putin russia corona vaccine

আলোচনা সমালোচনায় রাশিয়ান ভ্যাকসিন ‘স্পুটনিক-ভি’

মো. যোবায়ের হাসান
4
(2)
Bookmark

No account yet? Register

কোভিড-১৯, এই এক নাম শুনতে শুনতে হয়ত বিরক্ত হয়ে গিয়েছেন। কেউ বলে মাস্ক পরতে হবে কেউ বলে মাস্ক পরলে কোন লাভ নেই। কেউ মাস্কের সাদা অংশ বাইরে রাখার পক্ষে আবার কেউ ভিতরে।

অসামান্যতে লিখুন

এক কোভিড-১৯ এর সময় দেখা যাচ্ছে পৃথিবীতে গুণী মানুষের অভাব নেই, কিন্তু বহুল আকাঙ্ক্ষিত ভ্যাকসিনের যেন কোন সুখবরই পাওয়া যাচ্ছিল না। বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশসমূহ রীতিমত খাবি খাচ্ছে। চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানির মত উন্নত রাষ্ট্রের মধ্যে এক স্নায়ু যুদ্ধ (Cold War) এরই মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, আর সেই যুদ্ধ হচ্ছে কার আগে কে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন তৈরি করবে। 

চীন বহুদিন যাবত কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন তৈরি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় আছে ভ্যাকসিন নিয়ে তাদের কাজের দরুন। বাংলাদেশের গ্লোব বায়টেকও আলোচনায় উঠে আসে তাদের ভ্যাকসিন তৈরির ঘোষণা দিয়ে।

কিন্তু আলোচনার বাহিরে থাকা রাশিয়া গত ১১ই আগস্ট যখনই ভ্যাকসিন তৈরিই শুধু নয় তা সর্বপ্রথম অনুমোদন দিয়ে দিল, তখন তোলপাড় শুরু হয়ে গেল রাশিয়ান ভ্যাকসিন ও ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে। আর তা নিয়েই অসামান্যের পাঠকদের জন্য এই আয়োজন। 

মাস্ক ব্যবহারে সচেতনতা । চিত্রসূত্র: Pixabay

এই নিবন্ধে আমাদের আলোচ্য বিষয় কোভিড-১৯ কী, কীভাবে ছড়ায় বা কিভাবে সচেতন থাকতে হবে তা নয় বরং আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে কোভিড-১৯ এর রাশিয়ান ভ্যাকসিন।

কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার শুরু থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উঠেপড়ে লাগে এর ভ্যাকসিন বের করার কাজে। বিশ্বের সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গবেষক গবেষণা কাজে নেমে পড়েন। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বহুবার কোভিড-১৯ ভাইরাসটির প্রকৃতি পাল্টালে গবেষকগণ পড়ে যায় মহা সমস্যায়। প্রথম দিকে ধারণা করা হচ্ছিল হয়ত এই ভ্যাকসিন বের হতে হতে ২০২০ এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লাগবে, কিন্তু সেই সময়ও অতিক্রম করে ফেলেছে। তাহলে কেন এত দেরি? 

কোভিড-১৯ পজিটিভ এর একটি প্রতীকী চিত্র। চিত্রসূত্র: Pixabay

ভ্যাকসিন পরীক্ষার ধাপসমূহ

আসুন সংক্ষেপে দেখে নেয়া যাক ভ্যাকসিন পরীক্ষা করার জন্য যেসব ধাপ অবলম্বন করতে হয়:

১। ক্লিনিক্যাল টেস্ট এর পূর্বধাপ বা প্রি-ক্লিনিক্যাল টেস্টিং: এ পর্যায়ে গবেষকগণ বিভিন্ন প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালান। শুনে থাকবেন হয়ত ইঁদুর এবং বানরের উপরই এটি বেশি করা হয়ে থাকে।

২। ধাপ ০১: নিরাপত্তা পরীক্ষণ বা সেইফটি ট্রায়াল: খুবই অল্প পরিমাণ মানুষের উপর পরীক্ষা করে দেখা হয় ভ্যাকসিনটি মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করতে কতটুকু সক্ষম।

৩। ধাপ ০২: বিস্তৃত পরীক্ষণ বা এক্সপ্যান্ডেড ট্রায়াল: এবার এই পর্যায়ে দেয়া হয় বিভিন্ন বয়সের প্রায় শতাধিক মানুষকে। শিশু, যুবক কিংবা বৃদ্ধের ক্ষেত্রে এটি আলাদা প্রভাব ফেলে কি না তা এই ধাপে লক্ষ্য করা হয়। এই ধাপে আরও দেখা হয় ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা ও এটি কতটুকু নিরাপদ।

