মুক্তাগাছার জমিদার বংশের ইতিবৃত্ত: প্রথম পর্ব

জুবায়ের সাঈদ লিনাস
Latest posts by জুবায়ের সাঈদ লিনাস (see all)
4.4
(5)
Bookmark

No account yet? Register

ভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রাচীন জেলা হল ময়মনসিংহ। অবিভক্ত বাংলায় এই জেলাটি ছিল বৃহত্তম একটি জেলা। সুপ্রাচীন এই জেলাটির ইতিহাসও অনেক সমৃদ্ধ। ইতিহাস থেকে জানা যায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে কামরূপ, মৌর্য, গুপ্ত ও পাল শাসকরা শাসন করে। পরে সেন, ঈসা খাঁ, মোঘল সাম্রাজ্য ও নবাবী আমলের পরে আসে কোম্পানি আমল। এই কোম্পানি আমলেই মুক্তাগাছার জমিদার বংশের ব্যুৎপত্তি হয়। ১৭৩৪ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দুইশ বছরেরও অধিক সময়জুড়ে তাদের জমিদারী বজায় ছিল। মুক্তাগাছার জমিদার বংশ সম্পর্কে আজ এই নিবন্ধে আমরা জানবো।

অসামান্যতে লিখুন

বংশের ইতিহাস

মুক্তাগাছার আচার্য্য বংশের গোড়াপত্তন করেন স্বনামধন্য দার্শনিক পণ্ডিত উদয়নাচার্য্য। দ্বাদশ শতাব্দীতে তার খোঁজ পাওয়া যায়। ন্যায় ও দর্শনশাস্ত্রের উপর তার লেখা ‘কুসুমাঞ্জলি’ ছিল তখনকার সময়ে খুবই প্রসিদ্ধ। সেই সময়ে তিনি বঙ্গ ও বিহারে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার দেখেন। এসব দেখে ব্যথিত হয়ে তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বৌদ্ধদের সাথে বিভিন্ন তর্কে জিতে হিন্দুধর্মের পুনঃগৌরব প্রতিষ্ঠা করার কাজে নিয়োজিত হন। মনু সংহিতা সহ বিভিন্ন স্মৃতিগ্রন্থের টীকাকার কুল্লুক ভট্ট ও ময়ূর ভট্ট তার সমসাময়িক পণ্ডিত ছিলেন। ‘সম্বর্ধ নির্ণয়’ নামক গ্রন্থ অনুসারে তাঁর নিবাস ছিল রাজশাহীর নিসিন্দা গ্রামে।

তার দুই পত্নী ছিল। প্রথম পত্নীর ছয় পুত্র ছিল। প্রথম পত্নীর দ্বিতীয়পুত্র ভবানীপতি হতে মুক্তাগছার রাজবংশ এবং দ্বিতীয় পত্নীর একমাত্র পুত্র পশুপতি হতে তাহেরপুরের রাজবংশ ও চৌগায়ের রাজবংশের উৎপত্তি হয়। 

ভবানীপতি পুত্র গজপতি, গজপতির পুত্র অম্বুপতি। অম্বুপতির দ্বিতীয় পুত্র পাণ্ডব ভট্ট। পাণ্ডব ভট্টের দ্বিতীয় পুত্র চূড়ামণি আচার্য্যের একমাত্র পুত্র কামদেব আচার্য্য। কামদেব আচার্য্যের দ্বিতীয় পুত্র নারায়ণ আচার্য্যের পুত্র রঘুনাথ আচার্য্য। রঘুনাথ আচার্য্যের দ্বিতীয় পুত্র শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্যই  আলাপসিংহ পরগণার অন্তর্গত মুক্তাগাছায় জমিদারী স্থাপন করেন। 

মুক্তাগাছার জমিদার বংশের বাসস্থান শশিকান্ত প্রাসাদের পশ্চাৎভাগ এর চিত্র
শশিকান্ত প্রাসাদের পশ্চাৎভাগ। চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য

ভারতে তখন বিভিন্ন জায়গায় উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছিল। প্রবল পরাক্রমশালী নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর অনুগ্রহে মুসলমানদের বেশ উন্নতি হচ্ছিল। তার দরবারে হিন্দুদেরও বেশ কদর ছিল। এদের মাঝে ভূপতি রায়, কিশোর রায়, পুঠিয়ার রাজবংশের আদিপুরুষ দর্পনারায়ণ ঠাকুর, নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রঘুনন্দন রায় ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ এর পরামর্শদাতা।

ভাগ্য অন্বেষণে মুর্শিদকুলি খাঁর সাথে দেখা করতে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী নামের এক যুবক বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্যকে নিয়ে ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গের রাজধানী মুর্শিদাবাদে যান। সেই দরবারে তার গুনাবলির জন্য তিনি  মুর্শিদকুলি খাঁর আস্থাভাজন হন।

নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

পরগণা প্রাপ্তি

আলাপসিংহ পরগণা ‘আইন-ই-আকবরি’তে আলেপসাহি নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের জরিপে এর আয়তন ধরা হয় ৩,২৬,৫৫৬ একর।

