মহানবি (ﷺ) এর জীবনের শেষ দিনগুলোর ধারাবাহিক ঘটনাপঞ্জি

মো. রেদোয়ান হোসেন
4.9
(12)
Bookmark

No account yet? Register

২৩ বছরের নবুওয়াত জীবনের প্রতিটি ক্ষণ মহানবি ﷺ নিজের উম্মাহের জন্য ব্যয় করেছেন। ব্যক্তিগত সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে উম্মাহর সামষ্টিক কল্যাণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজ মানুষের চলার পথের পাথেয়স্বরূপ। চলমান নিবন্ধে এই মহামানবের জীবনের শেষ দিনগুলোর প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। 

অসামান্যতে লিখুন

বিদায় হজের ভাষণ

৯ জিলহজ, ১০ম হিজরি। আরাফাত প্রান্তরে সকলের সামনে মহানবি ﷺ এসে দাঁড়ালেন। 

আরাফাত প্রান্তরে মহানবি ﷺ বিদায় হজের ভাষণ দেন।
চিত্র: আরাফাত প্রান্তরে অবস্থান করা হজের একটি আবশ্যকীয় কাজ; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স 

আল্লাহর রাসুল ﷺ বক্তব্য শুরু করলেন,

হে মানবসকল, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনো। আমি জানি না, আগামী বছর এই স্থানে আবার তোমাদের সকলের সাথে মিলিত হতে পারবো কি না।

সকলেই উৎকণ্ঠ হয়ে আল্লাহর রাসুল ﷺ এর কথা শুনতে লাগলেন। ভাষণ দিচ্ছেন আল্লাহর রাসুল ﷺ। জীবনের হেন কোনো দিক নেই, যার সম্পর্কে বলতে তিনি বাদ রেখেছেন। এমন সময় নাজিল হলো কুরআনের আয়াত – 

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ করলাম, আর তোমাদের উপরে আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ধর্মরূপে মনোনীত করলাম ইসলাম।

সুরা আল মায়িদাহ, আয়াত – ৩

আল্লাহর রাসুল ﷺ নিজের বক্তব্য শেষ করলেন। তাঁর চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। তিনি উচ্চস্বরে বললেন, হে আল্লাহ, আমি কি তোমার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি? জনসমাগম থেকে উত্তর আসলো, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল, আপনি পেরেছেন। ঊর্ধ্বাকাশে তাকিয়ে আল্লাহর রাসুল ﷺ বললেন, হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেকো। কিন্তু কেন জানি এক অজানা বিয়োগব্যথায় সকলের মন বিষণ্ণ হয়ে রইলো। 

পরদিন, ১০ জিলহজ। ইদুল আজহা। উপস্থিত সকল সাহাবির সাথে মিলে মহানবি ﷺ নিজেও আল্লাহর রাস্তায় পশু কুরবানি করলেন। তারপর অন্য সকল হাজিদের মতনই মাথা মুণ্ডন করলেন। 

মহানবি ﷺ অন্য সকল সাহাবির সাথে আল্লাহর নামে কুরবানি করেন।
চিত্র: কুরবানির উদ্দেশ্যে পশু কিনছেন হাজিগণ; চিত্রসূত্র – Ilm Feed 

পরবর্তীতে, ১১ এবং ১২ জিলহজ বিধি মোতাবেক অন্য সকল কার্যক্রম পালন করে আল্লাহর রাসুল ﷺ মদিনায় ফিরে গেলেন। 

একাদশ হিজরির মুহররম মাস  

মক্কায় হজ থেকে ফিরে আসার পরে মহানবি ﷺ প্রায়ই অসুস্থতা বোধ করতেন। কিন্তু কখনোই এই অসুস্থতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি অথবা রাসুলুল্লাহের নিয়মিত কাজে বাঁধার সৃষ্টি করেনি। এসময় প্রায়ই রাতের বেলা হযরত মুহাম্মদ ﷺ রাতের বেলা বাসা থেকে বের হয়ে জান্নাতুল বাকি এবং মদিনার অন্যান্য কবরস্থানে যেতেন। সেখানে তিনি কবরবাসীর রুহের মাগফেরাতের জন্য তিনি গভীর রাত ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। 

জান্নাতুল বাকি'তে অনেক শহিদ সাহাবি শায়িত আছেন।
চিত্র: মহানবি প্রায়ই জান্নাতুল বাকি’তে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দুআ করতেন; চিত্রসূত্র – ট্রিপ অ্যাডভাইজর 

