Michio kaku

মিশিও কাকু : বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় এক পদার্থবিজ্ঞানী

মো. যোবায়ের হাসান
5
(7)
Bookmark

No account yet? Register

মিশিও কাকু নামটি প্রথমবার শুনে আপনারও মনে হয়ত ‘কাকু’ শব্দটি নিয়ে একটু দুষ্টুমির আবির্ভাব হয়েছে। নাম এবং চেহারা দেখা যে কেউই হয়ত ভেবে বসবে উনি হয়ত জাপানি বা কোরিয়ান। কথাটি সম্পূর্ণ ভুল না হলেও পুরোপুরি সঠিকও কিন্তু নয়। মিশিও কাকু আসলে জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক। 

অসামান্যতে লিখুন
মিশিও কাকু
মিশিও কাকু। উৎস: Medium

স্টিফেন হকিং এর মৃত্যুর পর বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন হচ্ছেন এই মিশিও কাকু। বিজ্ঞানী নাম শুনলেই আমাদের মাথায় হয়ত ভেসে উঠে চোখে চশমা পড়া বইয়ে মুখ ডুবিয়ে রাখা এক বৃদ্ধের ছবি। কিন্তু মিশিও কাকুকে দেখলে হয়ত আপনাকে সেই চিন্তা দূর করতে হবে। কেননা উনি সহজ ও সাবলীল ভাষায় বিজ্ঞান বুঝানোর মানুষ। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন টেলিভিশন শোতেও তিনি বেশ সক্রিয়। 

বিজ্ঞান ও মিশিও কাকু বিষয়ে কিছু বলার আগে তার সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেয়া যাক। 

জন্ম

১৯৪৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে জাপানি-তিব্বতি বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মিশিও কাকু। কাকুর বাবা-মা ক্যালিফোর্নিয়াতেই জন্মেছিলেন। আসলে তার কোন পূর্ববর্তী দাদার একজন সান ফ্রান্সিসকোতে ১৯০৬ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরবর্তী বিনির্মাণ কাজে আমেরিকাতে এসেছিলেন। 

তরুণ মিশিও কাকু
তরুণ অবস্থায় মিশিও কাকু (ডানে)। উৎস: Altoidyoda

মনে হতে পারে তার বাবা-মা যেহেতু আমেরিকাতে জন্মেছেন তাই তারা আমেরিকান। কিন্তু ১৯৪০ সালের দিকে পরিস্থিতি অনুসারে এমনটা ছিল না। অন্যান্য অনেক জাপানি-আমেরিকানদের সম্পত্তির মত তাদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং তারা চার বছর ধরে কাঁটাতারে ঘেরা হোল্ডিং ক্যাম্পে বন্দী ছিলেন। কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভয় ছিল যে, জাপানি-আমেরিকানরা আমেরিকাতে জাপানের সাম্রাজ্যের পক্ষে নাশকতা সৃষ্টি করবে। 

বন্দীশিবির থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কাকুর জন্ম হয়। তিনি একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তোশিও একজন মালিক হিসেবে কাজ করতেন এবং মা হিদেকো কাজের মেয়ে হিসেবে কাজ করতেন। দরিদ্র হলেও মিশিও কাকুর বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহকে তোশিও এবং হিদেকো উভয়ই উৎসাহ দিতেন। এমনকি কাকুর ছোটবেলায় তারা তাকে একটি এটম স্ম্যাশার (Atom smasher) তৈরি করতেও সহায়তা করেছিল। 

মিশিও কাকুর বানানো এটম স্ম্যাশার
মিশিও কাকুর বানানো এটম স্ম্যাশার (Atom smasher)। উৎস: Altoidyoid

শিক্ষাজীবন

মিশিও কাকু পালো অল্টোর (Palo Alto) ‘কিউবার্লি হাই স্কুলে’ পড়াশুনা করেন এবং এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান। সেখান থেকে তিনি তার বিষয়ে ১ম হয়ে পদার্থবিজ্ঞানের উপর স্নাতক (প্রকৃতপক্ষে ‘Summa Cum Laude’ যাকে ল্যাটিন অনার্স ও বলা হয়) ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড থেকে স্নাতক সম্পন্নের পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে যান এবং ১৯৭২ সালে তার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।

মিশিও কাকু
মিশিও কাকু। উৎস: Flickr

যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে মিশিও কাকু

১৯৬৮ সালে মিশিও কাকু মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, সে বছরই তিনি তার স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিং এ তার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ এবং ওয়াশিংটনের ফোর্ট লুইসে উন্নত পদাতিক প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন। তিনি তার বই ‘Hyperspace: A Scientific Odyssey Through Parallel Universes, Time Warps, and the 10th Dimension’ এ উল্লেখ করেন,

