহার করেছেন। হ্যাঁ আমরা তাঁকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নামেই চিনি। বন্ধু ও পরিচিতজনদের কাছে তিনি রুদ্র নাম শুনতেই বেশি পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে বন্ধুরা দুষ্টুমি করে শহিদুল্লাহ নামে ডাকতেন, কবি তাতে দারুণ রেগে যেতেন।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। চিত্রসূত্র: জীবনীগ্রন্থ-রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

কবি ও ব্যক্তি রুদ্র

রুদ্র ছিলেন প্রতিবাদী, দ্রোহী, অভিমানী, হাস্যোজ্বল, প্রাণবন্ত এক যুবক। এই প্রতিবাদী মনোভাব তাঁর লেখনী ও জীবনাচরণে সর্বদা ঝরে পড়েছে। স্বৈরাচার বিরোধীতায় তিনি গড়েছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদ। এই পরিষদেও যখন স্বৈরকর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে দেখলেন তখন তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করলেন। বিনিময়ে তিনি নিগৃহীত হয়েছিলেন। কবিতায় তিনি ছিলেন স্থির, সিদ্ধহস্ত কিন্তু বৈষয়িক বুদ্ধিতে ছিলেন অস্থির, ব্যর্থ। বারবার পেশা বদলেছেন কিন্তু তাঁর সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো বদলায়নি।

রুদ্র ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী এবং সংস্কারমুক্ত একজন উদারনৈতিক মানুষ। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন না। তাঁর মতাদর্শ ছিল সাম্যবাদী। ডাকসু নির্বাচনে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মনোনয়নে নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে সেই চিন্তাধারার প্রমাণ রেখেছেন। তিনি “অগ্রদূত” নামের একটি ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণ সংঘ গড়ে তুলেছিলেন। যার সদস্যপত্রের অঙ্গীকারনামায় তিনি লিখেছিলেন, “আমি স্বাধীনতা, সামাজিক সাম্য এবং মুক্তমন প্রগতিশীলতার প্রতি আমার সমর্থনকে কার্যকর করতে সংগঠিত থাকবো।

ছেলেবেলা ও শিক্ষাজীবন 

বাবা শেখ ওয়ালীউল্লাহ ও মা শিরিয়া বেগমের দশ সন্তানের মধ্যে সবার বড় সন্তান রুদ্র জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর। বরিশালের রেডক্রস হাসপাতালে তাঁর জন্ম। রুদ্রের নিজের বাড়ি ও নানাবাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় ছোটবেলার বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে নানাবাড়িতে। নানাবাড়ির পাঠশালাতেই তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। এমনকি লেখালেখির আগ্রহও সৃষ্টি হয় নানাবাড়িতেই। নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয় ঘটেছিল সেই বয়সেই। তাদের অনেক কবিতাই শিশুকালে মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নানাবাড়ির পাঠশালায় পড়াশোনা শেষে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন মংলা সেন্ট পলস স্কুলে। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের পর দশম শ্রেণিতে ভর্তি হন ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড স্কুলে। এখান থেকেই প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে। 

কিশোর রুদ্র
কিশোর রুদ্র। চিত্রসূত্র: জীবনীগ্রন্থ-রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

 মা বাবার ইচ্ছা ছিল রুদ্রও বড় হয়ে বাবার মতো ডাক্তার হবেন। কিন্তু রুদ্র নিজের পছন্দমতো মানবিক শাখায় ভর্তি হয়েছিলেন। এখানে তিনি পুরোপুরি সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। এসময়ে সহপাঠী হিসেবে কামাল চৌধুরী, আলী রিয়াজ, জাফর ওয়াজেদ, ইসহাক খানদের মতো একঝাঁক তরুণ সাহিত্যকর্মীকে পান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন বাংলায়। কিন্তু ক্লাসে তাকে খুব কমই পাওয়া যেত।  কম উপস্থিতির কারণে বাংলা বিভাগীয় প্রধান তাঁকে বিএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করতে দেননি। পরের বছর পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছিলেন। 