ইয়েমেনে এক ভণ্ড নবির আবির্ভাব ঘটে যে নিজেকে সৃষ্টিকর্তা প্রেরিত পুরুষ বলে দাবি করে। তার নাম ছিল আসওয়াদ আল আনসি। ইয়েমেনের আনসি গোত্রে সে তার প্রচলিত ধর্ম প্রচার শুরু করে। এক পর্যায়ে সে তার গোত্রের ৬০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে ইয়েমেনে নিযুক্ত গভর্নর শাহরকে আক্রমণ করে হত্যা করে এবং তাঁর স্ত্রীকে জোরপূর্বক বিবাহ করে। পাশাপাশি ইয়েমেনের দখল নিয়ে নেয়। এদের প্রতিরোধের জন্য মহানবি ﷺ মুহররম মাসে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর এবং নিযুক্ত সেনানায়কদের নির্দেশ দেন। মহানবি ﷺ এর মৃত্যুর আগেই রবিউল আওয়াল মাসের ৮ তারিখে আসওয়াদ আল আনসি নিহত হয়। 

কাছাকাছি সময়ে নজদের মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার মুসায়লিমা কাজ্জাব মহানবি ﷺ এর কাছে একটি নিকৃষ্ট শব্দ সংবলিত চিঠি প্রেরণ করে। এই চিঠিতে মুসায়লিমা কাজ্জাব পৃথিবীর অর্ধেক অংশে নিজের এবং বাকি অর্ধেক অংশে আল্লাহর রাসুলকে ধর্ম প্রচার করতে বলে। মহানবি ﷺ তার প্রতিনিধির থেকে চিঠি গ্রহণ করেন এবং নম্র ভাষায় উত্তর লিখেন যে, 

‘আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদের ﷺ পক্ষ থেকে, মিথ্যাবাদী মুসায়লিমার প্রতি। মুত্তাকিদের উপরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। অবশ্যই, সমগ্র জগৎ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি যাকে ইচ্ছা ভূমির অংশবিশেষ দান করেন। তবে এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো আল্লাহ-ভীরুতা।’ 

মুসায়লিমা কাজ্জাব মিথ্যা নবওয়াতের দাবি করে।
চিত্র: অনুগামীদের সাথে ভণ্ড নবি মুসায়লিমা; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট 

একাদশ হিজরির সফর মাস

এদিকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট হেরাকিউলিস নিয়মের তোয়াক্কা না করে মুসলিম অধিকৃত ভূমি দখল শুরু করে এবং বসরার পথে গমনকারী মহানবি ﷺ এর দূতকে নির্মমভাবে হত্যা করে। 

হেরাকিউলিস অযাচিতভাবে মুসলিমদের আক্রমণ করে।
চিত্র: সম্রাট হেরাকিউলিস; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট 

তাই সফর মাসের মাঝামাঝি দিকে মহানবি ﷺ উসামা ইবনে যায়েদের নেতৃত্বে প্রায় ৩০০০ সৈন্যের একটি দল বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। 

সফর মাসের শেষ দশদিনে মহানবির ﷺ মাথাব্যথা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পায়। প্রায়ই এমন ঘটে যে, তিনি মসজিদে নামাজের ইমামতি করতে পারেননি। ২৮ তারিখ, বুধবার মহানবি কিছুটা সুস্থবোধ করেন। তিনি শয্যা থেকে উঠে গোসল করেন এবং মসজিদে উপস্থিত জনসাধারণের উদ্দেশ্যে খুতবা দেন। মদিনাবাসী জনগণ এতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। সকলে তাদের নিজেদের সাধ্যানুযায়ী বিভিন্ন দান-সদকা করেন এবং আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহর ﷺ সুস্থতার জন্য শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন। 

কিন্তু পরদিন থেকেই তিনি আবার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। 

আরো পড়ুন: বদর যুদ্ধ: ইসলামের ইতিহাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়

জীবনের সর্বশেষ সপ্তাহে মহানবি ﷺ

আল্লাহর রাসুল ﷺ তখন মারাত্মকভাবে অসুস্থ। প্রতিদিনই অনেক সাহাবি তাঁকে দেখতে আসেন। তাই তাদের সকলের সুবিধার জন্য তিনি মসজিদে নববির পাশেই হযরত আয়েশার (রা.) ঘরে চলে যান। 

মসজিদে নববি ছিল মহানবি ﷺ এর মূল শিক্ষাদান কেন্দ্র।
চিত্র: বিংশ শতাব্দীতে মসজিদে নববি; চিত্রসূত্র – বিউটিফুল মস্কস