গ্রাজুয়েশন সম্পন্নের তিন দিন পর আমি ক্যামব্রিজ ত্যাগ করি, আমি নিজেকে জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিং এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি স্টেশনে দেখতে পেলাম এরপর ফোর্ট লুইস, ওয়াশিংটনে। পূর্বে কোন সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল না এমন প্রায় ১০ হাজার সৈন্যকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল এবং ভিয়েতনামে প্রেরণ করা হয়েছিল ৫০০ GI কে প্রতিস্থাপিত করে যারা প্রতি সপ্তাহে মারা যাচ্ছিল।

মিশিও কাকু

GI হচ্ছে Galvanized Iron; যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রকার সৈন্য।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের GI সৈন্য
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের GI সৈন্য। উৎস: Wikimedia commons

যদিও মিশিও কাকুকে কখনো ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে হয় নি। 

বিজ্ঞান ও মিশিও কাকু এর সখ্যতা

বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে মিশিও কাকু বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। বিশেষ করে স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কাজ করে। তিনি স্ট্রিং ফিল্ড থিওরির (স্ট্রিং থিওরির একটি শাখা) একজন সহ-প্রস্তাবক। ১৯৭৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশিও কাকু অধ্যাপনায় যোগ দেন। মিশিও কাকু আইনস্টাইনের খুঁজতে থাকা “দ্য থিওরি অব এভ্রিথিং” নিয়ে কাজ করতে থাকেন। চারটি মৌলিক বল (সবল নিউক্লিয় বল, দুর্বল নিউক্লিয় বল, মহাকর্ষ বল এবং তাড়িতচৌম্বক বল) একত্রীকরণ নিয়ে কাজ করেন। 

১৯৭৫ এবং ১৯৭৭ সালে মিশিও কাকু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার উপর নিউ ইয়র্কের “দ্য সিটি ইউনিভার্সিটি” এর “দ্য সিটি কলেজ” এ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে গবেষণা করেন। মিশিও কাকু ১৯৮৪ সাল থেকে এখনও এই নিউ ইয়র্কের দ্য সিটি কলেজে এ পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পদে আছেন। তিনি মূলত সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান, গাণিতিক পদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনা করে থাকেন।

মিডিয়াতে মিশিও কাকু

বিজ্ঞান নিয়ে তার রয়েছে তথ্যচিত্র এবং বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক টিভি প্রোগ্রামেও সরব তিনি। তিনি ‘Me & Isaac newton’ এর মতো তথ্যচিত্রেও স্থান পেয়েছিলেন যার পরিচালক ছিলেন মিশেল আপ্টেড।

আরও পড়ুন: মিলিয়ন ডলার এর গণিতের সাত সমস্যা

‘BBC Series: Time’, ‘BBC Four series: Visions of the future’ নামের অনুষ্ঠানে তিনি কাজ করেছিলেন। এছাড়াও ‘Big Think’ নামের ইউটিউব চ্যানেলেও তিনি কাজ করেছেন।

BBC Four - Time, Cosmic Time
BBC Four – Time, Cosmic Time। উৎস: BBC

বিভিন্ন টিভি চ্যানেল যার মধ্যে Discovery, BBC, ABC, Science Channel and History Channel এ তিনি বেশ পরিচিত মুখ। তিনি Fox News, CBS, CBSN, CNN, CNBC এর মত খবরের চ্যানেলেও অবদান রেখেছেন।

Fox News এ মিশিও কাকু
Fox News এ মিশিও কাকু। উৎস: Pinterest

আর্ট বেল নামের একজন ঘোষক মিশিও কাকুকে “পরবর্তী কার্ল সেগান” বলে উল্লেখ করেছিলেন কারণ কাকু সহজে বিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করতে পারেন যাতে মানুষ সহজে বুঝতে পারে।

কার্ল সেগান
কার্ল সেগান। উৎস: Wikimedia Commons

তিনি বেশ কিছু বেতার অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে ‘Science Fantastic’, ‘Explorations in science’

Science Fantastic with Dr. Michio Kaku। উৎস: Michio Kaku

আর লেখালেখি? সেটির কথা আর বলতে! বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের অন্যতম হচ্ছেন এই মিশিও কাকু। 

Discover, Wired এবং New scientist এর মত জনপ্রিয় বিজ্ঞান প্রকাশনায় তিনি লিখেছেন। এছাড়াও Encyclopedia Britannica তেও তিনি অবদান রেখেছেন, লিখেছেন আলবার্ট আইনস্টাইনকে নিয়ে। 