সাহিত্যকর্ম

স্কুলের ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরু। মাত্র ৮ বছর বয়সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় স্কুলে কবিতা আবৃত্তিতে প্রথম হয়েছিলেন। কিন্তু বাবা ছিলেন সেই স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি। তাই তিনি প্রথম পুরষ্কারটি নিজের ছেলেকে না দিয়ে অন্য একজনকে দিলেন। এই বঞ্চনা শিশু রুদ্রের মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীতেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। কবিতা আবৃত্তি ছাড়াও ক্রিকেট খেলার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল তাঁর। কিন্তু বাবার নিষেধাজ্ঞার কারণে ওদিকে মনোনিবেশ করেন নি। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় পাঠ্য বইয়ের সব কবিতা মুখস্থ করে ফেলেন। এমনকি বুদ্ধদেব বসুর অনুকরণে সেসময় একটি কবিতাও লিখে ফেলেন। কিন্তু পরে তা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়ই তাঁর কবিতার খাতা ভরিয়ে ফেলেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় অনেককিছুর সাথে কবিতার খাতাটিও হারিয়ে যায়।

কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ
কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ। চিত্রসূত্র: জীবনীগ্রন্থ-রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

দশম শ্রেণিতে থাকাবস্থায় তাঁর প্রথম কবিতা “আমি ঈশ্বর আমি শয়তান” প্রকাশিত হয় “আজাদ” পত্রিকায়। এরপর “দুর্বিনীত” নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ “উপদ্রুত উপকূল” এর প্রকাশক ছিলেন আহমদ ছফা। দ্বিতীয়টি ছিল “ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম”। দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ প্রবর্তিত মুনীর চৌধুরী “স্মৃতি পুরষ্কার” লাভ করেন। তাঁর জীবদ্দশায় সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়- উপদ্রুত উপকূল, ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম, মানুষের মানচিত্র, ছোবল, গল্প, দিয়েছিলে সকল আকাশ, মৌলিক মুখোশ। শেষজীবনে কিছু গানও লিখেছেন। এর মধ্যে বিখ্যাত 

“আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে

আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।”

স্ত্রীর সাথে কবি রুদ্র
স্ত্রীর সাথে কবি। চিত্রসূত্র: জীবনীগ্রন্থ-রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

এ কেমন ভ্রান্তি আমার !

এলে মনে হয় দূরে স’রে আছো, বহুদূরে,

দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে আকাশ।

এলে মনে হয় অন্যরকম জল হাওয়া, প্রকৃতি,

অন্য ভূগোল, বিষুবরেখারা সব অন্য অর্থবহ-

তুমি এলে মনে হয় আকাশে জলের ঘ্রান।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে বলা হয় প্রতিবাদী রোমান্টিক কবি। তাঁর কবিতার ভাষায় যেন ঢেলে দিতেন সমস্ত আশা, আকাঙ্খা  আর প্রেম। তার প্রতিটি লাইনই যেন নির্দেশ করতো পৃথিবীর তামাম প্রেমিকের মনের কথা। রুদ্র ছিলেন প্রেমী। তাঁর প্রেম ছিল আন্তরিক ও নিষ্পাপ। যে-কোনো প্রেমে ব্যর্থ হয়েও তিনি কখনো অভিযোগ করেন নি। সব কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল তাঁর। লেখক হিসেবেই পরিচয় ঘটে ময়মনসিংহের মেয়ে লীমা নাসরিনের সাথে। পরিচয় থেকে প্রণয় এরপর পরিণয়। অনেকটা সামাজিক রীতিনীতির বাইরে গিয়েই তারা বিয়ে করেন। পরিবারের বিনা অনুমতিতে কাউকে কিছু না জানিয়ে মাত্র কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে বিয়ে করেন রুদ্র ও লীমা। পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রীও রুদ্রের হাত ধরে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং তসলিমা নাসরিন নামে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁদের সংসার জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিয়ের ছয় বছর পর দুজনের সম্মতিতে বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