 হযরত আয়েশা (রা.) দিবারাত্রি হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর যত্ন-আত্তি করতেন। 

৭ তারিখ আল্লাহর রাসুল কিছুটা সুস্থ হলে, মসজিদে আসেন এবং জনগণের সামনে খুতবা দেন। তিনি জনগণকে নির্দেশ দেন, তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর অনুসারীরা যেন তাঁর সমাধিকে নিজেদের তীর্থস্থানে পরিণত না করে। তিনি তাদেরকে এই বলে সতর্ক করেন, পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা এই কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিশাপপ্রাপ্ত। তিনি উপস্থিত সকলকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কারো কাছে ঋণী কী না। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তিন দিরহাম ঋণের কথা বলেন। মহানবি ﷺ এর পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়। এই সময়েই আল্লাহর রাসুল ﷺ সবার সামনে আরো বলেন যে, যদি তিনি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে পৃথিবীতে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতেন, তবে তা হতেন হযরত আবু বকর (রা.)।

৮ তারিখ মাগরিবের নামাজের পূর্বে তিনি এতই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, তিনি নামাজের ইমামতি করার পরিস্থিতিতে ছিলেন না। তিনি উঠে দাঁড়ান কিন্তু ওজু করার সময়েই আবার জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরলে তিনি উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করেন যে, সবাই নামাজ আদায় করেছে কী না। হযরত আয়েশা (রা.) না-সূচক উত্তর দেন এবং বলেন , মুসল্লিরা আল্লাহর রাসুল ﷺ এর জন্য অপেক্ষা করছেন। তখন তিনি হযরত আবু বকর (রা.) কে নামাজে ইমামতি করার জন্য প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে মহানবি ﷺ আর কোনো নামাজেই ইমামতি করার মতন শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারেননি। আল্লাহর রাসুলের জীবদ্দশায় হযরত আবু বকর (রা.) মোট ১৭ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করেছিলেন। 

৯ বা ১০ তারিখ (নিশ্চিত করে জানা যায়নি) মহানবি ﷺ কিছুটা সুস্থতাবোধ করলে মসজিদে নববিতে আসেন। তখন হযরত আবু বকর (রা.) জনসাধারণের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছিলেন। মহানবিকে ﷺ দেখে তিনি সরে যান এবং তাঁকে খুতবা দেওয়ার জন্য আহবান করেন। কিন্তু মহানবি ﷺ তাঁকে নিষেধ করেন এবং তাঁকে নিজের খুতবা চালিয়ে নিতে বলেন। সেদিন হযরত মুহাম্মদ ﷺ হযরত আবু বকর (রা.) এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করেন। 

১১ তারিখে হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর শরীরের অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। দুপুরের দিকে তিনি নিজের অধীনে থাকা সকল ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেন। এই অবস্থায় তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতে ছিল কেবলমাত্র সাত দিনার। এই সাত দিনারও তিনি দান করে দেন। অবস্থা এমনই হয়ে যায় যে, রাতে কুপি জ্বালানোর জন্য হযরত আয়েশাকে (রা.) তেল এক প্রতিবেশী থেকে ধার করতে হয়। এমনকি মহানবির ﷺ নিজের বর্ম ত্রিশ সা গমের বিনিময়ে এক ইহুদি প্রতিবেশীর নিকট বন্ধক ছিল। 

১২ তারিখ ফজরের নামাজের সময় সকল মুসল্লি মসজিদে নববিতে হযরত আবু বকরের ইমামতিতে নামাজ শুরু করার জন্য মাত্র দাঁড়িয়েছেন। হযরত আয়েশার (রা.) কক্ষের পর্দা সরিয়ে বিছানা থেকে সেই দৃশ্য দেখছিলেন মহানবি হযরত মুহাম্মদ ﷺ। হযরত আবু বকর (রা.) বাইরে থেকে এই দৃশ্য দেখে ভেবেছিলেন হয়তো মহানবি ﷺ নিজে ইমামতি করতে চান। তাই তিনি মহানবিকে ﷺ ডাক দেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল তাঁদের নামাজ চালিয়ে যেতে বলেন। সকল মুসল্লিরা হযরত আবু বকর (রা.) এর নেতৃত্বে নামাজ আদায় করার দৃশ্য মহানবী ﷺ নিজের কক্ষ থেকেই দেখতে থাকেন। পরবর্তী ওয়াক্তে মুসল্লিদের একসাথে নামাজ পড়তে তিনি আর দেখতে পারেননি। 