মিশিও কাকুর গ্রন্থসমূহ

অনলাইনে লেখার পাশাপাশি তিনি কিন্তু অফলাইনেও লেখালেখি করেছেন, মানে তার রয়েছে বেশ কয়েকটি বেস্টসেলিং বই যেগুলোর জন্য তিনি বেশ সুপরিচিত। 

তার প্রথম বই ‘হাইপারস্পেস‘ ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি ঐ বছর প্রকাশিত বিজ্ঞান বইসমূহের মধ্যে বেস্টসেলার হয়েছিল এবং New York Times এ ও বেস্টসেলার হয়েছিল। Beyond Einstein নামের একটি বই তিনি জেনিফার থম্পসন (Jennifer Thompson) এর সাথে যৌথভাবে লিখেন, যা ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ সালে তার অন্যতম বিখ্যাত বই Visions প্রকাশিত হয়।

হাইপারস্পেস বই
হাইপারস্পেস বই। উৎস: Goodreads

এছাড়াও ২০০৫ , ২০০৬ এবং ২০০৮ সালে যথাক্রমে প্রকাশিত হয় Einsteins Cosmos, Parallel worlds এবং Physics of the impossible যা মূলত অসম্ভবের পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে লেখা।

ফিজিক্স অব দি ইম্পসিবল
ফিজিক্স অব দি ইম্পসিবল বইয়ের প্রচ্ছদ। উৎস: Amazon
ফিজিক্স অব দি ইম্পসিবল বইয়ের রিভিউ ইনফোগ্রাফে প্রকাশ
ফিজিক্স অব দি ইম্পসিবল বইয়ের রিভিউ ইনফোগ্রাফে প্রকাশ। উৎস: Jule Owen

২০১১ এবং ২০১৪ সালে যথাক্রমে তার বই Physics of the futureThe future of the mind প্রকাশিত হয়।

মিশিও কাকুর বিশ্বাস

মিশিও কাকু সম্পর্কে মানুষের ধারণা তিনি একজন আস্তিক বিজ্ঞানী। কাকুর মতে সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন একজন গণিতবিদ (শুধু গণিতবিদ উনি এই অর্থে বলেন নি; একটি গুণ হিসেবে বলেছেন)। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে তার সাথে রিচার্ড ডকিন্সের একটি বিতর্ক অনুষ্ঠান রয়েছে।

তার একটি উক্তি রয়েছে,

যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য কোনোও ব্যাখাই প্রয়োজন নেই। আর যারা বিশ্বাস করে না, কোনো ব্যাখাই তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

মিশিও কাকু

বিজ্ঞানকে জনপ্রিয়করণ ও বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে নিজের মেধার পরিচয় বিশ্বের কাছে ঠিকই তুলে ধরতে পেরেছেন বিজ্ঞানী মিশিও কাকু।

মিশিও কাকুর বাজি !

আপনার মনে হয়ত প্রশ্ন জেগেছে মিশিও কাকু কি আদৌও নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন? উত্তর হলো “না” । তিনি এখনও কোন নোবেল পুরস্কার পান নি। তবে নোবেল পুরস্কার নিয়ে তার সাথে মার্কিন বিজ্ঞান লেখক জন হর্গান এর একটি বাজি ছিল।

জন হর্গান
জন হর্গান। উৎস: Wikimedia Commons

২০০২ সালের এই বাজিটি ছিল ২০০০ ডলারের। লেখক জন হর্গান দাবি করেছিলেন, “২০২০ এর আগে কেউ পদার্থবিজ্ঞানের ইউনিফাইড থিওরির উপর নোবেল পাবে না”। অর্থাৎ ২০১৯ ছিল শেষ সময়। এবং দেখা যায় আসলেও কেউ ইউনিফাইড থিওরির উপর নোবেল পায় নি এই কয়েক বছরে। এটি নিয়ে ৮ই অক্টোবর ২০১৯ সালে Scientific American এ জন হর্গানের একটি ব্লগ প্রকাশিত হয়।

জন হর্গান এর লেখা ব্লগ। উৎস: Scientific American Blog

তো এই হচ্ছে বিজ্ঞানী মিশিও কাকুকে নিয়ে লেখা এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ!

মিশিও কাকু
মিশিও কাকু। উৎস: Wikimedia Commons

প্রচ্ছদসূত্র: Sci-Fi Empire

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on মিশিও কাকু : বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় এক পদার্থবিজ্ঞানী

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!