শার্লক হোমসের চোখে মাইক্রোসফটের টিকটক ক্রয়

শার্লক হোমসের চোখে মাইক্রোসফটের টিকটক ক্রয়

মার্শাল আশিফ
4.8
(9)
Bookmark

No account yet? Register

২২১ – বি বেকার স্ট্রিট। এই জায়গাটার নাম শুনলে আপনার কার কথা মনে পড়ে? নিশ্চয়ই শার্লক হোমস। স্যার আর্থার কোনান ডায়েল শার্লক হোমসকে তৈরি করেছিলেন। একসময় মেরেও ফেলেছিলেন আবার বাঁচিয়েও তুলেছেন। আজকে তার কাছেই শুনবো মাইক্রোসফটের টিকটক ক্রয়ের পিছনের কারণ কী হতে পারে।

অসামান্যতে লিখুন
শিল্পীর কল্পনায় শার্লক হোমস
শিল্পীর কল্পনায় শার্লক হোমস । ছবিসূত্র: Pixabay

ওহ হো! আমার পরিচয় তো দেওয়া হয়নি। আমাকেও সবার মনে থাকার কথা। কারণ, আমি যে জন ওয়াটসন, হোমসের প্রতিটি অভিযানের সাথী। আপনারা হয়ত ভাবছেন এতদিন পর হঠাৎ আবার আবির্ভূত হলাম কেন? অসামান্য ব্লগ থেকে আমাদের নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে যে। আমরা না এসে কি থাকতে পারি?

শার্লক হোমসের জ্ঞান যেমন সুবিশাল, তেমনি অজ্ঞতাও সুগভীর। অ্যানাটমি ভাল জানে, কেমিস্ট্রিতে তুখোড়। কিন্তু সমসাময়িক দর্শন, সাহিত্য নিয়ে জ্ঞান শূন্য। আগে রাজনীতি নিয়ে তেমন কোন আগ্রহ না থাকলেও ইদানীং রাজনীতি নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে শার্লক।

সরাসরি কাজের কথায় আসা যাক। সেদিন দেখলাম, শার্লক হোমস খবরের কাগজে কী একটা খবর খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। এর আগে এরকম মনোযোগ দিয়ে বহুবার খবরের কাগজ পড়তে দেখেছি। এটা আমার গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু মনের কী খেয়াল হল কে জানে? আমার বেশ কৌতূহল হল।

সংবাদপত্র পড়া অবস্থায় এক ব্যক্তি।
সংবাদপত্র পড়া অবস্থায় এক ব্যক্তি। ছবিসূত্র: Unsplash

ভাবলাম, হোমসকে খবরটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু পরের মুহূর্তেই দমে গেলাম। আপনি শার্লক হোমসকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবেন, আর সে তার সোজাসুজি উত্তর দিয়ে দিবে – এমনটা ভাবলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। হোমস তার উত্তরগুলো এমনভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দেয় যে মনে হয় তার চেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ এই জগত সংসারে আর দুটি নেই। হোমসের এ ধরণের আত্ম-অহংকার আমার একদম ভাল লাগেনা।

তাই ঠিক করলাম, তার পড়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি চুপিসারে গিয়ে খবরের কাগজ থেকে খবরটা পড়ে নিব।

কিছুক্ষণ পরেই চা খাওয়ার জন্য শার্লক হোমস চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। আমি এই সুযোগটা কাজে লাগালাম। খবরের কাগজটা খোলা রেখেই হোমস চলে গিয়েছিল। তাই, খবরটা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হল না। খবরের কাগজে চোখ রাখতেই আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। সেখানে বড় করে শিরোনাম দেওয়া: টিকটকের সম্পূর্ণ বা আংশিক শেয়ার কিনতে চায় মাইক্রোসফট। আমি আর কাল বিলম্ব না করে পুরো সংবাদটা এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম। সংবাদটা পড়ার পর আমার মনের অবস্থা কিরূপ হল তা বর্ণনা করার মত ভাষা আমার জানা নেই।