আরো পড়ুন: ভালোবাসার এই নদী কিন্ত নিঃশব্দে বয়ে চলছে: প্রাঞ্জল

শেষ জীবনে রুদ্র 

রুদ্র ছিলেন বেপরোয়া স্বভাবের। নিজের শরীরের ওপর করতেন যথেষ্ট অত্যাচার। তাঁর জীবনযাপন ছিল অনিয়ন্ত্রিত। কবিতা ছাড়া সবকিছুর প্রতিই তাঁর যেন ছিল তীব্র অবহেলা। খাবারদাবারে ছিল অনিয়ম। যার ফলে বাঁধিয়েছিলেন পাকস্থলীর আলসার। এছাড়াও পায়ে বেঁধেছিল বার্জার্স ডিজিস। তাঁর এক পা প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছিল। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারতেন না। তবুও তাঁর চোখেমুখে কষ্টের লেশমাত্র ছিল না। এত কিছুর পরও সর্বদা মুখে লেগে থাকতো অমলিন হাসি। 

জাতীয় কবিতা উৎসবে কবিতা পাঠ করছেন
জাতীয় কবিতা উৎসবে কবিতা পাঠ করছেন। চিত্রসূত্র: জীবনীগ্রন্থ-রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

শেষ সময়ে রুদ্র হয়ে পড়েছিলেন একাকী। নিসঃঙ্গ সময় কাটতো তাঁর। মাঝে মাঝেই চলে যেতেন অসীম সাহার প্রেস “ইত্যাদি” তে। সেখানে সময় কাটাতে আসতেন, কবি মহাদেব সাহা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক আহমেদ ছফা, কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা, চিত্রকর সমর মজুমদার, সঙ্গীতশিল্পী কিরণচন্দ্র রায়, কবি কাজলেন্দু দে, সাহিত্যিক ইসহাক খান প্রমুখ। হঠাৎ একদিন রুদ্রকে দেখা গেল না, রুদ্র তখন পেপটিক আলসারে আক্রান্ত হয়ে হলিফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি। টানা তিনসপ্তাহ শুধু স্যালাইন দিতে হয়েছিল মুখে খেতে পারেন নি। সেখানে অনেকেই তাকে দেখতে যান। 

সুস্থ হয়ে ২০ জুন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন। পরদিন ভোরবেলা দাঁত ব্রাশ করতে বেসিনে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ মুখ থুবড়ে বেসিনের ওপর পরে যান। সিরামিকের বেসিন তাঁর ভার সইতে না পেরে ভেঙ্গে পরে যায়। চিরতরুণ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। কবির ভাই মুহম্মদ সাইফুল্লাহ জানান Sudden Cardiac Arrest এ রুদ্রের মৃত্যু হয়। ১৯৯১ সালের ২১ জুন মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অকালে ঝড়ে যায় একটি জ্বলন্ত শিখা। মুহুর্তের মধ্যে তাঁর মৃত্যু সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পরে। দেশের সমস্ত পত্রিকা ছবিসহ সংবাদ প্রকাশ করে। দেশের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন শোক প্রকাশ করে। রুদ্রের মরদেহ কয়েকদফা জানাজা শেষে ২২ জুন তাঁর গ্রামের বাড়ি মিঠেখালিতে দাফন করা হয়। 

রুদ্র সম্পর্কে স্মৃতিচারণ

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ জীবদ্দশাতেই তাঁর কাব্যরচনার স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর সময়ের কোনো কবিই এতটা আলোচিত ও নন্দিত হননি। রুদ্র ছিলেন প্রচন্ড মিশুক প্রকৃতির। অল্প সময়েই আপন করে নিতে পারতেন বড়-ছোট, পরিচিত-অপরিচিত, খ্যাতিমান-খ্যাতিহীন সবাইকে। 

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons 

তাঁর সম্পর্কে কবি শামসুর রাহমান বলেছেন,

এই কবির মধ্যে একধরনের বাউন্ডুলেপনা ছিল। যা তাকে সুস্থির হতে দেয়নি। সবসময় নিজেকে পুড়িয়েছেন আতশবাজির মতো। যারা এই দৃশ্য দেখে তাদের কাছে তা অত্যন্ত মনোহর, চিত্তাকর্ষক মনে হয়। কিন্তু যে পোড়ে তাঁর পক্ষে এই জ্বলতে থাকা অত্যন্ত যন্ত্রণাময়।

কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন,

ওর অহেতুক কিছু কাজকর্মে আমি ওর ওপর রাগ হতাম তবে বয়সে তরুণ হলেও আমার একান্ত বন্ধু ছিল। আমার ভালো লাগছে ওর জীবদ্দশায় আমার সর্বশেষ কাব্যখানি ওকে উৎসর্গ করেছিলাম।

কবি অসীম সাহার উপলব্ধি,

ব্যক্তিগত জীবনে রুদ্র ছিলেন একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কবির অস্থির হতাশাগ্রস্ত মন সবসময় আমাকে দংশন করতো। অনেক ছোটখাটো ঘটনায় আঘাত পেয়ে একা একা থাকতে ভালবাসতেন।

কবি সাংবাদিক জাফর ওয়াজেদ ছিলেন রুদ্রের সহপাঠী, অনেক আনদ বেদনার সঙ্গী। তিনি বলেন,

ভিন্ন আদলে গড়া এক অনিরুদ্ধ মানুষ ছিল। যেন তার সবকিছুতেই এক স্বতন্ত্র আবহ, বৈশিষ্ট্যটুকুও নিজস্ব। মোহমুগ্ধ আকর্ষণে অনায়াসে টেনে নিতো যেকোনো জনকেই। তারুণ্যের অসম সাহস, অন্তহীন ভালবাসা গ্রহনের দক্ষতা আর হৃদয় উজার করে বিলিয়ে দেবার পাশাপাশি নানা গুণের মিশ্রণে সম্পন্ন মানুষের পথে চলেছিল। মাঝপথ পেরিয়ে যাওয়া হলো না আর।

তাঁর আরেক বন্ধু, কবি আলমগীর রেজা চৌধুরীর মূল্যায়ন

রুদ্রের মধ্যে কিছু বেপরোয়া ভাব ছিল, দ্রোহী স্বভাব। কবিতায় শেকড়সন্ধানী আত্মমগ্নতা আমাকে প্রথম থেকেই আকর্ষণ করেছিলো। পাঁচফুট সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা, মাথায় ঝাকড়া চুলের অধিকারী, মুখে গোঁফ, পোষাকে রঙ চকচকে পাঞ্জাবি আর জিন্সের প্যান্ট। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ওর অসাধারণ দুটো চোখ। সত্যি কসম করে বলি, আমি ওকে হিংসে করতাম। রুদ্রকে বললে ও হাসতো। সবকিছুর মধ্যে ছিল বাউলপনা।

কবির স্বহস্তে লেখা পান্ডুলিপি
কবির স্বহস্তে লেখা পান্ডুলিপি। চিত্রসূত্র: জীবনীগ্রন্থ-রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

রুদ্র ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন মানুষ। ছিলেন এক ক্ষণজন্মা নক্ষত্র। সবকিছু ছাপিয়ে রুদ্রের যে রুপটি বেশি প্রতিভাত হয়েছে, তা হল তাঁর রুদ্ররূপ, প্রতিবাদী রুদ্ররূপ। ব্যক্তিগত মনোকষ্টে ব্যথিত হয়েছেন কিন্তু বাইরে কখনো প্রকাশ করেন নি। সবকিছু ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতার চরণে। রুদ্র ছিলেন কবি, পুরোদস্তুর কবি একজন জাত কবি। সবকিছু ছাড়িয়েও তাঁর দেশের জন্য বোধ, কষ্ট-সুখ, আনন্দ-বেদনা, ভালোবাসা সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে কবিতার মধ্যেই। তিনি ছিলেন খাঁটি দেশপ্রেমিক। তাই দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হতে দেখে তিনি হয়েছিলেন শংকিত- “জাতির পতাকা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন।” দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্বও যেন নিজের কাঁধেই তুলে নেন।

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই

আজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি,

ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…

এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?

বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে

মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স 

তথ্যসূত্র:

  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ১৪
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ৪৩
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ১০
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ২৬
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ৬১
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ১৬
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ৫৬
  • বাগচি, তপন (১৯৯৮)। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা একাডেমি প্রকাশনা, পৃষ্ঠা- ৯৯

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা নক্ষত্র

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!