মোঘল সেনাপতি মানসিংহের সাথে যুদ্ধের পর ঈসা খাঁ আলেপসাহি, মমিনসাহি ও হুসেন-সাহি এই পরগণাগুলি তিনিই পরিচালনা করেন। তার মৃত্যুর পর আলেপসাহি ও মমিনসাহি এই দুই পরগণা টিকরা গ্রাম নিবাসী মোহাম্মদ মেন্দি পেয়েছিলেন। এরপর ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ এর বন্দোবস্তের সময় পুরো পরগণার ১৬ ভাগের ৬ ভাগের মালিক ছিলেন রামচন্দ্র রায় ও ভবানীদেব রায় এবং ১০ ভাগের মালিক ছিলেন বিনোদরাম চন্দ। 

একবার তারা যখন রাজস্ব প্রেরণ করছিলেন মুর্শিদাবাদে তখন দস্যুদল তাদের রাজস্ব ছিনিয়ে নেয়। তখন তারা ভয়ে ও অক্ষম হয়ে এই পরগনাস্বত্ব ত্যাগ করেন।

এই খবর যখন মুর্শিদাবাদে পৌঁছায় সেখান তখন শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য ছিলেন। তিনি তার প্রভাব খাটিয়ে এই পরগণার বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। তার এই আগ্রহের ফলে তাকে এই পরগণা পরিচালনা করার জন্য তার অনুকূলে রাজকর্মচারীকে প্রভাবিত করেন।

এর পরপরই মুর্শিদ কুলি খাঁর মৃত্যু ঘটে। সিংহাসন নিয়ে সুজা উদ্দিন ও মির্জা মোহাম্মদ আলির মাঝে বিরোধ শুরু হয়। মির্জা মোহাম্মদ আলির পক্ষালম্বন করে তাকে জেতাতে বিশেষ সাহায্য করেন শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য। মির্জা মোহাম্মদ আলিই পরবর্তীতে আলিবর্দি খাঁ নামধারণ করে রাজ্যশাসন করেন।

নবাব আলিবর্দি খাঁ। চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে কালীরবাজার, বৈলর, লক্ষীপুর ও কাজিশিমলা এই অঞ্চলগুলো শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য মুর্শিদাবাদ থেকে প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে নিজস্ব বাসস্থান বগুড়ার বাকরে অবস্থান করেন কিছুদিন। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার চার পুত্র ছিল – রামরাম, হরিরাম, বিষ্ণুরাম ও শিবরাম।

নামকরণ

জমিজমা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিবাদ চলে ভাইদের মধ্যে। বড় ভাই রামরাম ভাইদের থেকে পৃথক হয়ে আলাপশাহীর বাহাদুরপুর গ্রাম বসবাস করতে থাকেন। পরবর্তীতে তিন ভাইও এসে তার এখানেই থাকতে শুরু করেন। কিছুদিন পরেই তারা ওই জায়গা ত্যাগ করে মুক্তাগাছা গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন। 

তারা যেখানে নৌকা ভিড়িয়েছিলেন সেখানকার নাম হয় রাজঘাট নামে আজও পরিচিত। কোন এলাকায় জমিদার আসলে তৎকালীন সময়ে নজরানা বা উপঢৌকন দেওয়ার প্রচলন ছিল। তাদেরকে নজরানা দেওয়ার মাঝে একজন কর্মকারের নাম ছিল মুক্তারাম। সে একটি পিতলের গাছা নজরানা দিয়েছিল। জমিদাররা তার মুক্তার সাথে গাছা লাগিয়ে মুক্তাগাছা নামকরণ করেন। 

আলাপশাহী পরগণা ছিল গাছপালা ভরপুর এক অরণ্যের সমারোহ। বাঘ হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীতে ভরপুর। এর সীমানা ছিল জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব এবং মেঘালয়ের সীমান্ত থেকে ভালুকার ভাওয়াল পরগনা পর্যন্ত। 

হরিরাম ও শিবরাম দুই ভাই মিলে যে জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন তা আট আনি জমিদারবাড়ি নামে পরিচিত। 

বর্তমানের জমিদার বাড়ির দক্ষিণাংশে বাস করতেন জ্যেষ্ঠ পুত্র রামরাম আচার্য্য। বর্তমানে সেখানে উপজেলা ভূমি অফিস এবং নবারুন বিদ্যানিকেতন রয়েছে। চতুর্থপুত্র শিবরাম আচার্য্যের মালিকানাধীন অংশে বর্তমানে শহীদ স্মৃতি কলেজের অবস্থান।

আরও পড়ুন: খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য, শেষ পর্ব

জমিদার বাড়ির যে অংশটুকু পুরাকীর্তি হিসেবে অধিগ্রহনে সমর্থ হয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সেখানে বসবাস করতেন দ্বিতীয়পুত্র হরিরাম আচার্য চৌধুরী। হরিরাম আচার্য চৌধুরী ও তার বংশধরদের মালিকানাধীন অংশটুকুই বর্তমানে মুক্তাগাছার রাজবাড়ি নামে পরিচিত।