এই সংবাদ যেমন একদিকে আমাকে অবাক করেছে, তেমনি অন্যদিকে আমি একটু খুশিই হয়েছি। খুশির কারণটা অবশ্য ভিন্ন। প্রথমবারের মত আমার সামনে সুযোগ এসেছে শার্লক হোমসকে জ্ঞানের দিক দিয়ে টক্কর দেওয়ার। শার্লক হোমস প্রযুক্তির বিষয়ে তেমন ধারণা রাখে না। তার প্রমাণ তো আপনারা একটু আগেই দেখেছেন। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সে মুঠোফোনে খবর না পড়ে কাগজের খবর দিয়ে কাজ চালায়। তাকে কতবার এ নিয়ে বুঝিয়েছি। কিন্তু সে কি আর আমার কথা কানে তোলার বান্দা। আমি নিজে একজন কট্টর প্রযুক্তি-প্রেমী। তাই, এরকম সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। শার্লককে বুঝিয়ে দিতে হবে আমিও কোন অংশে কম না। এতে করে যদি তার আলগা অহংকার একটু কমে।

খবরের কাগজটা আগের জায়গায় রেখে আমি নাস্তা করতে গেলাম। নাস্তা করা শেষ করে আমি শার্লক হোমসের মুখোমুখি বসলাম। হোমসকে নাস্তানাবুদ করার জন্য মনটা বড়ই আনচান করছিল। কিন্তু কথাটা যে কীভাবে শুরু করা যায় তাই নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিলাম। আসলে প্রসঙ্গ ছাড়া কোন কথা উত্থাপন করা যে বেশ কঠিন কাজ তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। যাইহোক, কোন রকম ভনিতা ছাড়াই আমি কথা বলা শুরু করলাম।

-“আজকাল প্রযুক্তি নিয়ে বেশ আগ্রহ জন্মেছে দেখছি।”

-“হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ?

-“সকালে দেখলাম, মাইক্রোসফট আর টিকটক নিয়ে যে লেখাটা বেড়িয়েছে তা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছ। আগে তো প্রযুক্তি পাতা ছুঁয়ে দেখতে না।

-“আমাকে ফলো করছ দেখছি !

ফাঁদে রাখা পনিরে মুখ দেওয়ার পর একটা ঘট শব্দ শুনে ইঁদুর যেমন বুঝতে পারে যে সে ধরা পড়ে গেছে আমার অবস্থাও তেমন হল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “প্রযুক্তি নিয়ে আমি আগে থেকেই তোমার চেয়ে বেশি জানি”। ‘তোমার চেয়ে’ কথাটা বলার সময় আমি অনাবশ্যক জোর দিলাম।

-“তো মহান শার্লক হোমস, গোয়েন্দাদের গোয়েন্দা, এ বিষয়ে তোমার বিশ্লেষণ কী?

মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে কুঠুরির মত। কতটুকু তথ্য আমাদের মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারবে তার একটা সীমা আছে। আমি তো আর তোমার মত নই যে অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে মস্তিষ্ককে ভারাক্রান্ত করে রাখব আর কাজের সময় হলে কোন তথ্যই মনে করতে পারব না।

আমাকে করা অপমান আমি হজম করে নিলাম। শার্লক বলেই চলল,

বর্তমান সময়ের দুইটি পরাশক্তি হচ্ছে চীন আর আমেরিকা। চীনকে রুখতে আমেরিকা তাই একের পর এক চাল চেলে যাচ্ছে। প্রথমে হুওয়ায়ে, এবার টিকটক

চীন আর আমেরিকার মধ্যে চলছে বাণিজ্য যুদ্ধ, টিকটক ইস্যু সেটারই উদাহরণ
চীন আর আমেরিকার মধ্যে চলছে বাণিজ্য যুদ্ধ। ছবিসূত্র: Unsplash

-“হোমস, তুমি কী করে এত নিশ্চিত হচ্ছ যে রাজনৈতিক কারণেই আমেরিকা টিকটক নিষিদ্ধ করতে চাইছে। এটাও তো সত্যি যে টিকটক ব্যবহারকারীদের তথ্য চীনে পাচার হয়ে যেতে পারে।