সকালের দিকে আল্লাহর রাসুল তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমাকে (রা.) ডাকেন। তিনি নিজের মেয়ের কানে কানে কিছু কথা বলেন। এতে প্রথমে তিনি কেঁদে ফেলেন আর পরে তিনি হেসে ফেলেন। পরে এক সময়ে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, প্রথমে তাঁর বাবা তাঁকে জানান যে, তিনি এই অসুস্থতা থেকে আর কখনোই মুক্তিলাভ করবেন না, এই জন্য তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন; আর পরে তিনি বলেছিলেন যে, পরিবারের সকল সদস্যদের মধ্যে তিনিই প্রথম পিতার সাথে সাক্ষাৎ করবেন, তাই তিনি হেসে ফেলেছিলেন।৫ 

হযরত ফাতিমা (রা.) তাঁর পিতার কষ্ট দেখে অনেক দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ছিলেন। আল্লাহর রাসুল প্রথমবারের মত পৃথিবীর কোনো মানুষকে বলেন , আজই তাঁর এই কষ্টের ইতি ঘটবে এবং এর পরে তিনি আর জীবিত থাকবেন না।৬ 

মহানবি ﷺ এরপরে হযরত হাসান (রা.) এবং হুসাইনকে (রা.) ডাক দেন এবং তাঁদের দুইজনকে যেন ঠিকভাবে খেয়াল রাখা হয়, হযরত আলিকে (রা.) সেই নির্দেশ দেন। এরপরে আল্লাহর রাসুল তাঁর সকল জীবিত স্ত্রীকে ডাক দেন। তিনি তাঁদের সবাইকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের দেওয়া বিধান যথাযথভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন। তখন হঠাৎ করেই আল্লাহর রাসুল ﷺ এর চেহারা ব্যথায় কুঁচকে যেতে শুরু করে। তিনি আয়েশা (রা.) কে বলেন যে, খায়বারে সেই বিষমিশ্রিত খাদ্যের প্রভাব যেন তখনো তাঁর কাছে বিদ্যমান এবং তাঁর মনে হচ্ছিল মৃত্যু যেন তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। 

কিছুক্ষণ পরে হযরত আবু বকর (রা.) এর পুত্র হযরত আব্দুর রহমান (রা.) মহানবি ﷺ এর ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে একটি মিসওয়াক ছিল। সেই মিসওয়াক দেখে আল্লাহর রাসুল ﷺ নিজেও মিসওয়াক করতে চাইলেন। যদিও তাঁর মুখের অভিব্যক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি প্রচুর কষ্ট অনুভব করছেন; তাও হযরত আয়েশার (রা.) সাহায্য নিয়ে তিনি মিসওয়াক করা শেষ করলেন।

মহানবির ﷺ অন্যতম সুন্নাহ হলো মিসওয়াক।
চিত্র: মিসওয়াক মহানবির নিত্য ব্যবহার্য ছিল; চিত্রসূত্র – দারুস সালাম 

মহানবি ﷺ এর ইন্তেকাল

কিছুক্ষণ পরে আল্লাহর রাসুলের কথা শুনে হযরত আয়েশা (রা.) বুঝতে পারলেন যে, ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আঃ) এসে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি মহানবিকে ﷺ জানান, বাহিরে এক অপেক্ষমাণ ব্যক্তি ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন। আল্লাহর রাসুল অনুমতি দিলে, তিনি ভিতরে আসেন এবং জানান যে, তিনি মৃত্যুদূত হযরত আজরাইল (আঃ)। ফেরেশতা জানালেন যে, আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন মহানবির ﷺ কাছে যাতে মহানবি ﷺ পৃথিবীতে অবস্থান করা অথবা আপন রবের সাথে সাক্ষাতের মধ্যে কোনো একটি বাছাই করে নিতে পারেন। মহানবি ﷺ দ্বিতীয় বিকল্প বেছে নিলে হযরত আজরাইল (আঃ) তাঁর মাথার কাছে যান এবং বলেন, হে পুণ্যাত্মা, যাত্রা করো তোমার রবের সন্তুষ্টির প্রতি। সেই মুহূর্তে আল্লাহর রাসুল বলছিলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোত্তম বন্ধু সহসাই হযরত মুহাম্মদের হাত হযরত আয়েশার (রা.) থেকে পড়ে গেল এবং আয়েশা (রা.) নিজের কোলে মহানবির মাথা হঠাৎ করেই ভারী অনুভব করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহর রাসুল এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তাঁর রবের কাছে চলে গেছেন। 