মুক্তাগাছার জমিদার বংশের বাসস্থান শশিকান্ত প্রাসাদের রাজদরবার
শশিকান্ত প্রাসাদের রাজদরবার। চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

রঘুনন্দন আচার্য্য

শিবরাম আচার্য্যের মৃত্যুর পর তার পুত্র রঘুনন্দন আচার্য্য সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগের মালিক হন। ছিয়াত্তরের মনন্তরের সময় তিনি দান করে অনেক মানুষের জীবন বাঁচান। 

১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলা স্থাপিত হয়। বেগুনবাড়ি কুঠি থেকেই কোম্পানির শাসন চলতে থাকে। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে রঘুনন্দন আচার্য্যের জমিদারির উপর নাসিরাবাদ শহর স্থাপিত হয়। তারপর থেকেই তা উত্তরাধিকারীগণ এই নগরের শাসন করে আসছেন।

রঘুনন্দনের কোন উত্তরাধিকারি না থাকায় তিনি গৌরীকান্ত নামে একজনকে পালকপুত্র হিসেবে নেন। রঘুনন্দনের মৃত্যুর পর তিনি কিছুদিন মাত্র শাসন করেন। তার মৃত্যুর পর তার বিধবা বউ বিমলা দেবী এই অঞ্চল শাসন করেন। তিনি প্রজাবৎসল ছিলেন। তিনি কাশীকান্ত নামে একজনকে দত্তক নেন। সে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তিনি কাশীতে যেয়ে অবস্থান করেন।

ভরপুরের মহারাণির সাথে তার ভাল সম্পর্ক ছিল। তিনি বিমলাদেবীকে একটি মূল্যবান পাথর দেন যেটি কিনা বহুদিন রাজবাটীতে ছিল। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এই পাথর ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। 

মুক্তাগাছার জমিদার বংশের বাসস্থান শশিকান্ত প্রাসাদের টিনের দোতলা
শশিকান্ত প্রাসাদের টিনের দোতলা। চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

কাশীকান্ত ও চন্দ্রকান্ত আচার্য্য

কাশীকান্ত এরপর শাসন করেন। তিনি প্রচুর ব্যয় করতেন। তবে তার রোগের কারণে তিনি কষ্টে ভুগতেন। কাশীতে যাওয়ার সময় তার মৃত্যু ঘটে। তারপর তার স্ত্রী লক্ষ্মীস্বরুপা দেবী হাল ধরেন। তিনিও বিমলা দেবীর মতন প্রজাবৎসল ছিলেন।

তিনি চন্দ্রকান্ত নামে একজনকে পালক নেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। এরপর লক্ষ্মীদেবী ভেঙ্গে পড়েন।
তার এই শোচনীয় অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেওয়ান রুদ্রনাথ ফরিদপুরের ঈশ্বরচন্দ্র মজুমদার পরিবারের এক পুত্রকে দত্তক পুত্র হিসেবে নিবেন বলে স্থির করেন।

এই নিয়ে একটা ঘটনা শুরু হয়। ঈশ্বরচন্দ্র এর স্ত্রী ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী তাদের কনিষ্ঠপুত্র পূর্ণচন্দ্রকে দিতে রাজি হন না। তৃতীয় পুত্র মারা যায়। প্রথম পুত্রকে দত্তক হিসেবে দেওয়ার চল নেই। তাই দ্বিতীয় পুত্র রাজকুমারকেই দত্তক দিবেন বলে ঈশ্চরচন্দ্র সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার বয়স বেশী হওয়ায় তাকে নিতে লক্ষ্মীদেবী চাইলেন না। তিনি একটা শর্ত দিলেন যে দুই পুত্রের মাঝে যে প্রথমে তাকে মা বলে সম্বোধন করবে তাকেই তিনি দত্তক নিবেন। অট্টালিকার মাঝে দুই পুত্রকে ছেড়ে দেওয়া হল। ভাগ্যক্রমে সেই পুর্ণচন্দ্রই তাকে মা বলে আগে ডাক দিলেন। তার নামকরণ করা হল সূর্য্যকান্ত আচার্য্য।

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে নাবালক সুর্য্যকান্তকে রেখে তিনি মৃত্যবরণ করেন। 

পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা সুর্য্যকান্ত আচার্য্যসহ এই আচার্য্য বংশের অন্যান্যদের ইতিহাস জানবো।

তথ্যসূত্র:

  • বংশ পরিচয় – জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমার
    ময়মনসিংহের রাজপরিবার – আব্দুর রশিদ
  • ময়মনসিংহের জমিদারী ও ভূমিস্বত্ব – মো. হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া 

প্রচ্ছদসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on মুক্তাগাছার জমিদার বংশের ইতিবৃত্ত: প্রথম পর্ব

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!