এই কথা বলে আমি একটু দম নিলাম। আমার মুখের উপর যাতে শার্লক হোমস আর কোন কথা বলতে না পারে সেইজন্য আমি মুঠোফোন বের করে কিছু নিউজ সাইটের খবর দেখালাম। আমি শার্লক হোমসকে হারানোর ক্ষেত্রে চেষ্টার কোনো ত্রূটি রাখতে চাইনা।

-“টিকটকের বিরুদ্ধে ব্যবহারকারীদের প্রাইভেসি লঙ্ঘন করার অভিযোগ আছে। টিকটক আইফোনের ক্লিপবোর্ডে থাকা ইনফরমেশন চুরি করত।

-“সেটাতো লিংকডইন, পাবজি, হাফিংটোন পোস্ট, রয়টার্স, ভাইবার, ট্রু-কলারসহ আরও অনেকে করত। তবে এটাও সত্যি অন্যরা অপরাধ করছে বলেই টিকটক পার পেয়ে যাবে না। এটা খুবই দুঃখজনক যে বর্তমানে মানুষের প্রাইভেসি বলে আর কিছু থাকছে না। গুগল, ফেসবুক থেকে শুরু করে ছোট বড় সবাই মানুষের প্রাইভেসি লঙ্ঘনের উন্মত্ত খেলায় মেতেছে।”

আমি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাচ্ছি। ভেবেছিলাম, প্রযুক্তি বিষয়ে তর্ক করে হোমসকে সহজে হারিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু এখন তো দেখছি শার্লক হোমস প্রযুক্তি বিষয়েও ভাল ধারণা রাখে। তবে আমি সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নই। আমিও শার্লক হোমসকে পালটা জবাব দিলাম-

-“খুব তো প্রযুক্তি নিয়ে ধারণা রাখছ ইদানীং। তাহলে বল তো মাইক্রোসফট কেন টিকটক কিনতে চাইছে? মাইক্রোসফট তো কোন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি নয়। ফেসবুকের কি টিকটক কেনা উচিত নয়? কারণ, ফেসবুকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে টিকটক কিন্তু ভালই টক্কর দিচ্ছিল। টিকটক কিনে নিলে ফেসবুকের দুই দিক থেকেই লাভ। সাপও মরল আবার লাঠিও ভাঙল না।”

আমার সাথে থেকে থেকে তোমার বুদ্ধি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখছি। একটা বিষয় খেয়াল কর, টিকটকের শেয়ার পুরোটা বা আংশিকভাবে কেনার ক্ষমতা খুব কম কোম্পানির আছে। আমরা যদি প্রযুক্তি জগতের পাঁচ দৈত্য – অ্যাপল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, গুগল, ফেসবুক নিয়ে কথা বলি তাহলে বিষয়টা একটু আঁচ করা সম্ভব। প্রথমেই অ্যাপলকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ, অ্যাপলের মূল বিজনেস হচ্ছে হার্ডওয়ার বিক্রি করা। বাকি চারটা কোম্পানির প্রত্যেকেরই টিকটক কেনার সম্ভাবনা রয়েছে। ফেসবুকের কথা তো তুমি আগেই বলে দিলে। অ্যামাজন কিনতে চাইলে আমি অবাক হতাম না। অনেকে অ্যামাজনকে শুধু ই-কমার্স সাইট হিসেবে চিনে। কিন্তু অ্যামাজন এর থেকেও আরও অনেক বড়। তুমি কি জান সিনেমা রেটিং দেওয়ার ওয়েবসাইট আইএমডিবি, বই রিভিউ করার ওয়েবসাইট গুডরিডস, ভিডিও গেম স্ট্রিমিং প্ল্যার্টফর্ম টুইচ সবগুলোই অ্যামাজন কিনে নিয়েছে?

