মধু: অসাধারণ এই খাদ্যের উপকারিতা ও ব্যবহার

এন মাহমুদ
4.4
(5)
Bookmark

No account yet? Register

মধুর কথা মনে পড়লেই আমাদের সামনে আলে আসে মিষ্টি, চটচটে, গাঢ় ধূসর-কমলা বর্ণের এক তরল পদার্থের কথা। আমাদের মাঝে মধু খায়নি এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের সকলেই জানে যে মধু খাওয়া ভালো। তবে মধু সম্পর্কে জানা এতটুকুতেই আমরা সীমাবদ্ধ থাকি। অথচ মধু সম্পর্কে জানতে পারলে বেঁচে থাকার তাগিদে মধু খাওয়া ছাড়া কোন দিন পার করতে হবে তা ভাবতেই পারতাম না৷ আর তাই আজকের বিষয় হল এই মধু সম্পর্কে জানা৷ 

মধু সম্পর্কে অনেক ছোট থেকে জানলেও মধু যে মৌমাছিই তৈরি করে তা জানতে পারা যায় ছোট বেলায় মায়ের কোলে থেকে শোনা সেই নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা থেকে-

‘মৌমাছি, মৌমাছি 

কোথা যাও নাচি নাচি

দাঁড়াও না একবার ভাই।

ওই ফুল ফোটে বনে

যাই মধু আহরণে

দাঁড়াবার সময় তো নাই।’

মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছি
মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছি; চিত্রসূত্র: লেখক নিজে

মধু 

মৌমাছি ফুলের নেকটার থেকে মধু সংগ্রহ করে। এই নেকটারে থাকে ৮০-৯৫ শতাংশ পানি আর ৫-২০ শতাংশ সুগার। এই সুগার মৌমাছির পাকস্থলীতে থাকা ইনভার্টেজ নামক এনজাইম গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ৷ মৌমাছি এই নেকটার থেকে পানি বের করে দেয়। এভাবে চলতে চলতে একসময় সব সুগার গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজে পরিণত হলে ও পানির পরিমাণে প্রায় ১৭-১৮ শতাংশ হয়ে গেলে যা থাকে তাকেই আমরা মধু হিসেবে চিনে থাকি।

মধুতে থাকা উপাদান

এক চামচ মধুতে থাকে ৬৪ ক্যালোরি। তবে এটা জানাই যথেষ্ট নয়৷ মধুতে থাকে 

  • গ্লুকোজ ৩১%
  • ফ্রুক্টোজ ৩৮%
  • পানি ১৭%
  • ম্যাল্টোজ ৭%

এবং অংশ থাকে অন্যন্য পদার্থ। যার মধ্যে ভিটামিন থাকে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, ভিটামিন কে, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, নিয়াসিন।

মিনারেল হিসেবে থাকে থাকে ক্যালসিয়াম, কপার, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, জিংক, পটাশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি।

তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মধু থেকে ফ্যাট বা প্রোটিন কোনটাই থাকে না। এর পুরোটাই কার্বোহাইড্রেট।

উল্লেখ মধু সামান্য এসিডিক হয়ে থাকে।

এক চামচ মধু; চিত্রসূত্র: লেখক নিজে

শীতকালে জমে যাওয়া মধু

শীতকালে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণে মধু অনেক সময় জমে যায়। অনেকে মনে করেন মধু জমে যাওয়া মানে হল ভেজাল মধু। বাস্তব না সত্য নয়। মধু জমে গেলে তা কিছুক্ষণ রোদে বা মধুর পাত্রটি গরম পানি কিছুক্ষণ রাখলেই তা আগের অবস্থা তথা তরলে মধুতে পরিণত হয়।

ইতিহাস

গুহার চিত্রকর্ম থেকে দেখা যায় যে মানুষ প্রায় ৮০০০ বছর আগে থেকে মধু ব্যবহার করে আসছে। যদিও গুহা চিত্র ছাড়া অন্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না। তবে ৪০০০ বছর আগে থেকে যে মধু ব্যবহার করা হত তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ২১০০ খৃষ্টপূর্বে প্রাচীন মিশনে যুদ্ধের ময়দানে আহত সৈনিকের আঘাতপ্রাপ্ত অংশকে সারিয়ে তুলতে মধু ব্যবহার করা হত।

চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার

অন্যদের থেকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকগণ তাদের চিকিৎসায় সরাসরি মধুর ব্যবহার করে থাকেন। যার মধ্যে –

  • অস্বস্তি 
  • দূর্বলতা 
  • ঘুমে ব্যাঘাত
  • দাঁতে ব্যাথা
  • সর্দি কাশি
  • আলসার
  • ডায়রিয়া 
  • বমি
  • স্থুলতা 
  • জন্ডিস

ইত্যাদির চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। 

সুস্থ থাকতে মধুর ব্যবহার

১. মধুতে রয়েছে হরেক খাদ্যগুণ: মধু ঘন, মিষ্টি, তরল পদার্থ৷ মধুতে ভিটামিন ও খণিজ লবণের পরিমাণ কম থাকলেও উদ্ভিজ্জ পদার্থ বেশ পাওয়া যায়। 

