‘যদ্যপি আমার গুরু’: আহমদ ছফার গুরু বন্দনা

3.3
(6)
Bookmark

No account yet? Register

  • গ্রন্থের নাম: যদ্যপি আমার গুরু
  • ভাষা: বাংলা
  • লেখকের নাম: আহমদ ছফা
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা:১১০
  • প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮
  • প্রকাশনীর নাম:মাওলা ব্রাদার্স 
  • আইএসবিএন নাম্বার: ৯৮৪ ৪১০ ০২২ ৪

তাজমহলকে সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডাইনে থেকে, বায়ে থেকে যেদিক থেকেই দেখা হােক না কেনাে দর্শকের দৃষ্টিতে ক্লান্তি আসে না, আরও দেখার পিপাসা জাগে। আমি আব্দুর রাজ্জাক সাহেবকে মনেমনে তাজমহলের সঙ্গেই তুলনা করতে থাকলাম। তাঁর ব্যক্তিত্বের এমন একটা সুন্দর সম্মােহন রয়েছে, তার আকর্ষণ এড়ানাে আমার পক্ষে অসম্ভব। ইন্টেলেকচুয়াল বিউটি তথা মনীষার কান্তি কী জিনিস আমাদের সমাজে তার সন্ধান সচরাচর পাওয়া যায় না। আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের প্রতি প্রাণের গভীরে যে একটা নিষ্কাম টান অনুভব করেছি, ও দিয়েই অনুভব করতে চেষ্টা করি এথেন্স নগরীর তরুণেরা দলেদলে কোন অমৃতের আকর্ষণে সক্রেটিসের কাছে ছুটে যেতাে।

— যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা।

চরিত্র এবং প্রেক্ষাপট

‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থটি বাংলাদেশের বিখ্যাত গণবুদ্ধিজীবী ‘আহমদ ছফা’ রচিত জাতীয় অধ্যাপক ‘আব্দুর রাজ্জাক’ সম্পর্কিত একটি বই।

বইটিতে লেখক জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর সমগ্র ব্যক্তিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমী থেকে তিন বছরের ফেলোশিপ পান আহমদ ছফা। আহমদ ছফা তার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করলেন এবং তাদের বললেন যে, “একজন জ্ঞানী শিক্ষকের নাম বলো, যাকে আমার পিএইচডি থিসিসটির পরামর্শক হিসেবে বেছে নিতে পারি।” তখন তার বন্ধুরা তাকে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এ-র কথা বলে।

আহমদ ছফা এবং আব্দুর রাজ্জাক
চিত্র: আহমদ ছফা এবং আব্দুর রাজ্জাক; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

আর নিজের পিএইচডি থিসিসের পরামর্শক হওয়ার জন্য আহমদ ছফা যান অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এ-র বাসায়। এরই মাধ্যমে আহমদ ছফা এবং অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর পরিচয় ঘটে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক রাজিও হন আহমদ ছফার থিসিসের পরামর্শক হতে। 

এরপর থেকে ধিরে ধিরে তাদের মধ্যে গড়ে উঠে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। আর এর প্রেক্ষিতে আহমদ ছফা প্লেটো, বসওয়েল এবং একারমানের মতো করেছেন গুরু বন্দনা। প্লেটোর ‘সক্রেটেস এর জবানবন্দী’ বইয়ের যেমন মূল চরিত্র ছিলো ‘সক্রেটেস’ তেমনি আহমদ ছফা রচিত ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র অধ্যাপক ‘আব্দুর রাজ্জাক’।

'যদ্যপি আমার গুরু' বইয়ের প্রচ্ছদ
চিত্র: ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইয়ের প্রচ্ছদ; চিত্রসূত্র – কিছু লাগবে

বিষয়বস্তু

যদ্যপি আমার গুরু বইটার মূল বিষয়বস্তুই হলো জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। তার সাথে চলাচলের দীর্ঘ ২৭ বছরের বর্ননা তুলে ধরেছেন আহমদ ছফা। 

জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকে চলমান বিশ্বকোষ বললে খুব একটা অত্যুক্তি করা হয় না। অর্থশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম-সংস্কৃতি এই সবগুলো বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞের মতো মতামত দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু তিনি একটি বই-ও রচনা করেননি। তা-ই তাকে জনসম্মুখে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য আহমদ ছফার এই বইটা।