-“সত্যি আমি এটা জানতাম না।

অ্যাামাজন কিন্তু শুধু ই-কমার্স সাইট নয় তাই এরাও কিন্তু কিনে ফেলতে পারত টিকটক
অ্যাামাজন কিন্তু শুধু ই-কমার্স সাইট নয়। ছবিসূত্র: Unsplash

আরও পড়ুন: প্রণব মুখার্জি: এক বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি

শার্লকের মুচকি হাসি আমার চোখ এড়ালো না। যাইহোক, হোমস বলে চলল,

এরকম আরও কত কোম্পানি যে অ্যামাজন কিনে নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। পাঁচ মোড়লের মধ্যে তিনজন গেল, বাকি থাকল দুই। গুগল চাইলে টিকটক কিনতে পারত। তবে এর আগে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম বানিয়ে ব্যর্থ হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাই হোক, কিংবা গুগলের ওপর থাকা মনোপলির অভিযোগের কারণেই হোক গুগল টিকটক কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তবে স্বীকার করতেই হবে, মাইক্রোসফটের টিকটক কেনার আগ্রহ আমাকে বেশ অবাক করেছে।

-“তুমিও অবাক হও এটা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়।

সুযোগ পেয়ে শার্লক হোমসকে টিটকিরি মারতে আমিও ছাড়লাম না। আমাকে অগ্রাহ্য করে হোমস বলেই চলল- 

মাইক্রোসফটের টিকটক কেনার পেছনে দুটো কারণ আপাতত মাথায় আসছে। টিকটক বর্তমানে বাইটড্যান্স কোম্পানির অধীন। বাইটড্যান্স কোম্পানি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছে। অন্যদিকে মাইক্রোসফট এই দিক দিয়ে অন্য মোড়লদের (যেমনঃ গুগল) তুলনায় পিছিয়ে আছে। তাই হয়ত এআই এর দিকে উন্নতি করার জন্য মাইক্রোসফট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে রাজনৈতিক। এই তো গত বছরের ঘটনা। ক্লাউড কম্পিউটিং নির্ভর একটি প্রজেক্টের জন্য আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাথে মাইক্রোসফটের ১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। যদিও এই চুক্তি অ্যামাজনের সাথে হওয়ার কথা ছিল। কারণ, ক্লাউড কম্পিউটিং এ মাইক্রোসফটের চেয়ে অ্যামাজন অনেকটাই এগিয়ে। এ নিয়ে অ্যামাজন বেশ ক্ষুব্ধ ছিল। ট্রাম্প যে জেফ বেজোসকে পছন্দ করেন না তা সর্বজনবিদিত। এ থেকে ধারণা করা যায় যে আমেরিকার সরকারের সাথে মাইক্রোসফটের বেশ ভাল কানেকশন আছে।

-“দিনকে দিন চীন যেভাবে চোখ রাঙ্গানি দিচ্ছে – এই বুঝি আমেরিকাকে বিশ্ব মোড়লের মুকুট হারাতে হয়। এই ভয় থেকেই হয়ত ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বড় বড় কোম্পানির প্রতি একের পর এক আঘাত হেনে যাচ্ছেন। এমনটাও হতে পারে যে সরকারের নির্দেশেই মাইক্রোসফট টিকটক কিনতে চাইছে।

এইভাবে কথা চলতে থাকলে আমি হেরে যাব। তাই আমি আজকের মত এখানেই কথার ক্ষান্তি দিলাম যাতে করে পরবর্তীতে আরও ভাল প্রস্তুতি নিয়ে শার্লক হোমসের সঙ্গে তর্ক করতে পারি।

আমাকে বেশি দেরি করতে হল না। পরের দিনই টিকটককে নিয়ে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর বের হল। ওয়ালমার্ট নাকি টিকটককে কিনতে চায়। এ খবর দেখে আমার মাথা ঘোরার জোগাড় হল। কারণ, ওয়ালমার্ট সুপারশপের মত একটা কোম্পানি। তাদের আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলো দোকান আছে। সেখানে জামা-কাপড়সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো বিক্রি করা হয়। আমি ভেবে পাচ্ছি না, টিকটকের মত সোশ্যাল মিডিয়া কিনে ওয়ালমার্ট কী করবে?