মুহূর্তের জন্য হযরত আয়েশা (রা.) কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। কী করবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ পড়ে উঠে গিয়ে নিজের কক্ষের দরজা খুললেন এবং সেখানে উপস্থিত সকল মুসল্লিদের সামনে মহানবির ﷺ মৃত্যুর ঘোষণা দেন। 

উমর (রা.) মহানবির ﷺ মৃত্যুর খবর শুনে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি ঘোষণা দেন, যদি কেউ তাঁর সামনে বলে মহানবির মৃত্যুর কথা উচ্চারণ করে তবে তাঁর গর্দান যাবে। এরূপ অবস্থায় হযরত আবু বকর (রা.) এগিয়ে আসেন এবং মানুষের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, 

তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদের ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যারা কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে, জেনে রাখো নিশ্চয়ই আল্লাহ চিরঞ্জীব।৯ 

একথা শুনে হযরত উমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি নিজের তরবারি হাত থেকে ফেলে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অধিকাংশ লোক এমনভাবেই এই কথাটি শুনলো, যেন তারা জীবনে প্রথমবারের মত এই কথা শুনলো। যদিও তাঁরা পূর্বে রাসুলুল্লাহর মুখে এই কথা বহুবার শুনেছে, কিন্তু আজ রাসুলুল্লাহর মৃত্যুর পরে এই কথার আসল মর্ম তাঁদের সামনে প্রকটিত হলো। 

এরপরে প্রশ্ন উঠলো আল্লাহর রাসুল কোথায় সমাধিস্থ হবেন। এই প্রশ্নের জবাবে হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, তিনি জীবিতবস্থায় আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছেন যে, একজন মৃত নবি তাঁর মৃত্যুর স্থানেই সমাধিস্থ হন। এই কথা শুনে হযরত তালহা (রা.) নিজেই হযরত আয়েশার (রা.) কক্ষের খাট সরিয়ে খাটের স্থানেই কিছু মাটি কেটে চিহ্নিত করে রাখেন যাতে পরে আল্লাহর রাসুলকে সমাধিস্থ করতে গিয়ে স্থান শনাক্তকরণে সমস্যা তৈরি না হয়। 

পরবর্তীতে হযরত আলি (রা.) হযরত আব্বাস (রা.) সহ আরো বেশ কয়েকজন সাহাবি মিলে মহানবিকে ﷺ গোসল দেন। পরে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা হয়ে হযরত আয়েশার (রা.) কক্ষে ঢুকে তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করেন।১০ বুধবার রাতে আল্লাহর রাসুলকে ঐ স্থানেই দাফন করা হয়।১১

মহানবির ﷺ রওযা মোবারক।
চিত্র: মহানবির ﷺ রওজার বর্তমান অবস্থা; চিত্রসূত্র – ইসলামিক ল্যান্ডমার্ক  

মহানবি ﷺ চলে গেছেন কিন্তু উম্মাহর কাছে রেখে গেছেন আল্লাহ প্রেরিত আল কুরআন এবং তাঁর সারাজীবনের কর্মপন্থা সুন্নাহ। এই দুই জিনিসকে আঁকড়ে ধরেই মানুষ ইহকাল এবং পরকালের বৈতরণী সফলভাবে পার করতে পারবে। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সকলকে হেদায়াতের পথে রাখুন এবং রাসুলুল্লাহকে ﷺ জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন।

গ্রন্থসূত্র

  • ইবনে জাবির, মুহাম্মদ।তারিখ আল তাবারি।পৃষ্ঠা ১০৭
  •  ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ১/৬২
  • ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ১/২২, ৪২৯, ৪৪৯
  • ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ১/৯৯
  • ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ২/৬৩৮
  • ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ২/৬৪১
  • ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ৪৪৬৩
  • হিশাম, আবু মুহাম্মদ বিন। আস সিরাত আন নাবিয়্যাহ। ২/৬৫৫ 
  • ইবনে ইসমাইল আল বুখারি, মুহাম্মদ।সহিহ বুখারি। ১২৪১, ১২৪২
  • ১০ ইবনে ইয়াজিদ, মুহাম্মদ। সুনানে ইবনে মাজাহ। ১৬২৮
  • ১১ ইবনে হানবাল, আহমাদ। মুসনাদে আহমাদ। ২৩৬৪৬

তথ্যসূত্র

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on মহানবি (ﷺ) এর জীবনের শেষ দিনগুলোর ধারাবাহিক ঘটনাপঞ্জি

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!