৪। ধাপ ০৩: কার্যকরণ পরীক্ষণ বা ইফিক্যাসি ট্রায়াল: এই ধাপে প্রায় হাজারখানেক বা তার চেয়ে বেশি মানুষের উপর পরীক্ষা করা হয়। ফলে ভ্যাকসিনটি সম্পর্কে আরও বিস্তর জানা যায়। এর কোন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া আছে নাকি, এটি কী ধরণের প্রভাব ফেলে বা এটি কতটুকুই বা কার্যকর তা সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়। আর তাই এই ধাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৫। অনুমোদন: বিভিন্ন দেশের মানুষের উপর এটি প্রয়োগ করা হয় এবং গবেষকদের কাজ থাকে তখন প্রতিনিয়ত লক্ষ্য রাখা যে এটি মানুষের শরীরে কোনও ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে কিনা।

তো একদম সংক্ষেপে বোঝার সুবিধার্থে এটি হচ্ছে ভ্যাকসিন নির্বাচনের প্রক্রিয়া। আর বর্তমান কোভিড-১৯ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনুসরণ করে তাদের ভ্যাকসিনকে অনুমোদিত করার চেষ্টায় আছে।

বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১৬৫ টির মত ভ্যাকসিন করোনা ভাইরাসের জন্য সম্ভাব্য ভ্যাকসিন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যেগুলোর কোনটি হয়ত ১ম পর্যায়ে আবার কোনটি ২য় বা অন্য পর্যায়ে আছে। এখানে বলে রাখা ভালো অনেক ভ্যাকসিন মিশ্র পর্যায়ে বিদ্যমান। মানে ১ ও ২ এর মাঝামাঝি। 

তো এবার প্রসঙ্গ আসে রাশিয়ার ভ্যাকসিন কি সবগুলো পর্যায় অতিক্রম করে অনুমতি প্রাপ্ত হয়েছে? এর সহজ উত্তর হচ্ছে রাশিয়া তৃতীয় পর্যায় নিয়ে তেমন মাথা না ঘামিয়েই তাদের ভ্যাকসিনকে অনুমোদন করে দিয়েছে। 

কিন্তু কেন? 

হয়ত স্নায়ু যুদ্ধের অংশ হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের দাবিতে এই কার্যক্রম। আবার হয়ত মানুষের আস্থা তৈরির জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার মেয়েরও এই ভ্যাকসিন ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন মিডিয়াতে। যদিও তার দুই মেয়ের কোন মেয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছে তা জানায় নি। 

পুতিনের কথা,

প্রথম ইনজেকশনের পর তার (তার মেয়ের) তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরের দিন ছিল ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দ্বিতীয় ইনজেকশনের পর তার তাপমাত্রা কিছুটা উপরে উঠে যায় এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে

ভ্লাদিমির পুতিন । চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

তো এখন জানা যাক কোন কোন প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার এই ভ্যাকসিনটি তৈরির কাজ করছে। Russian Direct Investment Fund (RDIF) এর সাথে Gamaleya Research Institute of Epidemiology and Microbiology এর সমন্বিত কার্যক্রম ছিল এটি।

RDIF এর ভাষ্যমতে,

আমরা আমাদের ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা কেবল রাশিয়াতেই করি নি। আমরা আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেও করেছি এবং সম্ভবত ব্রাজিল এবং ভারতেও করতে যাচ্ছি।

কিন্তু রাশিয়ার এমন কার্যক্রমে অনেক গবেষকই উদ্বিগ্ন। এর অন্যতম প্রধান কারণ খুব বেশি তথ্য নিয়ে কাজ না করার ব্যাপারটি। রাশিয়া মাত্র ৭৬ জন মানুষের উপর এটির পরীক্ষা করেছে। নিরাপত্তা কিংবা ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা নিয়েও কোন স্টাডি পাবলিশ করা হয় নি। 

কিন্তু রাশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রি মিখাইল মুরাশকো (Mikhail Murashko) জানিয়েছেন,

প্রাপ্ত ফলাফলসমূহ (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হতে) ভ্যাকসিনটির উচ্চ কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রমাণ করে।

রাশিয়া এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভ্যাকসিন দিয়ে সাহায্য করতে চাইলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র না করে দিয়েছে।

নামকরণ

রাশিয়ার এই ভ্যাকসিনটির নাম দেয়া হয়েছে স্পুটনিক-ভি (Sputnik V)। কেন এই নাম? 