ওয়ালমার্টের একটি দোকান। ছবিসূত্রঃ people.com
ওয়ালমার্টের একটি দোকান । ছবিসূত্র: People.com

ভাবলাম এই নিয়ে শার্লক হোমসের সঙ্গে একটু আলাপ করা যাক। হোমস তখন বেহালা বাজাচ্ছে। বেহালা সে ভালোই বাজায়। কিন্তু তার বাজানোর ধরনটা কেমন যেন খ্যাপাটে। আমি হোমসের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। হোমস আমার দিকে একটিবারের জন্য মুখ ফিরে তাকাল। তারপর বলল, 

কিছু বলবে বলে মনে হচ্ছে।

হোমসের কোন ব্যক্তির দিকে তাকিয়েই তার মনের ভাব বলার অনন্য সাধারণ গুণ আছে তা আপনারা সকলেই জানেন।

শার্লক হোমস বেহালা বাজাতে পছন্দ করতেন। ছবিসূত্রঃ Pixabay
শার্লক হোমস বেহালা বাজাতে পছন্দ করতেন । ছবিসূত্র: Pixabay

আমি হোমসের দিকে মুঠোফোনটা এগিয়ে দিলাম। মুঠোফোনের মধ্য দিয়ে খবরটার দিকে এক নজর তাকিয়ে হোমস ফোনটা আমাকে ফেরত দিল। আমি কিন্তু তার চেহারায় অবাক হওয়ার মত কোনো লক্ষণ দেখলাম না। বরং হোমস আমাকে পালটা প্রশ্ন করল-

-“কী এই জিনিস তোমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, তাই না?

-“তোমার কাছে আর কী লুকোবো, তুমি তো সবই বুঝতে পার।

-“গতকাল তো খুব তর্ক করছিলে, আজ কী হল?

আমি গতকালকেই নৈতিক পরাজয় মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সেটা মুখে বললে হোমসের আত্মম্ভরিতা বেড়ে যাবে। তাই কথা না বলে চুপ থাকলাম।

আমাকে চুপ দেখে হোমস যা বোঝার বুঝে নিল। সে যথারীতি কথার ফুলঝুড়ি নিয়ে বসল, 

ওয়ালমার্টের টিকটক কেনার আগ্রহের পিছনে দুটো কারণ থাকতে পারে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, টিকটক ব্যবহার করে তরুণ বয়সীরা। আবার ওয়ালমার্ট পোশাক বিক্রি করে থাকে। ফলে, ওয়ালমার্ট এমন একটা সিস্টেম দাঁড় করাতে চাইছে যেখানে তুমি একটা টিকটক ভিডিওতে কোন একটা মেয়ের পোশাক দেখে পছন্দ করলে। এখন তুমি চাইলেও টিকটক অ্যাপের মাধ্যামে সেই পোশাকটা কিনতে পারবে।

-“আশ্চর্য! আমি কেন মেয়েদের পোশাক কিনতে যাব?

-“তোমাকে কিনতে বলিনি। শুধু কল্পনা করতে বলেছি। যাইহোক, দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে একটা ফেক কম্পিটিশন তৈরি করা। তারপর মাইক্রোসফট আর ওয়ালমার্ট একসাথে হয়ে টিকটক কিনতে চাইবে। এতে আরও কম দামে টিকটকের শেয়ার কেনা সম্ভব হবে।

-“কিন্তু শার্লক, চীন কি চুপ করে বসে থাকবে?

ওয়াটসন, এ ব্যাপারে আমি তোমার সাথে একমত। আমার মনে হয় না টিকটক তাদের সম্পূর্ণ শেয়ার বিক্রি করতে রাজি হবে। খুব চাপে পড়লে আমেরিকা আর তাদের বন্ধু রাষ্ট্রদের আংশিক শেয়ার মাইক্রোসফট বা ওয়ালমার্টকে বিক্রি করে দিতে পারে। এই দুটি কোম্পানি ছাড়াও আরও তিনটি কোম্পানি টিকটক কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের কাছেও আংশিক শেয়ার বিক্রি করতে পারে। তবে এভাবে শেয়ার বিক্রি করার অনুমোদন চীন সরকার দিবে কিনা সেটাও এক প্রশ্ন। এত কিছুর মধ্যেও টিকটকের জন্য ইতিবাচক দিক রয়েছে।  যদিও ভারতের কাছ থেকে একটা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে, তবুও টিকটক অন্যান্য দেশ থেকে ভাল অর্থ আয় করতে পারবে। কারণ, তরুণরা এই প্ল্যার্টফর্ম খুব পছন্দ করেছে।