২. মধুতে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট পদার্থ: এই এন্টি এক্সিডেন্ট পদার্থগুলো হার্ট অ্যাটাক, স্টোক এমনকি অনেক ধরনের ক্যান্সারেরও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

৩. মিষ্টি পদার্থ হলেও “খারাপ চিনি” র পরিমাণ কম থাকে এই মধুতে। 

৪. মধু লো ব্লাড প্রেশার এ সাহায্য করে। 

৫. মধুতে থাকে খারাপ কোলেস্টেরল এর পরিবর্তে ভাল কোলেস্টেরল। 

সকালের নাস্তায় মধু
সকালের নাস্তায় মধু; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

আরও পড়ুন: কফিনামা: কফি আবিষ্কার থেকে আজ অবধি

আধুনিক বিজ্ঞানে মধুর পুরোনো ধারণা

মধু যে বহু আগে থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে তা আগেই বলেছি৷ তবে আগে মধু সম্পর্কে যেসব ধারণা পোষণ করা হত তার অনেকগুলোই এখন বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণিত। এগুলোর কয়েকটি হল-

১. দগ্ধ ও আঘাত প্রাপ্ত স্থান নিরাময়: ক্রোকেন এর এক তথ্যে উঠে এসেছে মধু দগ্ধ স্থান নিরাময়ে বেশ কাজ করে। এমনকি অন্যান্য ওষুধের তুলনায় মধুর দাম কম হওয়ায় এবং পার্শপ্রতিক্রয়া না থাকায় এর ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহও দেয়া হয়েছে৷ যদিও বেশি দগ্ধ রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। 

২. ডায়রিয়া নিরাময়ে মধু কাজ করে৷ ডায়রিয়ার সময় মধু পটাশিয়াম এবং পানি গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে থাকে বলে ডায়রিয়া নিরাময়ে মধু খাওয়া হয়৷ যদিও শিশুদের ক্ষেত্রে তা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়ে থাকে৷ 

৩. মধু পাকস্থলীর এসিডিটি কমাতে পারে বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। 

প্রিয় মধু
প্রিয় মধু; চিত্রসূত্র: pixy

৪. ২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় যে মধু ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে কাজ করে থাকে।

৫. অনেকের ধারণা মধু MARS রোগের নিয়াময়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৬. তাছাড়া সর্দি জ্বরে যে মধু বেশ ভাল নিয়াময়ক হিসেবে কাজ করে তা আমরা সবাই জানি। এ বিষয়ে ২০০৭ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, রাত্রীকালীন সর্দি নিরাময় ও ভালো ঘুমের ক্ষেত্রে মধু বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়াও শ্বাসনালির সংক্রমণ নিয়াময়েও মধু ভূমিকা তুলে ধরা হয় এই গবেষণা পত্রে। যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকান একাডেমি অব পিডিয়াট্রিক্সও একে সমর্থন দেয়।

৭. মধু অন্য চিনির মতো মিষ্টি হলেও এর পার্শপ্রতিক্রিয়া বেশ কম। যার কারণে ডায়াবেটিস, স্থুলতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কামিয়ে দেয়, যদিও ব্যক্তির মিষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। 

এক খন্ড মৌচাক
এক খন্ড মৌচাক; চিত্রসূত্র: pixabay

ঝুঁকি

মধু ভাল মানে এই নয় যে খেয়েই যাব খেয়েই যাব। মনে রাখতে হবে যেকোন কিছুর অতিরিক্ত মানেই ক্ষতি। তেমনটা মধুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

খারাপ চিনির পরিমাণ কম থাকলে মনে রাখতে হবে মধু কিন্তু চিনি জাতীয় ই পদার্থ। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন এর মতে কোন নারীর উচিত হয় ১০০ ক্যালরির বেশি শক্তি চিনি থেকে নেয়া। যা পুরুষের জন্য ১৫০ ক্যালরি। যা মধুর জন্য ১০০ ক্যালরি সমান ২ টেবিল চামচ পরিমাণ ও ১৫০ ক্যালরি সমান ৩ টেবিল চামচ পরিমাণ। তাই অবশ্যই মধু খাওয়ার সময় এ কথা মনে রাখতে হবে।

এছাড়াও শিশুদের মধু খাওয়াতে নিষেধ করা হয়। কেননা অনেক সময়ই শিশু অবস্থায় শিশুদের পরিপাকতন্ত্রের পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে না৷ যার কারণে মধু ঠিকমত হজম হয় না৷ ফলে শিশুদের বটুলিজম দেখা দেয়। যদিও এ রোগ দূর্লভ তবু এক্ষেত্রে সতর্ক থাকাই জরুরি। 

সে যাইহোক মধু যে আমাদের নানা দিক দিয়ে সাহায্য করে থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মধুর বহুমুখী উপকারীতা জানলেও আমরা মধু খাওয়ার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠি আর ছুটে যায় ফার্স্ট ফুডের দিকে। আশা করি সকলের সকাল শুরু হোক এক চামচ মধু খাওয়ার মাধ্যমে।

প্রচ্ছদ সূত্র: pixabay

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on মধু: অসাধারণ এই খাদ্যের উপকারিতা ও ব্যবহার

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!