১৯৫৭ সালের চৌঠা অক্টোবর রাশিয়া সফলভাবে তাদের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে যার নাম ছিল স্পুটনিক-১। 

স্পুটনিক-১ এর রেপ্লিকা। চিত্রসূত্র: Pixabay

এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম স্যাটেলাইট। আর এর নামানুসারেই নামকরণ করা হয়েছে তাদের ভ্যাকসিনের। হয়ত স্যাটেলাইট যেমন প্রথম সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছিল তেমনি ভ্যাকসিন তৈরিতেও প্রথম এজন্যই এ নামকরণ। 

আরও পড়ুনঃ নিকোলা টেসলা: পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিন্তু অবহেলিত এক প্রকৌশলী

গবেষকদের কথা

বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড্যানিয়েল স্যালমন জানান, 

সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা বিবেচনায় ভাইরাসের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল তুলনামুলকভাবে কঠিন কেননা লোকেদের মাঝে ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে, এটি সত্যিই তিন নম্বর ধাপ যখন আপনি এটি কতটুকু নিরাপদ তা নিয়ে জানতে পারবেন।

অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার উইস্টার ইন্সটিটিউট (Wistar Institute in Philadelphia) এর ভ্যাকসিন গবেষক হিল্ডগান্ড আর্টল (Hildegund Ertl) জানান,

পুতিন জানিয়েছে তারা তাদের ভ্যাকসিন অক্টোবর বা নভেম্বরের দিকে অন্যান্য দেশকে দিবে, যখন কিনা আমাদের দেশের নির্বাচনের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের)সময়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছে নভেম্বরের দিকে আমাদের নিজেদেরই ভ্যাকসিন থাকবে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের রাজনীতিবিদ স্নায়ু যুদ্ধের অংশ হিসেবে গবেষকদের উপর চাপ সৃষ্টি করবেন না। এছাড়া লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ড্যানি অল্টম্যানও (Danny Altmann) এই কথায় সমর্থন করেছেন।

তবে হিল্ডগান্ড আর্টল (Hildegund Ertl) ভ্যাকসিন তৈরিতে রাশিয়ার পদ্ধতিটি পছন্দ করেছেন কিন্তু তার মতে তিন নম্বর ধাপ ট্রায়াল ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। 

তার মতে রাশিয়ার ভ্যাকসিনটি যদি মানুষের মধ্যে প্রয়োগ করা হয় এবং তা যদি ঠিকমত কাজ না করে তবে অনেকের মধ্যেই অনাস্থা তৈরি হবে আর এতে করে হয়ত এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হবে। 

রাশিয়া কবে থেকে মানুষের জন্য ভ্যাকসিনটি ছাড়বে?

রাশিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী আশা করা যায় অক্টোবর থেকেই তারা তাদের ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম শুরু করবে। আশা করা যাচ্ছে এ বছর শেষের দিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে রাশিয়ান ভ্যাকসিন।

কিন্তু এটি কতটুকু কার্যকর বা এর নিরাপত্তা ঝুকি আছে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

তাহলে কবে আমরা একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে পারি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ছয়টি ভ্যাকসিন তিন নম্বর ধাপে রয়েছে, কিন্তু কোনটিই এখনও সম্পূর্ণ হয় নি এবং অনেক ভ্যাকসিনই ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কার্যালয় । চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

তাই এখন আবারও অপেক্ষার পালা। 

আর্টিকেল সম্পর্কে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট বক্সে জানানোর অনুরোধ রইল।


ফিচার ছবিসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

তথ্যসূত্র:

  1. Sputnic V
  2. The New York Times
  3. BBC
  4. Economic Times
  5. Chemistry World
  6. CNN
  7. DW
  8. New Scientist
  9. Space

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
4 Thoughts on আলোচনা সমালোচনায় রাশিয়ান ভ্যাকসিন ‘স্পুটনিক-ভি’
    Mehrab Khan
    23 Aug 2020
    10:57pm

    Joss lagse vai…tmr research ar information providing is just awesome….
    Keep it up brother jubair

    1
    0
      MD. Jubair Hasan
      23 Aug 2020
      11:10pm

      সুন্দর মন্তব্যের জাযাকাল্লাহ ভাই।

      1
      0
    Sharif Nirjon
    23 Aug 2020
    10:59pm

    অনেক ইনফোরমেটিভ একটা লেখা…দারুণ হয়েছে!

    1
    0
      MD. Jubair Hasan
      23 Aug 2020
      11:11pm

      সুন্দর মন্তব্যের জন্য জাযাকাল্লাহ ও অনেক ধন্যবাদ ভাই।

      1
      0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!