শার্লক হোমসের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির আর ধারালো যুক্তির কাছে আমি ধরাশায়ী হয়েছি সেটা আলাদা করে বলার কিছু নেই।  প্রিয় পাঠক, আপনারা তো জানেন আমি একসময় সার্জন ছিলাম। এখন প্রযুক্তি বিষয়ক নিবন্ধ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে এই বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলাম বলে আমার ধারণা ছিল। কিন্তু শার্লক হোমসের সাথে যুক্তির দৌড়ে এমনভাবে হেরে যাওয়ার পর আমি মুখ দেখাব কি করে!

যাইহোক, হোমস কিন্তু আমার ভাল বন্ধু। মাঝেমধ্যে আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আমরা একে অপরের পরিপূরক। আপনারা যদি শার্লক হোমসকে আবারও অসামান্য ব্লগে দেখতে চান তাহলে কমেন্টে জানাবেন কিন্তু। 

তথ্যসূত্র:

ফিচার ছবিসূত্র: Pixabay

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
5 Thoughts on শার্লক হোমসের চোখে মাইক্রোসফটের টিকটক ক্রয়
    Moidul Hasan
    3 Sep 2020
    8:52pm

    ভাই, সত্যি সত্যিই যেন মনে হচ্ছিল এইটা কোনান ডয়েল সাহেবই লিখেছেন। আশা করি, খুব তাতাড়ি শার্লক হোমস নিয়ে আরো লেখা পাবো ❤

    1
    0
      Marshal Ashif
      6 Sep 2020
      2:10pm

      মইদুল হাসানকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। নিবন্ধটি লেখার সময় চিন্তায় ছিলাম শার্লক হোমস ভক্তরা আবার ক্ষেপে না যায়! এখন দেখছি তারাও লেখাটা পছন্দ করেছে। এটা দেখে বেশ অনুপ্রেরণা পাচ্ছি।

      2
      0
    MD. Jubair Hasan
    6 Sep 2020
    1:36pm

    Tiktok keno fb kinbe na seta niye kono info pelam na eta kharap laglo jodio microsoft keno linbe seta valo korei bujhano hoyeche.😀

    1
    0
      Marshal Ashif
      6 Sep 2020
      2:09pm

      ধন্যবাদ জুবায়ের হাসানকে। আপনি যে মনোযোগ দিয়ে লেখাটা পড়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। আমি ইচ্ছা করেই ফেসবুকের প্রসঙ্গ সযতনে এড়িয়ে গেছি। তবে এখন মনে হচ্ছে মূল লেখায় সেটা যুক্ত করলেই ভাল হত।
      ফেসবুক কেন টিকটক কিনতে আগ্রহ দেখাল না সেই ব্যাপারে শার্লক হোমসের যুক্তি ছিল ফেসবুকের উপর থাকা মনোপলির অভিযোগ। যখন একটা কোম্পানি খুব বড় হয়ে যায় তখন সেই টাইপের অন্যন্য ছোট কোম্পানি আর গড়ে উঠে না। ফলে বড় কোম্পানি যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। এটাকেই বলা হয় মনোপলি। গুগল আর ফেসবুককে এর আগে এর জন্য জরিমানা গুনতে হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এটার বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার। এছাড়াও আমেরিকার অনেক নেতা ফেসবুককে ভেঙ্গে ফেলার মতামত জানিয়েছেন। এটা নিয়ে একসময় বেশ শোরগোল হয়ে ছিল। তাই টিকটক কিনে ফেসবুক তাদের রাজত্ব আরও বিস্তার করতে পারত ঠিকই কিন্তু তাদেরকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও অনেকের রোষানলে পড়তে হত।
      এই বিষয়ে আরও জানতে চাইলে-
      https://www.nytimes.com/2019/05/09/opinion/sunday/chris-hughes-facebook-zuckerberg.html

      1
      1
        MD. Jubair Hasan
        7 Sep 2020
        12:35am

        ফেসবুকের না কেনার ব্যাপারটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য জাযাকাল্লাহ। 😍

        1
        0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!