আরও পড়ুন: একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়: লাখো তরুণের স্বপ্নজয়ের শক্তি

উল্লেখযোগ্য কিছু কথোপকথন এবং উক্তি

একবার কাচাঁবাজার নিয়ে কথা উঠলে আব্দুর রাজ্জাক স্যার বললেন,

একটা কথা খেয়াল রাখন খুব দরকার। যখন কোনো নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায় এবং পড়ালেখা করে? কাচাঁবাজারে যাইবেন, কী খায় এইডা দেখনের লাইগ্যা আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা কী করে হেইডা জাননের লাইগ্যা।….বইয়ের দোকান পরখ করলেই বেবাক সমাজটা কোনদিকে যাইতাছে, হেইডা টের পাওন যায়।….কী খায়, কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কোনো কিছু জানন যায় না।

লেখালেখির কথা উঠতেই স্যার বললেন, “লেখার ব্যাপারটি অইল পুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো ব্যাপার। যতো বড় ঢিল যতো জোরে ছুড়বেন পাঠকের মনে তরঙ্গটাও তত জোরে উঠব এবং অধিকক্ষণ থাকব। আর পড়ার কাজটি অইল অন্য রকম। আপনে মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে-বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা? আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভাণ্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনেমনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইর‍্যা নিবেন আপনের পড়া অয় নাই।

জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক

আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবী। ১৯৭৩ সালের প্রথমদিকে ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পিএইচডি প্রদান করে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে মনোনীত করে। তার জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত ছিল বিশেষত প্রাচ্যতত্ত্ব, ইতিহাস ও রাজনীতিতে।

আব্দুর রাজ্জাক
চিত্র: আব্দুর রাজ্জাক; চিত্রসূত্র – ডেইলি স্টার
  • জন্ম: ১৯১৪, নবাবগঞ্জ উপজেলা।
  • মৃত্যু: ২৮ নভেম্বর, ১৯৯৯, ঢাকা।
  • উল্লেখযোগ্য রচনাবলি: State of the Nation: জাতির অবস্থা।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী: শেখ মুজিবুর রহমান, আহমদ ছফা, সলিমুল্লাহ খান, রেহমান সোবহান, রওনক জাহান সহ আরও অনেকে।
  • শিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা গভ. মুসলিম হাইস্কুল, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স।

লেখক পরিচিতি

আহমদ ছফা একজন বাংলাদেশি লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সলিমুল্লাহ খানসহ আরো অনেকের মতে, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন আহমদ ছফা। তার লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে।

 আহমদ ছফা
চিত্র: আহমদ ছফা; চিত্রসূত্র – কালের কণ্ঠ
  • জন্ম: ৩০ জুন, ১৯৪৩, চট্টগ্রাম।
  • মৃত্যু: ২৮ জুলাই, ২০০১, ঢাকা।
  • শিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সমাধিস্থল: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ।
  • বই: যদ্যপি আমার গুরু, সংকটের নানা চেহারা, একজন আলী কেনানের উত্থানপতন, বাঙালী মুসলমানের মন, অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, গাভী বিত্তান্ত, পুস্প বিহঙ্গ পুরান, সাম্প্রতিক বিবেচনা: বু্দ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, মরন বিলাস, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, অলাতচক্র, জাগ্রত বাংলাদেশ, সূর্য তুমি সাথী, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, তানিয়া(অনুবাদ), সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, গ্যোতের দেশে, বাংলা ভাষা: রাজনীতির আলোকে, একটি প্রবীন বটের কাছে প্রার্থনা, শতবর্ষের ফেরারী বঙ্কিম, আনুপূর্বিক তাসলিমা অন্যান্য স্পশকাতর প্রসঙ্গ, হারানো লেখা, গো হাকিম, লেলিন ঘুমাবে এবার, ওঙ্কার, দুঃখের দিনের দোহা, শান্তিচুক্তি ও নির্বাচিত প্রবন্ধ, জল্লাদ সময়, উপলক্ষের লেখা, সেইসব লেখা, অহিতাগ্নি(কবিতা), নিহত নক্ষত্র ইত্যাদি।

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মতো আমাদের বাংলায়ও গুরু বন্দনা শুনতে পড়ে ফেলুন ‘আহমদ ছফা’ রচিত ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটি।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: ফেসবুক

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ‘যদ্যপি আমার গুরু’: আহমদ ছফার গুরু বন্দনা

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!